সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 সম্পাদকীয়সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের রাষ্ট্র-দর্শন: কাগুজে প্রতিশ্রুতি আর দয়া-দাক্ষিণ্যের রাজনীতির গোলকধাঁধা

বাংলাদেশের রাষ্ট্র-দর্শন: কাগুজে প্রতিশ্রুতি আর দয়া-দাক্ষিণ্যের রাজনীতির গোলকধাঁধা

সাংবিধানিক অঙ্গীকার বনাম রূঢ় বাস্তবতা: জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে আমাদের সীমাবদ্ধতা ও উত্তরণের পথ

একটি রাষ্ট্র কতটা মানবিক, তা পরিমাপের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো সংকটের সময় রাষ্ট্র তার সাধারণ নাগরিকের পাশে কতটা নিঃশর্তভাবে দাঁড়াতে পারছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে এসে আজ আমাদের নির্মোহভাবে ভাবার সময় হয়েছে—বাংলাদেশ কি আসলেও একটি কল্যাণ রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পেরেছে, নাকি আমরা কেবল ‘দয়া-দাক্ষিণ্যের’ এক অপরাজনীতির আবর্তে আটকে আছি?

 আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: কল্যাণ রাষ্ট্রের সফল ও ভিন্নতর মডেল

এই দুনিয়ায় কল্যাণ রাষ্ট্র বা ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’ কোনো আকাশকুসুম কল্পনা নয়, বরং আধুনিক বিশ্বের অনেক দেশই এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। এক্ষেত্রে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর নাম সবার আগে আসে। নরওয়ের কথা ধরা যাক। দেশটি তার বিশাল তেল সম্পদের আয় কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর পকেটে না ভরে একটি সার্বভৌম তহবিলের মাধ্যমে নাগরিকদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় ব্যয় করে। সেখানে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া নাগরিকের অলঙ্ঘনীয় অধিকার, সরকারের কোনো করুণা নয়। আবার সুইডেন বা ডেনমার্কের মডেলটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে নাগরিকরা উচ্চহারে কর দেন ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে রাষ্ট্র তাদের দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এটি জনগণের সাথে রাষ্ট্রের একটি  চুক্তির মতো—জনগণ রাষ্ট্রকে অর্থ দিচ্ছে, রাষ্ট্র তার বদলে দিচ্ছে নিশ্চিন্ত জীবন।

অন্যদিকে কিউবার মডেলটি ভিন্ন মাত্রার। সমাজতান্ত্রিক আদর্শের এই দেশটি সীমিত সম্পদ নিয়েও তার প্রতিটি নাগরিকের জন্য উচ্চমানের শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিশ্চিত করেছে। সেখানে হয়তো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন আছে, কিন্তু মৌলিক চাহিদার প্রশ্নে রাষ্ট্র কোনো আপস করেনি। এই উদাহরণগুলো এটাই প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রব্যবস্থা গণতান্ত্রিক হোক বা সমাজতান্ত্রিক, সদিচ্ছা থাকলে নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।

  বাংলাদেশের বাস্তবতা: অধিকার যখন দয়া হিসেবে গণ্য হয়

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাকালে দেখা যায় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। আমাদের সংবিধানে কল্যাণ রাষ্ট্রের সব উপাদানই স্পষ্ট হরফে লেখা আছে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে আমরা এখনো ‘নিরাপত্তা বলয়’ বা ‘সেফটি নেট’-এর ধারণার বাইরে বের হতে পারিনি। প্রকৃত কল্যাণ রাষ্ট্রে সেবা হয় সর্বজনীন। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিটি সেবা ধনী-দরিদ্র সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত থাকবে। কিন্তু আমাদের দেশে আমরা যা দেখি, তা হলো বাছাইকৃত কিছু মানুষকে যৎসামান্য ভাতা বা টিসিবির ট্রাকের পেছনে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। যখন রাষ্ট্র তার নাগরিককে অধিকারের বদলে ‘দয়া’ বা ‘অনুকম্পা’ দিতে শুরু করে, তখনই বুঝতে হবে রাষ্ট্র তার মূল দর্শন থেকে বিচ্যুত হয়েছে। আমাদের সাম্প্রতিক সকল সমস্যা সমাধানে 'কার্ড সংস্কৃতি'  সেই রাষ্ট্রীয় দয়া বা অনুকম্পারই আধুনিক সংস্করণ মাত্র। 

সবচেয়ে করুণ চিত্র ফুটে ওঠে আমাদের চিকিৎসা খাতে। দেশে বর্তমানে দেড় লাখের কাছাকাছি নিবন্ধিত চিকিৎসক থাকলেও সরকারি পর্যায়ে কাজ করছেন মাত্র ৩০ হাজার। রাজধানী থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত বিশাল অবকাঠামো তৈরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষ সেখানে গেলে সেবা পায় না। সরকারি হাসপাতালে একটি সাধারণ পরীক্ষার জন্য ২০ দিন অপেক্ষা করতে হয়, অথচ পাশের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ১০ গুণ বেশি টাকা দিলেই তাৎক্ষণিক সেই সেবা মিলছে। এটি স্পষ্টতই একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা।তারপরই রয়েছে আরেক উল্লেখযোগ্য সেবা খাত শিক্ষা। এই খাত নিয়ে প্রতিটি সরকারই নানা প্রকার পরীক্ষণ আর ব্যবচ্ছেদ চালিয়েছে। কিন্তু যুগোপযোগী একটি শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম ,টেক্স বই , শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, পাঠদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতি কিছুই গড়ে তুলতে পারেনি। প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা, বাজার ব্যবস্থাপনা, খাদ্য নিরাপত্তার মত জীবন ঘনিষ্ট নাগরিক অধিকারগুলো যেন রাষ্ট্র স্বজ্ঞানেই এড়িয়ে যাচ্ছে।

 এই অব্যবস্থাপনার মূলে রয়েছে দুর্নীতি এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে না পারা। সাধারণ মানুষ যে দিয়াশলাই কেনা থেকে শুরু করে প্রতিটি পদক্ষেপে সরকারকে কর দিচ্ছে, তার বিনিময়ে রাষ্ট্র তাকে ন্যূনতম সেবাটুকু দিতেও হিমশিম খাচ্ছে।

 উত্তরণের পথ: প্রয়োজন দৃশ্যমান সংস্কার ও নীতিগত দৃঢ়তা

বাংলাদেশকে যদি প্রকৃত অর্থে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে বক্তৃতা, বন্দনা আর স্লোগানসর্বস্ব রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবসম্মত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতকে মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার থেকে মুক্ত করে রাষ্ট্রীয় সেবার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে জনবল সংকট নিরসনে দ্রুত নিয়োগ এবং চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। যন্ত্র বিকল থাকা বা টেকনিশিয়ান না থাকার যে চিরাচরিত অজুহাত, তা বন্ধ করতে বিকেন্দ্রীকরণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। তবে  শিক্ষা খাতেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিতে রাষ্ট্রের কোন সীমাবদ্ধতা বা অজুহাতের দোহাই হাজির করা উচিৎ হবে না।  

দ্বিতীয়ত, কর ব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। সরাসরি করদাতার সংখ্যা বাড়িয়ে পরোক্ষ করের বোঝা কমানো উচিত, যাতে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ কমে। একই সাথে দুর্নীতি নামক অদৃশ্য দেয়ালটি ভাঙতে হবে। এই দেয়ালটিই জনগণ এবং সরকারের প্রাপ্য সেবার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্র মেরামতের কথা এখন অনেকের মুখে শোনা যায়, কিন্তু এই মেরামত কেবল সংবিধানের পাতা পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এটি সম্ভব হবে তখনই, যখন প্রতিটি নাগরিকের জন্য মৌলিক চাহিদাগুলো করুণা নয় বরং ‘অধিকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

তৃতীয়ত, আমাদের রাজনীতিকে জনকল্যাণমুখী দর্শনে ফিরিয়ে নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য সাময়িক ত্রাণ বিতরণের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করা। বেকারত্ব বীমা, বার্ধক্যকালীন সর্বজনীন পেনশন এবং মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারলে তবেই আমরা কল্যাণ রাষ্ট্রের পথে এক ধাপ এগোতে পারব।

আগামীর বাংলাদেশ ও আমাদের দায়বদ্ধতা

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের যে জোয়ার এসেছে, তাকে কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করলে বড় ভুল হবে।১৯৭১ এর স্বাধীনতার প্রকৃত নির্যাসও প্রায় অভিন্ন ছিল,  একটি বৈষম্যহীন সমাজ এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্র। আমরা যদি এখনো কেবল দলীয় সংকীর্ণতা আর গোষ্ঠীতন্ত্রের পেছনে সময় ব্যয় করি, তবে ইতিহাসের কাছে নিকট ভবিষ্যতে আমাদের জবাবদিহি করতেই হবে।

মনে রাখা প্রয়োজন, জনকল্যাণ কোনো চ্যারিটি বা দান নয়। এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ অনেক লড়াকু, তারা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের ভাগ্য বদলাতে জানে। রাষ্ট্র যদি শুধু তাদের ন্যূনতম অধিকারগুলো নিশ্চিত করে একটি সমতল ক্ষেত্র তৈরি করে দিতে পারে, তবে এই দেশ বিশ্ব মানচিত্রে একটি আদর্শ মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। 

আমাদের আগামীর রাজনীতির মূল মন্ত্র হওয়া উচিত—দয়া নয়, অধিকারের নিশ্চয়তা। কেবল সেই পথেই নিহিত আছে আমাদের মুক্তি।

বিষয় : আগামীর বাংলাদেশ কল্যাণ রাষ্ট্র

কাল মহাকাল

শনিবার, ০৯ মে ২০২৬


বাংলাদেশের রাষ্ট্র-দর্শন: কাগুজে প্রতিশ্রুতি আর দয়া-দাক্ষিণ্যের রাজনীতির গোলকধাঁধা

প্রকাশের তারিখ : ০৮ মে ২০২৬

featured Image

সাংবিধানিক অঙ্গীকার বনাম রূঢ় বাস্তবতা: জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে আমাদের সীমাবদ্ধতা ও উত্তরণের পথ

একটি রাষ্ট্র কতটা মানবিক, তা পরিমাপের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো সংকটের সময় রাষ্ট্র তার সাধারণ নাগরিকের পাশে কতটা নিঃশর্তভাবে দাঁড়াতে পারছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে এসে আজ আমাদের নির্মোহভাবে ভাবার সময় হয়েছে—বাংলাদেশ কি আসলেও একটি কল্যাণ রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পেরেছে, নাকি আমরা কেবল ‘দয়া-দাক্ষিণ্যের’ এক অপরাজনীতির আবর্তে আটকে আছি?

 আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: কল্যাণ রাষ্ট্রের সফল ও ভিন্নতর মডেল

এই দুনিয়ায় কল্যাণ রাষ্ট্র বা ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’ কোনো আকাশকুসুম কল্পনা নয়, বরং আধুনিক বিশ্বের অনেক দেশই এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। এক্ষেত্রে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর নাম সবার আগে আসে। নরওয়ের কথা ধরা যাক। দেশটি তার বিশাল তেল সম্পদের আয় কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর পকেটে না ভরে একটি সার্বভৌম তহবিলের মাধ্যমে নাগরিকদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় ব্যয় করে। সেখানে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া নাগরিকের অলঙ্ঘনীয় অধিকার, সরকারের কোনো করুণা নয়। আবার সুইডেন বা ডেনমার্কের মডেলটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে নাগরিকরা উচ্চহারে কর দেন ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে রাষ্ট্র তাদের দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এটি জনগণের সাথে রাষ্ট্রের একটি  চুক্তির মতো—জনগণ রাষ্ট্রকে অর্থ দিচ্ছে, রাষ্ট্র তার বদলে দিচ্ছে নিশ্চিন্ত জীবন।

অন্যদিকে কিউবার মডেলটি ভিন্ন মাত্রার। সমাজতান্ত্রিক আদর্শের এই দেশটি সীমিত সম্পদ নিয়েও তার প্রতিটি নাগরিকের জন্য উচ্চমানের শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিশ্চিত করেছে। সেখানে হয়তো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন আছে, কিন্তু মৌলিক চাহিদার প্রশ্নে রাষ্ট্র কোনো আপস করেনি। এই উদাহরণগুলো এটাই প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রব্যবস্থা গণতান্ত্রিক হোক বা সমাজতান্ত্রিক, সদিচ্ছা থাকলে নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।

  বাংলাদেশের বাস্তবতা: অধিকার যখন দয়া হিসেবে গণ্য হয়

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাকালে দেখা যায় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। আমাদের সংবিধানে কল্যাণ রাষ্ট্রের সব উপাদানই স্পষ্ট হরফে লেখা আছে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে আমরা এখনো ‘নিরাপত্তা বলয়’ বা ‘সেফটি নেট’-এর ধারণার বাইরে বের হতে পারিনি। প্রকৃত কল্যাণ রাষ্ট্রে সেবা হয় সর্বজনীন। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিটি সেবা ধনী-দরিদ্র সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত থাকবে। কিন্তু আমাদের দেশে আমরা যা দেখি, তা হলো বাছাইকৃত কিছু মানুষকে যৎসামান্য ভাতা বা টিসিবির ট্রাকের পেছনে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। যখন রাষ্ট্র তার নাগরিককে অধিকারের বদলে ‘দয়া’ বা ‘অনুকম্পা’ দিতে শুরু করে, তখনই বুঝতে হবে রাষ্ট্র তার মূল দর্শন থেকে বিচ্যুত হয়েছে। আমাদের সাম্প্রতিক সকল সমস্যা সমাধানে 'কার্ড সংস্কৃতি'  সেই রাষ্ট্রীয় দয়া বা অনুকম্পারই আধুনিক সংস্করণ মাত্র। 

সবচেয়ে করুণ চিত্র ফুটে ওঠে আমাদের চিকিৎসা খাতে। দেশে বর্তমানে দেড় লাখের কাছাকাছি নিবন্ধিত চিকিৎসক থাকলেও সরকারি পর্যায়ে কাজ করছেন মাত্র ৩০ হাজার। রাজধানী থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত বিশাল অবকাঠামো তৈরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষ সেখানে গেলে সেবা পায় না। সরকারি হাসপাতালে একটি সাধারণ পরীক্ষার জন্য ২০ দিন অপেক্ষা করতে হয়, অথচ পাশের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ১০ গুণ বেশি টাকা দিলেই তাৎক্ষণিক সেই সেবা মিলছে। এটি স্পষ্টতই একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা।তারপরই রয়েছে আরেক উল্লেখযোগ্য সেবা খাত শিক্ষা। এই খাত নিয়ে প্রতিটি সরকারই নানা প্রকার পরীক্ষণ আর ব্যবচ্ছেদ চালিয়েছে। কিন্তু যুগোপযোগী একটি শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম ,টেক্স বই , শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, পাঠদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতি কিছুই গড়ে তুলতে পারেনি। প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা, বাজার ব্যবস্থাপনা, খাদ্য নিরাপত্তার মত জীবন ঘনিষ্ট নাগরিক অধিকারগুলো যেন রাষ্ট্র স্বজ্ঞানেই এড়িয়ে যাচ্ছে।

 এই অব্যবস্থাপনার মূলে রয়েছে দুর্নীতি এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে না পারা। সাধারণ মানুষ যে দিয়াশলাই কেনা থেকে শুরু করে প্রতিটি পদক্ষেপে সরকারকে কর দিচ্ছে, তার বিনিময়ে রাষ্ট্র তাকে ন্যূনতম সেবাটুকু দিতেও হিমশিম খাচ্ছে।

 উত্তরণের পথ: প্রয়োজন দৃশ্যমান সংস্কার ও নীতিগত দৃঢ়তা

বাংলাদেশকে যদি প্রকৃত অর্থে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে বক্তৃতা, বন্দনা আর স্লোগানসর্বস্ব রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবসম্মত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতকে মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার থেকে মুক্ত করে রাষ্ট্রীয় সেবার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে জনবল সংকট নিরসনে দ্রুত নিয়োগ এবং চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। যন্ত্র বিকল থাকা বা টেকনিশিয়ান না থাকার যে চিরাচরিত অজুহাত, তা বন্ধ করতে বিকেন্দ্রীকরণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। তবে  শিক্ষা খাতেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিতে রাষ্ট্রের কোন সীমাবদ্ধতা বা অজুহাতের দোহাই হাজির করা উচিৎ হবে না।  

দ্বিতীয়ত, কর ব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। সরাসরি করদাতার সংখ্যা বাড়িয়ে পরোক্ষ করের বোঝা কমানো উচিত, যাতে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ কমে। একই সাথে দুর্নীতি নামক অদৃশ্য দেয়ালটি ভাঙতে হবে। এই দেয়ালটিই জনগণ এবং সরকারের প্রাপ্য সেবার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্র মেরামতের কথা এখন অনেকের মুখে শোনা যায়, কিন্তু এই মেরামত কেবল সংবিধানের পাতা পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এটি সম্ভব হবে তখনই, যখন প্রতিটি নাগরিকের জন্য মৌলিক চাহিদাগুলো করুণা নয় বরং ‘অধিকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

তৃতীয়ত, আমাদের রাজনীতিকে জনকল্যাণমুখী দর্শনে ফিরিয়ে নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য সাময়িক ত্রাণ বিতরণের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করা। বেকারত্ব বীমা, বার্ধক্যকালীন সর্বজনীন পেনশন এবং মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারলে তবেই আমরা কল্যাণ রাষ্ট্রের পথে এক ধাপ এগোতে পারব।

আগামীর বাংলাদেশ ও আমাদের দায়বদ্ধতা

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের যে জোয়ার এসেছে, তাকে কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করলে বড় ভুল হবে।১৯৭১ এর স্বাধীনতার প্রকৃত নির্যাসও প্রায় অভিন্ন ছিল,  একটি বৈষম্যহীন সমাজ এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্র। আমরা যদি এখনো কেবল দলীয় সংকীর্ণতা আর গোষ্ঠীতন্ত্রের পেছনে সময় ব্যয় করি, তবে ইতিহাসের কাছে নিকট ভবিষ্যতে আমাদের জবাবদিহি করতেই হবে।

মনে রাখা প্রয়োজন, জনকল্যাণ কোনো চ্যারিটি বা দান নয়। এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ অনেক লড়াকু, তারা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের ভাগ্য বদলাতে জানে। রাষ্ট্র যদি শুধু তাদের ন্যূনতম অধিকারগুলো নিশ্চিত করে একটি সমতল ক্ষেত্র তৈরি করে দিতে পারে, তবে এই দেশ বিশ্ব মানচিত্রে একটি আদর্শ মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। 

আমাদের আগামীর রাজনীতির মূল মন্ত্র হওয়া উচিত—দয়া নয়, অধিকারের নিশ্চয়তা। কেবল সেই পথেই নিহিত আছে আমাদের মুক্তি।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত