রাজনীতি
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। আন্দোলনের মুখে সরকারের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ফোনালাপ। পরে সেই কথোপকথনের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ফোনালাপে তাপস শেখ হাসিনাকে সালাম জানিয়ে বলেন, তিনি সিঙ্গাপুর যেতে চান। উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, 'হ্যাঁ, যাও।' এরপর তাঁদের মধ্যে আরও কিছু কথা হয়।
জানা যায়, ফোনটি করা হয়েছিল ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট সকাল ৮টা ১৬ মিনিটে। সেদিন তাপস সিঙ্গাপুর যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছান। কিন্তু ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাঁকে বিদেশ যেতে বাধা দেয়। তখনই তিনি শেখ হাসিনাকে ফোন করে সহায়তা চান।
সেই সময় দেশের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। ছাত্র-জনতার আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। সংঘর্ষ ও সহিংসতায় কয়েক শ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সরকারবিরোধী আন্দোলন দিন দিন আরও জোরালো হতে থাকে। এর আগের দিন 'দ্রোহযাত্রা' কর্মসূচিতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন।
২০২৪ সালের ৩ আগস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ওই দিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিশাল সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। এরপর কোটা সংস্কার আন্দোলন পূর্ণাঙ্গ সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়।
একই দিন সেনা সদরে একটি অভ্যন্তরীণ বৈঠকেও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে আপত্তির কথা উঠে আসে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। সব মিলিয়ে সরকার যে কঠিন সংকটের মুখে পড়েছে, তা তখন স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই শেখ ফজলে নূর তাপসের দেশ ছাড়ার চেষ্টা বিশেষ গুরুত্ব পায়। পরে দেখা যায়, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে ও পরে তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ও একে একে দেশ ছাড়েন। আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে শেখ পরিবারের অনেক সদস্য মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, উপদেষ্টা, মেয়র ও দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। রাষ্ট্র ও দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তাঁদের প্রভাব ছিল।
তবে সরকার পতনের পর পরিবারের খুব কম সদস্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। তাঁদের মধ্যে শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ছেলে মঈন উদ্দিন আবদুল্লাহ ২০২৪ সালের অক্টোবরে ঢাকায় গ্রেপ্তার হন। তিনি মূলত ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং রাজনীতিতে খুব বেশি সক্রিয় ছিলেন না বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের দাবি।
অন্যদিকে শেখ পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য সরকার পতনের আগেই অথবা পতনের পরপরই বিদেশে চলে যান। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের অনেকেই বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে তাঁদের অবস্থানের ছবি ও ভিডিওও প্রকাশ পেয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা। আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকার পতনের দুই দিন আগে তিনি যুক্তরাজ্য থেকে ঢাকায় আসেন। দেশ ছাড়ার পর তিনি ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। একই সফরে শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকও।
(চলবে—দ্বিতীয় পর্বে: সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ, টিউলিপ সিদ্দিক, শেখ সেলিম, শেখ হেলাল, নিক্সন চৌধুরীসহ শেখ পরিবারের অন্য সদস্যদের অবস্থান এবং দেশত্যাগের বিস্তারিত বিবরণ।)
বিষয় : শেখ হাসিনা শেখ পরিবার পতন
2.png)
বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। আন্দোলনের মুখে সরকারের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ফোনালাপ। পরে সেই কথোপকথনের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ফোনালাপে তাপস শেখ হাসিনাকে সালাম জানিয়ে বলেন, তিনি সিঙ্গাপুর যেতে চান। উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, 'হ্যাঁ, যাও।' এরপর তাঁদের মধ্যে আরও কিছু কথা হয়।
জানা যায়, ফোনটি করা হয়েছিল ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট সকাল ৮টা ১৬ মিনিটে। সেদিন তাপস সিঙ্গাপুর যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছান। কিন্তু ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাঁকে বিদেশ যেতে বাধা দেয়। তখনই তিনি শেখ হাসিনাকে ফোন করে সহায়তা চান।
সেই সময় দেশের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। ছাত্র-জনতার আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। সংঘর্ষ ও সহিংসতায় কয়েক শ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সরকারবিরোধী আন্দোলন দিন দিন আরও জোরালো হতে থাকে। এর আগের দিন 'দ্রোহযাত্রা' কর্মসূচিতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন।
২০২৪ সালের ৩ আগস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ওই দিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিশাল সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। এরপর কোটা সংস্কার আন্দোলন পূর্ণাঙ্গ সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়।
একই দিন সেনা সদরে একটি অভ্যন্তরীণ বৈঠকেও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে আপত্তির কথা উঠে আসে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। সব মিলিয়ে সরকার যে কঠিন সংকটের মুখে পড়েছে, তা তখন স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই শেখ ফজলে নূর তাপসের দেশ ছাড়ার চেষ্টা বিশেষ গুরুত্ব পায়। পরে দেখা যায়, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে ও পরে তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ও একে একে দেশ ছাড়েন। আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে শেখ পরিবারের অনেক সদস্য মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, উপদেষ্টা, মেয়র ও দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। রাষ্ট্র ও দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তাঁদের প্রভাব ছিল।
তবে সরকার পতনের পর পরিবারের খুব কম সদস্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। তাঁদের মধ্যে শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ছেলে মঈন উদ্দিন আবদুল্লাহ ২০২৪ সালের অক্টোবরে ঢাকায় গ্রেপ্তার হন। তিনি মূলত ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং রাজনীতিতে খুব বেশি সক্রিয় ছিলেন না বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের দাবি।
অন্যদিকে শেখ পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য সরকার পতনের আগেই অথবা পতনের পরপরই বিদেশে চলে যান। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের অনেকেই বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে তাঁদের অবস্থানের ছবি ও ভিডিওও প্রকাশ পেয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা। আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকার পতনের দুই দিন আগে তিনি যুক্তরাজ্য থেকে ঢাকায় আসেন। দেশ ছাড়ার পর তিনি ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। একই সফরে শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকও।
(চলবে—দ্বিতীয় পর্বে: সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ, টিউলিপ সিদ্দিক, শেখ সেলিম, শেখ হেলাল, নিক্সন চৌধুরীসহ শেখ পরিবারের অন্য সদস্যদের অবস্থান এবং দেশত্যাগের বিস্তারিত বিবরণ।)
2.png)