জাতীয়
নতুন অর্থবছর শুরু হয়ে গেছে, অথচ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাঙ্ক্ষিত নতুন বেতন কাঠামোর (পে-স্কেল) গেজেট এখনো আলোর মুখ দেখেনি। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলেও, এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অস্পষ্টতা। ফলে সরকারি চাকরিজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাঝে বাড়ছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা।
বেতন কাঠামো নিয়ে ধোঁয়াশা:
গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় বেতন কত বাড়বে, কোন ধাপে বাড়বে, ভাতা কখন যুক্ত হবে—এসব প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। বিশেষ করে পিআরএল (অবসর-পূর্ব প্রস্তুতিমূলক ছুটি) ও অবসরে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা সবচেয়ে বেশি। সরকারি দপ্তরে সরাসরি যুক্ত না থাকায় আনুষ্ঠানিক তথ্যও তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। প্রতিদিন বিভিন্ন দপ্তরে এবং গণমাধ্যমে ‘গেজেট কবে’, ‘বেতন কত বাড়বে’—এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে।
প্রযুক্তিগত ও ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ:
২০১৫ সালের অষ্টম বেতন স্কেলের সময় অধিকাংশ কাজ ম্যানুয়ালি করা সম্ভব হলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ সব আর্থিক কার্যক্রম ইএফটি (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) এবং ‘আইবাস++’ সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক বলেন, “আগের মতো এখন আর হাতে বেতন নির্ধারণের সুযোগ নেই। যদি ধাপে ধাপে মূল বেতন কার্যকর করা হয়, তবে একই কর্মচারীর জন্য বারবার পে-ফিক্সেশন করতে হবে, যা সফটওয়্যারে ভুল হওয়ার ঝুঁকি বাড়াবে।”
তিনি সমস্যার সমাধানে বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে বলেন, “প্রথম ধাপেই শতভাগ মূল বেতন কার্যকর করে পে-ফিক্সেশন সম্পন্ন করা উচিত। পরে বাড়ি ভাড়া বা অন্যান্য ভাতা পর্যায়ক্রমে কার্যকর করা যেতে পারে।”
অবসরপ্রাপ্তদের বিশেষ উদ্বেগ:
সবচেয়ে বড় সংকটে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্তরা। কারণ একজন কর্মচারীর পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও ছুটির নগদায়ন শেষ প্রাপ্ত বেতনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থায় অবসরপ্রাপ্তদের পাওনা দুই বা তিন ধাপে দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে আংশিক বেতন বৃদ্ধিতে অবসরে গেলে পরবর্তী ধাপের সুবিধা পাওয়া নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ:
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা আসার পর সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি বেতন বাড়লে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে কি না, তা নিয়ে সাধারণ ভোক্তারা আতঙ্কে আছেন। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর যৌক্তিকতা থাকলেও, একই সঙ্গে বাজারের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজনীয়, তবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখাটা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।”
সরকারি অবস্থান ও সম্ভাব্য সময়:
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া রূপরেখা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে এর আর্থিক প্রভাব, সফটওয়্যার সামঞ্জস্য এবং প্রশাসনিক দিকগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শেষ সপ্তাহের মধ্যে গেজেট প্রকাশ হতে পারে। তবে বেতন বৃদ্ধির কার্যকারিতা ১ জুলাই থেকেই গণ্য করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যার ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বকেয়াসহ সুবিধা পাবেন।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে। তবে গেজেট প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত এই উদ্বেগ নিরসনের কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা এখনো পাওয়া যায়নি।
2.png)
রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬
নতুন অর্থবছর শুরু হয়ে গেছে, অথচ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাঙ্ক্ষিত নতুন বেতন কাঠামোর (পে-স্কেল) গেজেট এখনো আলোর মুখ দেখেনি। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলেও, এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অস্পষ্টতা। ফলে সরকারি চাকরিজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাঝে বাড়ছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা।
বেতন কাঠামো নিয়ে ধোঁয়াশা:
গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় বেতন কত বাড়বে, কোন ধাপে বাড়বে, ভাতা কখন যুক্ত হবে—এসব প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। বিশেষ করে পিআরএল (অবসর-পূর্ব প্রস্তুতিমূলক ছুটি) ও অবসরে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা সবচেয়ে বেশি। সরকারি দপ্তরে সরাসরি যুক্ত না থাকায় আনুষ্ঠানিক তথ্যও তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। প্রতিদিন বিভিন্ন দপ্তরে এবং গণমাধ্যমে ‘গেজেট কবে’, ‘বেতন কত বাড়বে’—এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে।
প্রযুক্তিগত ও ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ:
২০১৫ সালের অষ্টম বেতন স্কেলের সময় অধিকাংশ কাজ ম্যানুয়ালি করা সম্ভব হলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ সব আর্থিক কার্যক্রম ইএফটি (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) এবং ‘আইবাস++’ সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক বলেন, “আগের মতো এখন আর হাতে বেতন নির্ধারণের সুযোগ নেই। যদি ধাপে ধাপে মূল বেতন কার্যকর করা হয়, তবে একই কর্মচারীর জন্য বারবার পে-ফিক্সেশন করতে হবে, যা সফটওয়্যারে ভুল হওয়ার ঝুঁকি বাড়াবে।”
তিনি সমস্যার সমাধানে বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে বলেন, “প্রথম ধাপেই শতভাগ মূল বেতন কার্যকর করে পে-ফিক্সেশন সম্পন্ন করা উচিত। পরে বাড়ি ভাড়া বা অন্যান্য ভাতা পর্যায়ক্রমে কার্যকর করা যেতে পারে।”
অবসরপ্রাপ্তদের বিশেষ উদ্বেগ:
সবচেয়ে বড় সংকটে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্তরা। কারণ একজন কর্মচারীর পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও ছুটির নগদায়ন শেষ প্রাপ্ত বেতনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থায় অবসরপ্রাপ্তদের পাওনা দুই বা তিন ধাপে দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে আংশিক বেতন বৃদ্ধিতে অবসরে গেলে পরবর্তী ধাপের সুবিধা পাওয়া নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ:
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা আসার পর সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি বেতন বাড়লে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে কি না, তা নিয়ে সাধারণ ভোক্তারা আতঙ্কে আছেন। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর যৌক্তিকতা থাকলেও, একই সঙ্গে বাজারের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজনীয়, তবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখাটা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।”
সরকারি অবস্থান ও সম্ভাব্য সময়:
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া রূপরেখা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে এর আর্থিক প্রভাব, সফটওয়্যার সামঞ্জস্য এবং প্রশাসনিক দিকগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শেষ সপ্তাহের মধ্যে গেজেট প্রকাশ হতে পারে। তবে বেতন বৃদ্ধির কার্যকারিতা ১ জুলাই থেকেই গণ্য করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যার ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বকেয়াসহ সুবিধা পাবেন।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে। তবে গেজেট প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত এই উদ্বেগ নিরসনের কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা এখনো পাওয়া যায়নি।
2.png)