সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 মতামতমতামত

চুপ্পুর বিদায়: এক রাষ্ট্রপতির উত্থান, বিতর্ক ও জবাবদিহির প্রশ্ন

চুপ্পুর বিদায়: এক রাষ্ট্রপতির উত্থান, বিতর্ক ও জবাবদিহির প্রশ্ন
ছবি- সংকলিত

রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পদত্যাগ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তিনি পদত্যাগপত্রে জানিয়েছেন, হৃদযন্ত্রে বাইপাস অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি তাঁর শরীরে ‘অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি’ রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে তিনি মাঝেমধ্যে অচেতন হয়ে পড়েন এবং শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতার কারণে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন তাঁর পক্ষে আর সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে সাংবিধানিক পদ থেকে সরে দাঁড়ানো একটি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়মিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অপরিহার্য। তবে এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে তাঁর দায়িত্ব পালনকাল ঘিরে বিতর্ক ও প্রশ্নগুলোরও অবসান ঘটেনি।

মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর একাধিক বক্তব্যে স্বীকার করেছিলেন যে, রাষ্ট্রপতি হওয়া তাঁর নিজের কিংবা তাঁর পরিবারের কল্পনারও বাইরে ছিল। তিনি বলেছিলেন, তাঁর বাবা-মাও কখনো ভাবেননি যে তাঁদের ছেলে রাষ্ট্রপতি হবেন। আবার তিনি এটিও বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন এবং সেই কারণেই শেষ কয়েক মাস তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলে তাঁর উপলব্ধি হয়েছিল।

এই বক্তব্যগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করে। সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় আস্থাই যদি প্রধান বিবেচ্য হয়, তাহলে সেই পদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয় ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে তিনি প্রথমে এক ধরনের বক্তব্য দেন, পরে আরেক ধরনের বক্তব্য দেন। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয় এবং তাঁর পদত্যাগের দাবিও ওঠে। যদিও সে সময় তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন।

তাঁর অতীত কর্মজীবন নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিচারক, দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার এবং পরে এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের কারণে তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। রাজনৈতিক মহলেও দীর্ঘদিন ধরে এমন ধারণা প্রচলিত ছিল যে, ক্ষমতাকেন্দ্রের আস্থা অর্জনই তাঁর উত্থানের অন্যতম কারণ। যদিও এসব বিষয়ে তাঁর পক্ষ থেকে সব অভিযোগ স্বীকার করা হয়নি।

সম্প্রতি বিদেশে চিকিৎসাকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর টেলিফোনে কথা হওয়ার খবর প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়। এর কিছুদিন পরই তিনি স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। ঘটনাক্রমের এই ধারাবাহিকতা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে, যদিও এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এখন নতুন করে আরেকটি বিতর্ক সামনে এসেছে—রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব কি না। সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সময়কার সরকারি কার্যক্রমের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি প্রদান করে। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, দায়িত্বের বাইরে সংঘটিত কোনো ব্যক্তিগত বা ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ থাকলে সেই সাংবিধানিক দায়মুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে যদি কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্তের পর্যায়ে আসে, তার আইনি পরিণতি আদালত ও সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করবে।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ তাই কেবল একজন ব্যক্তির দায়িত্ব ছাড়ার ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহির প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। স্বাস্থ্যগত কারণে তাঁর সরে দাঁড়ানো একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও, তাঁর দায়িত্ব পালনকাল নিয়ে যে বিতর্ক ও মূল্যায়ন শুরু হয়েছে, তা সম্ভবত আরও দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক ও আইনি আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।

বিষয় : জবাবদিহি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু উত্থান

কাল মহাকাল

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬


চুপ্পুর বিদায়: এক রাষ্ট্রপতির উত্থান, বিতর্ক ও জবাবদিহির প্রশ্ন

প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুলাই ২০২৬

featured Image

রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পদত্যাগ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তিনি পদত্যাগপত্রে জানিয়েছেন, হৃদযন্ত্রে বাইপাস অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি তাঁর শরীরে ‘অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি’ রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে তিনি মাঝেমধ্যে অচেতন হয়ে পড়েন এবং শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতার কারণে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন তাঁর পক্ষে আর সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে সাংবিধানিক পদ থেকে সরে দাঁড়ানো একটি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়মিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অপরিহার্য। তবে এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে তাঁর দায়িত্ব পালনকাল ঘিরে বিতর্ক ও প্রশ্নগুলোরও অবসান ঘটেনি।

মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর একাধিক বক্তব্যে স্বীকার করেছিলেন যে, রাষ্ট্রপতি হওয়া তাঁর নিজের কিংবা তাঁর পরিবারের কল্পনারও বাইরে ছিল। তিনি বলেছিলেন, তাঁর বাবা-মাও কখনো ভাবেননি যে তাঁদের ছেলে রাষ্ট্রপতি হবেন। আবার তিনি এটিও বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন এবং সেই কারণেই শেষ কয়েক মাস তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলে তাঁর উপলব্ধি হয়েছিল।

এই বক্তব্যগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করে। সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় আস্থাই যদি প্রধান বিবেচ্য হয়, তাহলে সেই পদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয় ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে তিনি প্রথমে এক ধরনের বক্তব্য দেন, পরে আরেক ধরনের বক্তব্য দেন। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয় এবং তাঁর পদত্যাগের দাবিও ওঠে। যদিও সে সময় তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন।

তাঁর অতীত কর্মজীবন নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিচারক, দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার এবং পরে এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের কারণে তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। রাজনৈতিক মহলেও দীর্ঘদিন ধরে এমন ধারণা প্রচলিত ছিল যে, ক্ষমতাকেন্দ্রের আস্থা অর্জনই তাঁর উত্থানের অন্যতম কারণ। যদিও এসব বিষয়ে তাঁর পক্ষ থেকে সব অভিযোগ স্বীকার করা হয়নি।

সম্প্রতি বিদেশে চিকিৎসাকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর টেলিফোনে কথা হওয়ার খবর প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়। এর কিছুদিন পরই তিনি স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। ঘটনাক্রমের এই ধারাবাহিকতা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে, যদিও এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এখন নতুন করে আরেকটি বিতর্ক সামনে এসেছে—রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব কি না। সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সময়কার সরকারি কার্যক্রমের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি প্রদান করে। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, দায়িত্বের বাইরে সংঘটিত কোনো ব্যক্তিগত বা ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ থাকলে সেই সাংবিধানিক দায়মুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে যদি কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্তের পর্যায়ে আসে, তার আইনি পরিণতি আদালত ও সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করবে।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ তাই কেবল একজন ব্যক্তির দায়িত্ব ছাড়ার ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহির প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। স্বাস্থ্যগত কারণে তাঁর সরে দাঁড়ানো একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও, তাঁর দায়িত্ব পালনকাল নিয়ে যে বিতর্ক ও মূল্যায়ন শুরু হয়েছে, তা সম্ভবত আরও দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক ও আইনি আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত