মতামত
টেলিভিশনের পর্দায় সংসদ অধিবেশন দেখতে বসলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ একটা অদ্ভুত ক্লান্তি অনুভব করেন। একপক্ষ দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের পূর্বপুরুষ তুলে কটাক্ষ করছেন, আরেকপক্ষ অসংসদীয় ভাষায় পাল্টা তাচ্ছিল্য ছুড়ে দিচ্ছেন। কেউ নেতার গুণগান গাইছেন, কেউ উন্নয়নের ফিরিস্তি দিচ্ছেন—যার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব আকাশ-পাতাল। রিমোট বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে মানুষ ভাবেন, "এরা আসলে আমাদের জন্য কী করছেন?"
এই দৃশ্য নতুন নয়। কিন্তু এবার প্রশ্নটা আর আগের মতো নীরবে গিলে নেওয়ার সুযোগ নেই।
গত ৫ই আগস্ট যে রক্ত ঝরেছে, সে রক্তের একটাই মেসেজ—মানুষ এখন 'নেতা' চায় না, মানুষ চায় 'সমাধান'।
সংসদ যদি হতো দেশের সবচেয়ে বড় থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক
একটু কল্পনা করুন। একজন সংসদ সদস্য মাইক্রফোনের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের চরিত্র হননে ব্যস্ত না হয়ে তিনি বলছেন—"আমার নির্বাচনী এলাকায় গত ছয় মাসে কৃষি ও সেচব্যবস্থা নিয়ে আমি মাঠপর্যায়ে গবেষণা চালিয়েছি। পুরনো সেচপদ্ধতির কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ ৩০ শতাংশ বাড়ছে। এর সমাধানে তিনটি বৈজ্ঞানিক মডেল আমি প্রস্তাব করছি।"
শুনতে অনেকটা অলীক স্বপ্নের মতো লাগছে, তাই না? কিন্তু এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ আসলে খুব একটা দুর্গম নয়।
মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ যখন একটি পিছিয়ে পড়া দেশকে এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করছিলেন, তখন তাঁর নির্দেশনা ছিল একটাই—যেকোনো সমস্যার মূলে যেতে হবে, তথ্য-উপাত্ত দিয়ে কথা বলতে হবে। রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর নয়, দরকার কার্যকর সমাধান।
আমাদের সংসদও সেই পথে হাঁটতে পারে।
প্রতি ছয় মাসে একটি 'রিপোর্ট কার্ড'
প্রতিটি সংসদ সদস্যের জন্য ছয় মাস অন্তর একটি বাধ্যতামূলক গবেষণাপত্র পেশের বিধান চালু করা যেতে পারে। কেবল কেতাবি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নয়—সম্পূর্ণ মাঠনির্ভর, বাস্তবমুখী একটি থিসিস জমা দিতে হবে ।
তাঁর এলাকায় শিক্ষার হার কেন বাড়ছে না, রাস্তাঘাট কেন টেকসই হচ্ছে না, তরুণদের কর্মসংস্থান কোথায় আটকে যাচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর তাঁকে খুঁজতে হবে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে। তারপর সেই অনুসন্ধানের ফলাফল সমাধানের পথনির্দেশসহ সংসদে উপস্থাপন করতে হবে।
এই গবেষণাপত্রই হবে তাঁর 'রিপোর্ট কার্ড'। জনগণ দেখবেন, তাঁদের প্রতিনিধি কেবল দলীয় স্বার্থে নয়—মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে সত্যিকার অর্থে কাজ করছেন কি না।
ছোট জয়ে বড় বদল
একবারে পুরো দেশ পাল্টে দেওয়ার বড় বড় বুলি আমরা যথেষ্ট শুনেছি। এবার হয়তো সময় এসেছে ছোট ছোট সমস্যার দিকে মনোযোগ দেওয়ার।
সংসদে জমা পড়া সেরা গবেষণাপত্রগুলো থেকে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত প্রস্তাবগুলো বাছাই করতে একটি দলনিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। ধরুন, এ বছর লক্ষ্য নেওয়া হলো নদী ভাঙন রোধে সেরা তিনটি গবেষণা বাস্তবায়ন করা হবে। এভাবে প্রতি বছর একটি করে বড় সমস্যায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে হাত দিলে পাঁচ বছরে দেশ যে উচ্চতায় পৌঁছাবে, তা এখনকার কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যাবে।
সংসদ কাদা ছোড়াছুড়ির ময়দান থেকে বেরিয়ে একটি জাতীয় থিঙ্ক-ট্যাঙ্কে পরিণত হোক। এটি কোনো আদর্শবাদীর কাল্পনিক দাবি নয়—এটি একটি রক্তমাখা প্রজন্মের ন্যায্য প্রত্যাশা।

বুধবার, ০৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ মে ২০২৬
টেলিভিশনের পর্দায় সংসদ অধিবেশন দেখতে বসলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ একটা অদ্ভুত ক্লান্তি অনুভব করেন। একপক্ষ দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের পূর্বপুরুষ তুলে কটাক্ষ করছেন, আরেকপক্ষ অসংসদীয় ভাষায় পাল্টা তাচ্ছিল্য ছুড়ে দিচ্ছেন। কেউ নেতার গুণগান গাইছেন, কেউ উন্নয়নের ফিরিস্তি দিচ্ছেন—যার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব আকাশ-পাতাল। রিমোট বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে মানুষ ভাবেন, "এরা আসলে আমাদের জন্য কী করছেন?"
এই দৃশ্য নতুন নয়। কিন্তু এবার প্রশ্নটা আর আগের মতো নীরবে গিলে নেওয়ার সুযোগ নেই।
গত ৫ই আগস্ট যে রক্ত ঝরেছে, সে রক্তের একটাই মেসেজ—মানুষ এখন 'নেতা' চায় না, মানুষ চায় 'সমাধান'।
সংসদ যদি হতো দেশের সবচেয়ে বড় থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক
একটু কল্পনা করুন। একজন সংসদ সদস্য মাইক্রফোনের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের চরিত্র হননে ব্যস্ত না হয়ে তিনি বলছেন—"আমার নির্বাচনী এলাকায় গত ছয় মাসে কৃষি ও সেচব্যবস্থা নিয়ে আমি মাঠপর্যায়ে গবেষণা চালিয়েছি। পুরনো সেচপদ্ধতির কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ ৩০ শতাংশ বাড়ছে। এর সমাধানে তিনটি বৈজ্ঞানিক মডেল আমি প্রস্তাব করছি।"
শুনতে অনেকটা অলীক স্বপ্নের মতো লাগছে, তাই না? কিন্তু এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ আসলে খুব একটা দুর্গম নয়।
মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ যখন একটি পিছিয়ে পড়া দেশকে এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করছিলেন, তখন তাঁর নির্দেশনা ছিল একটাই—যেকোনো সমস্যার মূলে যেতে হবে, তথ্য-উপাত্ত দিয়ে কথা বলতে হবে। রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর নয়, দরকার কার্যকর সমাধান।
আমাদের সংসদও সেই পথে হাঁটতে পারে।
প্রতি ছয় মাসে একটি 'রিপোর্ট কার্ড'
প্রতিটি সংসদ সদস্যের জন্য ছয় মাস অন্তর একটি বাধ্যতামূলক গবেষণাপত্র পেশের বিধান চালু করা যেতে পারে। কেবল কেতাবি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নয়—সম্পূর্ণ মাঠনির্ভর, বাস্তবমুখী একটি থিসিস জমা দিতে হবে ।
তাঁর এলাকায় শিক্ষার হার কেন বাড়ছে না, রাস্তাঘাট কেন টেকসই হচ্ছে না, তরুণদের কর্মসংস্থান কোথায় আটকে যাচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর তাঁকে খুঁজতে হবে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে। তারপর সেই অনুসন্ধানের ফলাফল সমাধানের পথনির্দেশসহ সংসদে উপস্থাপন করতে হবে।
এই গবেষণাপত্রই হবে তাঁর 'রিপোর্ট কার্ড'। জনগণ দেখবেন, তাঁদের প্রতিনিধি কেবল দলীয় স্বার্থে নয়—মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে সত্যিকার অর্থে কাজ করছেন কি না।
ছোট জয়ে বড় বদল
একবারে পুরো দেশ পাল্টে দেওয়ার বড় বড় বুলি আমরা যথেষ্ট শুনেছি। এবার হয়তো সময় এসেছে ছোট ছোট সমস্যার দিকে মনোযোগ দেওয়ার।
সংসদে জমা পড়া সেরা গবেষণাপত্রগুলো থেকে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত প্রস্তাবগুলো বাছাই করতে একটি দলনিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। ধরুন, এ বছর লক্ষ্য নেওয়া হলো নদী ভাঙন রোধে সেরা তিনটি গবেষণা বাস্তবায়ন করা হবে। এভাবে প্রতি বছর একটি করে বড় সমস্যায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে হাত দিলে পাঁচ বছরে দেশ যে উচ্চতায় পৌঁছাবে, তা এখনকার কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যাবে।
সংসদ কাদা ছোড়াছুড়ির ময়দান থেকে বেরিয়ে একটি জাতীয় থিঙ্ক-ট্যাঙ্কে পরিণত হোক। এটি কোনো আদর্শবাদীর কাল্পনিক দাবি নয়—এটি একটি রক্তমাখা প্রজন্মের ন্যায্য প্রত্যাশা।
