সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 আন্তর্জাতিকআন্তর্জাতিক

গাজা ইস্যুতে লেবার পার্টির ভরাডুবি, অস্তিত্ব সংকটে ব্রিটিশ রাজনীতি

গাজা যুদ্ধে ইসরাইলি আগ্রাসনে কিয়ার স্টারমারের সমর্থন ব্রিটিশ মুসলিমদের তীব্র ক্ষোভের মুখে ফেলেছে। ভোটব্যাঙ্কে ধস ও স্থানীয় নির্বাচনে শোচনীয় হারের জেরে এখন নতুন নেতৃত্বের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

গাজা ইস্যুতে লেবার পার্টির ভরাডুবি, অস্তিত্ব সংকটে ব্রিটিশ রাজনীতি
ছবি -সংগৃহীত

যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এক গভীর অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। ২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণা দলটির ভেতরে ও বাইরে দীর্ঘদিনের জমিয়ে রাখা রাজনৈতিক সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ। এই সংকটের মূলে রয়েছে গাজা ইস্যুতে লেবার পার্টির বিতর্কিত অবস্থান, যা দলটির দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মুসলিম ভোটারদের মনে গভীর ক্ষোভ ও অনাস্থার জন্ম দিয়েছে। একসময় যে মুসলিমপ্রধান এলাকাগুলোতে লেবার পার্টির জয় ছিল নিশ্চিত, সেখান থেকেই এখন বড় ধরনের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে।

সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। কিন্তু গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন শুরুর পর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা কিয়ার স্টারমার যখন মন্তব্য করলেন যে গাজাবাসীর বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ করার ‘অধিকার’ ইসরাইলের রয়েছে, তখনই যেন বাঁধ ভাঙল। মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল ওই মন্তব্য ব্রিটিশ মুসলিম ভোটারদের সরাসরি আঘাত করে। দলের ভেতর থেকেও ১৫০ জনের বেশি কাউন্সিলর যুদ্ধবিরতির দাবিতে নেতৃত্বকে বারবার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন নেতৃত্ব সেই কণ্ঠকে পাত্তাই দেয়নি।

যদিও ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টি সরকার গঠন করেছিল, তবে তা ছিল দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে কম ভোট শেয়ার নিয়ে গঠিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার। গাজা ইস্যুতে সৃষ্ট অসন্তোষের কারণে কয়েকটি আসনে লেবার পার্টিকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। বিশেষ করে ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারের ‘ডিউসবারি অ্যান্ড ব্যাটলি’ আসনে লেবার প্রার্থীর শোচনীয় পরাজয় এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ইকবাল মোহাম্মদের জয় ছিল এই ক্ষোভেরই বড় প্রমাণ। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও। কির্কিলস কাউন্সিলে লেবার পার্টি একটি আসনও ধরে রাখতে পারেনি; সেখানে ভোটাররা বিপুল ভোটে ফিলিস্তিনপন্থী স্বতন্ত্র ও গ্রিন পার্টির প্রার্থীদের বেছে নিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, জেরেমি করবিন বা এড মিলিব্যান্ডের আমলের সমাজতান্ত্রিক ও ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান থেকে সরে এসে কিয়ার স্টারমার যেভাবে দলকে অতি-ডানপন্থার দিকে টেনে নিয়েছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত লেবার পার্টির জন্য আত্মঘাতী প্রমাণিত হয়েছে। যদিও শেষের দিকে এসে স্টারমার প্রশাসন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। স্থানীয় ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করে, ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বর্ণবাদ ও দখলদারিত্বে লেবার পার্টি পরোক্ষ মদদ দিয়েছে।

ডিউসবারি অ্যান্ড ব্যাটলি আসনের স্বতন্ত্র এমপি ইকবাল মোহাম্মদের মতে, এই অঞ্চলের মানুষ যুক্তরাজ্যের প্রচলিত দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ভোটারদের এই আস্থার সংকট শুধু স্থানীয় নির্বাচন নয়, জাতীয় পর্যায়েও দলের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছে। এখন অ্যান্ডি বার্নামসহ দলের সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—দেশের মানুষের মনের ক্ষত সারিয়ে তোলা এবং নীতিতে আমূল পরিবর্তন এনে মুসলিম সমাজ তথা সাধারণ ভোটারদের হারানো বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করা।

বিষয় : ব্রিটিশ রাজনীতি কিয়ার স্টারমার

কাল মহাকাল

বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬


গাজা ইস্যুতে লেবার পার্টির ভরাডুবি, অস্তিত্ব সংকটে ব্রিটিশ রাজনীতি

প্রকাশের তারিখ : ০২ জুলাই ২০২৬

featured Image

যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এক গভীর অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। ২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণা দলটির ভেতরে ও বাইরে দীর্ঘদিনের জমিয়ে রাখা রাজনৈতিক সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ। এই সংকটের মূলে রয়েছে গাজা ইস্যুতে লেবার পার্টির বিতর্কিত অবস্থান, যা দলটির দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মুসলিম ভোটারদের মনে গভীর ক্ষোভ ও অনাস্থার জন্ম দিয়েছে। একসময় যে মুসলিমপ্রধান এলাকাগুলোতে লেবার পার্টির জয় ছিল নিশ্চিত, সেখান থেকেই এখন বড় ধরনের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে।

সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। কিন্তু গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন শুরুর পর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা কিয়ার স্টারমার যখন মন্তব্য করলেন যে গাজাবাসীর বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ করার ‘অধিকার’ ইসরাইলের রয়েছে, তখনই যেন বাঁধ ভাঙল। মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল ওই মন্তব্য ব্রিটিশ মুসলিম ভোটারদের সরাসরি আঘাত করে। দলের ভেতর থেকেও ১৫০ জনের বেশি কাউন্সিলর যুদ্ধবিরতির দাবিতে নেতৃত্বকে বারবার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন নেতৃত্ব সেই কণ্ঠকে পাত্তাই দেয়নি।

যদিও ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টি সরকার গঠন করেছিল, তবে তা ছিল দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে কম ভোট শেয়ার নিয়ে গঠিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার। গাজা ইস্যুতে সৃষ্ট অসন্তোষের কারণে কয়েকটি আসনে লেবার পার্টিকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। বিশেষ করে ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারের ‘ডিউসবারি অ্যান্ড ব্যাটলি’ আসনে লেবার প্রার্থীর শোচনীয় পরাজয় এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ইকবাল মোহাম্মদের জয় ছিল এই ক্ষোভেরই বড় প্রমাণ। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও। কির্কিলস কাউন্সিলে লেবার পার্টি একটি আসনও ধরে রাখতে পারেনি; সেখানে ভোটাররা বিপুল ভোটে ফিলিস্তিনপন্থী স্বতন্ত্র ও গ্রিন পার্টির প্রার্থীদের বেছে নিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, জেরেমি করবিন বা এড মিলিব্যান্ডের আমলের সমাজতান্ত্রিক ও ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান থেকে সরে এসে কিয়ার স্টারমার যেভাবে দলকে অতি-ডানপন্থার দিকে টেনে নিয়েছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত লেবার পার্টির জন্য আত্মঘাতী প্রমাণিত হয়েছে। যদিও শেষের দিকে এসে স্টারমার প্রশাসন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। স্থানীয় ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করে, ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বর্ণবাদ ও দখলদারিত্বে লেবার পার্টি পরোক্ষ মদদ দিয়েছে।

ডিউসবারি অ্যান্ড ব্যাটলি আসনের স্বতন্ত্র এমপি ইকবাল মোহাম্মদের মতে, এই অঞ্চলের মানুষ যুক্তরাজ্যের প্রচলিত দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ভোটারদের এই আস্থার সংকট শুধু স্থানীয় নির্বাচন নয়, জাতীয় পর্যায়েও দলের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছে। এখন অ্যান্ডি বার্নামসহ দলের সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—দেশের মানুষের মনের ক্ষত সারিয়ে তোলা এবং নীতিতে আমূল পরিবর্তন এনে মুসলিম সমাজ তথা সাধারণ ভোটারদের হারানো বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করা।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত