আন্তর্জাতিক
দক্ষিণ এশিয়ার দুই বড় অর্থনীতি—বাংলাদেশ ও পাকিস্তান—দুটোই এখন বৈশ্বিক অস্থিরতার জাঁতাকলে পিষ্ট। মূল্যস্ফীতির চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আর ঋণের ভার; এই সব চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে দুই দেশই সম্প্রতি তাদের নতুন বাজেট ঘোষণা করেছে। লক্ষ্য অভিন্ন হলেও, এই দুই দেশের বাজেটের দর্শন ও বাস্তবায়নের কৌশলে রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাত।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের ১৮.৯ ট্রিলিয়ন রুপির (প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা) বাজেটে দেখা যাচ্ছে চরম সীমাবদ্ধতার ছাপ। এই বাজেট ঘোষণার মধ্য দিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের রূপরেখাও পরিষ্কার হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ: উন্নয়নের ভিত্তি গড়তে মানুষের ওপর বিনিয়োগ
বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এবারের বাজেটের মূল সুর ছিল ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ’। বাংলাদেশ যেখানে সংকটের এই সময়েও ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক অবকাঠামোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে, সেখানে পাকিস্তানের কৌশল পুরোটাই ভিন্ন। বাংলাদেশের বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ৩০ শতাংশ।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা গত কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য। স্নাতক পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষা, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি, প্রতিটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট এবং নতুন করে ৫ হাজার চিকিৎসক ও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মতো বড় বড় উদ্যোগই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে চাইছে। ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে সরকার এখন মানুষের মানোন্নয়নকে মূল হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছে।
পাকিস্তান: ঋণ পরিশোধের গোলকধাঁধায় বন্দি অর্থনীতি
অন্যদিকে, পাকিস্তানের বাজেট চিত্রটা এক করুণ বাস্তবতার কথা বলে। দেশটির অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব যখন বাজেট পেশ করছেন, তখন তার মূল মাথাব্যথা ছিল আইএমএফের শর্ত পূরণ ও নতুন করে বেইলআউট বা আর্থিক সহায়তা পাওয়া। পাকিস্তানের মোট বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি—প্রায় ৯.৮ ট্রিলিয়ন রুপি—চলে যাচ্ছে কেবল ঋণ পরিশোধের পেছনে।
যখন কোনো দেশের বাজেটের একটি বড় অংশ শুধু সুদের টাকা শোধ করতেই শেষ হয়ে যায়, তখন উন্নয়নের জন্য খুব সামান্যই জায়গা থাকে। পাকিস্তানের বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে ৯৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা তাদের কৌশলগত অগ্রাধিকারের জায়গাটি স্পষ্ট করে। কর আদায় বৃদ্ধি ও জ্বালানিতে লেভি বসিয়ে আইএমএফকে খুশি করা বা ঋণযোগ্যতা ধরে রাখাই এখন তাদের মূল এজেন্ডা। ৩.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা এবং ১২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির বোঝা নিয়ে পাকিস্তান কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের সংশয় রয়েছে।
দুই দেশের এই বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ এখন ‘উন্নয়নমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ প্রবৃদ্ধির পথে হাঁটছে। তারা বিশ্বাস করে, মানুষ দক্ষ হলে এবং সুস্থ থাকলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। অন্যদিকে, পাকিস্তান এখন কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। ঋণের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার মতো সুযোগ বা বিনিয়োগ করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ তাদের হাতে নেই।
সংকট সবার জন্যই সমান। কিন্তু বাংলাদেশ সেই সংকটকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে জনশক্তি উন্নয়নের দিকে মনোনিবেশ করেছে, আর পাকিস্তান এখনো আইএমএফের শর্ত আর ঋণ পরিশোধের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এই দুই বাজেট আসলে কেবল দুটি দেশের বার্ষিক হিসাব নয়; এটি দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার স্পষ্ট দলিল। আগামী কয়েক বছর এই দুই দেশের অর্থনীতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা এই বাজেট থেকেই আঁচ করা সম্ভব।
2.png)
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুন ২০২৬
দক্ষিণ এশিয়ার দুই বড় অর্থনীতি—বাংলাদেশ ও পাকিস্তান—দুটোই এখন বৈশ্বিক অস্থিরতার জাঁতাকলে পিষ্ট। মূল্যস্ফীতির চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আর ঋণের ভার; এই সব চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে দুই দেশই সম্প্রতি তাদের নতুন বাজেট ঘোষণা করেছে। লক্ষ্য অভিন্ন হলেও, এই দুই দেশের বাজেটের দর্শন ও বাস্তবায়নের কৌশলে রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাত।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের ১৮.৯ ট্রিলিয়ন রুপির (প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা) বাজেটে দেখা যাচ্ছে চরম সীমাবদ্ধতার ছাপ। এই বাজেট ঘোষণার মধ্য দিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের রূপরেখাও পরিষ্কার হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ: উন্নয়নের ভিত্তি গড়তে মানুষের ওপর বিনিয়োগ
বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এবারের বাজেটের মূল সুর ছিল ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ’। বাংলাদেশ যেখানে সংকটের এই সময়েও ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক অবকাঠামোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে, সেখানে পাকিস্তানের কৌশল পুরোটাই ভিন্ন। বাংলাদেশের বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ৩০ শতাংশ।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা গত কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য। স্নাতক পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষা, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি, প্রতিটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট এবং নতুন করে ৫ হাজার চিকিৎসক ও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মতো বড় বড় উদ্যোগই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে চাইছে। ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে সরকার এখন মানুষের মানোন্নয়নকে মূল হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছে।
পাকিস্তান: ঋণ পরিশোধের গোলকধাঁধায় বন্দি অর্থনীতি
অন্যদিকে, পাকিস্তানের বাজেট চিত্রটা এক করুণ বাস্তবতার কথা বলে। দেশটির অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব যখন বাজেট পেশ করছেন, তখন তার মূল মাথাব্যথা ছিল আইএমএফের শর্ত পূরণ ও নতুন করে বেইলআউট বা আর্থিক সহায়তা পাওয়া। পাকিস্তানের মোট বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি—প্রায় ৯.৮ ট্রিলিয়ন রুপি—চলে যাচ্ছে কেবল ঋণ পরিশোধের পেছনে।
যখন কোনো দেশের বাজেটের একটি বড় অংশ শুধু সুদের টাকা শোধ করতেই শেষ হয়ে যায়, তখন উন্নয়নের জন্য খুব সামান্যই জায়গা থাকে। পাকিস্তানের বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে ৯৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা তাদের কৌশলগত অগ্রাধিকারের জায়গাটি স্পষ্ট করে। কর আদায় বৃদ্ধি ও জ্বালানিতে লেভি বসিয়ে আইএমএফকে খুশি করা বা ঋণযোগ্যতা ধরে রাখাই এখন তাদের মূল এজেন্ডা। ৩.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা এবং ১২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির বোঝা নিয়ে পাকিস্তান কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের সংশয় রয়েছে।
দুই দেশের এই বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ এখন ‘উন্নয়নমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ প্রবৃদ্ধির পথে হাঁটছে। তারা বিশ্বাস করে, মানুষ দক্ষ হলে এবং সুস্থ থাকলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। অন্যদিকে, পাকিস্তান এখন কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। ঋণের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার মতো সুযোগ বা বিনিয়োগ করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ তাদের হাতে নেই।
সংকট সবার জন্যই সমান। কিন্তু বাংলাদেশ সেই সংকটকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে জনশক্তি উন্নয়নের দিকে মনোনিবেশ করেছে, আর পাকিস্তান এখনো আইএমএফের শর্ত আর ঋণ পরিশোধের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এই দুই বাজেট আসলে কেবল দুটি দেশের বার্ষিক হিসাব নয়; এটি দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার স্পষ্ট দলিল। আগামী কয়েক বছর এই দুই দেশের অর্থনীতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা এই বাজেট থেকেই আঁচ করা সম্ভব।
2.png)