চিত্র বিচিত্র
ভাবুন তো, এমন এক পাহাড় যেখানে মানুষ অক্সিজেনের অভাবে কয়েক ঘণ্টাও টিকতে হিমশিম খায়। অথচ সেই বরফঢাকা চূড়াতেই দিব্যি দৌড়ে বেড়াচ্ছে একটি ছোট্ট ইঁদুর! শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও এটাই বাস্তব। আর এই বিস্ময়কর প্রাণীর নাম ‘আন্দিয়ান লিফ-ইয়ার্ড মাউস'।
আন্দিজ পর্বতমালার ৬ হাজার ৭০০ মিটার বা প্রায় ২২ হাজার ফুট উচ্চতায় এ প্রাণীর সন্ধান মিলেছে। এত উঁচুতে কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর বসবাস একসময় অসম্ভব বলেই মনে করতেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে হাতের তালুতে ধরে ফেলা যায় এমন এই ক্ষুদে প্রাণী।
ছয় বছর আগে চিলির এক তুষারাবৃত পর্বতচূড়ায় প্রথম এদের দেখা মেলে। এরপর আন্তর্জাতিক গবেষকদের দীর্ঘ অনুসন্ধানে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে এর অবিশ্বাস্য অভিযোজনক্ষমতার রহস্য। সম্প্রতি *সায়েন্স* সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা নতুন করে আলোচনায় এনেছে এই প্রাণীটিকে।
মন্টানা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী জাখারি চেভিরনের ভাষায়, **পৃথিবীর সর্বোচ্চ উচ্চতায় বসবাসকারী স্তন্যপায়ী প্রাণীর বিশ্ব রেকর্ড এখন এদের দখলে।** শুধু তাই নয়, যে উচ্চতায় পর্বতারোহীরাও বেশিক্ষণ থাকতে পারেন না, সেখানে এরা স্বাভাবিকভাবেই জীবন কাটায়।
এর আগে সর্বোচ্চ উচ্চতায় বসবাসকারী স্তন্যপায়ী প্রাণী হিসেবে পরিচিত ছিল হিমালয়ান পিকা। কিন্তু আন্দিয়ান লিফ-ইয়ার্ড মাউসকে তারও কয়েক শ মিটার ওপরে পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই একই প্রজাতির ইঁদুরকে আবার সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছেও দেখা যায়। অর্থাৎ সমুদ্রতট থেকে শুরু করে প্রায় ২২ হাজার ফুট পর্যন্ত—এত বিশাল উচ্চতার ব্যবধানে টিকে থাকার নজির পৃথিবীর আর কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর নেই।
এত কম অক্সিজেনের পরিবেশে এরা কীভাবে বেঁচে থাকে?
গবেষণায় দেখা গেছে, নিচু এলাকা ও উঁচু পাহাড়ে থাকা ইঁদুরগুলোর জিনগত পার্থক্য খুবই সামান্য। তবে উচ্চভূমির ইঁদুরগুলোর কিছু বিশেষ জিন রয়েছে, যার একটি তিব্বতের মানুষের অক্সিজেনস্বল্প পরিবেশে অভিযোজনের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনের মতো।
আরও মজার বিষয়, অধিকাংশ স্তন্যপায়ীর মতো এরা বেশি লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করে না। বরং দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। এতে যে ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রভাব তৈরি হয়, তা সামলাতে ব্যবহার করে বিশেষ ধরনের পরিবর্তিত এনজাইম।
গবেষণাগারে করা পরীক্ষায় আরও দেখা গেছে, প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যেও শরীরের তাপ ধরে রাখার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে এই প্রাণীর।
বরফ, পাথর আর অক্সিজেনস্বল্প পরিবেশ—এটাই যেন যথেষ্ট কঠিন ছিল। কিন্তু বিস্ময় এখানেই শেষ নয়।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, এরা এমন কিছু দুর্লভ ও বিষাক্ত উদ্ভিদও খেতে পারে, যা অধিকাংশ প্রাণীর জন্য বিপজ্জনক। তাদের জিনোমে এমন কিছু জিনের সন্ধান মিলেছে, যা বিষাক্ত উপাদান ভেঙে শরীরের জন্য নিরাপদ করতে সাহায্য করে।
এই ক্ষুদে প্রাণী শুধু প্রাণিবিজ্ঞানেই নতুন প্রশ্ন তুলছে না, চিকিৎসাবিজ্ঞানেও খুলে দিতে পারে নতুন দিগন্ত।
হৃদরোগ, স্ট্রোক কিংবা শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতিজনিত নানা রোগে মানুষের কোষ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই ইঁদুরের অভিযোজন কৌশল গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে। এমনকি ক্যানসার গবেষণাতেও এর ভূমিকা থাকতে পারে, কারণ টিউমারের ভেতরেও অনেক সময় অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়।
একসময় বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, নির্দিষ্ট উচ্চতার পর স্তন্যপায়ী প্রাণীর পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। আন্দিয়ান লিফ-ইয়ার্ড মাউস সেই ধারণাকেই নতুন করে লিখতে বাধ্য করেছে।
মাত্র কয়েক ইঞ্চি লম্বা এই ইঁদুর যেন প্রকৃতির একটি বার্তা—জীবন অনেক সময় আমাদের কল্পনার চেয়েও বেশি সহনশীল, বেশি অভিযোজনক্ষম এবং অনেক বেশি বিস্ময়কর।
বিষয় : ‘আন্দিয়ান লিফ-ইয়ার্ড মাউস
2.png)
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুলাই ২০২৬
ভাবুন তো, এমন এক পাহাড় যেখানে মানুষ অক্সিজেনের অভাবে কয়েক ঘণ্টাও টিকতে হিমশিম খায়। অথচ সেই বরফঢাকা চূড়াতেই দিব্যি দৌড়ে বেড়াচ্ছে একটি ছোট্ট ইঁদুর! শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও এটাই বাস্তব। আর এই বিস্ময়কর প্রাণীর নাম ‘আন্দিয়ান লিফ-ইয়ার্ড মাউস'।
আন্দিজ পর্বতমালার ৬ হাজার ৭০০ মিটার বা প্রায় ২২ হাজার ফুট উচ্চতায় এ প্রাণীর সন্ধান মিলেছে। এত উঁচুতে কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর বসবাস একসময় অসম্ভব বলেই মনে করতেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে হাতের তালুতে ধরে ফেলা যায় এমন এই ক্ষুদে প্রাণী।
ছয় বছর আগে চিলির এক তুষারাবৃত পর্বতচূড়ায় প্রথম এদের দেখা মেলে। এরপর আন্তর্জাতিক গবেষকদের দীর্ঘ অনুসন্ধানে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে এর অবিশ্বাস্য অভিযোজনক্ষমতার রহস্য। সম্প্রতি *সায়েন্স* সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা নতুন করে আলোচনায় এনেছে এই প্রাণীটিকে।
মন্টানা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী জাখারি চেভিরনের ভাষায়, **পৃথিবীর সর্বোচ্চ উচ্চতায় বসবাসকারী স্তন্যপায়ী প্রাণীর বিশ্ব রেকর্ড এখন এদের দখলে।** শুধু তাই নয়, যে উচ্চতায় পর্বতারোহীরাও বেশিক্ষণ থাকতে পারেন না, সেখানে এরা স্বাভাবিকভাবেই জীবন কাটায়।
এর আগে সর্বোচ্চ উচ্চতায় বসবাসকারী স্তন্যপায়ী প্রাণী হিসেবে পরিচিত ছিল হিমালয়ান পিকা। কিন্তু আন্দিয়ান লিফ-ইয়ার্ড মাউসকে তারও কয়েক শ মিটার ওপরে পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই একই প্রজাতির ইঁদুরকে আবার সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছেও দেখা যায়। অর্থাৎ সমুদ্রতট থেকে শুরু করে প্রায় ২২ হাজার ফুট পর্যন্ত—এত বিশাল উচ্চতার ব্যবধানে টিকে থাকার নজির পৃথিবীর আর কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর নেই।
এত কম অক্সিজেনের পরিবেশে এরা কীভাবে বেঁচে থাকে?
গবেষণায় দেখা গেছে, নিচু এলাকা ও উঁচু পাহাড়ে থাকা ইঁদুরগুলোর জিনগত পার্থক্য খুবই সামান্য। তবে উচ্চভূমির ইঁদুরগুলোর কিছু বিশেষ জিন রয়েছে, যার একটি তিব্বতের মানুষের অক্সিজেনস্বল্প পরিবেশে অভিযোজনের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনের মতো।
আরও মজার বিষয়, অধিকাংশ স্তন্যপায়ীর মতো এরা বেশি লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করে না। বরং দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। এতে যে ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রভাব তৈরি হয়, তা সামলাতে ব্যবহার করে বিশেষ ধরনের পরিবর্তিত এনজাইম।
গবেষণাগারে করা পরীক্ষায় আরও দেখা গেছে, প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যেও শরীরের তাপ ধরে রাখার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে এই প্রাণীর।
বরফ, পাথর আর অক্সিজেনস্বল্প পরিবেশ—এটাই যেন যথেষ্ট কঠিন ছিল। কিন্তু বিস্ময় এখানেই শেষ নয়।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, এরা এমন কিছু দুর্লভ ও বিষাক্ত উদ্ভিদও খেতে পারে, যা অধিকাংশ প্রাণীর জন্য বিপজ্জনক। তাদের জিনোমে এমন কিছু জিনের সন্ধান মিলেছে, যা বিষাক্ত উপাদান ভেঙে শরীরের জন্য নিরাপদ করতে সাহায্য করে।
এই ক্ষুদে প্রাণী শুধু প্রাণিবিজ্ঞানেই নতুন প্রশ্ন তুলছে না, চিকিৎসাবিজ্ঞানেও খুলে দিতে পারে নতুন দিগন্ত।
হৃদরোগ, স্ট্রোক কিংবা শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতিজনিত নানা রোগে মানুষের কোষ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই ইঁদুরের অভিযোজন কৌশল গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে। এমনকি ক্যানসার গবেষণাতেও এর ভূমিকা থাকতে পারে, কারণ টিউমারের ভেতরেও অনেক সময় অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়।
একসময় বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, নির্দিষ্ট উচ্চতার পর স্তন্যপায়ী প্রাণীর পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। আন্দিয়ান লিফ-ইয়ার্ড মাউস সেই ধারণাকেই নতুন করে লিখতে বাধ্য করেছে।
মাত্র কয়েক ইঞ্চি লম্বা এই ইঁদুর যেন প্রকৃতির একটি বার্তা—জীবন অনেক সময় আমাদের কল্পনার চেয়েও বেশি সহনশীল, বেশি অভিযোজনক্ষম এবং অনেক বেশি বিস্ময়কর।
2.png)