বিনোদনবিনোদন

ঐশ্বরিয়ার কান লুকের পেছনে রয়েছে ৬০০ ঘণ্টার কারুকাজ ও ৭ হাজার মুক্তোর ঝলক

কান চলচ্চিত্র উৎসব শুধু সিনেমার নয়, বিশ্ব ফ্যাশনেরও অন্যতম বড় মঞ্চ। প্রতিবছর বিশ্বের সেরা অভিনেত্রী, মডেল ও তারকারা এখানে হাজির হন এমন সব পোশাকে, যা পরবর্তীতে ফ্যাশন ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। সেই তালিকায় বহু বছর ধরেই অন্যতম আলোচিত নাম ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন।

 ঐশ্বরিয়ার কান লুকের পেছনে রয়েছে ৬০০ ঘণ্টার কারুকাজ ও ৭ হাজার মুক্তোর ঝলক
ছবি -সংগৃহীত

২০২৬ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবেও নজরের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন সাবেক এই বিশ্বসুন্দরী। সাদা ভাস্কর্যসদৃশ একটি কাস্টম Haute Couture গাউন পরে যখন তিনি লাল গালিচায় হাঁটেন, তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ম্যাগাজিন—সবখানেই শুরু হয় আলোচনা। তবে পোশাকটির প্রকৃত বিস্ময় লুকিয়ে ছিল এর নির্মাণকাহিনিতে।

একটি পোশাক, ৬০০ ঘণ্টার শ্রম

ঐশ্বরিয়ার জন্য তৈরি এই বিশেষ গাউনটি ডিজাইন করেছেন লেবাননের বিশ্বখ্যাত Haute Couture ডিজাইনার টনি ওয়ার্ড। গাউনটি তৈরি করতে সময় লেগেছে প্রায় ৬০০ ঘণ্টা, অর্থাৎ টানা ২৫ দিনেরও বেশি সময়ের সমপরিমাণ শ্রম।

এতে ব্যবহার করা হয়েছে ৭ হাজারেরও বেশি হাতে বসানো মুক্তো। প্রতিটি মুক্তো একে একে সূক্ষ্ম টিউল কাপড়ের ওপর সেলাই করা হয়েছে। এমন নিখুঁত কাজ মেশিনে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ কারিগরের দীর্ঘ সময়ের মনোযোগ, ধৈর্য ও নিখুঁত হাতের কাজ।

ফ্যাশন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি Haute Couture পোশাকের প্রকৃত মূল্য শুধু কাপড় বা অলংকারে নয়, বরং এর পেছনে থাকা শত শত ঘণ্টার মানবশ্রম, নকশা ও কারুশিল্পে।

রাজকীয় নকশায় আধুনিক Haute Couture

গাউনটিতে ছিল অফ-শোল্ডার কাট, কাঠামোবদ্ধ করসেট বডিস এবং সরল কলাম সিলুয়েট। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রায় ৪০ মিটার সাদা টাফেটা সিল্ক দিয়ে তৈরি দীর্ঘ কেপ, যা পুরো পোশাকটিকে রাজকীয় মাত্রা দিয়েছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কেপটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে এটি গাউনের মুক্তোখচিত সূক্ষ্ম কারুকাজকে আড়াল না করে, বরং আরও উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরে। ফ্যাশনের ভাষায় একে বলা হয় "statement without excess"—অর্থাৎ অতিরঞ্জন নয়, বরং পরিমিত নাটকীয়তা।

কে এই টনি ওয়ার্ড?

মধ্যপ্রাচ্যের ফ্যাশন জগতের অন্যতম উজ্জ্বল নাম টনি ওয়ার্ড। লেবাননের বৈরুতে তার ফ্যাশন হাউসের যাত্রা শুরু হলেও, তার স্বপ্নের ভিত্তি গড়ে ওঠে প্যারিসে। সেখানে ফ্যাশন ডিজাইনের ওপর উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নিজের Haute Couture ব্র্যান্ড।

বর্তমানে তার ডিজাইন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রেড কার্পেটগুলোতে নিয়মিত দেখা যায়। জটিল এমব্রয়ডারি, স্থাপত্যশৈলী-প্রভাবিত সিলুয়েট এবং হাতে তৈরি সূক্ষ্ম অলংকরণই তার ডিজাইনের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

হলিউড, বলিউড, ইউরোপীয় চলচ্চিত্র অঙ্গন, এমনকি বিভিন্ন দেশের রাজপরিবারের সদস্যরাও নিয়মিত তার ডিজাইন করা পোশাক পরেন। ফলে টনি ওয়ার্ড আজ শুধু একজন ডিজাইনার নন, বরং আন্তর্জাতিক Haute Couture শিল্পের অন্যতম প্রতিনিধিত্বশীল নাম।


Haute Couture আসলে কী?

অনেকেই মনে করেন, দামি পোশাকই Haute Couture। বাস্তবে বিষয়টি অনেক গভীর।

Haute Couture শব্দটির উৎপত্তি ফরাসি ভাষা থেকে। এর অর্থ উচ্চমানের বা অভিজাত পোশাক নির্মাণ। এ ধরনের পোশাক গণহারে তৈরি হয় না। নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তির জন্য মাপ অনুযায়ী ডিজাইন করা হয় এবং প্রতিটি ধাপে থাকে হাতে করা সূক্ষ্ম কাজ।

একটি Haute Couture পোশাক তৈরিতে সাধারণত স্কেচ, কাপড় নির্বাচন, একাধিক ফিটিং, এমব্রয়ডারি, অলংকরণ এবং চূড়ান্ত ফিনিশিং—সব মিলিয়ে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তাই এগুলোকে পোশাকের চেয়ে শিল্পকর্ম বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন ফ্যাশন বিশ্লেষকরা।

কেন ঐশ্বরিয়ার কান লুক এত আলোচিত?

২০০২ সাল থেকে কান চলচ্চিত্র উৎসবের নিয়মিত মুখ ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন। গত দুই দশকে তিনি অসংখ্য স্মরণীয় ফ্যাশন মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন। কখনও ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় পোশাক, কখনও রাজকীয় বলগাউন, আবার কখনও পরীক্ষাধর্মী Haute Couture ডিজাইনে—প্রতিবারই তিনি নিজের উপস্থিতিকে আলাদা করে তুলেছেন।

তবে ২০২৬ সালের এই গাউনকে অনেক ফ্যাশন সমালোচক তার সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম পরিশীলিত এবং ভারসাম্যপূর্ণ রেড কার্পেট লুক হিসেবে দেখছেন। কারণ, এতে একই সঙ্গে ছিল বিলাসিতা, কারুশিল্প, আধুনিক নকশা এবং ব্যক্তিত্বের শক্তিশালী প্রকাশ।

ফ্যাশনের আড়ালে কারিগরদের গল্প

লাল গালিচায় দর্শক যে পোশাকটি কয়েক মিনিটের জন্য দেখেন, তার পেছনে কাজ করেন অসংখ্য মানুষ—ডিজাইনার, প্যাটার্ন মেকার, এমব্রয়ডারি শিল্পী, দর্জি, অলংকরণ বিশেষজ্ঞ এবং স্টাইলিস্ট। তাদের কয়েক সপ্তাহের শ্রমই শেষ পর্যন্ত ক্যামেরার ফ্ল্যাশে ধরা পড়ে কয়েকটি মুহূর্তে।


ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনের ২০২৬ সালের কান গাউন সেই অদৃশ্য শ্রমেরই এক অনন্য উদাহরণ। ৬০০ ঘণ্টার কারুকাজ, ৭ হাজার মুক্তোর নিখুঁত সংযোজন এবং হাতে তৈরি প্রতিটি সূক্ষ্ম খুঁটিনাটি প্রমাণ করে—সত্যিকারের Haute Couture শুধু একটি পোশাক নয়, এটি সময়, সৃজনশীলতা ও শিল্পের এক অপূর্ব সমন্বয়।

এই কারণেই লাল গালিচায় ঐশ্বরিয়ার উপস্থিতি কেবল ফ্যাশনের প্রদর্শনী ছিল না; এটি ছিল বিশ্বমানের কারুশিল্প, নকশা এবং সৃজনশীলতার এক জীবন্ত উদযাপন।

বিষয় : কান উৎসব ঐশ্বরিয়া Haute Couture টনি ওয়ার্ড

কাল মহাকাল

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬


ঐশ্বরিয়ার কান লুকের পেছনে রয়েছে ৬০০ ঘণ্টার কারুকাজ ও ৭ হাজার মুক্তোর ঝলক

প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

২০২৬ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবেও নজরের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন সাবেক এই বিশ্বসুন্দরী। সাদা ভাস্কর্যসদৃশ একটি কাস্টম Haute Couture গাউন পরে যখন তিনি লাল গালিচায় হাঁটেন, তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ম্যাগাজিন—সবখানেই শুরু হয় আলোচনা। তবে পোশাকটির প্রকৃত বিস্ময় লুকিয়ে ছিল এর নির্মাণকাহিনিতে।

একটি পোশাক, ৬০০ ঘণ্টার শ্রম

ঐশ্বরিয়ার জন্য তৈরি এই বিশেষ গাউনটি ডিজাইন করেছেন লেবাননের বিশ্বখ্যাত Haute Couture ডিজাইনার টনি ওয়ার্ড। গাউনটি তৈরি করতে সময় লেগেছে প্রায় ৬০০ ঘণ্টা, অর্থাৎ টানা ২৫ দিনেরও বেশি সময়ের সমপরিমাণ শ্রম।

এতে ব্যবহার করা হয়েছে ৭ হাজারেরও বেশি হাতে বসানো মুক্তো। প্রতিটি মুক্তো একে একে সূক্ষ্ম টিউল কাপড়ের ওপর সেলাই করা হয়েছে। এমন নিখুঁত কাজ মেশিনে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ কারিগরের দীর্ঘ সময়ের মনোযোগ, ধৈর্য ও নিখুঁত হাতের কাজ।

ফ্যাশন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি Haute Couture পোশাকের প্রকৃত মূল্য শুধু কাপড় বা অলংকারে নয়, বরং এর পেছনে থাকা শত শত ঘণ্টার মানবশ্রম, নকশা ও কারুশিল্পে।

রাজকীয় নকশায় আধুনিক Haute Couture

গাউনটিতে ছিল অফ-শোল্ডার কাট, কাঠামোবদ্ধ করসেট বডিস এবং সরল কলাম সিলুয়েট। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রায় ৪০ মিটার সাদা টাফেটা সিল্ক দিয়ে তৈরি দীর্ঘ কেপ, যা পুরো পোশাকটিকে রাজকীয় মাত্রা দিয়েছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কেপটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে এটি গাউনের মুক্তোখচিত সূক্ষ্ম কারুকাজকে আড়াল না করে, বরং আরও উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরে। ফ্যাশনের ভাষায় একে বলা হয় "statement without excess"—অর্থাৎ অতিরঞ্জন নয়, বরং পরিমিত নাটকীয়তা।

কে এই টনি ওয়ার্ড?

মধ্যপ্রাচ্যের ফ্যাশন জগতের অন্যতম উজ্জ্বল নাম টনি ওয়ার্ড। লেবাননের বৈরুতে তার ফ্যাশন হাউসের যাত্রা শুরু হলেও, তার স্বপ্নের ভিত্তি গড়ে ওঠে প্যারিসে। সেখানে ফ্যাশন ডিজাইনের ওপর উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নিজের Haute Couture ব্র্যান্ড।

বর্তমানে তার ডিজাইন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রেড কার্পেটগুলোতে নিয়মিত দেখা যায়। জটিল এমব্রয়ডারি, স্থাপত্যশৈলী-প্রভাবিত সিলুয়েট এবং হাতে তৈরি সূক্ষ্ম অলংকরণই তার ডিজাইনের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

হলিউড, বলিউড, ইউরোপীয় চলচ্চিত্র অঙ্গন, এমনকি বিভিন্ন দেশের রাজপরিবারের সদস্যরাও নিয়মিত তার ডিজাইন করা পোশাক পরেন। ফলে টনি ওয়ার্ড আজ শুধু একজন ডিজাইনার নন, বরং আন্তর্জাতিক Haute Couture শিল্পের অন্যতম প্রতিনিধিত্বশীল নাম।


Haute Couture আসলে কী?

অনেকেই মনে করেন, দামি পোশাকই Haute Couture। বাস্তবে বিষয়টি অনেক গভীর।

Haute Couture শব্দটির উৎপত্তি ফরাসি ভাষা থেকে। এর অর্থ উচ্চমানের বা অভিজাত পোশাক নির্মাণ। এ ধরনের পোশাক গণহারে তৈরি হয় না। নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তির জন্য মাপ অনুযায়ী ডিজাইন করা হয় এবং প্রতিটি ধাপে থাকে হাতে করা সূক্ষ্ম কাজ।

একটি Haute Couture পোশাক তৈরিতে সাধারণত স্কেচ, কাপড় নির্বাচন, একাধিক ফিটিং, এমব্রয়ডারি, অলংকরণ এবং চূড়ান্ত ফিনিশিং—সব মিলিয়ে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তাই এগুলোকে পোশাকের চেয়ে শিল্পকর্ম বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন ফ্যাশন বিশ্লেষকরা।

কেন ঐশ্বরিয়ার কান লুক এত আলোচিত?

২০০২ সাল থেকে কান চলচ্চিত্র উৎসবের নিয়মিত মুখ ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন। গত দুই দশকে তিনি অসংখ্য স্মরণীয় ফ্যাশন মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন। কখনও ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় পোশাক, কখনও রাজকীয় বলগাউন, আবার কখনও পরীক্ষাধর্মী Haute Couture ডিজাইনে—প্রতিবারই তিনি নিজের উপস্থিতিকে আলাদা করে তুলেছেন।

তবে ২০২৬ সালের এই গাউনকে অনেক ফ্যাশন সমালোচক তার সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম পরিশীলিত এবং ভারসাম্যপূর্ণ রেড কার্পেট লুক হিসেবে দেখছেন। কারণ, এতে একই সঙ্গে ছিল বিলাসিতা, কারুশিল্প, আধুনিক নকশা এবং ব্যক্তিত্বের শক্তিশালী প্রকাশ।

ফ্যাশনের আড়ালে কারিগরদের গল্প

লাল গালিচায় দর্শক যে পোশাকটি কয়েক মিনিটের জন্য দেখেন, তার পেছনে কাজ করেন অসংখ্য মানুষ—ডিজাইনার, প্যাটার্ন মেকার, এমব্রয়ডারি শিল্পী, দর্জি, অলংকরণ বিশেষজ্ঞ এবং স্টাইলিস্ট। তাদের কয়েক সপ্তাহের শ্রমই শেষ পর্যন্ত ক্যামেরার ফ্ল্যাশে ধরা পড়ে কয়েকটি মুহূর্তে।


ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনের ২০২৬ সালের কান গাউন সেই অদৃশ্য শ্রমেরই এক অনন্য উদাহরণ। ৬০০ ঘণ্টার কারুকাজ, ৭ হাজার মুক্তোর নিখুঁত সংযোজন এবং হাতে তৈরি প্রতিটি সূক্ষ্ম খুঁটিনাটি প্রমাণ করে—সত্যিকারের Haute Couture শুধু একটি পোশাক নয়, এটি সময়, সৃজনশীলতা ও শিল্পের এক অপূর্ব সমন্বয়।

এই কারণেই লাল গালিচায় ঐশ্বরিয়ার উপস্থিতি কেবল ফ্যাশনের প্রদর্শনী ছিল না; এটি ছিল বিশ্বমানের কারুশিল্প, নকশা এবং সৃজনশীলতার এক জীবন্ত উদযাপন।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত