আইন-কানুনআইন-কানুন

যৌতুক: আইনের চোখে অপরাধ, সমাজের বুকে অভিশাপ

যেন বিয়ে নয়, লেনদেন—যৌতুকের দাবিতে ভাঙছে সংসার, বাড়ছে সহিংসতা

যৌতুক: আইনের চোখে অপরাধ, সমাজের বুকে অভিশাপ

বাংলাদেশের সমাজে এখনো এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ সংকট হিসেবে রয়ে গেছে যৌতুক প্রথা। আধুনিকতার অগ্রযাত্রার মাঝেও এই প্রথা অনেক নারীর জীবনে নিয়ে আসছে অশান্তি, নির্যাতন, এমনকি মৃত্যুও। বিয়ের মতো পবিত্র সম্পর্ককে যখন আর্থিক লেনদেনের শর্তে বাঁধা হয়, তখন তা শুধু আইন লঙ্ঘনই নয়, মানবিক মূল্যবোধেরও চরম অবক্ষয়।

যৌতুক কী—আইনের ভাষায়

সাধারণভাবে, বিয়ের সময় কনেপক্ষ থেকে বরপক্ষকে অর্থ, সম্পদ বা অন্য কোনো সুবিধা দেওয়াকে আমরা যৌতুক হিসেবে জানি। কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে বিষয়টি আরও বিস্তৃত।

যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০ অনুযায়ী, বিয়ের আগে, পরে বা বিয়ের সময়—যে কোনো সময়ে এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের কাছে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সম্পদ বা মূল্যবান কিছু হস্তান্তর করা বা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়াও যৌতুক হিসেবে গণ্য হবে।

অর্থাৎ, এটি শুধু নগদ অর্থ নয়—গাড়ি, আসবাব, গহনা বা অন্য যেকোনো সম্পদও এর আওতায় পড়ে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই লেনদেন যদি বিয়ের শর্ত হিসেবে হয়, তাহলে সেটিই আইনের চোখে অপরাধ।

উপহার নাকি যৌতুক—পার্থক্য কোথায়?

অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে—বিয়েতে দেওয়া উপহার কি যৌতুক?

আইন এখানে একটি সীমা নির্ধারণ করেছে। সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা মূল্যের উপহার যৌতুক হিসেবে বিবেচিত হবে না—তবে শর্ত আছে।

  • উপহারটি বিয়ের শর্ত হিসেবে দেওয়া যাবে না
  • এটি এমন কারও পক্ষ থেকে আসতে হবে, যার সঙ্গে বিয়ের সরাসরি সম্পর্ক নেই
  • উপহার হিসেবে দিতে হবে, কোনো দাবি বা চাপের ভিত্তিতে নয়

অন্যথায়, অল্প পরিমাণ অর্থ বা সামগ্রী হলেও সেটি যৌতুক হিসেবে গণ্য হবে এবং অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

অন্যান্য আইনে যৌতুকের ব্যাখ্যা

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-তেও যৌতুকের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। এই আইনে বলা হয়েছে, বিয়ের শর্ত হিসেবে বা বিয়েকে কেন্দ্র করে যেকোনো অর্থ, সম্পদ বা সামগ্রী দেওয়া বা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি যৌতুক হিসেবে বিবেচিত হবে।

এতে বোঝা যায়, আইন প্রণেতারা যৌতুককে একটি গুরুতর সামাজিক অপরাধ হিসেবে দেখেছেন।

শাস্তির বিধান: কঠোর বার্তা আইনের

যৌতুক গ্রহণ বা প্রদান—দুটিই দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রমাণিত হলে—

  • সর্বনিম্ন ১ বছর কারাদণ্ড
  • সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড
  • অথবা জরিমানা
  • কিংবা উভয় দণ্ডই হতে পারে

এই শাস্তির বিধান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়—যৌতুক কোনোভাবেই সহনীয় নয়।

সমাজের জন্য সতর্কবার্তা

যৌতুক শুধু একটি আইনি অপরাধ নয়, এটি পরিবার ও সমাজের ভিত্তিকে দুর্বল করে। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রথা থেকে শুরু হয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, যা শেষ পর্যন্ত প্রাণহানির মতো ভয়াবহ পরিণতিও ডেকে আনে।

তাই সচেতনতা, আইনের প্রয়োগ এবং সামাজিক প্রতিরোধ—এই তিনটির সমন্বয়েই যৌতুকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

বিষয় : যৌতুক আইন অপরাধ

কাল মহাকাল

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬


যৌতুক: আইনের চোখে অপরাধ, সমাজের বুকে অভিশাপ

প্রকাশের তারিখ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের সমাজে এখনো এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ সংকট হিসেবে রয়ে গেছে যৌতুক প্রথা। আধুনিকতার অগ্রযাত্রার মাঝেও এই প্রথা অনেক নারীর জীবনে নিয়ে আসছে অশান্তি, নির্যাতন, এমনকি মৃত্যুও। বিয়ের মতো পবিত্র সম্পর্ককে যখন আর্থিক লেনদেনের শর্তে বাঁধা হয়, তখন তা শুধু আইন লঙ্ঘনই নয়, মানবিক মূল্যবোধেরও চরম অবক্ষয়।

যৌতুক কী—আইনের ভাষায়

সাধারণভাবে, বিয়ের সময় কনেপক্ষ থেকে বরপক্ষকে অর্থ, সম্পদ বা অন্য কোনো সুবিধা দেওয়াকে আমরা যৌতুক হিসেবে জানি। কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে বিষয়টি আরও বিস্তৃত।

যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০ অনুযায়ী, বিয়ের আগে, পরে বা বিয়ের সময়—যে কোনো সময়ে এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের কাছে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সম্পদ বা মূল্যবান কিছু হস্তান্তর করা বা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়াও যৌতুক হিসেবে গণ্য হবে।

অর্থাৎ, এটি শুধু নগদ অর্থ নয়—গাড়ি, আসবাব, গহনা বা অন্য যেকোনো সম্পদও এর আওতায় পড়ে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই লেনদেন যদি বিয়ের শর্ত হিসেবে হয়, তাহলে সেটিই আইনের চোখে অপরাধ।

উপহার নাকি যৌতুক—পার্থক্য কোথায়?

অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে—বিয়েতে দেওয়া উপহার কি যৌতুক?

আইন এখানে একটি সীমা নির্ধারণ করেছে। সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা মূল্যের উপহার যৌতুক হিসেবে বিবেচিত হবে না—তবে শর্ত আছে।

  • উপহারটি বিয়ের শর্ত হিসেবে দেওয়া যাবে না
  • এটি এমন কারও পক্ষ থেকে আসতে হবে, যার সঙ্গে বিয়ের সরাসরি সম্পর্ক নেই
  • উপহার হিসেবে দিতে হবে, কোনো দাবি বা চাপের ভিত্তিতে নয়

অন্যথায়, অল্প পরিমাণ অর্থ বা সামগ্রী হলেও সেটি যৌতুক হিসেবে গণ্য হবে এবং অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

অন্যান্য আইনে যৌতুকের ব্যাখ্যা

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-তেও যৌতুকের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। এই আইনে বলা হয়েছে, বিয়ের শর্ত হিসেবে বা বিয়েকে কেন্দ্র করে যেকোনো অর্থ, সম্পদ বা সামগ্রী দেওয়া বা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি যৌতুক হিসেবে বিবেচিত হবে।

এতে বোঝা যায়, আইন প্রণেতারা যৌতুককে একটি গুরুতর সামাজিক অপরাধ হিসেবে দেখেছেন।

শাস্তির বিধান: কঠোর বার্তা আইনের

যৌতুক গ্রহণ বা প্রদান—দুটিই দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রমাণিত হলে—

  • সর্বনিম্ন ১ বছর কারাদণ্ড
  • সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড
  • অথবা জরিমানা
  • কিংবা উভয় দণ্ডই হতে পারে

এই শাস্তির বিধান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়—যৌতুক কোনোভাবেই সহনীয় নয়।

সমাজের জন্য সতর্কবার্তা

যৌতুক শুধু একটি আইনি অপরাধ নয়, এটি পরিবার ও সমাজের ভিত্তিকে দুর্বল করে। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রথা থেকে শুরু হয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, যা শেষ পর্যন্ত প্রাণহানির মতো ভয়াবহ পরিণতিও ডেকে আনে।

তাই সচেতনতা, আইনের প্রয়োগ এবং সামাজিক প্রতিরোধ—এই তিনটির সমন্বয়েই যৌতুকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।


কাল মহাকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ সম্পাদক আলী
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত