জাতীয়
দীর্ঘ তিন মাসের অপেক্ষার প্রহর ফুরোচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। চেয়ারম্যান ও কমিশনারশূন্য অবস্থায় স্থবির হয়ে পড়া এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি অবশেষে নতুন নেতৃত্ব পেতে যাচ্ছে। সার্চ কমিটির চূড়ান্ত তৎপরতায় এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা—আগামী সপ্তাহ বা তার পরের সপ্তাহের শুরুতেই নতুন কমিশনের মুখ দেখতে পারে দেশ।
বুধবার সার্চ কমিটির এক বৈঠকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে এবং একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা (শর্টলিস্ট) তৈরির কাজও বেশ এগিয়েছে। একই সঙ্গে নতুন কমিশনকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিচ্ছে দুদক। সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, আগামী সপ্তাহেই নতুন দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যোগ দেবেন এবং পুরনো জট ছাড়িয়ে দাপ্তরিক কার্যক্রমে গতি ফিরবে।
সার্চ কমিটির তৎপরতা ও আবেদন প্রক্রিয়া
দুদক আইন, ২০০৪-এর ৭ ধারা অনুযায়ী নতুন কমিশন গঠনের দায়িত্ব পেয়েছে পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি। আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হকের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিতে আরও রয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি রাজিক আল জলিল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি), মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব এবং সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান।
প্রক্রিয়াটিকে আরও স্বচ্ছ ও গতিশীল করতে আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করেছে কমিটি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, যারা ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ আবেদন জমা দিয়েছেন, তাদের নতুন করে আবেদনের প্রয়োজন নেই। নিয়ম অনুযায়ী, সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে ছয়জনের একটি নাম প্রস্তাব করবে, যাদের মধ্য থেকে তিনজনকে কমিশন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।
কারা আলোচনায়?
দুদক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এবার বিচার বিভাগ থেকে চেয়ারম্যান নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সার্চ কমিটির বিবেচনায় আছেন সাবেক বিচারপতি থেকে শুরু করে অভিজ্ঞ বিচারক ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
আলোচনায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—সাবেক বিচারপতি আসাদুজ্জামান, ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এর সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেন, সাবেক জেলা জজ রুহুল কুদ্দুস, সাবেক যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ড. আবুল হোসেন খন্দকার এবং অবসরপ্রাপ্ত সচিব আবদুস সবুর। এছাড়া সাবেক অতিরিক্ত সচিব তাহসিনুর রহমান, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার এবং বেশ কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার নামও শোনা যাচ্ছে।
নতুন কমিশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
গত ৩ মার্চ চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনসহ কমিশনের তিন সদস্য পদত্যাগ করার পর থেকেই দুদক কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। আইনে কমিশনার পদ শূন্য হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নিয়োগের বাধ্যবাধকতা থাকলেও, বাস্তবে তা দীর্ঘায়িত হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক ফাইল আটকে আছে।
বর্তমানে নতুন মামলা অনুমোদন, চার্জশিট দাখিল, অনুসন্ধান ও তদন্তের মতো সংবেদনশীল সিদ্ধান্তগুলো স্থবির হয়ে আছে। ফলে নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই জমে থাকা মামলার ফাইল নিষ্পত্তি এবং দাপ্তরিক জট কাটানোই হবে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জনআস্থা ফেরানোর প্রত্যাশা
দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের এই স্থবিরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন:
"দুদকের নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিদের আনতে হবে, যারা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, পেশাগতভাবে দক্ষ এবং সৎ। তাদের ট্র্যাক রেকর্ড এমন হতে হবে যেন প্রমাণিত হয় যে, তারা যেকোনো রাজনৈতিক প্রভাব, স্বার্থের দ্বন্দ্ব কিংবা আমলাতান্ত্রিক চাপের ঊর্ধ্বে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি; নতুন কমিশন যদি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারে, তবে দুদকের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট আরও গভীর হবে।"
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, নতুন কমিশনকে আইনের চোখে সবাইকে সমানভাবে দেখার সাহস দেখাতে হবে। ব্যক্তির পরিচয় বা রাজনৈতিক পদমর্যাদা বড় না করে কেবল দুর্নীতির ঘটনাপ্রবাহকে গুরুত্ব দিলেই মানুষের আস্থা ও দুদকের ভাবমূর্তি রক্ষা করা সম্ভব হবে।
বিষয় : দুদক
2.png)
শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুলাই ২০২৬
দীর্ঘ তিন মাসের অপেক্ষার প্রহর ফুরোচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। চেয়ারম্যান ও কমিশনারশূন্য অবস্থায় স্থবির হয়ে পড়া এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি অবশেষে নতুন নেতৃত্ব পেতে যাচ্ছে। সার্চ কমিটির চূড়ান্ত তৎপরতায় এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা—আগামী সপ্তাহ বা তার পরের সপ্তাহের শুরুতেই নতুন কমিশনের মুখ দেখতে পারে দেশ।
বুধবার সার্চ কমিটির এক বৈঠকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে এবং একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা (শর্টলিস্ট) তৈরির কাজও বেশ এগিয়েছে। একই সঙ্গে নতুন কমিশনকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিচ্ছে দুদক। সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, আগামী সপ্তাহেই নতুন দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যোগ দেবেন এবং পুরনো জট ছাড়িয়ে দাপ্তরিক কার্যক্রমে গতি ফিরবে।
সার্চ কমিটির তৎপরতা ও আবেদন প্রক্রিয়া
দুদক আইন, ২০০৪-এর ৭ ধারা অনুযায়ী নতুন কমিশন গঠনের দায়িত্ব পেয়েছে পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি। আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হকের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিতে আরও রয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি রাজিক আল জলিল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি), মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব এবং সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান।
প্রক্রিয়াটিকে আরও স্বচ্ছ ও গতিশীল করতে আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করেছে কমিটি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, যারা ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ আবেদন জমা দিয়েছেন, তাদের নতুন করে আবেদনের প্রয়োজন নেই। নিয়ম অনুযায়ী, সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে ছয়জনের একটি নাম প্রস্তাব করবে, যাদের মধ্য থেকে তিনজনকে কমিশন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।
কারা আলোচনায়?
দুদক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এবার বিচার বিভাগ থেকে চেয়ারম্যান নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সার্চ কমিটির বিবেচনায় আছেন সাবেক বিচারপতি থেকে শুরু করে অভিজ্ঞ বিচারক ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
আলোচনায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—সাবেক বিচারপতি আসাদুজ্জামান, ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এর সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেন, সাবেক জেলা জজ রুহুল কুদ্দুস, সাবেক যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ড. আবুল হোসেন খন্দকার এবং অবসরপ্রাপ্ত সচিব আবদুস সবুর। এছাড়া সাবেক অতিরিক্ত সচিব তাহসিনুর রহমান, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার এবং বেশ কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার নামও শোনা যাচ্ছে।
নতুন কমিশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
গত ৩ মার্চ চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনসহ কমিশনের তিন সদস্য পদত্যাগ করার পর থেকেই দুদক কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। আইনে কমিশনার পদ শূন্য হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নিয়োগের বাধ্যবাধকতা থাকলেও, বাস্তবে তা দীর্ঘায়িত হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক ফাইল আটকে আছে।
বর্তমানে নতুন মামলা অনুমোদন, চার্জশিট দাখিল, অনুসন্ধান ও তদন্তের মতো সংবেদনশীল সিদ্ধান্তগুলো স্থবির হয়ে আছে। ফলে নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই জমে থাকা মামলার ফাইল নিষ্পত্তি এবং দাপ্তরিক জট কাটানোই হবে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জনআস্থা ফেরানোর প্রত্যাশা
দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের এই স্থবিরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন:
"দুদকের নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিদের আনতে হবে, যারা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, পেশাগতভাবে দক্ষ এবং সৎ। তাদের ট্র্যাক রেকর্ড এমন হতে হবে যেন প্রমাণিত হয় যে, তারা যেকোনো রাজনৈতিক প্রভাব, স্বার্থের দ্বন্দ্ব কিংবা আমলাতান্ত্রিক চাপের ঊর্ধ্বে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি; নতুন কমিশন যদি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারে, তবে দুদকের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট আরও গভীর হবে।"
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, নতুন কমিশনকে আইনের চোখে সবাইকে সমানভাবে দেখার সাহস দেখাতে হবে। ব্যক্তির পরিচয় বা রাজনৈতিক পদমর্যাদা বড় না করে কেবল দুর্নীতির ঘটনাপ্রবাহকে গুরুত্ব দিলেই মানুষের আস্থা ও দুদকের ভাবমূর্তি রক্ষা করা সম্ভব হবে।
2.png)