গল্পগল্প

চন্দনের ঘ্রাণ ও একটি নীল খাম

এফ আই রাজীব
এফ আই রাজীব
চন্দনের ঘ্রাণ ও একটি নীল খাম
ছবি- সংকলিত

আজ অরণীর আঠারো পূর্ণ হলো।

সকাল থেকেই বাড়িতে কেমন একটা থমথমে নীরবতা। প্রতি বছর এই দিনটিতে বাবা খুব ভোরে উঠে স্নান সেরে মন্দিরে যান। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অরণী জানে, বাবার এই নিভৃত প্রার্থনা শুধু তার মঙ্গলের জন্য নয়, বরং এই দিনের সাথে জড়িয়ে থাকা এক অপার্থিব স্মৃতির উদ্দেশ্যে।

দুপুরের দিকে বাবা ফিরে এলেন। তার চোখের কোণটা সামান্য লালচে। অরণীর মাথায় আশীর্বাদী ফুল ছুঁইয়ে দিয়ে মৃদু স্বরে বললেন, "আমার ঘরে আয় মা।"

বাবার পড়ার ঘরের পুরনো আলমারিটা খুলতেই এক অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ বের হয়। সেখান থেকে তিনি বের করে আনলেন নকশা করা একটি সেগুন কাঠের বাক্স। কাঠটা পুরনো হয়ে কালচে হয়ে গেছে, কিন্তু তার গায়ে খোদাই করা কাজগুলো এখনও অমলিন। বাবা বাক্সটা অরণীর হাতে দিয়ে বললেন, "তোর মা এই আমানতটা আমার কাছে রেখে গিয়েছিল। বলেছিল, যেদিন তুই আঠারো হবে— যেদিন পৃথিবীর রূঢ় বাস্তবতাকে বোঝার মতো বয়স তোর হবে, সেদিন যেন এটা তোকে দিই। নিজের ঘরে গিয়ে একা দেখিস।"

অরণী ধীর পায়ে নিজের ঘরে ফিরে এলো। জানলার ধারে বসে কাঁপাকাঁপা হাতে বাক্সের ডালাটা খুলতেই এক ঝলক চন্দনের তীব্র সুগন্ধ তার নাকে ঝাপটা দিল। ভেতরে কোনো দামী গয়না নেই, কোনো দামী উপহার নেই; আছে শুধু একটি নীল রঙের খাম। অরণী খামটা খুলে ভাঁজ করা কাগজটা হাতে নিল। কাগজের রং কিছুটা হলুদ হয়ে এসেছে, কিন্তু হাতের লেখাগুলো এখনও স্পষ্ট।

"প্রিয় অরণী,

জানিনা তোকে কী বলে ডাকব। আমার নাড়ির সাথে তোর যখন প্রথম বন্ধন তৈরি হলো, তখন থেকেই তোকে ভালোবেসে আমি এক নাম দিয়েছিলাম— 'অরণী'। অরণি মানে তো কাষ্ঠখণ্ড, যা থেকে আগুনের জন্ম হয়। তুইও ছিলি আমার জীবনের সেই আলো। ঠিক আঠারো বছর আগে যখন তুই আমার গভীরে তিল তিল করে বেড়ে উঠছিলিস, তখন পৃথিবীর আলো দেখার প্রবল এক আকুলতা তোর স্পন্দনে আমি টের পেতাম।

কিন্তু ভাগ্য বড় নিষ্ঠুর হয় রে মা। ডাক্তাররা বাবাকে বলেছিলেন, তোর জন্ম নিতে যাওয়া মানে আমার জীবনের প্রদীপটা নিভে যাওয়া। আমাকে আর তোকে— এই দুই সত্তার মাঝে একজনকে বেছে নেওয়ার দায় পড়েছিল তোর বাবার ওপর। তোর বাবা আমাকেই চেয়েছিলেন, কিন্তু আমি তো তোর প্রথম স্পন্দনটা নিজের রক্তে অনুভব করেছিলাম। মা হয়ে কী করে তোর পৃথিবীর আলো কেড়ে নিতাম? তোর বদলে আমি আমার বেঁচে থাকাকে গুরুত্ব দিতে পারিনি। আমি চেয়েছিলাম, আমি না থাকলেও আমার একটা অংশ এই পৃথিবীতে থাকুক। তুই বড় হবি, তোর চোখ দিয়ে আমি আকাশ দেখব, তোর হাসি দিয়ে আমি পৃথিবীর আনন্দ নেব।

জানি মা, তোর ছোটবেলায় আছাড় খেয়ে পড়ে যাওয়ার সময় তোকে টেনে তোলার জন্য আমার হাতটা ছিল না। বর্ষার দুপুরে গল্প শোনানোর জন্য আমি তোর পাশে ছিলাম না। কিন্তু বিশ্বাস কর, এই চিঠির প্রতিটি অক্ষরে আমার আঙুলের ছাপ আর চোখের জল মিশে আছে। তুই যখন এই চিঠিটা পড়বি, তখন আমি হয়তো কোনো দূর নক্ষত্র হয়ে তোকে দেখছি। তুই শুধু আমার সন্তানই না, তুই আমার অস্তিত্বের জয়গান। আজ থেকে তুই আর একা নোস, এই চন্দনের ঘ্রাণে আর আমার হাতের লেখায় আমি তোর পাশে থাকব আজীবন। বড় হ মা, অনেক বড় হ। মানুষের মতো মানুষ হয়ে দয়াময় ঈশ্বরের কাছে আমার সম্মান রাখিস।"

ইতি— তোর মা

চিঠিটা শেষ করে অরণী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার দু'চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে খামটার ওপর। সে ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছে, মায়েদের গায়ের একটা নিজস্ব ঘ্রাণ থাকে। এই সেগুন কাঠের বাক্স আর চিঠির ভাঁজ থেকে যে চন্দনের সুবাস আসছে, অরণীর মনে হলো এটাই তার মায়ের ঘ্রাণ।

সে চোখ বন্ধ করে চিঠিটা নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল। তার মনে হলো, একজোড়া অদৃশ্য হাত তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিচ্ছে। আঠারো বছরের অরণী আজ প্রথম অনুভব করল, সে অনাথ নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে দামী উপহারটি সে আজ হাতে পেয়েছে— তার মায়ের অমর ভালোবাসা। সারা ঘর চন্দনের গন্ধে মৌ মৌ করছে, যেন মা সত্যিই ঘরে এসে দাঁড়িয়েছেন তার মেয়ের জন্মদিন উদযাপন করতে।

বিষয় : গল্প ছোট গল্প

কাল মহাকাল

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬


চন্দনের ঘ্রাণ ও একটি নীল খাম

প্রকাশের তারিখ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

আজ অরণীর আঠারো পূর্ণ হলো।

সকাল থেকেই বাড়িতে কেমন একটা থমথমে নীরবতা। প্রতি বছর এই দিনটিতে বাবা খুব ভোরে উঠে স্নান সেরে মন্দিরে যান। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অরণী জানে, বাবার এই নিভৃত প্রার্থনা শুধু তার মঙ্গলের জন্য নয়, বরং এই দিনের সাথে জড়িয়ে থাকা এক অপার্থিব স্মৃতির উদ্দেশ্যে।

দুপুরের দিকে বাবা ফিরে এলেন। তার চোখের কোণটা সামান্য লালচে। অরণীর মাথায় আশীর্বাদী ফুল ছুঁইয়ে দিয়ে মৃদু স্বরে বললেন, "আমার ঘরে আয় মা।"

বাবার পড়ার ঘরের পুরনো আলমারিটা খুলতেই এক অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ বের হয়। সেখান থেকে তিনি বের করে আনলেন নকশা করা একটি সেগুন কাঠের বাক্স। কাঠটা পুরনো হয়ে কালচে হয়ে গেছে, কিন্তু তার গায়ে খোদাই করা কাজগুলো এখনও অমলিন। বাবা বাক্সটা অরণীর হাতে দিয়ে বললেন, "তোর মা এই আমানতটা আমার কাছে রেখে গিয়েছিল। বলেছিল, যেদিন তুই আঠারো হবে— যেদিন পৃথিবীর রূঢ় বাস্তবতাকে বোঝার মতো বয়স তোর হবে, সেদিন যেন এটা তোকে দিই। নিজের ঘরে গিয়ে একা দেখিস।"

অরণী ধীর পায়ে নিজের ঘরে ফিরে এলো। জানলার ধারে বসে কাঁপাকাঁপা হাতে বাক্সের ডালাটা খুলতেই এক ঝলক চন্দনের তীব্র সুগন্ধ তার নাকে ঝাপটা দিল। ভেতরে কোনো দামী গয়না নেই, কোনো দামী উপহার নেই; আছে শুধু একটি নীল রঙের খাম। অরণী খামটা খুলে ভাঁজ করা কাগজটা হাতে নিল। কাগজের রং কিছুটা হলুদ হয়ে এসেছে, কিন্তু হাতের লেখাগুলো এখনও স্পষ্ট।

"প্রিয় অরণী,

জানিনা তোকে কী বলে ডাকব। আমার নাড়ির সাথে তোর যখন প্রথম বন্ধন তৈরি হলো, তখন থেকেই তোকে ভালোবেসে আমি এক নাম দিয়েছিলাম— 'অরণী'। অরণি মানে তো কাষ্ঠখণ্ড, যা থেকে আগুনের জন্ম হয়। তুইও ছিলি আমার জীবনের সেই আলো। ঠিক আঠারো বছর আগে যখন তুই আমার গভীরে তিল তিল করে বেড়ে উঠছিলিস, তখন পৃথিবীর আলো দেখার প্রবল এক আকুলতা তোর স্পন্দনে আমি টের পেতাম।

কিন্তু ভাগ্য বড় নিষ্ঠুর হয় রে মা। ডাক্তাররা বাবাকে বলেছিলেন, তোর জন্ম নিতে যাওয়া মানে আমার জীবনের প্রদীপটা নিভে যাওয়া। আমাকে আর তোকে— এই দুই সত্তার মাঝে একজনকে বেছে নেওয়ার দায় পড়েছিল তোর বাবার ওপর। তোর বাবা আমাকেই চেয়েছিলেন, কিন্তু আমি তো তোর প্রথম স্পন্দনটা নিজের রক্তে অনুভব করেছিলাম। মা হয়ে কী করে তোর পৃথিবীর আলো কেড়ে নিতাম? তোর বদলে আমি আমার বেঁচে থাকাকে গুরুত্ব দিতে পারিনি। আমি চেয়েছিলাম, আমি না থাকলেও আমার একটা অংশ এই পৃথিবীতে থাকুক। তুই বড় হবি, তোর চোখ দিয়ে আমি আকাশ দেখব, তোর হাসি দিয়ে আমি পৃথিবীর আনন্দ নেব।

জানি মা, তোর ছোটবেলায় আছাড় খেয়ে পড়ে যাওয়ার সময় তোকে টেনে তোলার জন্য আমার হাতটা ছিল না। বর্ষার দুপুরে গল্প শোনানোর জন্য আমি তোর পাশে ছিলাম না। কিন্তু বিশ্বাস কর, এই চিঠির প্রতিটি অক্ষরে আমার আঙুলের ছাপ আর চোখের জল মিশে আছে। তুই যখন এই চিঠিটা পড়বি, তখন আমি হয়তো কোনো দূর নক্ষত্র হয়ে তোকে দেখছি। তুই শুধু আমার সন্তানই না, তুই আমার অস্তিত্বের জয়গান। আজ থেকে তুই আর একা নোস, এই চন্দনের ঘ্রাণে আর আমার হাতের লেখায় আমি তোর পাশে থাকব আজীবন। বড় হ মা, অনেক বড় হ। মানুষের মতো মানুষ হয়ে দয়াময় ঈশ্বরের কাছে আমার সম্মান রাখিস।"

ইতি— তোর মা

চিঠিটা শেষ করে অরণী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার দু'চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে খামটার ওপর। সে ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছে, মায়েদের গায়ের একটা নিজস্ব ঘ্রাণ থাকে। এই সেগুন কাঠের বাক্স আর চিঠির ভাঁজ থেকে যে চন্দনের সুবাস আসছে, অরণীর মনে হলো এটাই তার মায়ের ঘ্রাণ।

সে চোখ বন্ধ করে চিঠিটা নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল। তার মনে হলো, একজোড়া অদৃশ্য হাত তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিচ্ছে। আঠারো বছরের অরণী আজ প্রথম অনুভব করল, সে অনাথ নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে দামী উপহারটি সে আজ হাতে পেয়েছে— তার মায়ের অমর ভালোবাসা। সারা ঘর চন্দনের গন্ধে মৌ মৌ করছে, যেন মা সত্যিই ঘরে এসে দাঁড়িয়েছেন তার মেয়ের জন্মদিন উদযাপন করতে।


কাল মহাকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ সম্পাদক আলী
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত