সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 সম্পাদকীয়সম্পাদকীয়

প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন না-কি কূটনৈতিক ভারসাম্য কোনটিকে প্রাধান্য দিবেন?

বড়শক্তির সাথে সম্পর্কের সমীকরণ হতে হবে জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক। চীন সফরকে কেন্দ্র করে যে প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় প্রয়োজন দূরদর্শী ও কৌশলী অবস্থান।

প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন না-কি  কূটনৈতিক ভারসাম্য কোনটিকে প্রাধান্য দিবেন?
ছবি -সংগৃহীত

একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা তার জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রধান ভিত্তি। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক মহলে এবং জনমনে চীনের সাথে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক চুক্তির যে আলোচনা গুরুত্ব পেয়েছে, তা রাষ্ট্রের কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধিরই ইঙ্গিতবহ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে কেন্দ্র করে কেবল সামরিক সরঞ্জামের আধুনিকায়ন নয়, বরং বৃহত্তর ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো দেশই এককভাবে কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে টিকে থাকতে পারে না; বরং বহুমুখী সম্পর্ক ও কৌশলগত স্বনির্ভরতাই একটি জাতিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মানজনক স্থান করে দেয়।

বাংলাদেশের বিমানবাহিনী ও প্রতিরক্ষা খাতের আধুনিকায়ন সময়ের দাবি। আধুনিক যুদ্ধবিমানের মতো স্পর্শকাতর প্রতিরক্ষা সামগ্রী সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি ও সক্ষমতা যাচাই করা একান্ত জরুরি। চীন সফরকালে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বা জে-১০ সিই-এর মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহের আলোচনা যদি চূড়ান্ত হয়, তবে তা বাংলাদেশের আকাশ সীমার সুরক্ষায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে গণ্য হবে। তবে প্রতিরক্ষা কেনাকাটার ক্ষেত্রে আমাদের কেবল সাময়িক সামরিক শক্তির দিকে তাকালে চলবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং নিজস্ব জনশক্তির সক্ষমতা তৈরির দিকেও মনোনিবেশ করতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে প্রতিটি দেশের নিজস্ব কৌশলী অবস্থান থাকে এবং বাংলাদেশ সেই বাজারে নিজের জায়গা তৈরি করার সময় নিজেদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েই দর কষাকষি করবে—এমনটাই প্রত্যাশা।

তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বড় ধরনের অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ভারত ও চীন—উভয় দেশের সাথেই বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্পর্কগুলো হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তিতে। কোনো রাষ্ট্রের প্রতি দাসত্ব বা অন্ধ আনুগত্য যেমন কাঙ্ক্ষিত নয়, তেমনি কোনো রাষ্ট্রের সাথে শত্রুতা তৈরি করাও জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। বাংলাদেশ যদি তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে চায়, তবে তা হওয়া উচিত নিজের সুরক্ষার জন্য, অন্য কাউকে উত্তেজিত করার জন্য নয়। কূটনৈতিক পরিপক্বতা সেখানেই, যেখানে রাষ্ট্র তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বজায় রেখে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।

অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা যেকোনো সফল কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পূর্বশর্ত। যখন একটি রাষ্ট্র বড় কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির পথে এগোয়, তখন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উস্কানিমূলক অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়া বা জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার চেষ্টা হওয়াটা রাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক সময়ে মন্দিরের সুরক্ষা বা ধর্মীয় সংবেদনশীলতা নিয়ে যেসব উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে, তা দেশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষার এই ক্রান্তিলগ্নে সব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষের উচিত রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে রাখা। ষড়যন্ত্র বা উস্কানির কাছে মাথানত না করে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর যদি সত্যিই বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় কোনো মাইলফলক হয়ে ওঠে, তবে তা হবে দেশের জন্য ইতিবাচক। তবে এই সফলতা কেবল চুক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না, এর মাধ্যমে অর্জিত প্রযুক্তি ও কৌশল দেশের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কতটা শক্তিশালী করল, তা-ই হবে আসল মাপকাঠি। ভারতের সাথে সম্পর্কের সমীকরণেও বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্বের জায়গাটি অটুট রাখবে—এটাই জনগণের আকাঙ্ক্ষা। ভারত, চীন বা অন্য যেকোনো বিশ্বশক্তির সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে নিজস্ব উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়াই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ও বাস্তবসম্মত পথ। জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির স্বার্থে এখন আমাদের কূটনৈতিক বিচক্ষণতা ও ধৈর্যের পরিচয় দেওয়ার সময়।

প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন না-কি কূটনৈতিক ভারসাম্য কোনটিকে প্রাধান্য দিবেন?
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

সোমবার, ২২ জুন ২০২৬


প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন না-কি কূটনৈতিক ভারসাম্য কোনটিকে প্রাধান্য দিবেন?

প্রকাশের তারিখ : ২২ জুন ২০২৬

featured Image

একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা তার জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রধান ভিত্তি। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক মহলে এবং জনমনে চীনের সাথে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক চুক্তির যে আলোচনা গুরুত্ব পেয়েছে, তা রাষ্ট্রের কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধিরই ইঙ্গিতবহ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে কেন্দ্র করে কেবল সামরিক সরঞ্জামের আধুনিকায়ন নয়, বরং বৃহত্তর ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো দেশই এককভাবে কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে টিকে থাকতে পারে না; বরং বহুমুখী সম্পর্ক ও কৌশলগত স্বনির্ভরতাই একটি জাতিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মানজনক স্থান করে দেয়।

বাংলাদেশের বিমানবাহিনী ও প্রতিরক্ষা খাতের আধুনিকায়ন সময়ের দাবি। আধুনিক যুদ্ধবিমানের মতো স্পর্শকাতর প্রতিরক্ষা সামগ্রী সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি ও সক্ষমতা যাচাই করা একান্ত জরুরি। চীন সফরকালে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বা জে-১০ সিই-এর মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহের আলোচনা যদি চূড়ান্ত হয়, তবে তা বাংলাদেশের আকাশ সীমার সুরক্ষায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে গণ্য হবে। তবে প্রতিরক্ষা কেনাকাটার ক্ষেত্রে আমাদের কেবল সাময়িক সামরিক শক্তির দিকে তাকালে চলবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং নিজস্ব জনশক্তির সক্ষমতা তৈরির দিকেও মনোনিবেশ করতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে প্রতিটি দেশের নিজস্ব কৌশলী অবস্থান থাকে এবং বাংলাদেশ সেই বাজারে নিজের জায়গা তৈরি করার সময় নিজেদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েই দর কষাকষি করবে—এমনটাই প্রত্যাশা।

তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বড় ধরনের অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ভারত ও চীন—উভয় দেশের সাথেই বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্পর্কগুলো হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তিতে। কোনো রাষ্ট্রের প্রতি দাসত্ব বা অন্ধ আনুগত্য যেমন কাঙ্ক্ষিত নয়, তেমনি কোনো রাষ্ট্রের সাথে শত্রুতা তৈরি করাও জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। বাংলাদেশ যদি তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে চায়, তবে তা হওয়া উচিত নিজের সুরক্ষার জন্য, অন্য কাউকে উত্তেজিত করার জন্য নয়। কূটনৈতিক পরিপক্বতা সেখানেই, যেখানে রাষ্ট্র তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বজায় রেখে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।

অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা যেকোনো সফল কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পূর্বশর্ত। যখন একটি রাষ্ট্র বড় কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির পথে এগোয়, তখন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উস্কানিমূলক অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়া বা জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার চেষ্টা হওয়াটা রাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক সময়ে মন্দিরের সুরক্ষা বা ধর্মীয় সংবেদনশীলতা নিয়ে যেসব উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে, তা দেশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষার এই ক্রান্তিলগ্নে সব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষের উচিত রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে রাখা। ষড়যন্ত্র বা উস্কানির কাছে মাথানত না করে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর যদি সত্যিই বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় কোনো মাইলফলক হয়ে ওঠে, তবে তা হবে দেশের জন্য ইতিবাচক। তবে এই সফলতা কেবল চুক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না, এর মাধ্যমে অর্জিত প্রযুক্তি ও কৌশল দেশের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কতটা শক্তিশালী করল, তা-ই হবে আসল মাপকাঠি। ভারতের সাথে সম্পর্কের সমীকরণেও বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্বের জায়গাটি অটুট রাখবে—এটাই জনগণের আকাঙ্ক্ষা। ভারত, চীন বা অন্য যেকোনো বিশ্বশক্তির সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে নিজস্ব উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়াই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ও বাস্তবসম্মত পথ। জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির স্বার্থে এখন আমাদের কূটনৈতিক বিচক্ষণতা ও ধৈর্যের পরিচয় দেওয়ার সময়।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত