জাতীয়জাতীয়

দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন ঘিরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা

নির্বাসনের দুই বছর পূর্তিতে দিল্লিতে অডিওভিত্তিক সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিলেন শেখ হাসিনা। দেশে ফেরার ঘোষণা পুনর্ব্যক্তের পাশাপাশি রাজনৈতিক সম্প্রীতির কথা বললেও, অনুষ্ঠানটি ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

মিজানুল ইসলাম
মিজানুল ইসলাম
দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন ঘিরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা
ছবি -সংগৃহীত

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নির্বাসিত জীবনের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে এক ব্যতিক্রমধর্মী সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে তার বক্তব্যের চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে এই আয়োজনকে ঘিরে বাংলাদেশ সরকারের কঠোর প্রতিক্রিয়া, যা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন এক অস্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

৫ আগস্ট দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্স ক্লাবে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলন প্রচলিত অর্থে ছিল না। শেখ হাসিনার কোনো ভিডিও সম্প্রচার করা হয়নি। উপস্থিত দেশি-বিদেশি সাংবাদিকরা কেবল তার কণ্ঠ শুনেছেন। প্রায় দেড় ঘণ্টার অনুষ্ঠানে তিনি প্রায় ৪০ মিনিট অনলাইনে যুক্ত থেকে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসানও। তবে সেখানে ভারত সরকারের কোনো প্রতিনিধির উপস্থিতি দেখা যায়নি।

সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা জানান, ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্তে তিনি এখনও অনড়। যদিও কবে ফিরবেন কিংবা এ বিষয়ে কোনো ধরনের কূটনৈতিক যোগাযোগ বা আলোচনা চলছে কি না—সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দেননি।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে দায়বদ্ধতার প্রশ্ন উঠলে তিনি নিজে বিস্তারিত মন্তব্য না করে বিষয়টি ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ওপর ছেড়ে দেন। জয়ের দাবি, বর্তমান সরকার যেভাবে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ইনডেমনিটি বা আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করছে, একই ধরনের নীতি তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে শেখ হাসিনা বারবার জাতীয় পুনর্মিলন বা ‘রিকনসিলিয়েশন’-এর কথা বলেন। তার ভাষায়, প্রতিশোধ নয়, বিদ্বেষ ভুলে ঐক্যের পরিবেশ সৃষ্টি করেই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি ভারতে আশ্রয় ও আতিথ্য দেওয়ার জন্য ভারত সরকার ও দেশটির জনগণের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

তবে এই আয়োজন শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই কড়া ভাষায় একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পলাতক ও দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ দেওয়া এবং সেই মঞ্চে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় সরকার গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের প্রকাশ্য আয়োজন দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এ বিষয়ে আগেই ভারত সরকারকে অবহিত করা হয়েছিল। এরপরও অনুষ্ঠানটি আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় ঢাকা গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যেদিন বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালিত হয়েছে, ঠিক সেদিন ভারতীয় ভূখণ্ডে শেখ হাসিনার এই কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই আন্দোলনের নিহতদের প্রতি অসম্মান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও দাবি করে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি সম্পর্কে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য অস্বীকারের চেষ্টা ইতিহাসকে বিকৃত করার একটি ব্যর্থ উদ্যোগ। একই সঙ্গে সরকার পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, বাংলাদেশ আর কখনো ফ্যাসিবাদে ফিরে যাবে না এবং দেশের রাষ্ট্রীয় পরিসরে শেখ হাসিনা ও তার রাজনৈতিক বলয়ের আর কোনো জায়গা হবে না।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়েও অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। সরকার বলেছে, সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক ও পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্ক বজায় রাখতে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তবে একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ একাধিকবার অনুরোধ জানালেও এখন পর্যন্ত ভারতের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। এর পরিবর্তে তাকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়াকে বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতির পরিপন্থী এবং দুই দেশের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের জন্য অনুকূল নয় বলেও উল্লেখ করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

দিল্লির ওই সংবাদ সম্মেলন এবং তার পরপরই ঢাকার এই কঠোর প্রতিক্রিয়া—দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক ও চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও কূটনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বিষয় : দিল্লি হাসিনার সংবাদ সম্মেলন

কাল মহাকাল

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬


দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন ঘিরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা

প্রকাশের তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬

featured Image

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নির্বাসিত জীবনের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে এক ব্যতিক্রমধর্মী সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে তার বক্তব্যের চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে এই আয়োজনকে ঘিরে বাংলাদেশ সরকারের কঠোর প্রতিক্রিয়া, যা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন এক অস্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

৫ আগস্ট দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্স ক্লাবে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলন প্রচলিত অর্থে ছিল না। শেখ হাসিনার কোনো ভিডিও সম্প্রচার করা হয়নি। উপস্থিত দেশি-বিদেশি সাংবাদিকরা কেবল তার কণ্ঠ শুনেছেন। প্রায় দেড় ঘণ্টার অনুষ্ঠানে তিনি প্রায় ৪০ মিনিট অনলাইনে যুক্ত থেকে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসানও। তবে সেখানে ভারত সরকারের কোনো প্রতিনিধির উপস্থিতি দেখা যায়নি।

সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা জানান, ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্তে তিনি এখনও অনড়। যদিও কবে ফিরবেন কিংবা এ বিষয়ে কোনো ধরনের কূটনৈতিক যোগাযোগ বা আলোচনা চলছে কি না—সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দেননি।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে দায়বদ্ধতার প্রশ্ন উঠলে তিনি নিজে বিস্তারিত মন্তব্য না করে বিষয়টি ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ওপর ছেড়ে দেন। জয়ের দাবি, বর্তমান সরকার যেভাবে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ইনডেমনিটি বা আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করছে, একই ধরনের নীতি তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে শেখ হাসিনা বারবার জাতীয় পুনর্মিলন বা ‘রিকনসিলিয়েশন’-এর কথা বলেন। তার ভাষায়, প্রতিশোধ নয়, বিদ্বেষ ভুলে ঐক্যের পরিবেশ সৃষ্টি করেই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি ভারতে আশ্রয় ও আতিথ্য দেওয়ার জন্য ভারত সরকার ও দেশটির জনগণের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

তবে এই আয়োজন শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই কড়া ভাষায় একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পলাতক ও দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ দেওয়া এবং সেই মঞ্চে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় সরকার গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের প্রকাশ্য আয়োজন দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এ বিষয়ে আগেই ভারত সরকারকে অবহিত করা হয়েছিল। এরপরও অনুষ্ঠানটি আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় ঢাকা গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যেদিন বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালিত হয়েছে, ঠিক সেদিন ভারতীয় ভূখণ্ডে শেখ হাসিনার এই কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই আন্দোলনের নিহতদের প্রতি অসম্মান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও দাবি করে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি সম্পর্কে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য অস্বীকারের চেষ্টা ইতিহাসকে বিকৃত করার একটি ব্যর্থ উদ্যোগ। একই সঙ্গে সরকার পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, বাংলাদেশ আর কখনো ফ্যাসিবাদে ফিরে যাবে না এবং দেশের রাষ্ট্রীয় পরিসরে শেখ হাসিনা ও তার রাজনৈতিক বলয়ের আর কোনো জায়গা হবে না।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়েও অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। সরকার বলেছে, সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক ও পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্ক বজায় রাখতে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তবে একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ একাধিকবার অনুরোধ জানালেও এখন পর্যন্ত ভারতের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। এর পরিবর্তে তাকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়াকে বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতির পরিপন্থী এবং দুই দেশের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের জন্য অনুকূল নয় বলেও উল্লেখ করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

দিল্লির ওই সংবাদ সম্মেলন এবং তার পরপরই ঢাকার এই কঠোর প্রতিক্রিয়া—দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক ও চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও কূটনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত