সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 বিনোদনবিনোদন

সীমাবদ্ধতার ফ্রেমে বিশ্বজয় সামিউল করিম সুপ্তকের : সাংহাইয়ে ‘সাঁকোটা দুলছে’র রূপকথা

বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব ‘সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’ এ এবারের আসরটি বাংলাদেশের স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রের ইতিহাসের পাতায় এক সোনালী অধ্যায় হয়ে থাকবে।

সীমাবদ্ধতার ফ্রেমে বিশ্বজয় সামিউল করিম সুপ্তকের : সাংহাইয়ে ‘সাঁকোটা দুলছে’র রূপকথা
ছবি -সংগৃহীত

বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব ‘সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’-এর ২৮তম আসরের পর্দা নামল ২১ জুন। আর এবারের আসরটি বাংলাদেশের স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রের ইতিহাসের পাতায় এক সোনালী অধ্যায় হয়ে থাকবে। উৎসবের ‘এশিয়ান নিউ ট্যালেন্ট’ বিভাগে সেরা চিত্রগ্রাহকের (বেস্ট সিনেমাটোগ্রাফি) সম্মাননা বগলদাবা করে নিয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ চিত্রগ্রাহক সামিউল করিম সুপ্তক। তাঁর চোখ দিয়ে ক্যামেরায় ফুটিয়ে তোলা সাদাকালো সিনেমা ‘সাঁকোটা দুলছে’ (আন্তর্জাতিক নাম: দ্য ব্লাইন্ড গার্ল অ্যান্ড অ্যান এলিফ্যান্ট) এই অভাবনীয় গৌরব বয়ে এনেছে। একই বিভাগে এবার সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতেছে চীনের ‘হার ফার্স্ট টেস্ট’।

শনিবার রাতে যখন সাংহাইয়ের জমকালো মঞ্চে পুরস্কার ঘোষণা করা হচ্ছিল, সুপ্তক তখন নিজ দেশে অন্য একটি কাজের শুটিংয়ে ব্যস্ত। হোয়াটসঅ্যাপের টুংটাং শব্দে যখন খবরটি পৌঁছাল, তখন যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না এই তরুণ। বেশ কয়েক বছর ধরে ছোট ছবি বা স্বল্পদৈর্ঘ্য নির্মাণ করলেও ‘সাঁকোটা দুলছে’ তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। আর প্রথম ম্যাচেই একেবারে ছক্কা!

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সুপ্তক বলেন, “আমরা শুধুমাত্র একটা ক্যামেরা আর একটা মাত্র ২৪ মিলিমিটার লেন্স দিয়ে পুরো সিনেমাটার শুটিং করেছি। আমাদের কোনো প্রফেশনাল মনিটর ছিল না, ছিল না আলাদা কোনো লাইটিংয়ের জাঁকজমক। এই চরম সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আমরা আমাদের সেরাটা ঢেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সেই কাজ যে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এত বড় প্রতিযোগিতায় সেরা চিত্রগ্রহণের পুরস্কার এনে দেবে, এটা সত্যিই ভাবনার অতীত ছিল। এই সম্মান যেমন আনন্দের, তেমনি দায়বদ্ধতাও বাড়িয়ে দিল অনেকখানি। এখন পরের কাজগুলো নিয়ে আরও অনেক বেশি ভেবেচিন্তে এগোতে হবে।”

এই সিনেমার নেপথ্যের কারিগর ও প্রযোজক জনপ্রিয় অভিনেতা মনোজ প্রামাণিক। তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি অন্যরকম মেলবন্ধন। সিনেমাটির পরিচালক, অভিনয়শিল্পী থেকে শুরু করে কলাকুশলীদের ৯০ ভাগই ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যেখানে খোদ মনোজ প্রামাণিক ‘ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ’ বিভাগে শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকের হাত ধরে শিক্ষার্থীদের এই স্বপ্নযাত্রার ফসল আজ বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত।

সাংহাইয়ের উৎসবস্থল থেকে উচ্ছ্বসিত মনোজ প্রামাণিক বলেন, “আমরা বেশ কয়েক বছর ধরে একটা নিটোল টিম হিসেবে কাজ করছি। এই তরুণদের যদি ধরে রাখা যায় এবং আমরা যদি ভবিষ্যতেও এভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারি, তবে আমাদের এই প্রজন্মকে দিয়ে সিনেমার অনেক বড় বড় কাজ করানো সম্ভব। সিনেমার পরিচালক ইশতিয়াক আহমেদ জিহাদের এটাই প্রথম সিনেমা। মাত্র ২৪ বছর বয়সে বাংলাদেশের মতো একটা বাস্তবতার দেশ থেকে সিনেমা বানিয়ে সাংহাইয়ের মতো বড় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে লড়া এবং সেখানে নিজের জাত চেনানো—এটা চাট্টিখানি কথা নয়। ইশতিয়াক সামনে আরও চমৎকার কাজ করবে। আমরা সবাই মিলে দারুণ কিছু সিনেমা উপহার দিতে চাই।”

চিত্রগ্রাহক সুপ্তক দেশে থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতে মঞ্চে পুরস্কারটি গ্রহণ করেন ছবির ২৪ বছর বয়সী তরুণ পরিচালক ইশতিয়াক আহমেদ জিহাদ। সাংহাই থেকে তিনি জানান, “আমরা যখন কাজটা শুরু করি, তখন আমাদের সম্বল বলতে ছিল শুধু একবুক সাহস আর তাড়না। এই এশিয়ান নিউ ট্যালেন্ট বিভাগে বিশ্বের বড় বড় বাজেট ও বিশাল প্রোডাকশনের সিনেমাগুলো প্রতিযোগিতা করছিল। তাদের সেই জাঁকজমকের ভিড়ে আমাদের এই সাদাকালো ছবিটির ক্যামেরার কাজ যে জুরি মেম্বারদের মন ছুঁয়ে যাবে, তা আমাদের জন্য এক মস্ত বড় স্বীকৃতি। আমাদের পুরো টিমের অনেকেরই এটা প্রথম কাজ ছিল, এই অর্জন আমাদের আগামী দিনের পথচলাকে অনেক বেশি মসৃণ ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।”

জার্মানির মোগাদর ফিল্মস ও মনোজের ‘মনপাচিত্র’র যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ‘সাঁকোটা দুলছে’ মূলত গ্রামীণ বাংলাদেশের পটভূমিতে তৈরি একটি মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক আখ্যান। যেখানে কুসংস্কার, পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও সামাজিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিন তরুণীর বেঁচে থাকার সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিশেষ করে এক অন্ধ তরুণীর স্বপ্নপূরণের যাত্রা এবং এক রহস্যময় হাতির উপস্থিতি গল্পে এক প্রতীকী ও কাব্যিক মাত্রা যোগ করেছে। ছবিটিতে চমৎকার অভিনয় করেছেন সানজিদা আক্তার স্বর্ণা, তাহমিদা রহমান তৌহিদা, সুমাইয়া হক, অশোক ব্যাপারী, সাবিহা জামান, পঙ্কজ মজুমদার সহ আরও অনেকে।

সীমাবদ্ধ সম্পদ আর অদম্য মেধার জোরেও যে বিশ্বমঞ্চ কাঁপানো যায়, ‘সাঁকোটা দুলছে’র পুরো টিম যেন সেই ধ্রুব সত্যটিই প্রমাণ করল। বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য এই অর্জন নিঃসন্দেহে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন।

বিষয় : সাঁকোটা দুলছে

সীমাবদ্ধতার ফ্রেমে বিশ্বজয় সামিউল করিম সুপ্তকের : সাংহাইয়ে ‘সাঁকোটা দুলছে’র রূপকথা
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

সোমবার, ২২ জুন ২০২৬


সীমাবদ্ধতার ফ্রেমে বিশ্বজয় সামিউল করিম সুপ্তকের : সাংহাইয়ে ‘সাঁকোটা দুলছে’র রূপকথা

প্রকাশের তারিখ : ২২ জুন ২০২৬

featured Image

বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব ‘সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’-এর ২৮তম আসরের পর্দা নামল ২১ জুন। আর এবারের আসরটি বাংলাদেশের স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রের ইতিহাসের পাতায় এক সোনালী অধ্যায় হয়ে থাকবে। উৎসবের ‘এশিয়ান নিউ ট্যালেন্ট’ বিভাগে সেরা চিত্রগ্রাহকের (বেস্ট সিনেমাটোগ্রাফি) সম্মাননা বগলদাবা করে নিয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ চিত্রগ্রাহক সামিউল করিম সুপ্তক। তাঁর চোখ দিয়ে ক্যামেরায় ফুটিয়ে তোলা সাদাকালো সিনেমা ‘সাঁকোটা দুলছে’ (আন্তর্জাতিক নাম: দ্য ব্লাইন্ড গার্ল অ্যান্ড অ্যান এলিফ্যান্ট) এই অভাবনীয় গৌরব বয়ে এনেছে। একই বিভাগে এবার সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতেছে চীনের ‘হার ফার্স্ট টেস্ট’।

শনিবার রাতে যখন সাংহাইয়ের জমকালো মঞ্চে পুরস্কার ঘোষণা করা হচ্ছিল, সুপ্তক তখন নিজ দেশে অন্য একটি কাজের শুটিংয়ে ব্যস্ত। হোয়াটসঅ্যাপের টুংটাং শব্দে যখন খবরটি পৌঁছাল, তখন যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না এই তরুণ। বেশ কয়েক বছর ধরে ছোট ছবি বা স্বল্পদৈর্ঘ্য নির্মাণ করলেও ‘সাঁকোটা দুলছে’ তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। আর প্রথম ম্যাচেই একেবারে ছক্কা!

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সুপ্তক বলেন, “আমরা শুধুমাত্র একটা ক্যামেরা আর একটা মাত্র ২৪ মিলিমিটার লেন্স দিয়ে পুরো সিনেমাটার শুটিং করেছি। আমাদের কোনো প্রফেশনাল মনিটর ছিল না, ছিল না আলাদা কোনো লাইটিংয়ের জাঁকজমক। এই চরম সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আমরা আমাদের সেরাটা ঢেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সেই কাজ যে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এত বড় প্রতিযোগিতায় সেরা চিত্রগ্রহণের পুরস্কার এনে দেবে, এটা সত্যিই ভাবনার অতীত ছিল। এই সম্মান যেমন আনন্দের, তেমনি দায়বদ্ধতাও বাড়িয়ে দিল অনেকখানি। এখন পরের কাজগুলো নিয়ে আরও অনেক বেশি ভেবেচিন্তে এগোতে হবে।”

এই সিনেমার নেপথ্যের কারিগর ও প্রযোজক জনপ্রিয় অভিনেতা মনোজ প্রামাণিক। তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি অন্যরকম মেলবন্ধন। সিনেমাটির পরিচালক, অভিনয়শিল্পী থেকে শুরু করে কলাকুশলীদের ৯০ ভাগই ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যেখানে খোদ মনোজ প্রামাণিক ‘ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ’ বিভাগে শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকের হাত ধরে শিক্ষার্থীদের এই স্বপ্নযাত্রার ফসল আজ বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত।

সাংহাইয়ের উৎসবস্থল থেকে উচ্ছ্বসিত মনোজ প্রামাণিক বলেন, “আমরা বেশ কয়েক বছর ধরে একটা নিটোল টিম হিসেবে কাজ করছি। এই তরুণদের যদি ধরে রাখা যায় এবং আমরা যদি ভবিষ্যতেও এভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারি, তবে আমাদের এই প্রজন্মকে দিয়ে সিনেমার অনেক বড় বড় কাজ করানো সম্ভব। সিনেমার পরিচালক ইশতিয়াক আহমেদ জিহাদের এটাই প্রথম সিনেমা। মাত্র ২৪ বছর বয়সে বাংলাদেশের মতো একটা বাস্তবতার দেশ থেকে সিনেমা বানিয়ে সাংহাইয়ের মতো বড় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে লড়া এবং সেখানে নিজের জাত চেনানো—এটা চাট্টিখানি কথা নয়। ইশতিয়াক সামনে আরও চমৎকার কাজ করবে। আমরা সবাই মিলে দারুণ কিছু সিনেমা উপহার দিতে চাই।”

চিত্রগ্রাহক সুপ্তক দেশে থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতে মঞ্চে পুরস্কারটি গ্রহণ করেন ছবির ২৪ বছর বয়সী তরুণ পরিচালক ইশতিয়াক আহমেদ জিহাদ। সাংহাই থেকে তিনি জানান, “আমরা যখন কাজটা শুরু করি, তখন আমাদের সম্বল বলতে ছিল শুধু একবুক সাহস আর তাড়না। এই এশিয়ান নিউ ট্যালেন্ট বিভাগে বিশ্বের বড় বড় বাজেট ও বিশাল প্রোডাকশনের সিনেমাগুলো প্রতিযোগিতা করছিল। তাদের সেই জাঁকজমকের ভিড়ে আমাদের এই সাদাকালো ছবিটির ক্যামেরার কাজ যে জুরি মেম্বারদের মন ছুঁয়ে যাবে, তা আমাদের জন্য এক মস্ত বড় স্বীকৃতি। আমাদের পুরো টিমের অনেকেরই এটা প্রথম কাজ ছিল, এই অর্জন আমাদের আগামী দিনের পথচলাকে অনেক বেশি মসৃণ ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।”

জার্মানির মোগাদর ফিল্মস ও মনোজের ‘মনপাচিত্র’র যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ‘সাঁকোটা দুলছে’ মূলত গ্রামীণ বাংলাদেশের পটভূমিতে তৈরি একটি মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক আখ্যান। যেখানে কুসংস্কার, পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও সামাজিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিন তরুণীর বেঁচে থাকার সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিশেষ করে এক অন্ধ তরুণীর স্বপ্নপূরণের যাত্রা এবং এক রহস্যময় হাতির উপস্থিতি গল্পে এক প্রতীকী ও কাব্যিক মাত্রা যোগ করেছে। ছবিটিতে চমৎকার অভিনয় করেছেন সানজিদা আক্তার স্বর্ণা, তাহমিদা রহমান তৌহিদা, সুমাইয়া হক, অশোক ব্যাপারী, সাবিহা জামান, পঙ্কজ মজুমদার সহ আরও অনেকে।

সীমাবদ্ধ সম্পদ আর অদম্য মেধার জোরেও যে বিশ্বমঞ্চ কাঁপানো যায়, ‘সাঁকোটা দুলছে’র পুরো টিম যেন সেই ধ্রুব সত্যটিই প্রমাণ করল। বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য এই অর্জন নিঃসন্দেহে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত