আন্তর্জাতিক
ভূমিকম্পসহ বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় রাজধানী টোকিওর বিকল্প প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে জাপান। এ লক্ষ্যে দেশটির পার্লামেন্ট সম্প্রতি একটি আইন পাস করেছে, যার মাধ্যমে প্রয়োজন হলে একটি বা একাধিক অঞ্চলকে অস্থায়ীভাবে জাতীয় প্রশাসনের কেন্দ্র হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হবে।
সরকারের যুক্তি, ভবিষ্যতে কোনো বড় দুর্যোগে টোকিওর প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে রাষ্ট্র পরিচালনায় যেন অচলাবস্থা তৈরি না হয়, সে কারণেই এই প্রস্তুতি। তবে আইনটি পাস হওয়ার পর থেকেই জাপানের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৩০ বছরের মধ্যে টোকিও মহানগর এলাকায় ৭ মাত্রা বা তার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা প্রায় ৭০ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পার্লামেন্ট, কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নতুন আইন সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় বিকল্প প্রশাসনিক কেন্দ্র সক্রিয় করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
শুধু দুর্যোগ মোকাবিলাই নয়, রাজধানীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে সরকারের পরিকল্পনায়। বর্তমানে জাপানের মোট অর্থনীতির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ টোকিওকে ঘিরে আবর্তিত হয়। দেশের অর্ধেকেরও বেশি তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রধান কার্যালয় এই মহানগরে অবস্থিত এবং প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ এখানেই বসবাস করেন। এই অতিনির্ভরতা কমাতে সম্ভাব্য বিকল্প অঞ্চলগুলোতে সরকারি দপ্তর, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, কর-সুবিধা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বিরোধীরা অভিযোগ করছে, পরিকল্পনাটি কেবল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য নয়; এর পেছনে রাজনৈতিক সমঝোতারও ভূমিকা রয়েছে। তাদের দাবি, প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির জোটসঙ্গী ‘জাপান ইনোভেশন পার্টি’ দীর্ঘদিন ধরে ওসাকাকে বিকল্প রাজধানী করার পক্ষে প্রচার চালিয়ে আসছে। সেই দলকে সন্তুষ্ট করতেই সরকার এই আইন পাস করেছে বলে সমালোচকদের অভিযোগ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত বছর ক্ষমতাসীন জোটের পুনর্গঠনের সময় ‘জাপান ইনোভেশন পার্টি’র সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবেই বিকল্প রাজধানী পরিকল্পনা গুরুত্ব পায়। ফলে সরকারি বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর-সুবিধা নির্দিষ্ট কয়েকটি অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে সরকার এখনো প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় কিংবা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করেনি। ফলে পরিকল্পনার বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
আইনে কোনো নির্দিষ্ট শহরের নাম উল্লেখ করা হয়নি। বরং বিভিন্ন অঞ্চল আবেদন করতে পারবে এবং প্রয়োজন হলে একাধিক বিকল্প রাজধানীও নির্ধারণ করা যাবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে।
এই দৌড়ে ইতোমধ্যে ফুকুওকা, হোক্কাইদো, মিয়াগি এবং আইচি প্রিফেকচার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আইচির গভর্নর হিদেয়াকি ওমুরা আইন পাসের পরই তার অঞ্চলকে দেশের প্রথম বিকল্প রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আইনটি পাস হলেও প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির জন্য সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। উচ্চকক্ষে অল্প ভোটের ব্যবধানে বিলটি অনুমোদিত হওয়া তার সরকারের সীমিত রাজনৈতিক শক্তির ইঙ্গিত দিয়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে সরকারের ওপর জনচাপও বাড়ছে। ফলে বিকল্প রাজধানী প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি জনগণের অর্থনৈতিক প্রত্যাশা পূরণ করাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিষয় : জাপান
2.png)
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬
ভূমিকম্পসহ বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় রাজধানী টোকিওর বিকল্প প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে জাপান। এ লক্ষ্যে দেশটির পার্লামেন্ট সম্প্রতি একটি আইন পাস করেছে, যার মাধ্যমে প্রয়োজন হলে একটি বা একাধিক অঞ্চলকে অস্থায়ীভাবে জাতীয় প্রশাসনের কেন্দ্র হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হবে।
সরকারের যুক্তি, ভবিষ্যতে কোনো বড় দুর্যোগে টোকিওর প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে রাষ্ট্র পরিচালনায় যেন অচলাবস্থা তৈরি না হয়, সে কারণেই এই প্রস্তুতি। তবে আইনটি পাস হওয়ার পর থেকেই জাপানের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৩০ বছরের মধ্যে টোকিও মহানগর এলাকায় ৭ মাত্রা বা তার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা প্রায় ৭০ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পার্লামেন্ট, কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নতুন আইন সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় বিকল্প প্রশাসনিক কেন্দ্র সক্রিয় করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
শুধু দুর্যোগ মোকাবিলাই নয়, রাজধানীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে সরকারের পরিকল্পনায়। বর্তমানে জাপানের মোট অর্থনীতির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ টোকিওকে ঘিরে আবর্তিত হয়। দেশের অর্ধেকেরও বেশি তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রধান কার্যালয় এই মহানগরে অবস্থিত এবং প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ এখানেই বসবাস করেন। এই অতিনির্ভরতা কমাতে সম্ভাব্য বিকল্প অঞ্চলগুলোতে সরকারি দপ্তর, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, কর-সুবিধা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বিরোধীরা অভিযোগ করছে, পরিকল্পনাটি কেবল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য নয়; এর পেছনে রাজনৈতিক সমঝোতারও ভূমিকা রয়েছে। তাদের দাবি, প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির জোটসঙ্গী ‘জাপান ইনোভেশন পার্টি’ দীর্ঘদিন ধরে ওসাকাকে বিকল্প রাজধানী করার পক্ষে প্রচার চালিয়ে আসছে। সেই দলকে সন্তুষ্ট করতেই সরকার এই আইন পাস করেছে বলে সমালোচকদের অভিযোগ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত বছর ক্ষমতাসীন জোটের পুনর্গঠনের সময় ‘জাপান ইনোভেশন পার্টি’র সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবেই বিকল্প রাজধানী পরিকল্পনা গুরুত্ব পায়। ফলে সরকারি বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর-সুবিধা নির্দিষ্ট কয়েকটি অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে সরকার এখনো প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় কিংবা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করেনি। ফলে পরিকল্পনার বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
আইনে কোনো নির্দিষ্ট শহরের নাম উল্লেখ করা হয়নি। বরং বিভিন্ন অঞ্চল আবেদন করতে পারবে এবং প্রয়োজন হলে একাধিক বিকল্প রাজধানীও নির্ধারণ করা যাবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে।
এই দৌড়ে ইতোমধ্যে ফুকুওকা, হোক্কাইদো, মিয়াগি এবং আইচি প্রিফেকচার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আইচির গভর্নর হিদেয়াকি ওমুরা আইন পাসের পরই তার অঞ্চলকে দেশের প্রথম বিকল্প রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আইনটি পাস হলেও প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির জন্য সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। উচ্চকক্ষে অল্প ভোটের ব্যবধানে বিলটি অনুমোদিত হওয়া তার সরকারের সীমিত রাজনৈতিক শক্তির ইঙ্গিত দিয়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে সরকারের ওপর জনচাপও বাড়ছে। ফলে বিকল্প রাজধানী প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি জনগণের অর্থনৈতিক প্রত্যাশা পূরণ করাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
2.png)