সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 ইতিহাস ও ঐতিহ্য ইতিহাস ও ঐতিহ্য

গোলপোস্টের বিজ্ঞানী ও অলিম্পিক মাতানো গণিতবিদ: বোর ভ্রাতৃদ্বয়ের রূপকথার মতো গল্প

গোলপোস্টের বিজ্ঞানী ও অলিম্পিক মাতানো গণিতবিদ: বোর ভ্রাতৃদ্বয়ের রূপকথার মতো গল্প
ছবি -সংগৃহীত

বিজ্ঞানের ছাত্র মাত্রই জানেন, কোয়ান্টাম বলবিদ্যার জনক নিলস বোর মানেই পারমাণবিক গঠন, ইলেকট্রন আর শক্তির স্তরের এক জটিল সমীকরণ। ডেনমার্কের এই নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীকে নিয়ে কতই না গবেষণা, কত না তাত্ত্বিক আলোচনার মেলা! কিন্তু মহাকালের ধুলোবালি সরিয়ে ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, এই বিখ্যাত বিজ্ঞানীর জীবনে বিজ্ঞানের মতোই এক দারুণ আকর্ষণ ছিল ফুটবল। আর মজার ব্যাপার হলো, শুধু তিনিই নন, তাঁর ছোট ভাই হারাল্ড বোরও ছিলেন ডেনমার্কের ক্রীড়া জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

**বিজ্ঞানের পাতায় গোলরক্ষক**

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনের ‘এবি’ (Akademisk Boldklub) ক্লাবটির নাম তখন ফুটবলপাড়ায় বেশ পরিচিত। সেই দলের গোলপোস্টের নিচে যার বিশ্বস্ত উপস্থিতি দেখা যেত, তিনি আর কেউ নন—স্বয়ং নিলস বোর। নিলস ছিলেন লম্বা, শান্ত আর ভীষণ মনোযোগী। তিনি শুধু গোলরক্ষকই ছিলেন না, দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়ও ছিলেন।

তবে মাঠের খেলায় মাঝে মাঝে নিলস বোরের অদ্ভুত স্বভাব সতীর্থদের অবাক করত। একবার এক ম্যাচ চলাকালীন বল ছিল মাঠের অপর প্রান্তে। আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা গোল করার জন্য মরিিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। এই সুযোগে নিলস বোর গোলপোস্টের কাঠের গায়ে একটি জ্যামিতিক সমস্যা নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করলেন। হাতে না থাকায় গোলপোস্টের কাঠামোই হয়ে উঠল তাঁর ব্ল্যাকবোর্ড। হঠাৎ প্রতিপক্ষ দলের এক খেলোয়াড় দ্রুত বল নিয়ে তাঁর দিকে ছুটে এল। গ্যালারির চিৎকার আর সতীর্থদের সতর্কবাণীতে নিলসের ঘোর কাটল। মুহূর্তের মধ্যে তিনি বাস্তবে ফিরে এসে এক দুর্দান্ত ডাইভ দিয়ে বলটি আটকে দিলেন। ম্যাচ শেষে সতীর্থরা হেসে বলেছিল, “নিলস, তুমি কি গোল বাঁচাতে এসেছিলে নাকি গণিত সমাধান করতে?”

**হারাল্ড বোর: অলিম্পিকের রুপালি নায়ক**

নিলস বোরের ফুটবল প্রেমের গল্পটা এখানেই শেষ নয়। তাঁর ছোট ভাই হারাল্ড বোর—যিনি পরবর্তীকালে গণিতশাস্ত্রের এক কিংবদন্তি হিসেবে পরিচিত হন—তিনি ছিলেন খোদ ফুটবলের ময়দানের গোল্ডেন বয়। নিলসের চেয়ে ফুটবল মাঠে হারাল্ডের দাপট ছিল অনেক বেশি।

১৯০৮ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক গেমসে হারাল্ড বোর ছিলেন ডেনমার্ক জাতীয় ফুটবল দলের অন্যতম প্রধান খেলোয়াড়। সেবার ডেনমার্ক ফুটবলে রৌপ্য পদক জিতেছিল। টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ডেনমার্কের ১৭-১ গোলের সেই ঐতিহাসিক জয় আজও ফুটবল ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে। হারাল্ড বোর শুধু সেই ম্যাচের অংশ ছিলেন না, বরং ডেনমার্কের মাঝমাঠের প্রাণ ছিলেন তিনি। তৎকালীন ডেনমার্কের ক্রীড়াঙ্গনে ‘বোর ব্রাদার্স’ নামে পরিচিত এই দুই ভাই তখন ছিলেন তরুণদের আদর্শ।

**মেধা ও মাঠের যুগলবন্দী**

নিলস বোর ও হারাল্ড বোর—এই দুই ভাইয়ের বেড়ে ওঠা ছিল অত্যন্ত জ্ঞানদীপ্ত এক পরিবেশে। তাঁদের বাবা ক্রিশ্চিয়ান বোর ছিলেন শারীরবিজ্ঞানের অধ্যাপক। বাড়িতে সবসময়ই বিজ্ঞান, দর্শন আর বিতর্কের চর্চা হতো। কিন্তু সেই মেধাবী পরিবেশে থেকেও তাঁরা ফুটবলের মাঠকে অবহেলা করেননি। নিলস বোর একবার বলেছিলেন, “ফুটবল আমার মস্তিষ্কের জট খুলতে সাহায্য করে।”

বিজ্ঞানের জটিল গবেষণায় ডুবে থাকার আগে তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক স্বচ্ছতা একে অপরের পরিপূরক। নিলস বোর যখন গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে বলের গতিপথ বিশ্লেষণ করতেন, হয়তো সেই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রাথমিক জ্যামিতিই তাঁর মস্তিষ্কে কাজ করত। আর হারাল্ড বোর মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যখন সতীর্থদের পাস দিতেন, তখন তাঁর মাথায় ঘুরত গাণিতিক বিন্যাস।

আজকালকার দিনে একজন বিজ্ঞানীর ফুটবল খেলার কথা ভাবাই যায় না। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর সেই সন্ধিক্ষণে, বোর ভ্রাতৃদ্বয় দেখিয়ে গিয়েছিলেন—মেধা আর মাঠের লড়াই—এই দুই ক্ষেত্রেই সফল হওয়া সম্ভব। ইতিহাস তাঁদের মনে রেখেছে কোয়ান্টাম মেকানিক্স আর গণিতের বিশুদ্ধ তত্ত্বের জন্য, কিন্তু ডেনমার্কের ক্রীড়া ইতিহাসের পাতায় আজও স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে ‘বোর ব্রাদার্স’-এর নাম।

মহাকালের সাক্ষী হয়ে সেই গোলপোস্ট আর ফুটবল মাঠ আজ হয়তো আর নেই, কিন্তু সেই রূপকথার মতো গল্পগুলো আমাদের শিখিয়ে দেয়—একজন মানুষের অসীম মেধা আর অদম্য নেশা থাকলে, সে একই সাথে গোলপোস্টের অতন্দ্র প্রহরী হতে পারে, আবার হতে পারে মহাবিশ্বের গোপন রহস্য উদঘাটনকারী বিজ্ঞানীও।

বিষয় : নীলস বোর ও হারাল্ড বোর

গোলপোস্টের বিজ্ঞানী ও অলিম্পিক মাতানো গণিতবিদ: বোর ভ্রাতৃদ্বয়ের রূপকথার মতো গল্প
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬


গোলপোস্টের বিজ্ঞানী ও অলিম্পিক মাতানো গণিতবিদ: বোর ভ্রাতৃদ্বয়ের রূপকথার মতো গল্প

প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুন ২০২৬

featured Image

বিজ্ঞানের ছাত্র মাত্রই জানেন, কোয়ান্টাম বলবিদ্যার জনক নিলস বোর মানেই পারমাণবিক গঠন, ইলেকট্রন আর শক্তির স্তরের এক জটিল সমীকরণ। ডেনমার্কের এই নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীকে নিয়ে কতই না গবেষণা, কত না তাত্ত্বিক আলোচনার মেলা! কিন্তু মহাকালের ধুলোবালি সরিয়ে ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, এই বিখ্যাত বিজ্ঞানীর জীবনে বিজ্ঞানের মতোই এক দারুণ আকর্ষণ ছিল ফুটবল। আর মজার ব্যাপার হলো, শুধু তিনিই নন, তাঁর ছোট ভাই হারাল্ড বোরও ছিলেন ডেনমার্কের ক্রীড়া জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

**বিজ্ঞানের পাতায় গোলরক্ষক**

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনের ‘এবি’ (Akademisk Boldklub) ক্লাবটির নাম তখন ফুটবলপাড়ায় বেশ পরিচিত। সেই দলের গোলপোস্টের নিচে যার বিশ্বস্ত উপস্থিতি দেখা যেত, তিনি আর কেউ নন—স্বয়ং নিলস বোর। নিলস ছিলেন লম্বা, শান্ত আর ভীষণ মনোযোগী। তিনি শুধু গোলরক্ষকই ছিলেন না, দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়ও ছিলেন।

তবে মাঠের খেলায় মাঝে মাঝে নিলস বোরের অদ্ভুত স্বভাব সতীর্থদের অবাক করত। একবার এক ম্যাচ চলাকালীন বল ছিল মাঠের অপর প্রান্তে। আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা গোল করার জন্য মরিিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। এই সুযোগে নিলস বোর গোলপোস্টের কাঠের গায়ে একটি জ্যামিতিক সমস্যা নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করলেন। হাতে না থাকায় গোলপোস্টের কাঠামোই হয়ে উঠল তাঁর ব্ল্যাকবোর্ড। হঠাৎ প্রতিপক্ষ দলের এক খেলোয়াড় দ্রুত বল নিয়ে তাঁর দিকে ছুটে এল। গ্যালারির চিৎকার আর সতীর্থদের সতর্কবাণীতে নিলসের ঘোর কাটল। মুহূর্তের মধ্যে তিনি বাস্তবে ফিরে এসে এক দুর্দান্ত ডাইভ দিয়ে বলটি আটকে দিলেন। ম্যাচ শেষে সতীর্থরা হেসে বলেছিল, “নিলস, তুমি কি গোল বাঁচাতে এসেছিলে নাকি গণিত সমাধান করতে?”

**হারাল্ড বোর: অলিম্পিকের রুপালি নায়ক**

নিলস বোরের ফুটবল প্রেমের গল্পটা এখানেই শেষ নয়। তাঁর ছোট ভাই হারাল্ড বোর—যিনি পরবর্তীকালে গণিতশাস্ত্রের এক কিংবদন্তি হিসেবে পরিচিত হন—তিনি ছিলেন খোদ ফুটবলের ময়দানের গোল্ডেন বয়। নিলসের চেয়ে ফুটবল মাঠে হারাল্ডের দাপট ছিল অনেক বেশি।

১৯০৮ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক গেমসে হারাল্ড বোর ছিলেন ডেনমার্ক জাতীয় ফুটবল দলের অন্যতম প্রধান খেলোয়াড়। সেবার ডেনমার্ক ফুটবলে রৌপ্য পদক জিতেছিল। টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ডেনমার্কের ১৭-১ গোলের সেই ঐতিহাসিক জয় আজও ফুটবল ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে। হারাল্ড বোর শুধু সেই ম্যাচের অংশ ছিলেন না, বরং ডেনমার্কের মাঝমাঠের প্রাণ ছিলেন তিনি। তৎকালীন ডেনমার্কের ক্রীড়াঙ্গনে ‘বোর ব্রাদার্স’ নামে পরিচিত এই দুই ভাই তখন ছিলেন তরুণদের আদর্শ।

**মেধা ও মাঠের যুগলবন্দী**

নিলস বোর ও হারাল্ড বোর—এই দুই ভাইয়ের বেড়ে ওঠা ছিল অত্যন্ত জ্ঞানদীপ্ত এক পরিবেশে। তাঁদের বাবা ক্রিশ্চিয়ান বোর ছিলেন শারীরবিজ্ঞানের অধ্যাপক। বাড়িতে সবসময়ই বিজ্ঞান, দর্শন আর বিতর্কের চর্চা হতো। কিন্তু সেই মেধাবী পরিবেশে থেকেও তাঁরা ফুটবলের মাঠকে অবহেলা করেননি। নিলস বোর একবার বলেছিলেন, “ফুটবল আমার মস্তিষ্কের জট খুলতে সাহায্য করে।”

বিজ্ঞানের জটিল গবেষণায় ডুবে থাকার আগে তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক স্বচ্ছতা একে অপরের পরিপূরক। নিলস বোর যখন গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে বলের গতিপথ বিশ্লেষণ করতেন, হয়তো সেই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রাথমিক জ্যামিতিই তাঁর মস্তিষ্কে কাজ করত। আর হারাল্ড বোর মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যখন সতীর্থদের পাস দিতেন, তখন তাঁর মাথায় ঘুরত গাণিতিক বিন্যাস।

আজকালকার দিনে একজন বিজ্ঞানীর ফুটবল খেলার কথা ভাবাই যায় না। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর সেই সন্ধিক্ষণে, বোর ভ্রাতৃদ্বয় দেখিয়ে গিয়েছিলেন—মেধা আর মাঠের লড়াই—এই দুই ক্ষেত্রেই সফল হওয়া সম্ভব। ইতিহাস তাঁদের মনে রেখেছে কোয়ান্টাম মেকানিক্স আর গণিতের বিশুদ্ধ তত্ত্বের জন্য, কিন্তু ডেনমার্কের ক্রীড়া ইতিহাসের পাতায় আজও স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে ‘বোর ব্রাদার্স’-এর নাম।

মহাকালের সাক্ষী হয়ে সেই গোলপোস্ট আর ফুটবল মাঠ আজ হয়তো আর নেই, কিন্তু সেই রূপকথার মতো গল্পগুলো আমাদের শিখিয়ে দেয়—একজন মানুষের অসীম মেধা আর অদম্য নেশা থাকলে, সে একই সাথে গোলপোস্টের অতন্দ্র প্রহরী হতে পারে, আবার হতে পারে মহাবিশ্বের গোপন রহস্য উদঘাটনকারী বিজ্ঞানীও।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত