সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 ইসলাম ও জীবনইসলাম ও জীবন

হজের পরে জীবন বদল: জান্নাত লাভের পথে করণীয় কী?

হজ শেষে নিজেকে নতুনভাবে গড়ার সময় এখনই। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত অর্জনে হাজিদের জন্য রইল বিশেষ কিছু দিকনির্দেশনা।

হজের পরে জীবন বদল: জান্নাত লাভের পথে করণীয় কী?
ছবি -সংগৃহীত

 

পবিত্র হজ ইসলামের অন্যতম প্রধান ইবাদত। হাজি সাহেব যখন হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেন, তখন তিনি নিষ্পাপ শিশুর মতো পবিত্র হয়ে যান। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোষণা অনুযায়ী, কবুল হজের একমাত্র প্রতিদানই হলো জান্নাত। তবে হজের পরবর্তী জীবনই প্রকৃত পরীক্ষা। এই পবিত্রতা ধরে রাখা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে অটল থাকাই একজন হাজি বা হাজানির বড় চ্যালেঞ্জ। হজ পরবর্তী সময়ে একজন মুমিনের করণীয় সম্পর্কে এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

আল্লাহর জিকির ও ইবাদতে নিমগ্ন থাকা

হজের সময় যেমন জিকির-আসকারে নিজেকে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল, সেই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। হজ শেষ হয়েছে মানেই ইবাদত শেষ—এমনটি ভাবার কোনো সুযোগ নেই। পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারা (২০০-২০২) অনুযায়ী, হজের পর আল্লাহকে এমনভাবে স্মরণ করতে হবে, যেমন মানুষ তার আপনজন বা বাপ-দাদাদের কথা স্মরণ করে। বরং তার চেয়েও বেশি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইবাদত অব্যাহত রাখাই একজন মুমিনের পরিচয়। তাই সুতা পাকানোর পর তা ছিঁড়ে ফেলার মতো যেন আমাদের ইবাদত ব্যর্থ না হয়।

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও দোয়া

হজ পাওয়া অনেক বড় নেয়ামত, যা সবার নসিবে জোটে না। সুতরাং এই মহান নেয়ামতের শোকরিয়া আদায় করা অপরিহার্য। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, শুকরিয়া আদায় করলে তিনি নেয়ামত বাড়িয়ে দেন। রাসুল (সা.) তাঁর প্রিয় সাহাবি মুয়াজ (রা.)-কে প্রত্যেক নামাজের পর এই দোয়াটি পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন: ‘আল্লাহুম্মা আঈন্নী আলা জিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ইবাদাতিকা’। অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আপনার জিকির, শোকর এবং উত্তম ইবাদতে আপনি আমাকে সাহায্য করুন।

অবিরত তওবা করা

পবিত্র ভূমি দর্শন ও হজের রুকনগুলো পালনের পর একজন মানুষের নতুন জীবন পাওয়ার কথা। দিন-রাত গুনাহের পর আল্লাহ যেমন তওবা কবুল করতে হাত বাড়িয়ে রাখেন, ঠিক তেমনি মুমিনের উচিত সারাক্ষণ নিজের ভুল স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। হাদিসের ভাষ্যমতে, প্রতিটি মানুষই ভুল করে, কিন্তু শ্রেষ্ঠ হলো তারাই যারা ভুল বুঝতে পেরে দ্রুত তওবার পথে ফিরে আসে।

মানবিক ও উত্তম চরিত্রের চর্চা

হজ আমাদের শিক্ষা দেয় শৃঙ্খলা, সবর এবং ভ্রাতৃত্ববোধ। ইহরামের অবস্থায় যেমন ঝগড়া, অশ্লীলতা ও রূঢ় আচরণ নিষিদ্ধ ছিল, হজ পরবর্তী সাধারণ জীবনেও তা পরিহার করতে হবে। প্রতিবেশীর সাথে সদয় ব্যবহার, মানুষের উপকার করা এবং কর্কশ ভাষা ত্যাগ করে শান্ত ও মার্জিত আচরণ করা একজন হাজির অন্যতম প্রধান কর্তব্য।

সৎকাজে লেগে থাকা

হজ নিজেই একটি বড় নেক আমল। এর ধারা বজায় রাখতে অন্যান্য ইবাদতেও মনোযোগী হতে হবে। হজ করেছেন বলে নিজেকে বড় মনে করার কিছু নেই। বরং আরও বেশি নেক আমল করার তাগিদ থাকতে হবে। হজরত আয়েশা (রা.) এমনকি মৃত্যুর আগেও নফল ইবাদতের ব্যাপারে আপসহীন ছিলেন। আল্লাহর কাছে কল্যাণের চাবি যেন আমাদের হাতে থাকে, সেই চেষ্টাই করতে হবে।

আমল কবুল না হওয়ার ভয়ে ভীত থাকা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিনয়। একজন প্রকৃত মুমিন সর্বদা ভয়ে থাকেন যে, তার ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হলো কি না। নিজেকে ইবাদতগুজার ভেবে অহংকার করা যাবে না। হজ করেছেন বলে অহমিকা তৈরি হলে সেই আমল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই আমল করার পর কবুলের জন্য কাঁদতে হবে।

আল্লাহর কাছে চাওয়া ও দোয়া

আল্লাহর কাছে চাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। রাসুল (সা.) শিখিয়েছেন, জীবনের ছোট-বড় যেকোনো প্রয়োজন—এমনকি জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেলেও আল্লাহর কাছেই চাইতে হবে। দোয়া নিজেই একটি ইবাদত। তাই নিজের পরকাল ও ঈমানের সুস্থিরতার জন্য আল্লাহর কাছে বেশি বেশি সাহায্য কামনা করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, হজের মাধ্যমে যে জান্নাতের পথ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি মিলেছে, সেই পথে অবিচল থাকাই এখনকার মূল কাজ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হজের শিক্ষা ধরে রেখে আমৃত্যু তাঁর আনুগত্য করার তৌফিক দান করুন।

বিষয় : হজের পরে করণীয়

হজের পরে জীবন বদল: জান্নাত লাভের পথে করণীয় কী?
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬


হজের পরে জীবন বদল: জান্নাত লাভের পথে করণীয় কী?

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬

featured Image

 

পবিত্র হজ ইসলামের অন্যতম প্রধান ইবাদত। হাজি সাহেব যখন হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেন, তখন তিনি নিষ্পাপ শিশুর মতো পবিত্র হয়ে যান। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোষণা অনুযায়ী, কবুল হজের একমাত্র প্রতিদানই হলো জান্নাত। তবে হজের পরবর্তী জীবনই প্রকৃত পরীক্ষা। এই পবিত্রতা ধরে রাখা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে অটল থাকাই একজন হাজি বা হাজানির বড় চ্যালেঞ্জ। হজ পরবর্তী সময়ে একজন মুমিনের করণীয় সম্পর্কে এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

আল্লাহর জিকির ও ইবাদতে নিমগ্ন থাকা

হজের সময় যেমন জিকির-আসকারে নিজেকে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল, সেই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। হজ শেষ হয়েছে মানেই ইবাদত শেষ—এমনটি ভাবার কোনো সুযোগ নেই। পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারা (২০০-২০২) অনুযায়ী, হজের পর আল্লাহকে এমনভাবে স্মরণ করতে হবে, যেমন মানুষ তার আপনজন বা বাপ-দাদাদের কথা স্মরণ করে। বরং তার চেয়েও বেশি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইবাদত অব্যাহত রাখাই একজন মুমিনের পরিচয়। তাই সুতা পাকানোর পর তা ছিঁড়ে ফেলার মতো যেন আমাদের ইবাদত ব্যর্থ না হয়।

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও দোয়া

হজ পাওয়া অনেক বড় নেয়ামত, যা সবার নসিবে জোটে না। সুতরাং এই মহান নেয়ামতের শোকরিয়া আদায় করা অপরিহার্য। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, শুকরিয়া আদায় করলে তিনি নেয়ামত বাড়িয়ে দেন। রাসুল (সা.) তাঁর প্রিয় সাহাবি মুয়াজ (রা.)-কে প্রত্যেক নামাজের পর এই দোয়াটি পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন: ‘আল্লাহুম্মা আঈন্নী আলা জিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ইবাদাতিকা’। অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আপনার জিকির, শোকর এবং উত্তম ইবাদতে আপনি আমাকে সাহায্য করুন।

অবিরত তওবা করা

পবিত্র ভূমি দর্শন ও হজের রুকনগুলো পালনের পর একজন মানুষের নতুন জীবন পাওয়ার কথা। দিন-রাত গুনাহের পর আল্লাহ যেমন তওবা কবুল করতে হাত বাড়িয়ে রাখেন, ঠিক তেমনি মুমিনের উচিত সারাক্ষণ নিজের ভুল স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। হাদিসের ভাষ্যমতে, প্রতিটি মানুষই ভুল করে, কিন্তু শ্রেষ্ঠ হলো তারাই যারা ভুল বুঝতে পেরে দ্রুত তওবার পথে ফিরে আসে।

মানবিক ও উত্তম চরিত্রের চর্চা

হজ আমাদের শিক্ষা দেয় শৃঙ্খলা, সবর এবং ভ্রাতৃত্ববোধ। ইহরামের অবস্থায় যেমন ঝগড়া, অশ্লীলতা ও রূঢ় আচরণ নিষিদ্ধ ছিল, হজ পরবর্তী সাধারণ জীবনেও তা পরিহার করতে হবে। প্রতিবেশীর সাথে সদয় ব্যবহার, মানুষের উপকার করা এবং কর্কশ ভাষা ত্যাগ করে শান্ত ও মার্জিত আচরণ করা একজন হাজির অন্যতম প্রধান কর্তব্য।

সৎকাজে লেগে থাকা

হজ নিজেই একটি বড় নেক আমল। এর ধারা বজায় রাখতে অন্যান্য ইবাদতেও মনোযোগী হতে হবে। হজ করেছেন বলে নিজেকে বড় মনে করার কিছু নেই। বরং আরও বেশি নেক আমল করার তাগিদ থাকতে হবে। হজরত আয়েশা (রা.) এমনকি মৃত্যুর আগেও নফল ইবাদতের ব্যাপারে আপসহীন ছিলেন। আল্লাহর কাছে কল্যাণের চাবি যেন আমাদের হাতে থাকে, সেই চেষ্টাই করতে হবে।

আমল কবুল না হওয়ার ভয়ে ভীত থাকা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিনয়। একজন প্রকৃত মুমিন সর্বদা ভয়ে থাকেন যে, তার ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হলো কি না। নিজেকে ইবাদতগুজার ভেবে অহংকার করা যাবে না। হজ করেছেন বলে অহমিকা তৈরি হলে সেই আমল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই আমল করার পর কবুলের জন্য কাঁদতে হবে।

আল্লাহর কাছে চাওয়া ও দোয়া

আল্লাহর কাছে চাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। রাসুল (সা.) শিখিয়েছেন, জীবনের ছোট-বড় যেকোনো প্রয়োজন—এমনকি জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেলেও আল্লাহর কাছেই চাইতে হবে। দোয়া নিজেই একটি ইবাদত। তাই নিজের পরকাল ও ঈমানের সুস্থিরতার জন্য আল্লাহর কাছে বেশি বেশি সাহায্য কামনা করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, হজের মাধ্যমে যে জান্নাতের পথ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি মিলেছে, সেই পথে অবিচল থাকাই এখনকার মূল কাজ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হজের শিক্ষা ধরে রেখে আমৃত্যু তাঁর আনুগত্য করার তৌফিক দান করুন।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত