সাক্ষাৎকারসাক্ষাৎকার

ভিকটিম সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকের করণীয়

সহিংসতা, দুর্ঘটনা বা দুর্যোগে বেঁচে ফেরা মানুষের সঙ্গে কথা বলার নৈতিক গাইডলাইন

নিজস্ব সাংবাদিক
নিজস্ব সাংবাদিক
 ভিকটিম সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকের করণীয়

সহিংস অপরাধ, সড়ক দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়—সংবাদমাধ্যমের জন্য এসব ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মানুষগুলো শুধু ‘খবরের উৎস’ নন, তারা গভীর মানসিক আঘাত নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষ। তাই তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া শুধু পেশাগত দক্ষতার বিষয় নয়, এটি মানবিকতা ও দায়িত্ববোধেরও পরীক্ষা।

দীর্ঘদিন মাঠে কাজ করা একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে অভিজ্ঞতা বলছে—এ ধরনের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কোনো একক নিয়ম নেই। তবে কিছু নৈতিক ও ব্যবহারিক দিক মেনে চললে কাজটি হতে পারে সম্মানজনক ও নিরাপদ।

সাক্ষাৎকারের আগে: নিজেকেই প্রশ্ন করুন

কোনো ট্র্যাজেডির শিকার ব্যক্তির কাছে যাওয়ার আগে থামুন। ভাবুন—
এই সাক্ষাৎকার কি সত্যিই প্রয়োজন?
নাকি শুধু প্রতিবেদনের ‘ড্রামাটিক’ অংশ বাড়ানোর জন্য?

কারও ব্যক্তিগত দুঃখ-যন্ত্রণা নতুন করে সামনে আনার আগে এর যৌক্তিকতা নিশ্চিত করা জরুরি।

পরিচয় দিন, উদ্দেশ্য পরিষ্কার করুন

সাংবাদিক হিসেবে নিজের পরিচয় স্পষ্ট করা বিশ্বাস তৈরির প্রথম ধাপ। একই সঙ্গে জানিয়ে দিন—

  • কেন সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন
  • কোথায় এটি প্রকাশ হবে
  • কীভাবে তথ্য ব্যবহার করবেন

এতে সাক্ষাৎকারদাতা মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারেন।

সময় ও পরিবেশ—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ

তাড়াহুড়োর মধ্যে সাক্ষাৎকার নেওয়া ঠিক নয়। সময় কম থাকলে তা আগেই জানিয়ে দিন।
শান্ত, নিরাপদ ও নিরিবিলি জায়গা বেছে নিন, যেখানে কথোপকথন বাধাগ্রস্ত হবে না। বিশেষ করে শিশুদের সামনে সংবেদনশীল আলোচনা এড়িয়ে চলুন।

নিয়ন্ত্রণ থাকুক সাক্ষাৎকারদাতার হাতে

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি—কোনো চাপ নয়।
সাক্ষাৎকার শুরুর আগে জানিয়ে দিন:

  • তারা চাইলে যেকোনো প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারেন
  • প্রয়োজনে বিরতি নিতে পারেন
  • কোনো তথ্য প্রকাশ না করার অনুরোধ জানাতে পারেন

এটি তাদের অধিকার।

প্রশ্ন হোক সংবেদনশীল, না যে আক্রমণাত্মক

“কেন ওই সময় সেখানে ছিলেন?”—এ ধরনের প্রশ্ন ভিকটিমকে দায়ী করে।
তার বদলে প্রেক্ষাপটভিত্তিক প্রশ্ন করুন, যেমন—
“ওই এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেমন ছিল?”

সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি এখানে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

শুনুন মন দিয়ে, শুধু প্রশ্ন নয়

একজন ভালো সাক্ষাৎকারগ্রহীতা আগে একজন মনোযোগী শ্রোতা।
চোখে চোখ রেখে কথা বলুন, মোবাইল বা বাইরের শব্দে মনোযোগ হারাবেন না।
অনেক সময় মানুষের অনুভূতিই সবচেয়ে বড় তথ্য।

রেকর্ড নাকি নোট—সিদ্ধান্ত নিন সচেতনভাবে

রেকর্ড করার আগে অনুমতি নিন।
যদি রেকর্ড করেন, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নিশ্চিত করুন।
গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য ভবিষ্যতে আইনি প্রমাণ হিসেবেও কাজে আসতে পারে।

আবেগের মুহূর্তে কী করবেন?

সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে কেউ কেঁদে ফেললে সেটি অস্বাভাবিক নয়।
এই সময়—

  • শান্ত থাকুন
  • জিজ্ঞাসা করুন, তিনি কী চান
  • পানি অফার করতে পারেন

অপ্রয়োজনীয় শারীরিক স্পর্শ বা চাপ তৈরি করা থেকে বিরত থাকুন।

ট্রমার গভীরতা বোঝার বিকল্প পথ

সবসময় সরাসরি কষ্টের স্মৃতি জানতে হবে—এমন নয়।
কখনো তাদের লেখা, আঁকা, কিংবা স্বপ্নের কথা জিজ্ঞাসা করেও মানসিক অবস্থার ধারণা পাওয়া যায়।

এতে তারা নতুন করে আঘাত না পেয়ে নিজেদের প্রকাশ করতে পারেন।

সাক্ষাৎকার শেষ হোক ইতিবাচকভাবে

শেষের দিকে এমন প্রশ্ন করুন যা তাদের শক্তি ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প তুলে আনে—
“আপনি কীভাবে পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন?”
“আগামী দিনের জন্য আপনার পরিকল্পনা কী?”

এতে আলোচনার শেষটা কিছুটা আশাবাদী হয়।

প্রকাশের আগে ভাবুন ঝুঁকির কথা

প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাক্ষাৎকারদাতার কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে কি না—তা বিবেচনা করা জরুরি।
প্রয়োজনে পরিচয় গোপন রাখা বা কিছু তথ্য বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

তথ্য যাচাই: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ

ট্রমার কারণে স্মৃতি বিভ্রান্ত হতে পারে। তাই—

  • একাধিক উৎস থেকে তথ্য যাচাই করুন
  • প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রমাণ সংগ্রহ করুন
  • নিজের ধারণার সঙ্গে না মিললেও তথ্য বাদ দেবেন না

বিষয় : সাক্ষাতকার পরামর্শ ভিকটিম

কাল মহাকাল

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬


ভিকটিম সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকের করণীয়

প্রকাশের তারিখ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

সহিংস অপরাধ, সড়ক দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়—সংবাদমাধ্যমের জন্য এসব ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মানুষগুলো শুধু ‘খবরের উৎস’ নন, তারা গভীর মানসিক আঘাত নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষ। তাই তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া শুধু পেশাগত দক্ষতার বিষয় নয়, এটি মানবিকতা ও দায়িত্ববোধেরও পরীক্ষা।

দীর্ঘদিন মাঠে কাজ করা একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে অভিজ্ঞতা বলছে—এ ধরনের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কোনো একক নিয়ম নেই। তবে কিছু নৈতিক ও ব্যবহারিক দিক মেনে চললে কাজটি হতে পারে সম্মানজনক ও নিরাপদ।

সাক্ষাৎকারের আগে: নিজেকেই প্রশ্ন করুন

কোনো ট্র্যাজেডির শিকার ব্যক্তির কাছে যাওয়ার আগে থামুন। ভাবুন—
এই সাক্ষাৎকার কি সত্যিই প্রয়োজন?
নাকি শুধু প্রতিবেদনের ‘ড্রামাটিক’ অংশ বাড়ানোর জন্য?

কারও ব্যক্তিগত দুঃখ-যন্ত্রণা নতুন করে সামনে আনার আগে এর যৌক্তিকতা নিশ্চিত করা জরুরি।

পরিচয় দিন, উদ্দেশ্য পরিষ্কার করুন

সাংবাদিক হিসেবে নিজের পরিচয় স্পষ্ট করা বিশ্বাস তৈরির প্রথম ধাপ। একই সঙ্গে জানিয়ে দিন—

  • কেন সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন
  • কোথায় এটি প্রকাশ হবে
  • কীভাবে তথ্য ব্যবহার করবেন

এতে সাক্ষাৎকারদাতা মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারেন।

সময় ও পরিবেশ—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ

তাড়াহুড়োর মধ্যে সাক্ষাৎকার নেওয়া ঠিক নয়। সময় কম থাকলে তা আগেই জানিয়ে দিন।
শান্ত, নিরাপদ ও নিরিবিলি জায়গা বেছে নিন, যেখানে কথোপকথন বাধাগ্রস্ত হবে না। বিশেষ করে শিশুদের সামনে সংবেদনশীল আলোচনা এড়িয়ে চলুন।

নিয়ন্ত্রণ থাকুক সাক্ষাৎকারদাতার হাতে

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি—কোনো চাপ নয়।
সাক্ষাৎকার শুরুর আগে জানিয়ে দিন:

  • তারা চাইলে যেকোনো প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারেন
  • প্রয়োজনে বিরতি নিতে পারেন
  • কোনো তথ্য প্রকাশ না করার অনুরোধ জানাতে পারেন

এটি তাদের অধিকার।

প্রশ্ন হোক সংবেদনশীল, না যে আক্রমণাত্মক

“কেন ওই সময় সেখানে ছিলেন?”—এ ধরনের প্রশ্ন ভিকটিমকে দায়ী করে।
তার বদলে প্রেক্ষাপটভিত্তিক প্রশ্ন করুন, যেমন—
“ওই এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেমন ছিল?”

সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি এখানে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

শুনুন মন দিয়ে, শুধু প্রশ্ন নয়

একজন ভালো সাক্ষাৎকারগ্রহীতা আগে একজন মনোযোগী শ্রোতা।
চোখে চোখ রেখে কথা বলুন, মোবাইল বা বাইরের শব্দে মনোযোগ হারাবেন না।
অনেক সময় মানুষের অনুভূতিই সবচেয়ে বড় তথ্য।

রেকর্ড নাকি নোট—সিদ্ধান্ত নিন সচেতনভাবে

রেকর্ড করার আগে অনুমতি নিন।
যদি রেকর্ড করেন, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নিশ্চিত করুন।
গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য ভবিষ্যতে আইনি প্রমাণ হিসেবেও কাজে আসতে পারে।

আবেগের মুহূর্তে কী করবেন?

সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে কেউ কেঁদে ফেললে সেটি অস্বাভাবিক নয়।
এই সময়—

  • শান্ত থাকুন
  • জিজ্ঞাসা করুন, তিনি কী চান
  • পানি অফার করতে পারেন

অপ্রয়োজনীয় শারীরিক স্পর্শ বা চাপ তৈরি করা থেকে বিরত থাকুন।

ট্রমার গভীরতা বোঝার বিকল্প পথ

সবসময় সরাসরি কষ্টের স্মৃতি জানতে হবে—এমন নয়।
কখনো তাদের লেখা, আঁকা, কিংবা স্বপ্নের কথা জিজ্ঞাসা করেও মানসিক অবস্থার ধারণা পাওয়া যায়।

এতে তারা নতুন করে আঘাত না পেয়ে নিজেদের প্রকাশ করতে পারেন।

সাক্ষাৎকার শেষ হোক ইতিবাচকভাবে

শেষের দিকে এমন প্রশ্ন করুন যা তাদের শক্তি ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প তুলে আনে—
“আপনি কীভাবে পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন?”
“আগামী দিনের জন্য আপনার পরিকল্পনা কী?”

এতে আলোচনার শেষটা কিছুটা আশাবাদী হয়।

প্রকাশের আগে ভাবুন ঝুঁকির কথা

প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাক্ষাৎকারদাতার কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে কি না—তা বিবেচনা করা জরুরি।
প্রয়োজনে পরিচয় গোপন রাখা বা কিছু তথ্য বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

তথ্য যাচাই: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ

ট্রমার কারণে স্মৃতি বিভ্রান্ত হতে পারে। তাই—

  • একাধিক উৎস থেকে তথ্য যাচাই করুন
  • প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রমাণ সংগ্রহ করুন
  • নিজের ধারণার সঙ্গে না মিললেও তথ্য বাদ দেবেন না

কাল মহাকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ সম্পাদক আলী
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত