জাতীয়
বর্ষা মানেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি, নদী-নালা আর খাল-বিল থইথই করা এক দৃশ্য। জুন মাস এলেই বাংলাজুড়ে যে সজীবতা ফিরে আসার কথা, এবার তার উল্টো চিত্র দেখা গেল। সদ্য বিদায়ী জুন মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ২৯ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। গত সাত বছরের পরিসংখ্যান বলছে, এই সময়ের মধ্যে এটাই জুন মাসে সর্বনিম্ন বৃষ্টির রেকর্ড।
আবহাওয়াবিদদের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে দেশে গড়ে ৪৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ার কথা। কিন্তু এবারের চিত্র ছিল ভিন্ন। শুধু চলতি বছরেই নয়, গত সাত বছরের ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জুনে বৃষ্টির পরিমাণ ক্রমশই কমছে। ২০২০ ও ২০২১ সালে বৃষ্টির হার স্বাভাবিকের কাছাকাছি বা তার চেয়ে কিছুটা বেশি থাকলেও, ২০২২ সাল থেকে সেই প্রবণতা কমতে শুরু করেছে। গত বছর বৃষ্টির ঘাটতি ছিল ২১ শতাংশ, আর এবার তা ২৯ শতাংশে পৌঁছেছে।
আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদের পর্যবেক্ষণ বলছে, শুধু বৃষ্টি কমছে তা নয়, জুন মাসটি ধীরে ধীরে আরও উষ্ণ হয়ে উঠছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মে থেকে সেপ্টেম্বর—এই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। জুন মাসে প্রতিবছর গড়ে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ০.০৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে বাড়ছে। বর্ষার শুরুর এই সময়টি এখন আর আগের মতো শীতল নেই, বরং তা ক্রমশ তপ্ত হয়ে উঠছে।
শুধু গড় তাপমাত্রা নয়, গরমে টিকে থাকাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশে প্রতি দশকে উষ্ণ দিনের সংখ্যা বাড়ছে ১২ দিন করে। একই সঙ্গে বাড়ছে টানা শুষ্ক দিনের সংখ্যা। ফলে গরমের স্থায়িত্ব দীর্ঘ হচ্ছে। চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি তাপজনিত অস্বস্তিতে ভোগেন। জুনের ডিসকমফোর্ট ইনডেক্স বা অস্বস্তির সূচক ২৮ দশমিক ১-এ পৌঁছেছে, যা ‘উচ্চ অস্বস্তি’ পর্যায়ের। এর অর্থ হলো, বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় মানুষের শরীরের ওপর তাপের প্রভাব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র।
এই বৃষ্টির ঘাটতির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি ও জনজীবনে। আমনের বীজতলা তৈরি ও রোপণের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বৃষ্টি না হওয়ায় কৃষকদের সেচের জন্য বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে। কৃষিবিদ মৃত্যুঞ্জয় রায় বলেন, ‘আমনের বীজতলা তৈরির সময় পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এই ধারা যদি জুলাই মাস পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, তবে আমন উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে।’
শহরের জনজীবনেও এর প্রভাব স্পষ্ট। তীব্র গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপ বাড়ছে। সেই সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষ, শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে বহুগুণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার গবেষণাও বলছে, উচ্চ আর্দ্রতা ও তাপপ্রবাহ কর্মঘণ্টার উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়।
আবহাওয়াবিদ ও গবেষকদের মতে, কোনো একটি বছরের বৃষ্টির ঘাটতি দিয়ে হয়তো বড় কোনো সিদ্ধান্ত টানা যায় না। তবে টানা কয়েক বছরের এই তথ্য ও দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের গবেষণার সংমিশ্রণ একটি বড় ঝুঁকির বার্তা দিচ্ছে। পরিবর্তনের এই ধারা যদি বজায় থাকে, তবে তা কেবল আবহাওয়ার বিচ্যুতি নয়, বরং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এখন দেখার বিষয়, জুনের এই ঘাটতি জুলাই ও আগস্টের বৃষ্টিতে পূরণ হয়, নাকি ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জলবায়ুর পরিবর্তিত চরিত্রের নতুন কোনো মাইলফলক হয়ে থাকে।
2.png)
শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুলাই ২০২৬
বর্ষা মানেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি, নদী-নালা আর খাল-বিল থইথই করা এক দৃশ্য। জুন মাস এলেই বাংলাজুড়ে যে সজীবতা ফিরে আসার কথা, এবার তার উল্টো চিত্র দেখা গেল। সদ্য বিদায়ী জুন মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ২৯ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। গত সাত বছরের পরিসংখ্যান বলছে, এই সময়ের মধ্যে এটাই জুন মাসে সর্বনিম্ন বৃষ্টির রেকর্ড।
আবহাওয়াবিদদের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে দেশে গড়ে ৪৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ার কথা। কিন্তু এবারের চিত্র ছিল ভিন্ন। শুধু চলতি বছরেই নয়, গত সাত বছরের ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জুনে বৃষ্টির পরিমাণ ক্রমশই কমছে। ২০২০ ও ২০২১ সালে বৃষ্টির হার স্বাভাবিকের কাছাকাছি বা তার চেয়ে কিছুটা বেশি থাকলেও, ২০২২ সাল থেকে সেই প্রবণতা কমতে শুরু করেছে। গত বছর বৃষ্টির ঘাটতি ছিল ২১ শতাংশ, আর এবার তা ২৯ শতাংশে পৌঁছেছে।
আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদের পর্যবেক্ষণ বলছে, শুধু বৃষ্টি কমছে তা নয়, জুন মাসটি ধীরে ধীরে আরও উষ্ণ হয়ে উঠছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মে থেকে সেপ্টেম্বর—এই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। জুন মাসে প্রতিবছর গড়ে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ০.০৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে বাড়ছে। বর্ষার শুরুর এই সময়টি এখন আর আগের মতো শীতল নেই, বরং তা ক্রমশ তপ্ত হয়ে উঠছে।
শুধু গড় তাপমাত্রা নয়, গরমে টিকে থাকাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশে প্রতি দশকে উষ্ণ দিনের সংখ্যা বাড়ছে ১২ দিন করে। একই সঙ্গে বাড়ছে টানা শুষ্ক দিনের সংখ্যা। ফলে গরমের স্থায়িত্ব দীর্ঘ হচ্ছে। চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি তাপজনিত অস্বস্তিতে ভোগেন। জুনের ডিসকমফোর্ট ইনডেক্স বা অস্বস্তির সূচক ২৮ দশমিক ১-এ পৌঁছেছে, যা ‘উচ্চ অস্বস্তি’ পর্যায়ের। এর অর্থ হলো, বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় মানুষের শরীরের ওপর তাপের প্রভাব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র।
এই বৃষ্টির ঘাটতির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি ও জনজীবনে। আমনের বীজতলা তৈরি ও রোপণের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বৃষ্টি না হওয়ায় কৃষকদের সেচের জন্য বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে। কৃষিবিদ মৃত্যুঞ্জয় রায় বলেন, ‘আমনের বীজতলা তৈরির সময় পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এই ধারা যদি জুলাই মাস পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, তবে আমন উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে।’
শহরের জনজীবনেও এর প্রভাব স্পষ্ট। তীব্র গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপ বাড়ছে। সেই সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষ, শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে বহুগুণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার গবেষণাও বলছে, উচ্চ আর্দ্রতা ও তাপপ্রবাহ কর্মঘণ্টার উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়।
আবহাওয়াবিদ ও গবেষকদের মতে, কোনো একটি বছরের বৃষ্টির ঘাটতি দিয়ে হয়তো বড় কোনো সিদ্ধান্ত টানা যায় না। তবে টানা কয়েক বছরের এই তথ্য ও দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের গবেষণার সংমিশ্রণ একটি বড় ঝুঁকির বার্তা দিচ্ছে। পরিবর্তনের এই ধারা যদি বজায় থাকে, তবে তা কেবল আবহাওয়ার বিচ্যুতি নয়, বরং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এখন দেখার বিষয়, জুনের এই ঘাটতি জুলাই ও আগস্টের বৃষ্টিতে পূরণ হয়, নাকি ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জলবায়ুর পরিবর্তিত চরিত্রের নতুন কোনো মাইলফলক হয়ে থাকে।
2.png)