সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 জাতীয়জাতীয়

‘মিনিকেট’ নামে কোনো ধান নেই, তবে চাল আছে কিভাবে

মোটা চাল ছেঁটে বছরে ৪,৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে মিলার চক্র। পুষ্টিহীন এ চালে বাড়ছে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি, আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই বাজারে।

‘মিনিকেট’  নামে কোনো ধান নেই, তবে চাল আছে কিভাবে
ছবি -সংগৃহীত

বাজারে ‘মিনিকেট’ চালের দাপট দীর্ঘদিনের। দীর্ঘদেহী চকচকে এই চাল দেখে সাধারণ ক্রেতারা একে উচ্চমানের ধানের জাত ভেবেই বাড়তি দামে কিনে নেন। অথচ কৃষি গবেষণায় ‘মিনিকেট’ নামে ধানের কোনো অস্তিত্বই নেই। নেই কোনো সরকারি স্বীকৃতি। উল্টো এই নামে চাল বাজারজাত করা আইনত দণ্ডনীয়। তবুও বছরের পর বছর এই ভুয়া নামেই চলছে রমরমা ব্যবসা, যার পেছনে রয়েছে অসাধু মিলারদের এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কৃষকের উৎপাদিত স্বর্ণা, পাইজাম বা বিআর-২৮-এর মতো মোটা ও মাঝারি জাতের ধান কম দামে কিনে মিলাররা আধুনিক মেশিনে অতিরিক্ত পলিশ বা ছাঁটাই করেন। এতে চালের আকার হয়ে যায় সরু ও চকচকে। এরপরই সেটিকে ‘মিনিকেট’ নাম দিয়ে বাজারজাত করা হয়। খুচরা বাজারে যেখানে সাধারণ মোটা চাল ৬০ টাকায় পাওয়া যায়, সেখানে একই চাল পলিশ করে ‘মিনিকেট’ নাম দিয়ে ৮৫ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। কেজিপ্রতি এই ২৫ টাকা বাড়তি মুনাফার অংকটা মোটেও ছোট নয়।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টন মিনিকেট চালের চাহিদা রয়েছে। সে হিসাবে, বছরে ভোক্তাদের পকেট থেকে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এই অসাধু চক্র। ক্যাবের কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘মিনিকেট নামের প্রতারণা ঠেকাতে ২০২৩ সালে আইন প্রণয়ন করা হলেও এর কার্যকর প্রয়োগ নেই। চক্রটি এতটাই শক্তিশালী যে, প্রকাশ্যেই এই প্রতারণা চলছে।’

শুধুমাত্র পকেট কাটা নয়, ‘মিনিকেট’ চাল জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ধরনের হুমকি। চাল অতিরিক্ত পলিশ বা ছাঁটাই করার ফলে এর গায়ে থাকা ভিটামিন বি-১, বি-৬, আয়রন ও ফাইবার সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। উবিনীগ-এর কনসালট্যান্ট ডা. এমএ সোবাহান বলেন, এই চাল বেশি খেলে শরীরে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ছে, যা দেশের স্বাস্থ্য খাতে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ সিড অ্যাসোসিয়েশনের স্পষ্ট অভিমত—বাংলাদেশে মিনিকেট নামে কোনো ধানের জাত উদ্ভাবন করা হয়নি, বিদেশ থেকেও এমন নামে কোনো ধান আমদানি করা হয়নি। মাঠপর্যায়ের কৃষকরাও জানেন না, এই নামের কোনো ধান তারা চাষ করেন কি না। অথচ বাজারে এই চালের দাপট থামছে না।

প্রতারণা ঠেকাতে ২০২৩ সালের ১১ জুলাই আইন করা হয়েছিল, যেখানে ‘মিনিকেট’ বা কোনো কাল্পনিক নাম ব্যবহার করলে ২ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, বাদামতলী থেকে শুরু করে নওগাঁ, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া ও শেরপুরের বিভিন্ন কোম্পানির বস্তায় এখনো এই ‘মিনিকেট’ নামেই চাল বিক্রি হচ্ছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারে অস্থিরতা কমাতে গিয়ে অনেক সময় তদারকি কিছুটা শিথিল করতে হয়, তবে এই প্রতারণা বন্ধে সামনে আবারও কঠোর অভিযানের পরিকল্পনা রয়েছে।

কারওয়ান বাজারের একজন পাইকারি আড়তদার অকপটেই স্বীকার করলেন, ক্রেতারা চকচকে চাল পছন্দ করেন বলেই মিলাররা এই কৃত্রিম সংকট ও নতুন নাম তৈরি করেছে। অর্থাৎ, ক্রেতার অভিরুচিকে পুঁজি করেই বছরের পর বছর চলছে এই হাজার কোটি টাকার প্রতারণা।

বিষয় : মিনিকেট স্বর্ণা পাইজাম বিআর-২৮

কাল মহাকাল

শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬


‘মিনিকেট’ নামে কোনো ধান নেই, তবে চাল আছে কিভাবে

প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুলাই ২০২৬

featured Image

বাজারে ‘মিনিকেট’ চালের দাপট দীর্ঘদিনের। দীর্ঘদেহী চকচকে এই চাল দেখে সাধারণ ক্রেতারা একে উচ্চমানের ধানের জাত ভেবেই বাড়তি দামে কিনে নেন। অথচ কৃষি গবেষণায় ‘মিনিকেট’ নামে ধানের কোনো অস্তিত্বই নেই। নেই কোনো সরকারি স্বীকৃতি। উল্টো এই নামে চাল বাজারজাত করা আইনত দণ্ডনীয়। তবুও বছরের পর বছর এই ভুয়া নামেই চলছে রমরমা ব্যবসা, যার পেছনে রয়েছে অসাধু মিলারদের এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কৃষকের উৎপাদিত স্বর্ণা, পাইজাম বা বিআর-২৮-এর মতো মোটা ও মাঝারি জাতের ধান কম দামে কিনে মিলাররা আধুনিক মেশিনে অতিরিক্ত পলিশ বা ছাঁটাই করেন। এতে চালের আকার হয়ে যায় সরু ও চকচকে। এরপরই সেটিকে ‘মিনিকেট’ নাম দিয়ে বাজারজাত করা হয়। খুচরা বাজারে যেখানে সাধারণ মোটা চাল ৬০ টাকায় পাওয়া যায়, সেখানে একই চাল পলিশ করে ‘মিনিকেট’ নাম দিয়ে ৮৫ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। কেজিপ্রতি এই ২৫ টাকা বাড়তি মুনাফার অংকটা মোটেও ছোট নয়।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টন মিনিকেট চালের চাহিদা রয়েছে। সে হিসাবে, বছরে ভোক্তাদের পকেট থেকে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এই অসাধু চক্র। ক্যাবের কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘মিনিকেট নামের প্রতারণা ঠেকাতে ২০২৩ সালে আইন প্রণয়ন করা হলেও এর কার্যকর প্রয়োগ নেই। চক্রটি এতটাই শক্তিশালী যে, প্রকাশ্যেই এই প্রতারণা চলছে।’

শুধুমাত্র পকেট কাটা নয়, ‘মিনিকেট’ চাল জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ধরনের হুমকি। চাল অতিরিক্ত পলিশ বা ছাঁটাই করার ফলে এর গায়ে থাকা ভিটামিন বি-১, বি-৬, আয়রন ও ফাইবার সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। উবিনীগ-এর কনসালট্যান্ট ডা. এমএ সোবাহান বলেন, এই চাল বেশি খেলে শরীরে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ছে, যা দেশের স্বাস্থ্য খাতে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ সিড অ্যাসোসিয়েশনের স্পষ্ট অভিমত—বাংলাদেশে মিনিকেট নামে কোনো ধানের জাত উদ্ভাবন করা হয়নি, বিদেশ থেকেও এমন নামে কোনো ধান আমদানি করা হয়নি। মাঠপর্যায়ের কৃষকরাও জানেন না, এই নামের কোনো ধান তারা চাষ করেন কি না। অথচ বাজারে এই চালের দাপট থামছে না।

প্রতারণা ঠেকাতে ২০২৩ সালের ১১ জুলাই আইন করা হয়েছিল, যেখানে ‘মিনিকেট’ বা কোনো কাল্পনিক নাম ব্যবহার করলে ২ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, বাদামতলী থেকে শুরু করে নওগাঁ, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া ও শেরপুরের বিভিন্ন কোম্পানির বস্তায় এখনো এই ‘মিনিকেট’ নামেই চাল বিক্রি হচ্ছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারে অস্থিরতা কমাতে গিয়ে অনেক সময় তদারকি কিছুটা শিথিল করতে হয়, তবে এই প্রতারণা বন্ধে সামনে আবারও কঠোর অভিযানের পরিকল্পনা রয়েছে।

কারওয়ান বাজারের একজন পাইকারি আড়তদার অকপটেই স্বীকার করলেন, ক্রেতারা চকচকে চাল পছন্দ করেন বলেই মিলাররা এই কৃত্রিম সংকট ও নতুন নাম তৈরি করেছে। অর্থাৎ, ক্রেতার অভিরুচিকে পুঁজি করেই বছরের পর বছর চলছে এই হাজার কোটি টাকার প্রতারণা।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত