বাংলাদেশ
ভোর থেকেই আকাশের মুখ ভার। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল আটটা, কিন্তু চারপাশের অন্ধকার জানান দিচ্ছিল এ যেন কোনো এক বর্ষণমুখর আষাঢ়ের সকাল। রাজধানীর মগবাজারের বাসিন্দা প্রতীক বর্ধন তার ছেলেকে নিয়ে ইস্কাটনের স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু সেই যাত্রা যেন এক অগ্নিপরীক্ষায় রূপ নিল। রাস্তায় রিকশার আকাল, আর যা-ও বা পাওয়া গেল, তাতে পলিথিন নেই। বৃষ্টির ছাট আর ঝোড়ো হাওয়ায় ছাতা সামলাতে গিয়ে বাবা-ছেলে দুজনেই ভিজে একশা।
প্রতীক বর্ধনের মতো এমন বিড়ম্বনার শিকার আজ রাজধানীর হাজারো মানুষ। বুধবার সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হওয়া এই বৃষ্টি জনজীবনে স্থবিরতা নামিয়ে এনেছে। বিশেষ করে স্কুলগামী শিক্ষার্থী এবং অফিসযাত্রীদের জন্য আজকের সকালটি ছিল চরম ভোগান্তির।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বৃষ্টির কারণে নিচু এলাকাগুলোতে ইতিমধ্যেই পানি জমতে শুরু করেছে। কারওয়ান বাজার, শান্তিনগর এবং মিরপুরের কিছু অংশে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় যানবাহন চলাচলে ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। সকাল পৌনে নয়টার দিকেও যখন এই প্রতিবেদন লেখা হচ্ছিল, তখনো দমকা হাওয়ার সাথে মাঝারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত ছিল।
আবহাওয়াবিদদের মতে, সাধারণত বৈশাখ মাসে কালবৈশাখী ঝড় হয় যা অল্প সময়ের জন্য স্থায়ী হয়। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। গতকাল মঙ্গলবার থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ৯৬ ঘণ্টা দেশের সব বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। কোথাও কোথাও এই বৃষ্টিপাত জলাবদ্ধতা তৈরি করবে এবং চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় পাহাড় ধসের সতর্কতাও জারি করা হয়েছে।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে, বৈশাখের এই সময়ে একটানা বৃষ্টির কারণ কী? আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, "দেশের অভ্যন্তরে গভীর সঞ্চরণশীল মেঘমালা বা বজ্রমেঘ তৈরি হয়েছে, যা সরতে কিছুটা সময় নিচ্ছে। এছাড়া সাগরে একটি লঘুচাপ তৈরির প্রক্রিয়া চলছে, যার প্রভাবও এখানে দৃশ্যমান। এটি একেবারে অস্বাভাবিক না হলেও, মেঘের এই দাপট আরও কয়েক দিন চলতে পারে।"
তিনি আরও জানান যে, বৃষ্টি একটানা না হয়ে থেমে থেমে হবে। তবে আকাশ মেঘলা থাকার কারণে ভ্যাপসা গরম বা গুমোট ভাবও অনুভূত হতে পারে। বেলা ১১টার পর বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।
শুধু ঢাকা নয়, বৃষ্টির দাপট চলছে সারা দেশেই। গত ২৪ ঘণ্টায় কিশোরগঞ্জের নিকলীতে দেশের সর্বোচ্চ ১৬১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া ভোলায় ১৫১ মিলিমিটার এবং ফেনীতে ১৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়াবিজ্ঞানের ভাষায়, ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলে তাকে 'অতি ভারী' বৃষ্টিপাত বলা হয়।
আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, "বজ্রমেঘের কারণে এই বৃষ্টিপাত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। ভোলা ও খুলনা অঞ্চলে মেঘ কিছুটা কাটতে শুরু করলেও রাজধানীতে আজ দিনভর মেঘলা আকাশ ও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। রোদেলা আকাশ দেখার জন্য নগরবাসীকে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।"
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এই ধরণের টানা বৃষ্টিতে ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়া এবং গণপরিবহনের সংকট সাধারণ মানুষের ভোগান্তিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
আজকের এই বৈরী আবহাওয়ায় চিকিৎসকরা সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর, সর্দি ও কাশির প্রকোপ বাড়তে পারে। তাই বাইরে বের হওয়ার সময় রেইনকোট বা মজবুত ছাতা সাথে রাখা এবং শিশুদের বিশেষ যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
2.png)
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬
ভোর থেকেই আকাশের মুখ ভার। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল আটটা, কিন্তু চারপাশের অন্ধকার জানান দিচ্ছিল এ যেন কোনো এক বর্ষণমুখর আষাঢ়ের সকাল। রাজধানীর মগবাজারের বাসিন্দা প্রতীক বর্ধন তার ছেলেকে নিয়ে ইস্কাটনের স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু সেই যাত্রা যেন এক অগ্নিপরীক্ষায় রূপ নিল। রাস্তায় রিকশার আকাল, আর যা-ও বা পাওয়া গেল, তাতে পলিথিন নেই। বৃষ্টির ছাট আর ঝোড়ো হাওয়ায় ছাতা সামলাতে গিয়ে বাবা-ছেলে দুজনেই ভিজে একশা।
প্রতীক বর্ধনের মতো এমন বিড়ম্বনার শিকার আজ রাজধানীর হাজারো মানুষ। বুধবার সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হওয়া এই বৃষ্টি জনজীবনে স্থবিরতা নামিয়ে এনেছে। বিশেষ করে স্কুলগামী শিক্ষার্থী এবং অফিসযাত্রীদের জন্য আজকের সকালটি ছিল চরম ভোগান্তির।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বৃষ্টির কারণে নিচু এলাকাগুলোতে ইতিমধ্যেই পানি জমতে শুরু করেছে। কারওয়ান বাজার, শান্তিনগর এবং মিরপুরের কিছু অংশে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় যানবাহন চলাচলে ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। সকাল পৌনে নয়টার দিকেও যখন এই প্রতিবেদন লেখা হচ্ছিল, তখনো দমকা হাওয়ার সাথে মাঝারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত ছিল।
আবহাওয়াবিদদের মতে, সাধারণত বৈশাখ মাসে কালবৈশাখী ঝড় হয় যা অল্প সময়ের জন্য স্থায়ী হয়। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। গতকাল মঙ্গলবার থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ৯৬ ঘণ্টা দেশের সব বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। কোথাও কোথাও এই বৃষ্টিপাত জলাবদ্ধতা তৈরি করবে এবং চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় পাহাড় ধসের সতর্কতাও জারি করা হয়েছে।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে, বৈশাখের এই সময়ে একটানা বৃষ্টির কারণ কী? আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, "দেশের অভ্যন্তরে গভীর সঞ্চরণশীল মেঘমালা বা বজ্রমেঘ তৈরি হয়েছে, যা সরতে কিছুটা সময় নিচ্ছে। এছাড়া সাগরে একটি লঘুচাপ তৈরির প্রক্রিয়া চলছে, যার প্রভাবও এখানে দৃশ্যমান। এটি একেবারে অস্বাভাবিক না হলেও, মেঘের এই দাপট আরও কয়েক দিন চলতে পারে।"
তিনি আরও জানান যে, বৃষ্টি একটানা না হয়ে থেমে থেমে হবে। তবে আকাশ মেঘলা থাকার কারণে ভ্যাপসা গরম বা গুমোট ভাবও অনুভূত হতে পারে। বেলা ১১টার পর বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।
শুধু ঢাকা নয়, বৃষ্টির দাপট চলছে সারা দেশেই। গত ২৪ ঘণ্টায় কিশোরগঞ্জের নিকলীতে দেশের সর্বোচ্চ ১৬১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া ভোলায় ১৫১ মিলিমিটার এবং ফেনীতে ১৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়াবিজ্ঞানের ভাষায়, ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলে তাকে 'অতি ভারী' বৃষ্টিপাত বলা হয়।
আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, "বজ্রমেঘের কারণে এই বৃষ্টিপাত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। ভোলা ও খুলনা অঞ্চলে মেঘ কিছুটা কাটতে শুরু করলেও রাজধানীতে আজ দিনভর মেঘলা আকাশ ও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। রোদেলা আকাশ দেখার জন্য নগরবাসীকে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।"
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এই ধরণের টানা বৃষ্টিতে ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়া এবং গণপরিবহনের সংকট সাধারণ মানুষের ভোগান্তিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
আজকের এই বৈরী আবহাওয়ায় চিকিৎসকরা সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর, সর্দি ও কাশির প্রকোপ বাড়তে পারে। তাই বাইরে বের হওয়ার সময় রেইনকোট বা মজবুত ছাতা সাথে রাখা এবং শিশুদের বিশেষ যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
2.png)