সংবাদ বিশ্লেষণসংবাদ বিশ্লেষণ

সংকটের সাময়িক স্বস্তি, সামনে কঠিন রাষ্ট্রপরীক্ষা

গ্যাস-বিদ্যুৎ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতা একই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে—বাংলাদেশকে এখন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা পেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় যেতে হবে।

সংকটের সাময়িক স্বস্তি, সামনে কঠিন রাষ্ট্রপরীক্ষা

সকালের আলোয় অনেক কিছু পরিষ্কার দেখা যায়। কোথাও স্বস্তি, কোথাও সংকট, আবার কোথাও এমন কিছু ফাটল চোখে পড়ে, যা অন্ধকারে বোঝা যায় না।

বাংলাদেশ এখন ঠিক এমন এক সময় পার করছে।

টানা প্রায় ২৫ দিনের গ্যাস-দুর্ভোগের পর মহেশখালীর দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বাড়ায় শিল্পাঞ্চলে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। কারখানার চুল্লি জ্বলেছে, মেশিন ঘুরেছে। সামিট পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরেছে, এক্সিলারেটও আংশিকভাবে সরবরাহ শুরু করেছে। জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৪২৫ মিলিয়ন ঘনফুটে উঠেছে।

স্বস্তির খবর অবশ্যই স্বস্তির। কিন্তু এটিকে সংকটের সমাধান ভাবার সুযোগ নেই।

কারণ দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। দেশীয় উৎপাদন কমছে। আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। দুটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে গেলে সরবরাহ নেমে গিয়েছিল ২ হাজার ৯৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত কতটা নড়বড়ে।

একটি শিল্প অর্থনীতি যদি দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর এত বেশি নির্ভরশীল হয়, তাহলে সমস্যাটিকে আর সাময়িক সরবরাহ সংকট বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এখানে প্রশ্ন জ্বালানি ব্যবস্থাপনার। প্রশ্ন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার। প্রশ্ন রাষ্ট্রের প্রস্তুতির।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদের নতুন অধিবেশনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ১০ বছরের পরিকল্পনা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এখন সেই পরিকল্পনাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

পরিকল্পনা কাগজে থাকলে হবে না। সেখানে গ্যাস অনুসন্ধান, দেশীয় উৎপাদন, এলএনজি আমদানির ঝুঁকি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা—সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।

আর একটি বক্তব্য এখানে রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অন্য কোনো রাজনৈতিক দল যদি সরকারের চেয়ে ভালো পরিকল্পনা দেয়, সরকার সেটি গ্রহণ করবে।

এই মানসিকতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রয়োজন।

বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো দলের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। গ্যাসের চুল্লিও দলীয় পরিচয় বোঝে না। শিল্পের শ্রমিকের বেতন, ব্যবসায়ীর উৎপাদন কিংবা সাধারণ মানুষের ঘরের বাতি—এসবের কাছে রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো মূল্য নেই। কাজেই ভালো পরিকল্পনা যে পক্ষ থেকেই আসুক, রাষ্ট্রের তা গ্রহণ করার সক্ষমতা থাকা উচিত।

রাজনীতির প্রতিযোগিতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা দেশের জন্য ভালো নীতির প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়।

কিন্তু জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি অর্থনীতির আরও কিছু সংকেত সতর্ক হওয়ার মতো।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বছরের প্রথম ছয় মাসে কমেছে। ইউরোপের সামগ্রিক পোশাক আমদানিও কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশের পতন অনেক প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বেশি।

এই খবরকে শুধু রপ্তানি কমার হিসাব হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

একটি পোশাকের অর্ডার কমলে তার প্রভাব কারখানায় পড়ে। কারখানায় উৎপাদন কমলে শ্রমিকের কাজের ওপর চাপ পড়ে। রপ্তানি কমলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে প্রভাব পড়ে। শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় শক্তি তৈরি পোশাক। তাই ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতা হারানোর কোনো লক্ষণ দেখা দিলে এখনই কারণ খুঁজতে হবে। উৎপাদন খরচ, জ্বালানি, ব্যাংক ঋণ, বন্দর, শ্রম উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, পণ্যের বৈচিত্র্য—সবকিছুকে নতুন করে দেখতে হবে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যাংকিং খাতের অস্বাভাবিক বাস্তবতা।

ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য চার লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অথচ ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগের জন্য সহজে ঋণ পাচ্ছেন না, কিংবা ঋণ নেওয়ার আগ্রহ হারাচ্ছেন। একই সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়ে ২০২৫ সালের শেষে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি টাকায় পৌঁছানোর কথা সংসদে জানানো হয়েছে।

অর্থনীতির জন্য এর চেয়ে অস্বস্তিকর ছবি আর কী হতে পারে?

ব্যাংকে টাকা আছে। কিন্তু সেই টাকা উৎপাদনে যাচ্ছে না।

কারখানায় নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। উদ্যোক্তা ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। ব্যাংক ঋণ দিতে ভয় পাচ্ছে। খেলাপি ঋণের বোঝা ব্যাংকের সক্ষমতা কমাচ্ছে।

ফলে অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে।

এখানে শুধু সুদের হার কমানো বা তারল্য বাড়ানোর মতো প্রচলিত ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঋণ যাচাই এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংস্কৃতি থেকে বের করতে হবে। ভালো উদ্যোক্তা যেন ঋণ পান, আবার ঋণ নিয়ে টাকা ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতিও যেন কোনোভাবেই প্রশ্রয় না পায়—দুটিই নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে দেশের সীমান্ত ও বিমানবন্দর ঘিরে স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনাও রাষ্ট্রের আরেকটি দুর্বল দিক সামনে আনছে।

জুলাইয়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৮ কেজির বেশি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। কখনো অন্তর্বাসে, কখনো ফলের বাক্সে, কখনো ব্যাগের গোপন কুঠুরিতে করে স্বর্ণ আসছে।

কিন্তু বাহক ধরা পড়লেই চোরাচালান বন্ধ হয় না।

আসল প্রশ্ন হচ্ছে, এই স্বর্ণ কার? টাকা কোথা থেকে আসছে? কারা এর পেছনে আছে? বিমানবন্দর, সীমান্ত, পরিবহন ও আর্থিক লেনদেনের কোন কোন স্তরে এই নেটওয়ার্ক কাজ করছে?

চোরাচালানকে শুধু কাস্টমস বা পুলিশের মামলা হিসেবে দেখলে মূল সমস্যাটি ধরা পড়বে না। এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা, কর ফাঁকি, দুর্নীতি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের সম্পর্ক রয়েছে। তাই চোরাচালান বন্ধ করতে হলে বাহক নয়, পুরো অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ককে লক্ষ্য করতে হবে।

রাজনীতিতেও পরিবর্তনের আলোচনা চলছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার পর বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো এবং সরকারে বিভিন্ন দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের আলোচনা সামনে এসেছে। দলের স্থায়ী কমিটিতে নতুন মুখ, মহাসচিব পদে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং মন্ত্রিসভায় সীমিত পরিবর্তন নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

এ ধরনের পরিবর্তনের গুরুত্ব দলীয় রাজনীতির সীমানায় আটকে থাকে না।

সরকার ও দলের সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে, প্রশাসনের গতি কতটা বাড়বে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর হবে—এসবের ওপর রাষ্ট্র পরিচালনার মান নির্ভর করে।

নেতৃত্বের পরিবর্তন তাই পদবদলের হিসাবেই শেষ হওয়া উচিত নয়। জনগণ দেখতে চায়, পরিবর্তনের ফলে সেবা কতটা বাড়ল, সিদ্ধান্ত কতটা দ্রুত হলো এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা শক্তিশালী হলো।

এর মধ্যেই বাংলাদেশের জন্য আরও বড় বাস্তবতা তৈরি করছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ তৈরি করছে। ১৪ আগস্ট ওই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় খুব কম জাহাজ চলাচল করেছে। যুক্তরাষ্ট্র চাপ বাড়াচ্ছে, ইরানও জানিয়ে দিচ্ছে—জলপথটির নিয়ন্ত্রণ সহজে ছাড়বে না।

এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশে পড়তে পারে।

আমরা জ্বালানি আমদানি করি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ে। শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচও বাড়ে।

অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের একটি সংকট ঢাকার কারখানা থেকে শুরু করে গ্রামের বাজার পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে।

খার্গ দ্বীপে আবার অপরিশোধিত তেল ট্যাংকারে তোলার ঘটনাটি অবশ্য দেখাচ্ছে, যুদ্ধ বা অবরোধের মধ্যেও জ্বালানি সরবরাহের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না। শুক্রবার একটি ইরানি সুপারট্যাংকারে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল তোলা হয়েছে বলে ট্যাংকার ট্র্যাকিং তথ্য থেকে জানা গেছে।

কিন্তু বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা যত বাড়বে, আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ঝুঁকিও তত বাড়বে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবেশগত বিপদ। উপসাগরীয় অঞ্চলে দুটি বড় তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। একটি দূষণ ইরানের কেশম দ্বীপের উপকূলে পৌঁছেছে, আরেকটি ওমানের কাছে ছড়িয়ে পড়েছে।

যুদ্ধের সময় হিসাব করা হয় কত মানুষ মারা গেল, কত জাহাজ ডুবল, কত ডলার খরচ হলো। সমুদ্রের ক্ষতি, মাছের ক্ষতি, উপকূলীয় মানুষের জীবিকার ক্ষতি অনেক সময় সেই হিসাবের বাইরে থেকে যায়।

কিন্তু প্রকৃতির ক্ষতির হিসাব পরে দিতে হয়।

এই পুরো চিত্রের মধ্যে শিক্ষাকে বাদ দিলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে পুরোনো শিক্ষাব্যবস্থাকে সামান্য পরিবর্তন করে ভবিষ্যতের নাগরিক তৈরি করা যাবে না। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে শেখাতে হবে। তথ্য খুঁজে পাওয়ার পাশাপাশি তথ্য যাচাই করতে শেখাতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।

আজ যে শিশু স্কুলে যাচ্ছে, তার কর্মজীবনে এমন অনেক পেশা তৈরি হবে, যেগুলোর অস্তিত্ব আজ নেই।

তাই তাকে শুধু আজকের চাকরির পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করলে চলবে না। তাকে পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে।

এআই মানুষের শিক্ষককে সরিয়ে দেবে কি না—এই বিতর্কের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, শিক্ষক এআইকে কতটা কাজে লাগাতে পারবেন। একজন শিক্ষার্থী এআই ব্যবহার করে কতটা ভালোভাবে চিন্তা, গবেষণা ও সমস্যা সমাধান করতে পারবে, সেটিই ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় বড় হয়ে উঠবে।

জ্বালানি, ব্যাংক, পোশাক, চোরাচালান, রাজনীতি, শিক্ষা—খবরগুলো আলাদা। কিন্তু সমস্যার গভীরে গেলে একটি জায়গায় এসে তারা মিলিত হয়।

সেটি হলো রাষ্ট্রের সক্ষমতা।

আমাদের জ্বালানি পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি হতে হবে। ব্যাংককে উৎপাদনমুখী করতে হবে। রপ্তানিকে নতুন বাজার ও নতুন পণ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। চোরাচালানের পুরো নেটওয়ার্ক ভাঙতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে আরও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। আর শিক্ষাকে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

আজকের গ্যাস সংকট সাময়িকভাবে কমেছে। কিন্তু আগামী শীতে কী হবে? আগামী পাঁচ বছর পর শিল্পের জ্বালানি চাহিদা কত হবে? দেশীয় গ্যাস কতটা পাওয়া যাবে? এলএনজির দাম কত হবে? বিশ্ববাজারে নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু হলে আমাদের প্রস্তুতি কী?

এসব প্রশ্নের উত্তর আজ থেকেই তৈরি করতে হবে।

কারণ সংকট যখন দরজায় এসে দাঁড়ায়, তখন পরিকল্পনা করার সময় থাকে না।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো তাৎক্ষণিক সংকট সামলানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা তৈরি করা। সরকার ভালো পরিকল্পনা নিলে রাজনৈতিক বিরোধীরা তা সমর্থন করুক। বিরোধীরা ভালো পরিকল্পনা দিলে সরকার সেটি গ্রহণ করুক। অর্থনীতিতে প্রয়োজন হলে কঠিন সংস্কার হোক। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরুক। শিক্ষা বদলাক। জ্বালানি অনুসন্ধান বাড়ুক।

রাজনীতির শেষ সাফল্য ক্ষমতার মেয়াদ দিয়ে মাপা যায় না। মাপতে হয় মানুষের জীবনে পরিবর্তন দিয়ে।

কারখানা চলছে কি না, বিদ্যুৎ আছে কি না, গ্যাস আছে কি না, চাকরি তৈরি হচ্ছে কি না, ব্যাংক উদ্যোক্তার পাশে দাঁড়াচ্ছে কি না, সন্তান ভালো শিক্ষা পাচ্ছে কি না—মানুষের কাছে রাষ্ট্রের মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত এসব প্রশ্নেই।

সাময়িক স্বস্তি তাই ধরে রাখতে হবে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতায়।

আজ গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। কাল হয়তো আরেকটি সংকট সামনে আসবে। রাষ্ট্রের কাজ প্রতিবার সংকটের পর আগুন নেভানো নয়। এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে আগুন বারবার লাগার সুযোগ না পায়।

বাংলাদেশের সামনে সেই কাজটাই এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।

বিষয় : জ্বালানি সংকট

কাল মহাকাল

রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬


সংকটের সাময়িক স্বস্তি, সামনে কঠিন রাষ্ট্রপরীক্ষা

প্রকাশের তারিখ : ১৬ আগস্ট ২০২৬

featured Image

সকালের আলোয় অনেক কিছু পরিষ্কার দেখা যায়। কোথাও স্বস্তি, কোথাও সংকট, আবার কোথাও এমন কিছু ফাটল চোখে পড়ে, যা অন্ধকারে বোঝা যায় না।

বাংলাদেশ এখন ঠিক এমন এক সময় পার করছে।

টানা প্রায় ২৫ দিনের গ্যাস-দুর্ভোগের পর মহেশখালীর দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বাড়ায় শিল্পাঞ্চলে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। কারখানার চুল্লি জ্বলেছে, মেশিন ঘুরেছে। সামিট পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরেছে, এক্সিলারেটও আংশিকভাবে সরবরাহ শুরু করেছে। জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৪২৫ মিলিয়ন ঘনফুটে উঠেছে।

স্বস্তির খবর অবশ্যই স্বস্তির। কিন্তু এটিকে সংকটের সমাধান ভাবার সুযোগ নেই।

কারণ দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। দেশীয় উৎপাদন কমছে। আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। দুটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে গেলে সরবরাহ নেমে গিয়েছিল ২ হাজার ৯৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত কতটা নড়বড়ে।

একটি শিল্প অর্থনীতি যদি দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর এত বেশি নির্ভরশীল হয়, তাহলে সমস্যাটিকে আর সাময়িক সরবরাহ সংকট বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এখানে প্রশ্ন জ্বালানি ব্যবস্থাপনার। প্রশ্ন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার। প্রশ্ন রাষ্ট্রের প্রস্তুতির।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদের নতুন অধিবেশনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ১০ বছরের পরিকল্পনা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এখন সেই পরিকল্পনাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

পরিকল্পনা কাগজে থাকলে হবে না। সেখানে গ্যাস অনুসন্ধান, দেশীয় উৎপাদন, এলএনজি আমদানির ঝুঁকি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা—সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।

আর একটি বক্তব্য এখানে রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অন্য কোনো রাজনৈতিক দল যদি সরকারের চেয়ে ভালো পরিকল্পনা দেয়, সরকার সেটি গ্রহণ করবে।

এই মানসিকতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রয়োজন।

বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো দলের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। গ্যাসের চুল্লিও দলীয় পরিচয় বোঝে না। শিল্পের শ্রমিকের বেতন, ব্যবসায়ীর উৎপাদন কিংবা সাধারণ মানুষের ঘরের বাতি—এসবের কাছে রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো মূল্য নেই। কাজেই ভালো পরিকল্পনা যে পক্ষ থেকেই আসুক, রাষ্ট্রের তা গ্রহণ করার সক্ষমতা থাকা উচিত।

রাজনীতির প্রতিযোগিতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা দেশের জন্য ভালো নীতির প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়।

কিন্তু জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি অর্থনীতির আরও কিছু সংকেত সতর্ক হওয়ার মতো।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বছরের প্রথম ছয় মাসে কমেছে। ইউরোপের সামগ্রিক পোশাক আমদানিও কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশের পতন অনেক প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বেশি।

এই খবরকে শুধু রপ্তানি কমার হিসাব হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

একটি পোশাকের অর্ডার কমলে তার প্রভাব কারখানায় পড়ে। কারখানায় উৎপাদন কমলে শ্রমিকের কাজের ওপর চাপ পড়ে। রপ্তানি কমলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে প্রভাব পড়ে। শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় শক্তি তৈরি পোশাক। তাই ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতা হারানোর কোনো লক্ষণ দেখা দিলে এখনই কারণ খুঁজতে হবে। উৎপাদন খরচ, জ্বালানি, ব্যাংক ঋণ, বন্দর, শ্রম উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, পণ্যের বৈচিত্র্য—সবকিছুকে নতুন করে দেখতে হবে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যাংকিং খাতের অস্বাভাবিক বাস্তবতা।

ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য চার লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অথচ ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগের জন্য সহজে ঋণ পাচ্ছেন না, কিংবা ঋণ নেওয়ার আগ্রহ হারাচ্ছেন। একই সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়ে ২০২৫ সালের শেষে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি টাকায় পৌঁছানোর কথা সংসদে জানানো হয়েছে।

অর্থনীতির জন্য এর চেয়ে অস্বস্তিকর ছবি আর কী হতে পারে?

ব্যাংকে টাকা আছে। কিন্তু সেই টাকা উৎপাদনে যাচ্ছে না।

কারখানায় নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। উদ্যোক্তা ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। ব্যাংক ঋণ দিতে ভয় পাচ্ছে। খেলাপি ঋণের বোঝা ব্যাংকের সক্ষমতা কমাচ্ছে।

ফলে অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে।

এখানে শুধু সুদের হার কমানো বা তারল্য বাড়ানোর মতো প্রচলিত ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঋণ যাচাই এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংস্কৃতি থেকে বের করতে হবে। ভালো উদ্যোক্তা যেন ঋণ পান, আবার ঋণ নিয়ে টাকা ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতিও যেন কোনোভাবেই প্রশ্রয় না পায়—দুটিই নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে দেশের সীমান্ত ও বিমানবন্দর ঘিরে স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনাও রাষ্ট্রের আরেকটি দুর্বল দিক সামনে আনছে।

জুলাইয়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৮ কেজির বেশি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। কখনো অন্তর্বাসে, কখনো ফলের বাক্সে, কখনো ব্যাগের গোপন কুঠুরিতে করে স্বর্ণ আসছে।

কিন্তু বাহক ধরা পড়লেই চোরাচালান বন্ধ হয় না।

আসল প্রশ্ন হচ্ছে, এই স্বর্ণ কার? টাকা কোথা থেকে আসছে? কারা এর পেছনে আছে? বিমানবন্দর, সীমান্ত, পরিবহন ও আর্থিক লেনদেনের কোন কোন স্তরে এই নেটওয়ার্ক কাজ করছে?

চোরাচালানকে শুধু কাস্টমস বা পুলিশের মামলা হিসেবে দেখলে মূল সমস্যাটি ধরা পড়বে না। এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা, কর ফাঁকি, দুর্নীতি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের সম্পর্ক রয়েছে। তাই চোরাচালান বন্ধ করতে হলে বাহক নয়, পুরো অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ককে লক্ষ্য করতে হবে।

রাজনীতিতেও পরিবর্তনের আলোচনা চলছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার পর বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো এবং সরকারে বিভিন্ন দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের আলোচনা সামনে এসেছে। দলের স্থায়ী কমিটিতে নতুন মুখ, মহাসচিব পদে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং মন্ত্রিসভায় সীমিত পরিবর্তন নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

এ ধরনের পরিবর্তনের গুরুত্ব দলীয় রাজনীতির সীমানায় আটকে থাকে না।

সরকার ও দলের সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে, প্রশাসনের গতি কতটা বাড়বে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর হবে—এসবের ওপর রাষ্ট্র পরিচালনার মান নির্ভর করে।

নেতৃত্বের পরিবর্তন তাই পদবদলের হিসাবেই শেষ হওয়া উচিত নয়। জনগণ দেখতে চায়, পরিবর্তনের ফলে সেবা কতটা বাড়ল, সিদ্ধান্ত কতটা দ্রুত হলো এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা শক্তিশালী হলো।

এর মধ্যেই বাংলাদেশের জন্য আরও বড় বাস্তবতা তৈরি করছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ তৈরি করছে। ১৪ আগস্ট ওই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় খুব কম জাহাজ চলাচল করেছে। যুক্তরাষ্ট্র চাপ বাড়াচ্ছে, ইরানও জানিয়ে দিচ্ছে—জলপথটির নিয়ন্ত্রণ সহজে ছাড়বে না।

এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশে পড়তে পারে।

আমরা জ্বালানি আমদানি করি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ে। শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচও বাড়ে।

অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের একটি সংকট ঢাকার কারখানা থেকে শুরু করে গ্রামের বাজার পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে।

খার্গ দ্বীপে আবার অপরিশোধিত তেল ট্যাংকারে তোলার ঘটনাটি অবশ্য দেখাচ্ছে, যুদ্ধ বা অবরোধের মধ্যেও জ্বালানি সরবরাহের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না। শুক্রবার একটি ইরানি সুপারট্যাংকারে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল তোলা হয়েছে বলে ট্যাংকার ট্র্যাকিং তথ্য থেকে জানা গেছে।

কিন্তু বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা যত বাড়বে, আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ঝুঁকিও তত বাড়বে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবেশগত বিপদ। উপসাগরীয় অঞ্চলে দুটি বড় তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। একটি দূষণ ইরানের কেশম দ্বীপের উপকূলে পৌঁছেছে, আরেকটি ওমানের কাছে ছড়িয়ে পড়েছে।

যুদ্ধের সময় হিসাব করা হয় কত মানুষ মারা গেল, কত জাহাজ ডুবল, কত ডলার খরচ হলো। সমুদ্রের ক্ষতি, মাছের ক্ষতি, উপকূলীয় মানুষের জীবিকার ক্ষতি অনেক সময় সেই হিসাবের বাইরে থেকে যায়।

কিন্তু প্রকৃতির ক্ষতির হিসাব পরে দিতে হয়।

এই পুরো চিত্রের মধ্যে শিক্ষাকে বাদ দিলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে পুরোনো শিক্ষাব্যবস্থাকে সামান্য পরিবর্তন করে ভবিষ্যতের নাগরিক তৈরি করা যাবে না। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে শেখাতে হবে। তথ্য খুঁজে পাওয়ার পাশাপাশি তথ্য যাচাই করতে শেখাতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।

আজ যে শিশু স্কুলে যাচ্ছে, তার কর্মজীবনে এমন অনেক পেশা তৈরি হবে, যেগুলোর অস্তিত্ব আজ নেই।

তাই তাকে শুধু আজকের চাকরির পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করলে চলবে না। তাকে পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে।

এআই মানুষের শিক্ষককে সরিয়ে দেবে কি না—এই বিতর্কের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, শিক্ষক এআইকে কতটা কাজে লাগাতে পারবেন। একজন শিক্ষার্থী এআই ব্যবহার করে কতটা ভালোভাবে চিন্তা, গবেষণা ও সমস্যা সমাধান করতে পারবে, সেটিই ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় বড় হয়ে উঠবে।

জ্বালানি, ব্যাংক, পোশাক, চোরাচালান, রাজনীতি, শিক্ষা—খবরগুলো আলাদা। কিন্তু সমস্যার গভীরে গেলে একটি জায়গায় এসে তারা মিলিত হয়।

সেটি হলো রাষ্ট্রের সক্ষমতা।

আমাদের জ্বালানি পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি হতে হবে। ব্যাংককে উৎপাদনমুখী করতে হবে। রপ্তানিকে নতুন বাজার ও নতুন পণ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। চোরাচালানের পুরো নেটওয়ার্ক ভাঙতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে আরও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। আর শিক্ষাকে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

আজকের গ্যাস সংকট সাময়িকভাবে কমেছে। কিন্তু আগামী শীতে কী হবে? আগামী পাঁচ বছর পর শিল্পের জ্বালানি চাহিদা কত হবে? দেশীয় গ্যাস কতটা পাওয়া যাবে? এলএনজির দাম কত হবে? বিশ্ববাজারে নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু হলে আমাদের প্রস্তুতি কী?

এসব প্রশ্নের উত্তর আজ থেকেই তৈরি করতে হবে।

কারণ সংকট যখন দরজায় এসে দাঁড়ায়, তখন পরিকল্পনা করার সময় থাকে না।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো তাৎক্ষণিক সংকট সামলানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা তৈরি করা। সরকার ভালো পরিকল্পনা নিলে রাজনৈতিক বিরোধীরা তা সমর্থন করুক। বিরোধীরা ভালো পরিকল্পনা দিলে সরকার সেটি গ্রহণ করুক। অর্থনীতিতে প্রয়োজন হলে কঠিন সংস্কার হোক। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরুক। শিক্ষা বদলাক। জ্বালানি অনুসন্ধান বাড়ুক।

রাজনীতির শেষ সাফল্য ক্ষমতার মেয়াদ দিয়ে মাপা যায় না। মাপতে হয় মানুষের জীবনে পরিবর্তন দিয়ে।

কারখানা চলছে কি না, বিদ্যুৎ আছে কি না, গ্যাস আছে কি না, চাকরি তৈরি হচ্ছে কি না, ব্যাংক উদ্যোক্তার পাশে দাঁড়াচ্ছে কি না, সন্তান ভালো শিক্ষা পাচ্ছে কি না—মানুষের কাছে রাষ্ট্রের মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত এসব প্রশ্নেই।

সাময়িক স্বস্তি তাই ধরে রাখতে হবে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতায়।

আজ গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। কাল হয়তো আরেকটি সংকট সামনে আসবে। রাষ্ট্রের কাজ প্রতিবার সংকটের পর আগুন নেভানো নয়। এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে আগুন বারবার লাগার সুযোগ না পায়।

বাংলাদেশের সামনে সেই কাজটাই এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  মোঃ ফখরুল ইসলাম রাজীব 

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত