আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রহিমা বেগম কতক্ষণ নিজের ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তার হিসেব নেই। বুকের বাঁ পাশে একটা ভোঁতা ব্যথা বেশ কদিন ধরেই জাপটে ধরেছে তাকে। কিন্তু এই ব্যথার কথা কাউকে বলা যাবে না। বললেই তিন ছেলের সংসারে একটা অশান্তির মেঘ ঘনিয়ে আসবে।
রহিমা বেগমের তিন ছেলে। বড় দুজনেই প্রতিষ্ঠিত, শহরে নিজের নিজের ফ্ল্যাটে সাজানো সংসার তাদের। ছোট ছেলে অয়ন থাকে সিলেটে, একটা ছোটখাটো এনজিওতে কাজ করে। অয়নের আয় সামান্য, তাই সে মাকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে না। বড় দুই ছেলের কাছেই পালা করে থাকেন রহিমা বেগম। এক মাসের দিন শেষ হলেই যেন তাঁর থাকার ‘মেয়াদ’ ফুরিয়ে যায়। তখন বড় ছেলের বাসা থেকে মেজ ছেলের বাসায় যাওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়। রহিমা বেগম খুব ভালো করেই জানেন, তাঁর এই বুড়ো শরীরটা এখন ছেলেদের কাছে কোনো মমতার উৎস নয়, বরং একটি মাসকাবারি দায়ভার মাত্র।
সেদিন রাতে ব্যথার তীব্রতা আর সহ্য করতে পারলেন না তিনি। বড় ছেলের ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে যখন নিঃশব্দে কাঁদছিলেন, তখন বড় বউ পাশ দিয়ে যেতে যেতে আলতো স্বরে বলে গেল, “মা, শরীরের যত্ন নিয়েন। অয়ন তো মাসে মাসে টাকা পাঠাতে পারে না, আমাদের একার ওপর দিয়ে তো সব যায় না।”
রহিমা বেগম মুখ নামিয়ে নিলেন। অয়ন প্রতি মাসে তাঁর জন্য এক হাজার টাকা পাঠায়, যা দিয়ে তাঁর ওষুধের খরচটুকুও হয় না। অথচ ছেলেটা নিজে হয়তো আধপেটা খেয়ে থাকে।
পরদিন সকালে অয়নের ফোন এলো। “আম্মু, শরীর কেমন? তোমার জন্মদিনে আমি বাড়ি আসছি। একটা বড় সারপ্রাইজ আছে তোমার জন্য!”
ছেলের উচ্ছ্বল গলার স্বর শুনে রহিমা বেগমের চোখের কোণ ভিজে উঠলো। ধরা গলায় বললেন, “ভালো আছি রে বাজান। তুই আসবি, এটাই আমার বড় পাওয়া।”
অয়ন জানালো, সে এবার মায়ের জন্য নিজের জমানো টাকায় একটা দামী কটন সিল্কের শাড়ি কিনেছে। মা সবসময় সাধারণ সুতির শাড়ি পরে, এবার একটু ভালো কিছু পরাবেন তাকে।
এদিকে রহিমা বেগমের ব্যথাটা জাঁকিয়ে বসেছে। বড় ছেলে ডাক্তার দেখিয়েছিল, কিন্তু ওষুধের লিস্ট দেখে মেজ ছেলের সাথে শুরু হলো বচসা। “আমি তো টেস্টের টাকা দিলাম, ওষুধের টাকা তুই দিবি”—এই নিয়ে দুজনের চিৎকার যখন কানে আসছিল, রহিমা বেগম তখন নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে প্রেসক্রিপশনটা ছিঁড়ে কুচিকুচি করে ডাস্টবিনে ফেলে দিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, এই একশো টাকার ওষুধের চেয়ে তাঁর অস্তিত্বের দাম এই সংসারে আরও কম।
অয়ন বাস ধরলো। তার কোলে সযত্নে রাখা শাড়ির প্যাকেটটা। সারাপথ সে ভেবেছে, মা যখন শাড়িটা পরবে, তখন তাকে ঠিক সেই আগের মতো সুন্দর লাগবে। কিন্তু ভাগ্য সবসময় হাসে না। বাসের চাকা যখন গন্তব্য ছুঁইছুঁই, তখনই এক ভয়াবহ যান্ত্রিক ত্রুটিতে বাসটি খাদে পড়ে গেল। অয়ন প্রাণে বেঁচে গেলেও তার সাধের ব্যাগটি মুহূর্তেই আগুনের গ্রাসে ছাই হয়ে গেল। যে শাড়িটার ভাঁজে ভাঁজে ছিল মায়ের জন্য একরাশ ভালোবাসা, সেটা আজ ধোঁয়ায় মিশে গেল।
অয়ন যখন কোনোমতে অন্য একটা গাড়িতে চড়ে বাড়ি পৌঁছালো, তখন সন্ধ্যা নামছে। সে কাঁদতে কাঁদতে মাকে বলতে চেয়েছিল, “মা, তোমার শাড়িটা আমি আনতে পারলাম না।” কিন্তু ঘরে ঢুকে সে দেখলো তার দুই দাদা আর বউদের কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
খাটিয়ায় শুয়ে আছেন রহিমা বেগম। সাদা কাপড়ে ঢাকা শরীর। পাশে পড়ে আছে অয়নের সেই ছিঁড়ে ফেলা প্রেসক্রিপশনের টুকরোগুলো, যা বড় ছেলে আজ ভুল করে ডাস্টবিনে দেখতে পেয়েছে।
অয়ন ধপ করে মেঝের ওপর বসে পড়লো। তার হাতের মুঠোয় এখন কোনো রঙিন শাড়ি নেই। মা যখন চলেই গেলেন, তখন আর রঙিন কাপড়ের কী প্রয়োজন? মা তো আজ নিজেই সেই সাদা পোশাকটি বেছে নিয়েছেন, যার পর আর কোনো ছেলের সংসারে তাকে ‘বোঝা’ হয়ে থাকতে হবে না। যে শাড়িটা আগুনে পুড়ে গিয়েছিল, সেটা হয়তো আজ আকাশের কোনো এক কোণে ধ্রুবতারা হয়ে মায়ের অপেক্ষায় আছে।

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রহিমা বেগম কতক্ষণ নিজের ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তার হিসেব নেই। বুকের বাঁ পাশে একটা ভোঁতা ব্যথা বেশ কদিন ধরেই জাপটে ধরেছে তাকে। কিন্তু এই ব্যথার কথা কাউকে বলা যাবে না। বললেই তিন ছেলের সংসারে একটা অশান্তির মেঘ ঘনিয়ে আসবে।
রহিমা বেগমের তিন ছেলে। বড় দুজনেই প্রতিষ্ঠিত, শহরে নিজের নিজের ফ্ল্যাটে সাজানো সংসার তাদের। ছোট ছেলে অয়ন থাকে সিলেটে, একটা ছোটখাটো এনজিওতে কাজ করে। অয়নের আয় সামান্য, তাই সে মাকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে না। বড় দুই ছেলের কাছেই পালা করে থাকেন রহিমা বেগম। এক মাসের দিন শেষ হলেই যেন তাঁর থাকার ‘মেয়াদ’ ফুরিয়ে যায়। তখন বড় ছেলের বাসা থেকে মেজ ছেলের বাসায় যাওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়। রহিমা বেগম খুব ভালো করেই জানেন, তাঁর এই বুড়ো শরীরটা এখন ছেলেদের কাছে কোনো মমতার উৎস নয়, বরং একটি মাসকাবারি দায়ভার মাত্র।
সেদিন রাতে ব্যথার তীব্রতা আর সহ্য করতে পারলেন না তিনি। বড় ছেলের ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে যখন নিঃশব্দে কাঁদছিলেন, তখন বড় বউ পাশ দিয়ে যেতে যেতে আলতো স্বরে বলে গেল, “মা, শরীরের যত্ন নিয়েন। অয়ন তো মাসে মাসে টাকা পাঠাতে পারে না, আমাদের একার ওপর দিয়ে তো সব যায় না।”
রহিমা বেগম মুখ নামিয়ে নিলেন। অয়ন প্রতি মাসে তাঁর জন্য এক হাজার টাকা পাঠায়, যা দিয়ে তাঁর ওষুধের খরচটুকুও হয় না। অথচ ছেলেটা নিজে হয়তো আধপেটা খেয়ে থাকে।
পরদিন সকালে অয়নের ফোন এলো। “আম্মু, শরীর কেমন? তোমার জন্মদিনে আমি বাড়ি আসছি। একটা বড় সারপ্রাইজ আছে তোমার জন্য!”
ছেলের উচ্ছ্বল গলার স্বর শুনে রহিমা বেগমের চোখের কোণ ভিজে উঠলো। ধরা গলায় বললেন, “ভালো আছি রে বাজান। তুই আসবি, এটাই আমার বড় পাওয়া।”
অয়ন জানালো, সে এবার মায়ের জন্য নিজের জমানো টাকায় একটা দামী কটন সিল্কের শাড়ি কিনেছে। মা সবসময় সাধারণ সুতির শাড়ি পরে, এবার একটু ভালো কিছু পরাবেন তাকে।
এদিকে রহিমা বেগমের ব্যথাটা জাঁকিয়ে বসেছে। বড় ছেলে ডাক্তার দেখিয়েছিল, কিন্তু ওষুধের লিস্ট দেখে মেজ ছেলের সাথে শুরু হলো বচসা। “আমি তো টেস্টের টাকা দিলাম, ওষুধের টাকা তুই দিবি”—এই নিয়ে দুজনের চিৎকার যখন কানে আসছিল, রহিমা বেগম তখন নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে প্রেসক্রিপশনটা ছিঁড়ে কুচিকুচি করে ডাস্টবিনে ফেলে দিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, এই একশো টাকার ওষুধের চেয়ে তাঁর অস্তিত্বের দাম এই সংসারে আরও কম।
অয়ন বাস ধরলো। তার কোলে সযত্নে রাখা শাড়ির প্যাকেটটা। সারাপথ সে ভেবেছে, মা যখন শাড়িটা পরবে, তখন তাকে ঠিক সেই আগের মতো সুন্দর লাগবে। কিন্তু ভাগ্য সবসময় হাসে না। বাসের চাকা যখন গন্তব্য ছুঁইছুঁই, তখনই এক ভয়াবহ যান্ত্রিক ত্রুটিতে বাসটি খাদে পড়ে গেল। অয়ন প্রাণে বেঁচে গেলেও তার সাধের ব্যাগটি মুহূর্তেই আগুনের গ্রাসে ছাই হয়ে গেল। যে শাড়িটার ভাঁজে ভাঁজে ছিল মায়ের জন্য একরাশ ভালোবাসা, সেটা আজ ধোঁয়ায় মিশে গেল।
অয়ন যখন কোনোমতে অন্য একটা গাড়িতে চড়ে বাড়ি পৌঁছালো, তখন সন্ধ্যা নামছে। সে কাঁদতে কাঁদতে মাকে বলতে চেয়েছিল, “মা, তোমার শাড়িটা আমি আনতে পারলাম না।” কিন্তু ঘরে ঢুকে সে দেখলো তার দুই দাদা আর বউদের কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
খাটিয়ায় শুয়ে আছেন রহিমা বেগম। সাদা কাপড়ে ঢাকা শরীর। পাশে পড়ে আছে অয়নের সেই ছিঁড়ে ফেলা প্রেসক্রিপশনের টুকরোগুলো, যা বড় ছেলে আজ ভুল করে ডাস্টবিনে দেখতে পেয়েছে।
অয়ন ধপ করে মেঝের ওপর বসে পড়লো। তার হাতের মুঠোয় এখন কোনো রঙিন শাড়ি নেই। মা যখন চলেই গেলেন, তখন আর রঙিন কাপড়ের কী প্রয়োজন? মা তো আজ নিজেই সেই সাদা পোশাকটি বেছে নিয়েছেন, যার পর আর কোনো ছেলের সংসারে তাকে ‘বোঝা’ হয়ে থাকতে হবে না। যে শাড়িটা আগুনে পুড়ে গিয়েছিল, সেটা হয়তো আজ আকাশের কোনো এক কোণে ধ্রুবতারা হয়ে মায়ের অপেক্ষায় আছে।
