কমলাপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মধ্যবয়সী মানুষ। হাতে ঘড়ি, চোখে ক্লান্তি, মনে হিসাব— আজো না জানি পৌঁছাতে কত দেরি হবে। এরই মধ্যে মাইকে ভেসে আসে সেই চিরচেনা ঘোষণা, "যাত্রীসাধারণের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, ট্রেনটি পাঁচ মিনিট বিলম্বে চলাচল করবে।" কেউ একটু বিরক্ত হন, কেউ কাঁধ ঝাঁকিয়ে মেনে নেন, বেশিরভাগ মানুষই কিছু বলেন না। কারণ এই পাঁচ মিনিট আমাদের কাছে আর খবর নয়, অভ্যাস। অথচ এই "সামান্য" পাঁচ মিনিটই যে আসলে একটি জাতির অর্থনীতি, রাজনীতি আর সামাজিক মূল্যবোধের গভীরে বসে থাকা এক পুরনো ব্যাধির লক্ষণ— সেটা আমরা কখনো ভেবে দেখি না।
সমস্যাটা শুধু ট্রেনেরই এমনটা নয়। সচিবালয়ের ফাইল টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরতে ঘুরতে মাস পার করে দেয়। ব্যাংক ঋণের একটি চিঠির জবাব আসতে লাগে সপ্তাহের পর সপ্তাহ। একটি সেতুর কাজ শুরুর কথা ছিল যেদিন, তার তিন বছর পর টেন্ডার হয়। মন্ত্রীর ভাষণে বলা "আগামী বছরের মধ্যে" আসলে মানে দাঁড়ায় অনির্দিষ্টকাল। আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে সময় একটি আপেক্ষিক ধারণা— যা মানা না-মানা দুটোই সমান স্বাভাবিক। আর এই সংস্কৃতিই ধীরে ধীরে গিলে খাচ্ছে আমাদের সম্ভাবনার একটা বিশাল অংশ।
সময়ানুবর্তিতা আসলে একটি সমাজের পারস্পরিক বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। যে সমাজে মানুষ একে অপরের কথা রাখবে বলে ভরসা করতে পারে, সেখানে সময়ও রক্ষা পায়। বাংলাদেশে সমস্যাটা উল্টো দিক থেকে শুরু হয়— আমরা ধরেই নিই, কেউ সময়মতো আসবে না, তাই আগেভাগেই নিজের প্রত্যাশা কমিয়ে রাখি। একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের কার্ডে লেখা সময়ের সাথে বাস্তবের সময়ের ফারাক, একটি সভার নির্ধারিত সময় ও প্রকৃত শুরুর সময়ের ফারাক— এসব এখন রসিকতার বিষয়। কিন্তু এই রসিকতার আড়ালে লুকিয়ে আছে একধরনের সামষ্টিক আত্মসমর্পণ। আমরা মেনে নিয়েছি যে ব্যবস্থা বদলাবে না, তাই নিজেদের অভ্যাস দিয়েই সেই ব্যর্থতাকে ঢেকে রাখি।
এই সংস্কৃতির মাশুল সবচেয়ে বেশি দিতে হয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে। একজন পোশাক শ্রমিক যখন যানজটে আটকে কারখানায় দেরি করে পৌঁছান, তার বেতন থেকে কাটা যায় টাকা। একজন দিনমজুর কাজের জায়গায় দেরিতে পৌঁছালে হারান সেদিনের পুরো মজুরি। অথচ যে কারণে তিনি দেরি করেছেন— অপরিকল্পিত সড়ক, অনিয়মিত গণপরিবহন, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা— সে দায় তার নয় । এখানেই সামাজিক সংকটের আসল রূপ ফুটে ওঠে: ব্যবস্থার ব্যর্থতার মূল্য পরিশোধ করতে হয় সবচেয়ে কম ক্ষমতাবান মানুষদের।
রাজনীতির মাঠে সময় একটি প্রতিশ্রুতির নাম— এবংএ ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি করাই হয় যেন তা ভাঙার জন্য। সরকারি কর্মকান্ডে যেন সময় অসীম এককে মাপা হয়। যদি বলে "একনেকে অনুমোদিত হয়েছে,বাস্তবায়ন ছয় মাসে", বাস্তবে লাগে তিন বছর। মেগা প্রকল্প উদ্বোধনের তারিখ পিছিয়ে যায় বারবার, অথচ প্রতিবার নতুন তারিখ ঘোষণার সময় জনগণকে তা মেনে নিতে বলা হয় স্বাভাবিক নিয়তি হিসেবে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো জবাবদিহিতার অভাব। একটি প্রকল্প দেরিতে শেষ হলে কে দায় নেবে, তা নির্ধারণের কোনো স্বচ্ছ ব্যবস্থা আমাদের নেই। ফাইল আটকে থাকলে কর্মকর্তা বলেন উপরের নির্দেশের অপেক্ষা, উপরওয়ালা বলেন নীতিগত জটিলতা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বলেন আমলাতান্ত্রিক বাধা— শেষ পর্যন্ত দায় কারো ঘাড়ে বসে না, ভাসতে থাকে হাওয়ায় আর ভোগান্তিতে প্রান্তিক জনগণ।
রাজনৈতিক দলবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের অগ্রাধিকারও বদলে যায়— একটি সরকারের শুরু করা কাজ পরের সরকার অগ্রাধিকার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেয়, ফলে বছরের পর বছর একই প্রকল্প অর্ধেক অবস্থায় পড়ে থাকে। এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থাতেও চিড় ধরায়— কারণ কেউ জানে না, আজকের নীতি আগামীকাল টিকবে কি না।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্সে বাংলাদেশ ১৩৯টি দেশের মধ্যে ৮৮তম অবস্থানে রয়েছে, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত ৩৮তম ও শ্রীলঙ্কা ৭৩তম স্থানে। উন্নতি হয়েছে ঠিকই, বিশেষত কাস্টমস ব্যবস্থাপনা ও সময়ানুবর্তিতার ক্ষেত্রে, কিন্তু অবকাঠামোর মান এবং পণ্য ট্র্যাকিং-ট্রেসিং সক্ষমতায় বাংলাদেশ বরং পিছিয়েছে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শীর্ষে থাকা দেশগুলোর দিকে তাকালে পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে— সিঙ্গাপুর ও ফিনল্যান্ড ৫-এর মধ্যে ৪.৩ ও ৪.২ স্কোর নিয়ে শীর্ষে, আর বাংলাদেশের স্কোর মাত্র ২.৬। এই পার্থক্যটুকুই আসলে প্রতিদিনের সেই পাঁচ মিনিট দেরির সামষ্টিক রূপ।
সময়ের এই অদক্ষতা সরাসরি প্রভাব ফেলে রপ্তানি প্রতিযোগিতায়। একটি কনটেইনার নির্ধারিত সময়ে বন্দর থেকে বের হতে না পারলে জাহাজ ধরতে ব্যর্থ হয়, আর তখন উদ্যোক্তাকে বাধ্য হয়ে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হয়— যার খরচ সমুদ্রপথের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। একবার এমন ঘটনা ঘটলে ক্রেতার আস্থা নষ্ট হয়, পরের অর্ডারটি হয়তো চলে যায় প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দেশে। এভাবে একটি ছোট বিলম্ব ধীরে ধীরে রূপ নেয় বাজার হারানোর গল্পে। ঢাকার যানজটের কারণে বছরে যে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তার একটি বড় অংশই আসলে এই ধরনের হারানো সুযোগের মূল্য— যা কোনো হিসাবের খাতায় সরাসরি দেখা যায় না, কিন্তু জাতীয় প্রবৃদ্ধির গতি রোধ করে দেয় নিঃশব্দে।
বাংলাদেশে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিলম্ব নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মূল কমিটিগুলো— প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি ও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি— অনেক সময় সঠিকভাবে গঠিতই হয় না। অল্প সংখ্যক জনবল অতিরিক্ত সংখ্যক প্রকল্প প্রস্তাবনা প্রস্তুতিতে যুক্ত থাকায় নথির মানও প্রভাবিত হয়, যা পরবর্তীতে বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আরও চমকপ্রদ তথ্য হলো, সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ মনে করেন, প্রকল্প পরিচালকের ঘন ঘন বদলিই প্রকল্পের গতি নষ্ট করার একটি বড় কারণ।
এই চিত্র শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি— যেখানে "প্রপার চ্যানেল", "প্রপার স্বাক্ষর", "প্রপার সংযুক্তি"র নামে একটি ফাইল টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরতে থাকে, অথচ প্রতিটি ধাপে সবাই জানেন সিদ্ধান্তটা কী হওয়া উচিত। বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে আলোচনায়ও বারবার উঠে আসে এই প্রসঙ্গ— প্রবাসী বিনিয়োগকারীরাও বলছেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সরকারের সহযোগিতার ঘাটতিই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। একটি লাইসেন্স পেতে, একটি অনুমোদন নিতে যত বেশি দপ্তরে যেতে হয়, প্রকল্প তত বেশি দেরিতে মাটিতে গড়ায়— আর এই দেরির প্রতিটি দিনের সুদ গুনতে হয় জাতিকেই।
এই সংকট থেকে বেরোনোর পথ খুঁজতে হলে প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, দায়টা একরৈখিক নয়— এটি ছড়িয়ে আছে সমাজের প্রতিটি স্তরে। প্রতিটি স্তরের জন্য পরিবর্তনের পথও আলাদা।
ব্যক্তি পর্যায়ে সময়ানুবর্তিতাকে ব্যক্তিগত সততার অংশ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি তৈরি করা জরুরি। এটি হয়তো শোনাবে ছোট একটি কথা, কিন্তু একটি জাতির অভ্যাস আসলে ব্যক্তিগত অভ্যাসেরই সমষ্টি। স্কুল থেকেই সময়ানুবর্তিতাকে শৃঙ্খলার অংশ হিসেবে শেখানো, কর্মক্ষেত্রে সময়মতো উপস্থিতিকে দক্ষতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা— এই ছোট ছোট চর্চাই দীর্ঘমেয়াদে সংস্কৃতি বদলায়।
প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট দায়বদ্ধতার কাঠামো। রেল হোক বা সড়ক পরিবহন, প্রতিটি বিলম্বের জন্য কারণ নথিভুক্ত করা এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করার ব্যবস্থা থাকা উচিত। যে প্রতিষ্ঠান বারবার নির্ধারিত সময়সূচি ভঙ্গ করে, তার জন্য সুনির্দিষ্ট জবাবদিহিতার ব্যবস্থা— এটি বিলাসিতা নয়, মৌলিক প্রশাসনিক সংস্কার।
আমলাতান্ত্রিক পর্যায়ে সবচেয়ে জরুরি হলো ফাইল চলাচলের ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা, যেখানে একটি ফাইল কোন টেবিলে কতদিন আটকে থাকল তা স্বচ্ছভাবে দেখা যাবে। প্রকল্প পরিচালকদের ঘন ঘন বদলি বন্ধ করে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া, এবং একাধিক দপ্তরের অনুমোদনের বদলে একক জানালা সেবা (ওয়ান-স্টপ সার্ভিস) বাস্তবায়ন করা— এই দুটি পদক্ষেপই বহু প্রকল্পের গতি বাড়িয়ে দিতে পারে।
নীতিনির্ধারণী ও রাজনৈতিক পর্যায়ে প্রয়োজন প্রকল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষার একটি জাতীয় সমঝোতা— যাতে সরকার বদল হলেও চলমান জনস্বার্থমূলক প্রকল্প থেমে না যায়। পাশাপাশি, প্রতিশ্রুত সময়সীমা অতিক্রম করলে তার ব্যাখ্যা জনসমক্ষে দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করা প্রয়োজন— জবাবদিহিতা যত প্রকাশ্য হবে, বিলম্বের সংস্কৃতি তত দুর্বল হবে।
জাপানের বুলেট ট্রেনের গড় বিলম্ব সেকেন্ডের হিসাবে মাপা হয়— এটি নিছক গর্বের বিষয় নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক দর্শনের ফল। "জাস্ট ইন টাইম" ব্যবস্থাপনা মডেল, যা মূলত জাপানি শিল্পক্ষেত্র থেকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়েছে, ধরেই নেয় যে সময়ের প্রতিটি মিনিট একটি সম্পদ— অপচয় করলে তার মূল্য সরাসরি উৎপাদন খরচে যোগ হয়। সিঙ্গাপুরের মতো দেশ, যাদের প্রাকৃতিক সম্পদ প্রায় নেই বললেই চলে, বিশ্ব লজিস্টিকস র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে ওঠার পেছনে মূল হাতিয়ার হয়েছে দক্ষ সময় ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা।
তুলনায় বাংলাদেশের অগ্রগতি বিচ্ছিন্ন হলেও অর্থবহ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাস্টমস ও সময়ানুবর্তিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে, মূলত চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের কার্যক্রম উন্নত হওয়ায়। এটি প্রমাণ করে যে সদিচ্ছা ও লক্ষ্যভিত্তিক সংস্কার থাকলে পরিবর্তন সম্ভব— সমস্যাটা সক্ষমতার নয়, অগ্রাধিকারের। যেসব দেশ পিছিয়ে থেকেও এগিয়ে গেছে, তাদের প্রতিটির গল্পেই একটি সাধারণ সূত্র মেলে: প্রথমে তারা সময়কে একটি জাতীয় সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তারপর তার অপচয় রোধে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছে।
স্বল্পমেয়াদে, প্রতিটি সরকারি পরিবহন ও সেবা সংস্থার জন্য একটি প্রকাশ্য সময়সূচি-পালন হার (অন-টাইম পারফরম্যান্স রেট) নির্ধারণ ও নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে— যা জনগণকে জবাবদিহিতা দাবি করার একটি সুনির্দিষ্ট হাতিয়ার দেবে। পাশাপাশি বন্দর ও কাস্টমস প্রক্রিয়ার ডিজিটাইজেশন আরও সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন, যেহেতু এই খাতে ইতিমধ্যে অর্জিত অগ্রগতি দেখাচ্ছে যে দ্রুত ফল পাওয়া সম্ভব।
মধ্যমেয়াদে, সরকারি ফাইল ব্যবস্থাপনার সম্পূর্ণ ডিজিটাইজেশন এবং প্রকল্প পরিচালকদের চাকরির মেয়াদ-নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে একটি প্রকল্প শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই নেতৃত্বে বাস্তবায়িত হতে পারে। গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়িয়ে প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতা তৈরি করাও ফলপ্রসূ হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে, প্রয়োজন একটি সাংস্কৃতিক রূপান্তর— যেখানে সময়ানুবর্তিতা শেখানো হবে শিক্ষাব্যবস্থার অংশ হিসেবে, আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রকল্প ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য দলনিরপেক্ষ একটি জাতীয় কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে, যাতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জনস্বার্থমূলক প্রকল্পগুলো থমকে না যায়।
স্টেশনের সেই ঘোষণাটা আসলে শুধু একটি ট্রেনের দেরির খবর নয়— এটি একটি জাতির সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের একটি প্রতিচ্ছবি। যতদিন আমরা এই পাঁচ মিনিটকে "সামান্য" বলে উড়িয়ে দেব, ততদিন আমাদের অর্থনীতি নিঃশব্দে রক্ত ঝরাতে থাকবে। মেগা প্রকল্পের চকচকে উদ্বোধন কিংবা উন্নয়নের বড় বড় সংখ্যা তখনই অর্থবহ হবে, যখন আমরা প্রতিদিনের ছোট ছোট সময়-অপচয়গুলো বন্ধ করতে শিখব। কারণ একটি জাতির অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত মাপা হয় তার বড় স্বপ্নে নয়, তার প্রতিদিনের অভ্যাসে। আর সেই অভ্যাস বদলানোর কাজটা শুরু হতে পারে আজই— একটি ট্রেন সময়মতো ছাড়ার মধ্য দিয়ে, একটি ফাইল সময়মতো সই হওয়ার মধ্য দিয়ে, একটি প্রতিশ্রুতি সময়মতো রক্ষা হওয়ার মধ্য দিয়ে।
বিষয় : সময়ের অপরাধ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ
2.png)
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুলাই ২০২৬
কমলাপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মধ্যবয়সী মানুষ। হাতে ঘড়ি, চোখে ক্লান্তি, মনে হিসাব— আজো না জানি পৌঁছাতে কত দেরি হবে। এরই মধ্যে মাইকে ভেসে আসে সেই চিরচেনা ঘোষণা, "যাত্রীসাধারণের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, ট্রেনটি পাঁচ মিনিট বিলম্বে চলাচল করবে।" কেউ একটু বিরক্ত হন, কেউ কাঁধ ঝাঁকিয়ে মেনে নেন, বেশিরভাগ মানুষই কিছু বলেন না। কারণ এই পাঁচ মিনিট আমাদের কাছে আর খবর নয়, অভ্যাস। অথচ এই "সামান্য" পাঁচ মিনিটই যে আসলে একটি জাতির অর্থনীতি, রাজনীতি আর সামাজিক মূল্যবোধের গভীরে বসে থাকা এক পুরনো ব্যাধির লক্ষণ— সেটা আমরা কখনো ভেবে দেখি না।
সমস্যাটা শুধু ট্রেনেরই এমনটা নয়। সচিবালয়ের ফাইল টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরতে ঘুরতে মাস পার করে দেয়। ব্যাংক ঋণের একটি চিঠির জবাব আসতে লাগে সপ্তাহের পর সপ্তাহ। একটি সেতুর কাজ শুরুর কথা ছিল যেদিন, তার তিন বছর পর টেন্ডার হয়। মন্ত্রীর ভাষণে বলা "আগামী বছরের মধ্যে" আসলে মানে দাঁড়ায় অনির্দিষ্টকাল। আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে সময় একটি আপেক্ষিক ধারণা— যা মানা না-মানা দুটোই সমান স্বাভাবিক। আর এই সংস্কৃতিই ধীরে ধীরে গিলে খাচ্ছে আমাদের সম্ভাবনার একটা বিশাল অংশ।
সময়ানুবর্তিতা আসলে একটি সমাজের পারস্পরিক বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। যে সমাজে মানুষ একে অপরের কথা রাখবে বলে ভরসা করতে পারে, সেখানে সময়ও রক্ষা পায়। বাংলাদেশে সমস্যাটা উল্টো দিক থেকে শুরু হয়— আমরা ধরেই নিই, কেউ সময়মতো আসবে না, তাই আগেভাগেই নিজের প্রত্যাশা কমিয়ে রাখি। একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের কার্ডে লেখা সময়ের সাথে বাস্তবের সময়ের ফারাক, একটি সভার নির্ধারিত সময় ও প্রকৃত শুরুর সময়ের ফারাক— এসব এখন রসিকতার বিষয়। কিন্তু এই রসিকতার আড়ালে লুকিয়ে আছে একধরনের সামষ্টিক আত্মসমর্পণ। আমরা মেনে নিয়েছি যে ব্যবস্থা বদলাবে না, তাই নিজেদের অভ্যাস দিয়েই সেই ব্যর্থতাকে ঢেকে রাখি।
এই সংস্কৃতির মাশুল সবচেয়ে বেশি দিতে হয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে। একজন পোশাক শ্রমিক যখন যানজটে আটকে কারখানায় দেরি করে পৌঁছান, তার বেতন থেকে কাটা যায় টাকা। একজন দিনমজুর কাজের জায়গায় দেরিতে পৌঁছালে হারান সেদিনের পুরো মজুরি। অথচ যে কারণে তিনি দেরি করেছেন— অপরিকল্পিত সড়ক, অনিয়মিত গণপরিবহন, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা— সে দায় তার নয় । এখানেই সামাজিক সংকটের আসল রূপ ফুটে ওঠে: ব্যবস্থার ব্যর্থতার মূল্য পরিশোধ করতে হয় সবচেয়ে কম ক্ষমতাবান মানুষদের।
রাজনীতির মাঠে সময় একটি প্রতিশ্রুতির নাম— এবংএ ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি করাই হয় যেন তা ভাঙার জন্য। সরকারি কর্মকান্ডে যেন সময় অসীম এককে মাপা হয়। যদি বলে "একনেকে অনুমোদিত হয়েছে,বাস্তবায়ন ছয় মাসে", বাস্তবে লাগে তিন বছর। মেগা প্রকল্প উদ্বোধনের তারিখ পিছিয়ে যায় বারবার, অথচ প্রতিবার নতুন তারিখ ঘোষণার সময় জনগণকে তা মেনে নিতে বলা হয় স্বাভাবিক নিয়তি হিসেবে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো জবাবদিহিতার অভাব। একটি প্রকল্প দেরিতে শেষ হলে কে দায় নেবে, তা নির্ধারণের কোনো স্বচ্ছ ব্যবস্থা আমাদের নেই। ফাইল আটকে থাকলে কর্মকর্তা বলেন উপরের নির্দেশের অপেক্ষা, উপরওয়ালা বলেন নীতিগত জটিলতা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বলেন আমলাতান্ত্রিক বাধা— শেষ পর্যন্ত দায় কারো ঘাড়ে বসে না, ভাসতে থাকে হাওয়ায় আর ভোগান্তিতে প্রান্তিক জনগণ।
রাজনৈতিক দলবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের অগ্রাধিকারও বদলে যায়— একটি সরকারের শুরু করা কাজ পরের সরকার অগ্রাধিকার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেয়, ফলে বছরের পর বছর একই প্রকল্প অর্ধেক অবস্থায় পড়ে থাকে। এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থাতেও চিড় ধরায়— কারণ কেউ জানে না, আজকের নীতি আগামীকাল টিকবে কি না।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্সে বাংলাদেশ ১৩৯টি দেশের মধ্যে ৮৮তম অবস্থানে রয়েছে, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত ৩৮তম ও শ্রীলঙ্কা ৭৩তম স্থানে। উন্নতি হয়েছে ঠিকই, বিশেষত কাস্টমস ব্যবস্থাপনা ও সময়ানুবর্তিতার ক্ষেত্রে, কিন্তু অবকাঠামোর মান এবং পণ্য ট্র্যাকিং-ট্রেসিং সক্ষমতায় বাংলাদেশ বরং পিছিয়েছে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শীর্ষে থাকা দেশগুলোর দিকে তাকালে পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে— সিঙ্গাপুর ও ফিনল্যান্ড ৫-এর মধ্যে ৪.৩ ও ৪.২ স্কোর নিয়ে শীর্ষে, আর বাংলাদেশের স্কোর মাত্র ২.৬। এই পার্থক্যটুকুই আসলে প্রতিদিনের সেই পাঁচ মিনিট দেরির সামষ্টিক রূপ।
সময়ের এই অদক্ষতা সরাসরি প্রভাব ফেলে রপ্তানি প্রতিযোগিতায়। একটি কনটেইনার নির্ধারিত সময়ে বন্দর থেকে বের হতে না পারলে জাহাজ ধরতে ব্যর্থ হয়, আর তখন উদ্যোক্তাকে বাধ্য হয়ে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হয়— যার খরচ সমুদ্রপথের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। একবার এমন ঘটনা ঘটলে ক্রেতার আস্থা নষ্ট হয়, পরের অর্ডারটি হয়তো চলে যায় প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দেশে। এভাবে একটি ছোট বিলম্ব ধীরে ধীরে রূপ নেয় বাজার হারানোর গল্পে। ঢাকার যানজটের কারণে বছরে যে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তার একটি বড় অংশই আসলে এই ধরনের হারানো সুযোগের মূল্য— যা কোনো হিসাবের খাতায় সরাসরি দেখা যায় না, কিন্তু জাতীয় প্রবৃদ্ধির গতি রোধ করে দেয় নিঃশব্দে।
বাংলাদেশে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিলম্ব নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মূল কমিটিগুলো— প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি ও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি— অনেক সময় সঠিকভাবে গঠিতই হয় না। অল্প সংখ্যক জনবল অতিরিক্ত সংখ্যক প্রকল্প প্রস্তাবনা প্রস্তুতিতে যুক্ত থাকায় নথির মানও প্রভাবিত হয়, যা পরবর্তীতে বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আরও চমকপ্রদ তথ্য হলো, সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ মনে করেন, প্রকল্প পরিচালকের ঘন ঘন বদলিই প্রকল্পের গতি নষ্ট করার একটি বড় কারণ।
এই চিত্র শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি— যেখানে "প্রপার চ্যানেল", "প্রপার স্বাক্ষর", "প্রপার সংযুক্তি"র নামে একটি ফাইল টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরতে থাকে, অথচ প্রতিটি ধাপে সবাই জানেন সিদ্ধান্তটা কী হওয়া উচিত। বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে আলোচনায়ও বারবার উঠে আসে এই প্রসঙ্গ— প্রবাসী বিনিয়োগকারীরাও বলছেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সরকারের সহযোগিতার ঘাটতিই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। একটি লাইসেন্স পেতে, একটি অনুমোদন নিতে যত বেশি দপ্তরে যেতে হয়, প্রকল্প তত বেশি দেরিতে মাটিতে গড়ায়— আর এই দেরির প্রতিটি দিনের সুদ গুনতে হয় জাতিকেই।
এই সংকট থেকে বেরোনোর পথ খুঁজতে হলে প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, দায়টা একরৈখিক নয়— এটি ছড়িয়ে আছে সমাজের প্রতিটি স্তরে। প্রতিটি স্তরের জন্য পরিবর্তনের পথও আলাদা।
ব্যক্তি পর্যায়ে সময়ানুবর্তিতাকে ব্যক্তিগত সততার অংশ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি তৈরি করা জরুরি। এটি হয়তো শোনাবে ছোট একটি কথা, কিন্তু একটি জাতির অভ্যাস আসলে ব্যক্তিগত অভ্যাসেরই সমষ্টি। স্কুল থেকেই সময়ানুবর্তিতাকে শৃঙ্খলার অংশ হিসেবে শেখানো, কর্মক্ষেত্রে সময়মতো উপস্থিতিকে দক্ষতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা— এই ছোট ছোট চর্চাই দীর্ঘমেয়াদে সংস্কৃতি বদলায়।
প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট দায়বদ্ধতার কাঠামো। রেল হোক বা সড়ক পরিবহন, প্রতিটি বিলম্বের জন্য কারণ নথিভুক্ত করা এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করার ব্যবস্থা থাকা উচিত। যে প্রতিষ্ঠান বারবার নির্ধারিত সময়সূচি ভঙ্গ করে, তার জন্য সুনির্দিষ্ট জবাবদিহিতার ব্যবস্থা— এটি বিলাসিতা নয়, মৌলিক প্রশাসনিক সংস্কার।
আমলাতান্ত্রিক পর্যায়ে সবচেয়ে জরুরি হলো ফাইল চলাচলের ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা, যেখানে একটি ফাইল কোন টেবিলে কতদিন আটকে থাকল তা স্বচ্ছভাবে দেখা যাবে। প্রকল্প পরিচালকদের ঘন ঘন বদলি বন্ধ করে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া, এবং একাধিক দপ্তরের অনুমোদনের বদলে একক জানালা সেবা (ওয়ান-স্টপ সার্ভিস) বাস্তবায়ন করা— এই দুটি পদক্ষেপই বহু প্রকল্পের গতি বাড়িয়ে দিতে পারে।
নীতিনির্ধারণী ও রাজনৈতিক পর্যায়ে প্রয়োজন প্রকল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষার একটি জাতীয় সমঝোতা— যাতে সরকার বদল হলেও চলমান জনস্বার্থমূলক প্রকল্প থেমে না যায়। পাশাপাশি, প্রতিশ্রুত সময়সীমা অতিক্রম করলে তার ব্যাখ্যা জনসমক্ষে দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করা প্রয়োজন— জবাবদিহিতা যত প্রকাশ্য হবে, বিলম্বের সংস্কৃতি তত দুর্বল হবে।
জাপানের বুলেট ট্রেনের গড় বিলম্ব সেকেন্ডের হিসাবে মাপা হয়— এটি নিছক গর্বের বিষয় নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক দর্শনের ফল। "জাস্ট ইন টাইম" ব্যবস্থাপনা মডেল, যা মূলত জাপানি শিল্পক্ষেত্র থেকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়েছে, ধরেই নেয় যে সময়ের প্রতিটি মিনিট একটি সম্পদ— অপচয় করলে তার মূল্য সরাসরি উৎপাদন খরচে যোগ হয়। সিঙ্গাপুরের মতো দেশ, যাদের প্রাকৃতিক সম্পদ প্রায় নেই বললেই চলে, বিশ্ব লজিস্টিকস র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে ওঠার পেছনে মূল হাতিয়ার হয়েছে দক্ষ সময় ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা।
তুলনায় বাংলাদেশের অগ্রগতি বিচ্ছিন্ন হলেও অর্থবহ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাস্টমস ও সময়ানুবর্তিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে, মূলত চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের কার্যক্রম উন্নত হওয়ায়। এটি প্রমাণ করে যে সদিচ্ছা ও লক্ষ্যভিত্তিক সংস্কার থাকলে পরিবর্তন সম্ভব— সমস্যাটা সক্ষমতার নয়, অগ্রাধিকারের। যেসব দেশ পিছিয়ে থেকেও এগিয়ে গেছে, তাদের প্রতিটির গল্পেই একটি সাধারণ সূত্র মেলে: প্রথমে তারা সময়কে একটি জাতীয় সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তারপর তার অপচয় রোধে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছে।
স্বল্পমেয়াদে, প্রতিটি সরকারি পরিবহন ও সেবা সংস্থার জন্য একটি প্রকাশ্য সময়সূচি-পালন হার (অন-টাইম পারফরম্যান্স রেট) নির্ধারণ ও নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে— যা জনগণকে জবাবদিহিতা দাবি করার একটি সুনির্দিষ্ট হাতিয়ার দেবে। পাশাপাশি বন্দর ও কাস্টমস প্রক্রিয়ার ডিজিটাইজেশন আরও সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন, যেহেতু এই খাতে ইতিমধ্যে অর্জিত অগ্রগতি দেখাচ্ছে যে দ্রুত ফল পাওয়া সম্ভব।
মধ্যমেয়াদে, সরকারি ফাইল ব্যবস্থাপনার সম্পূর্ণ ডিজিটাইজেশন এবং প্রকল্প পরিচালকদের চাকরির মেয়াদ-নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে একটি প্রকল্প শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই নেতৃত্বে বাস্তবায়িত হতে পারে। গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়িয়ে প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতা তৈরি করাও ফলপ্রসূ হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে, প্রয়োজন একটি সাংস্কৃতিক রূপান্তর— যেখানে সময়ানুবর্তিতা শেখানো হবে শিক্ষাব্যবস্থার অংশ হিসেবে, আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রকল্প ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য দলনিরপেক্ষ একটি জাতীয় কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে, যাতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জনস্বার্থমূলক প্রকল্পগুলো থমকে না যায়।
স্টেশনের সেই ঘোষণাটা আসলে শুধু একটি ট্রেনের দেরির খবর নয়— এটি একটি জাতির সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের একটি প্রতিচ্ছবি। যতদিন আমরা এই পাঁচ মিনিটকে "সামান্য" বলে উড়িয়ে দেব, ততদিন আমাদের অর্থনীতি নিঃশব্দে রক্ত ঝরাতে থাকবে। মেগা প্রকল্পের চকচকে উদ্বোধন কিংবা উন্নয়নের বড় বড় সংখ্যা তখনই অর্থবহ হবে, যখন আমরা প্রতিদিনের ছোট ছোট সময়-অপচয়গুলো বন্ধ করতে শিখব। কারণ একটি জাতির অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত মাপা হয় তার বড় স্বপ্নে নয়, তার প্রতিদিনের অভ্যাসে। আর সেই অভ্যাস বদলানোর কাজটা শুরু হতে পারে আজই— একটি ট্রেন সময়মতো ছাড়ার মধ্য দিয়ে, একটি ফাইল সময়মতো সই হওয়ার মধ্য দিয়ে, একটি প্রতিশ্রুতি সময়মতো রক্ষা হওয়ার মধ্য দিয়ে।
2.png)