গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর চার মাস অতিবাহিত হয়েছে। এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূলধারায় ফিরে আসার বিষয়টি এখন আলোচনার টেবিলে উঠে এসেছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং রাজনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ বলছে, এসব আলোচনার বড় অংশই নিছক গুঞ্জন বা এক ধরনের রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের প্রতিফলন। বর্তমান বাংলাদেশে যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তাতে শেখ হাসিনার ফিরে আসার সম্ভাবনা তাত্ত্বিকভাবে যতটা আলোচিত, প্রায়োগিকভাবে তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও অনিশ্চিত।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ক্ষমতার দম্ভে থাকা স্বৈরশাসক বা দীর্ঘমেয়াদী শাসকরা যখন ক্ষমতাচ্যুত হন, তখন তাদের প্রত্যাবর্তনের পথ সাধারণত কণ্টকাকীর্ণ থাকে। ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোস বা থাইল্যান্ডের থাকসিন সিনাওয়াত্রার দিকে তাকালে আমরা একধরনের তুলনামূলক চিত্র পাই। থাকসিন সিনাওয়াত্রা দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরেছিলেন, কিন্তু তার জন্য দীর্ঘ আইনি লড়াই ও সমঝোতার এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল। অন্যদিকে, গণ-অভ্যুত্থানে চূর্ণ হওয়া শাসনের পর শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেনি, বরং গত দেড় দশকের শাসনব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের ভেতরে এক গভীর ক্ষোভ ও বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। ফলে এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক রদবদল নয়, বরং একটি নতুন রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা।
আমাদের দেশের আজকের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে শেখ হাসিনার ফিরে আসার গুঞ্জনটি মূলত প্রচারণার অংশ বলে মনে করছেন অধিকাংশ বিশ্লেষক। সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের মতে, অপরাধ ও দুর্নীতির দায়মুক্তির কোনো সুযোগ এখানে নেই। তার ভাষ্যমতে, গণতন্ত্রের নামে কোনো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি এদেশের মানুষ আর চায় না। ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলে, আর বর্তমান সময়ে সেই ইতিহাস জনমতের পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, আওয়ামী লীগের ভেতরে যে আত্মসমালোচনার অভাব, তা তাদের জনগণের থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। দলটি যদি তাদের অতীতের ভুলগুলো স্বীকার করে নতুনভাবে সামনে আসতে পারত, তবে হয়তো ভিন্ন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জনগণ সেই পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখছে না।
বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র চার মাস। এই সময়ের মধ্যে সরকার সব আশা পূরণ করতে না পারলেও, হাসিনাবিরোধী জনমত ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলো এখনো অটুট আছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, শেখ হাসিনার ফেরা মানেই হলো দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া। তিনি ফিরলে তাকে আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে যেতেই হবে। এখানে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে জবাবদিহিতার বিষয়টিই মুখ্য। সুতরাং, যারা ভাবছেন যে রাজনীতির স্বাভাবিক ধারায় তিনি বা তার দল খুব সহজেই ফিরে আসবে, তারা হয়তো দেশের বর্তমান গভীর রাজনৈতিক পরিবর্তনকে পুরোপুরি অনুধাবন করছেন না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, আওয়ামী লীগ চিরতরে রাজনীতির মাঠ থেকে মুছে যাবে। একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের সাংগঠনিক শক্তি ও তৃণমূলের অস্তিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ যেমনটি মনে করেন, কোনো দল নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা থাকলেই রাজনীতি থেকে হারিয়ে যায় না, তবে তাদের ফেরার পথটি কঠিন হতে হবে তাদের নিজের অতীতের কাজের বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে। জনগণ কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা এখন আর দেখছে না, বরং তারা দেখছে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার এক কঠিন লড়াই।
আমরা যদি এই পরিস্থিতির একটি টেকসই সমাধান খুঁজতে চাই, তবে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে আইনের শাসন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের ঊর্ধ্বে নয়—এই সত্যটি প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার প্রয়োজন। আওয়ামী লীগসহ যেকোনো বড় দলকে ফিরতে হলে অবশ্যই নতুন ও স্বচ্ছ নেতৃত্বের উত্থান ঘটাতে হবে, যারা অতীতের ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে পরিশীলিত রাজনীতি চর্চা করবে। তৃতীয়ত, বর্তমান সরকারকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা রোধে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই সন্ধিক্ষণে অস্থিরতা সৃষ্টির যেকোনো অপচেষ্টা মোকাবিলায় কূটনৈতিক ও আইনি সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
পরিশেষে একটি কথাই বলা প্রয়োজন, রাজনীতির মাঠ কখনো খালি থাকে না। কিন্তু সেই মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে জনগণের বিশ্বাস অর্জন করতে হয়। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা যদি কেবল প্রোপাগান্ডা বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির কৌশল হয়, তবে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। দেশের মানুষ এখন জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে। ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে এই স্বপ্ন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য জনগণের অবিচল সংকল্প। ইতিহাসের এই বাঁকবদলে ব্যক্তি বা দলের চেয়ে রাষ্ট্রের সুরক্ষা এবং জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই হবে আগামীর মূল চালিকাশক্তি।
বিষয় : হাসিনার প্রত্যাবর্তন
2.png)
সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ জুন ২০২৬
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর চার মাস অতিবাহিত হয়েছে। এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূলধারায় ফিরে আসার বিষয়টি এখন আলোচনার টেবিলে উঠে এসেছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং রাজনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ বলছে, এসব আলোচনার বড় অংশই নিছক গুঞ্জন বা এক ধরনের রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের প্রতিফলন। বর্তমান বাংলাদেশে যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তাতে শেখ হাসিনার ফিরে আসার সম্ভাবনা তাত্ত্বিকভাবে যতটা আলোচিত, প্রায়োগিকভাবে তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও অনিশ্চিত।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ক্ষমতার দম্ভে থাকা স্বৈরশাসক বা দীর্ঘমেয়াদী শাসকরা যখন ক্ষমতাচ্যুত হন, তখন তাদের প্রত্যাবর্তনের পথ সাধারণত কণ্টকাকীর্ণ থাকে। ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোস বা থাইল্যান্ডের থাকসিন সিনাওয়াত্রার দিকে তাকালে আমরা একধরনের তুলনামূলক চিত্র পাই। থাকসিন সিনাওয়াত্রা দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরেছিলেন, কিন্তু তার জন্য দীর্ঘ আইনি লড়াই ও সমঝোতার এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল। অন্যদিকে, গণ-অভ্যুত্থানে চূর্ণ হওয়া শাসনের পর শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেনি, বরং গত দেড় দশকের শাসনব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের ভেতরে এক গভীর ক্ষোভ ও বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। ফলে এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক রদবদল নয়, বরং একটি নতুন রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা।
আমাদের দেশের আজকের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে শেখ হাসিনার ফিরে আসার গুঞ্জনটি মূলত প্রচারণার অংশ বলে মনে করছেন অধিকাংশ বিশ্লেষক। সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের মতে, অপরাধ ও দুর্নীতির দায়মুক্তির কোনো সুযোগ এখানে নেই। তার ভাষ্যমতে, গণতন্ত্রের নামে কোনো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি এদেশের মানুষ আর চায় না। ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলে, আর বর্তমান সময়ে সেই ইতিহাস জনমতের পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, আওয়ামী লীগের ভেতরে যে আত্মসমালোচনার অভাব, তা তাদের জনগণের থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। দলটি যদি তাদের অতীতের ভুলগুলো স্বীকার করে নতুনভাবে সামনে আসতে পারত, তবে হয়তো ভিন্ন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জনগণ সেই পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখছে না।
বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র চার মাস। এই সময়ের মধ্যে সরকার সব আশা পূরণ করতে না পারলেও, হাসিনাবিরোধী জনমত ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলো এখনো অটুট আছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, শেখ হাসিনার ফেরা মানেই হলো দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া। তিনি ফিরলে তাকে আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে যেতেই হবে। এখানে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে জবাবদিহিতার বিষয়টিই মুখ্য। সুতরাং, যারা ভাবছেন যে রাজনীতির স্বাভাবিক ধারায় তিনি বা তার দল খুব সহজেই ফিরে আসবে, তারা হয়তো দেশের বর্তমান গভীর রাজনৈতিক পরিবর্তনকে পুরোপুরি অনুধাবন করছেন না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, আওয়ামী লীগ চিরতরে রাজনীতির মাঠ থেকে মুছে যাবে। একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের সাংগঠনিক শক্তি ও তৃণমূলের অস্তিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ যেমনটি মনে করেন, কোনো দল নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা থাকলেই রাজনীতি থেকে হারিয়ে যায় না, তবে তাদের ফেরার পথটি কঠিন হতে হবে তাদের নিজের অতীতের কাজের বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে। জনগণ কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা এখন আর দেখছে না, বরং তারা দেখছে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার এক কঠিন লড়াই।
আমরা যদি এই পরিস্থিতির একটি টেকসই সমাধান খুঁজতে চাই, তবে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে আইনের শাসন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের ঊর্ধ্বে নয়—এই সত্যটি প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার প্রয়োজন। আওয়ামী লীগসহ যেকোনো বড় দলকে ফিরতে হলে অবশ্যই নতুন ও স্বচ্ছ নেতৃত্বের উত্থান ঘটাতে হবে, যারা অতীতের ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে পরিশীলিত রাজনীতি চর্চা করবে। তৃতীয়ত, বর্তমান সরকারকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা রোধে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই সন্ধিক্ষণে অস্থিরতা সৃষ্টির যেকোনো অপচেষ্টা মোকাবিলায় কূটনৈতিক ও আইনি সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
পরিশেষে একটি কথাই বলা প্রয়োজন, রাজনীতির মাঠ কখনো খালি থাকে না। কিন্তু সেই মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে জনগণের বিশ্বাস অর্জন করতে হয়। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা যদি কেবল প্রোপাগান্ডা বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির কৌশল হয়, তবে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। দেশের মানুষ এখন জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে। ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে এই স্বপ্ন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য জনগণের অবিচল সংকল্প। ইতিহাসের এই বাঁকবদলে ব্যক্তি বা দলের চেয়ে রাষ্ট্রের সুরক্ষা এবং জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই হবে আগামীর মূল চালিকাশক্তি।
2.png)