শিক্ষাঙ্গন
দেশের ইতিহাসে রেকর্ড ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট নিয়ে চারদিকে চলছে তুমুল বিশ্লেষণ। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আর কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিশাল লক্ষ্য নিয়ে সাজানো এই বাজেটকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। তবে এত বড় পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দেওয়া সরকারের জন্য কতটা সম্ভব, তা নিয়ে তাদের মনে দানা বাঁধছে নানা প্রশ্ন। সব মিলিয়ে এবারের বাজেটকে তারা দেখছেন উচ্চাভিলাষী এক পরিকল্পনারূপে, যার ভাগ্য ঝুলে আছে কার্যকর বাস্তবায়ন ও সুশাসনের ওপর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, চ্যালেঞ্জিং এই সময়ে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতের সম্প্রসারণের উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। তিনি বলেন, কর-প্রণোদনা ও রাজস্ব আহরণে ডিজিটাইজেশন দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়। তবে তার মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনার কৌশলের জায়গাটি আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন ছিল।
বাজেটকে একটি ‘রাজনৈতিক দলিল’ হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। তার দৃষ্টিতে, রাষ্ট্র কীভাবে এগোতে চায়, তার রূপরেখা ফুটে উঠেছে এতে। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং প্রান্তিক মানুষের সহায়তায় নেওয়া উদ্যোগগুলোকে তিনি বাজেটের অন্যতম ইতিবাচক দিক বলে মনে করেন।
বাজেটের সফলতা কেবল সংখ্যার বিচারে নয়, বরং এর প্রয়োগের ওপর নির্ভর করছে বলে মনে করছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক তারেক মোহাম্মদ শামসুল আরেফিন। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো, রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং মূল্যস্ফীতি কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকছে—এসবই হবে এবারের বাজেটের আসল পরীক্ষা। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহাদী হাসান জুয়েলের মতে, অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নের যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তা জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। তবে এর সুফল পাওয়া যাবে কেবল সঠিক সুশাসন নিশ্চিত করা গেলেই।
শিক্ষার্থীরাও বাজেট নিয়ে বেশ আশাবাদী, তবে তাদের চাহিদার জায়গাটা একটু ভিন্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আব্দুল আলিম শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্ব দেওয়ায় বাজেটকে বাস্তবসম্মত মনে করলেও, গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। এই একই সুর ঝরেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল ইসলামের কণ্ঠেও। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে এবং বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে শিক্ষা ও গবেষণায় আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মোস্তাকিম ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সুহাইল আহমদ। তারা মনে করেন, তরুণদের জন্য কাজের ক্ষেত্র তৈরি করতে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। অন্যদিকে একই বিভাগের শিক্ষার্থী মোহন খোন্দকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর করের চাপ না বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। তার শঙ্কা, সব বোঝা যেন শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধে না চাপে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এই আলোচনা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—বাজেটের খাতাটি বেশ চমৎকার ও আশাজাগানিয়া। কিন্তু অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থী, সবারই মূল দৃষ্টি এখন বাস্তবায়নের দিকে। রাজস্ব আদায়, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়ার মতো কঠিন কাজগুলো সরকার কীভাবে সামলায়, তার ওপরই নির্ভর করছে বাজেটের সার্থকতা।
2.png)
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুন ২০২৬
দেশের ইতিহাসে রেকর্ড ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট নিয়ে চারদিকে চলছে তুমুল বিশ্লেষণ। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আর কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিশাল লক্ষ্য নিয়ে সাজানো এই বাজেটকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। তবে এত বড় পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দেওয়া সরকারের জন্য কতটা সম্ভব, তা নিয়ে তাদের মনে দানা বাঁধছে নানা প্রশ্ন। সব মিলিয়ে এবারের বাজেটকে তারা দেখছেন উচ্চাভিলাষী এক পরিকল্পনারূপে, যার ভাগ্য ঝুলে আছে কার্যকর বাস্তবায়ন ও সুশাসনের ওপর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, চ্যালেঞ্জিং এই সময়ে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতের সম্প্রসারণের উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। তিনি বলেন, কর-প্রণোদনা ও রাজস্ব আহরণে ডিজিটাইজেশন দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়। তবে তার মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনার কৌশলের জায়গাটি আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন ছিল।
বাজেটকে একটি ‘রাজনৈতিক দলিল’ হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। তার দৃষ্টিতে, রাষ্ট্র কীভাবে এগোতে চায়, তার রূপরেখা ফুটে উঠেছে এতে। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং প্রান্তিক মানুষের সহায়তায় নেওয়া উদ্যোগগুলোকে তিনি বাজেটের অন্যতম ইতিবাচক দিক বলে মনে করেন।
বাজেটের সফলতা কেবল সংখ্যার বিচারে নয়, বরং এর প্রয়োগের ওপর নির্ভর করছে বলে মনে করছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক তারেক মোহাম্মদ শামসুল আরেফিন। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো, রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং মূল্যস্ফীতি কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকছে—এসবই হবে এবারের বাজেটের আসল পরীক্ষা। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহাদী হাসান জুয়েলের মতে, অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নের যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তা জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। তবে এর সুফল পাওয়া যাবে কেবল সঠিক সুশাসন নিশ্চিত করা গেলেই।
শিক্ষার্থীরাও বাজেট নিয়ে বেশ আশাবাদী, তবে তাদের চাহিদার জায়গাটা একটু ভিন্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আব্দুল আলিম শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্ব দেওয়ায় বাজেটকে বাস্তবসম্মত মনে করলেও, গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। এই একই সুর ঝরেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল ইসলামের কণ্ঠেও। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে এবং বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে শিক্ষা ও গবেষণায় আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মোস্তাকিম ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সুহাইল আহমদ। তারা মনে করেন, তরুণদের জন্য কাজের ক্ষেত্র তৈরি করতে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। অন্যদিকে একই বিভাগের শিক্ষার্থী মোহন খোন্দকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর করের চাপ না বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। তার শঙ্কা, সব বোঝা যেন শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধে না চাপে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এই আলোচনা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—বাজেটের খাতাটি বেশ চমৎকার ও আশাজাগানিয়া। কিন্তু অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থী, সবারই মূল দৃষ্টি এখন বাস্তবায়নের দিকে। রাজস্ব আদায়, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়ার মতো কঠিন কাজগুলো সরকার কীভাবে সামলায়, তার ওপরই নির্ভর করছে বাজেটের সার্থকতা।
2.png)