ইসলাম ও জীবন
হাতে অগাধ অর্থ, দামী গাড়ি, চাকচিক্য—তবুও এক অদ্ভুত হাহাকার; যেন আরও চাই, আরও পাওয়ার নেশায় মত্ত। আবার অন্যদিকে এমন একজন মানুষ, যার সম্বল বলতে কিছুই নেই, অথচ মুখের অমলিন হাসিতে এক গভীর প্রশান্তি। এই দুই জীবনের বৈপরীত্য আমাদের শেখায়, সম্পদ আর ঐশ্বর্য সব সময় সমার্থক নয়। আমরা সচরাচর যা বুঝে থাকি, তার চেয়েও গভীর কিছু লুকিয়ে আছে প্রকৃত ধনী হওয়ার সংজ্ঞায়।
টাকাপয়সা আর জমিজিরাতের পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেক সময় আমরা হালাল-হারামের সীমারেখাও ভুলে যাই। এই অন্ধ দৌড় কেবল চরিত্রকেই কলুষিত করে না, পরিবার ও প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের বুননকেও আলগা করে দেয়। অথচ যে সম্পদের জন্য এত হাহাকার, তা শেষ পর্যন্ত নিছক ইট-কাঠ কিংবা কাগজের দলিলেই বন্দী থেকে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই অমোঘ সত্যটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। সহিহ বুখারির (হাদিস ৬৪৪৬) ভাষ্যমতে, ‘বৈষয়িক প্রাচুর্য ঐশ্বর্য নয়, বরং প্রকৃত ঐশ্বর্য হলো অন্তরের সচ্ছলতা।’ অর্থাৎ, যার অন্তরে তৃপ্তি নেই, কোটি টাকার মালিক হয়েও সে আসলে দরিদ্র। আর যার অন্তরে তৃপ্তি আছে, তার হাতে কিছু না থাকলেও সে-ই পৃথিবীর প্রকৃত ধনী।
সাহাবি আবু জর (রা.)-এর সঙ্গে নবীজির (সা.) একটি কথোপকথন এ বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে দেয়। একদিন নবীজি (সা.) তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, সম্পদ বেশি হওয়াটাই কি ঐশ্বর্য আর কম হওয়াটাই কি দারিদ্র্য? আবু জর (রা.) সরল স্বীকারোক্তিতে ‘হ্যাঁ’ বলেছিলেন। তখন নবীজি (সা.) তাঁকে শুধরে দিয়ে বলেন, ‘অন্তরের অভাবমুক্তিই প্রকৃত ঐশ্বর্য, আর মনের দারিদ্র্যই প্রকৃত দারিদ্র্য।’
নবীজি (সা.) এরপর দুজন মানুষের উদাহরণ দেন। একজন কোরাইশের প্রভাবশালী ধনী ব্যক্তি, যাকে সবাই সমাদর করে। অন্যজন ‘সুফফা’য় থাকা এক অপরিচিত, দরিদ্র মানুষ। নবীজি (সা.) বলেন, ‘এই দরিদ্র মানুষটি সেই ধনী লোকটির চেয়ে উত্তম—এমনকি পৃথিবীর সব মানুষের চেয়েও।’ অবাক হয়ে আবু জর (রা.) প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কিন্তু ধনী লোকটিকে তো অনেক কিছু দেওয়া হয়েছে, আর এই মানুষটিকে কিছুই দেওয়া হয়নি!’ এর উত্তরে নবীজি (সা.) বলেছিলেন, ‘যদি তাকে ধনসম্পদ দেওয়া হয়, সে তার যোগ্য; আর যদি না দেওয়া হয়, তাকে তার চেয়েও বড় কিছু দেওয়া হয়েছে।’ (নাসায়ি, হাদিস ১১৭৮৫)
এই হাদিসের শিক্ষা হলো—সম্পদ থাকা বা না থাকা দুটোই আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের পরীক্ষা। এখানে সম্পদকে দোষারোপ করা হয়নি, বরং আসল মাপকাঠি হিসেবে মানুষের অন্তরের অবস্থাকে তুলে ধরা হয়েছে। ইসলাম কখনোই সম্পদ অর্জনকে নিরুৎসাহিত করেনি। ওসমান ইবনে আফফান (রা.) বা আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)-এর মতো সাহাবিরা বিপুল সম্পদের মালিক ছিলেন, যা তাঁদের দানশীলতার পথ প্রশস্ত করেছিল। পার্থক্যটা ছিল এখানেই—তাঁরা সম্পদের মালিক ছিলেন, কিন্তু সম্পদ তাঁদের মালিক হয়ে উঠতে পারেনি।
অন্তরের এই সচ্ছলতা বা প্রশান্তি অর্জনের পথ একটাই—আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা। সুনানে তিরমিজির (হাদিস ২৩০৫) একটি হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমার জন্য যা বণ্টন করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকো। তাহলে তুমিই হবে মানুষের মধ্যে সর্বাধিক ঐশ্বর্যশালী।’
এই সন্তুষ্টির অর্থ জীবন থেকে চেষ্টা-তদ্বির ছেড়ে দেওয়া নয়। এর মানে হলো, নিজের প্রাপ্য অর্জনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা, কিন্তু ফলাফলের জন্য অস্থির না হওয়া। অন্যের সাফল্য দেখে নিজেকে ছোট মনে না করা। ছোট ছোট অভ্যাসেই এই মানসিকতা গড়ে ওঠে। নিজের চেয়ে কম যাদের আছে, তাদের দিকে তাকালে শুকরিয়া আদায় করা সহজ হয়। যখনই আমরা বিশ্বাস করব যে আল্লাহই প্রকৃত দাতা এবং তাঁর বণ্টনই সর্বোত্তম, তখনই হাতে যা-ই থাকুক না কেন, মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
বিষয় : সীমিত সম্পদ প্রকৃত ধনী
2.png)
শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুলাই ২০২৬
হাতে অগাধ অর্থ, দামী গাড়ি, চাকচিক্য—তবুও এক অদ্ভুত হাহাকার; যেন আরও চাই, আরও পাওয়ার নেশায় মত্ত। আবার অন্যদিকে এমন একজন মানুষ, যার সম্বল বলতে কিছুই নেই, অথচ মুখের অমলিন হাসিতে এক গভীর প্রশান্তি। এই দুই জীবনের বৈপরীত্য আমাদের শেখায়, সম্পদ আর ঐশ্বর্য সব সময় সমার্থক নয়। আমরা সচরাচর যা বুঝে থাকি, তার চেয়েও গভীর কিছু লুকিয়ে আছে প্রকৃত ধনী হওয়ার সংজ্ঞায়।
টাকাপয়সা আর জমিজিরাতের পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেক সময় আমরা হালাল-হারামের সীমারেখাও ভুলে যাই। এই অন্ধ দৌড় কেবল চরিত্রকেই কলুষিত করে না, পরিবার ও প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের বুননকেও আলগা করে দেয়। অথচ যে সম্পদের জন্য এত হাহাকার, তা শেষ পর্যন্ত নিছক ইট-কাঠ কিংবা কাগজের দলিলেই বন্দী থেকে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই অমোঘ সত্যটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। সহিহ বুখারির (হাদিস ৬৪৪৬) ভাষ্যমতে, ‘বৈষয়িক প্রাচুর্য ঐশ্বর্য নয়, বরং প্রকৃত ঐশ্বর্য হলো অন্তরের সচ্ছলতা।’ অর্থাৎ, যার অন্তরে তৃপ্তি নেই, কোটি টাকার মালিক হয়েও সে আসলে দরিদ্র। আর যার অন্তরে তৃপ্তি আছে, তার হাতে কিছু না থাকলেও সে-ই পৃথিবীর প্রকৃত ধনী।
সাহাবি আবু জর (রা.)-এর সঙ্গে নবীজির (সা.) একটি কথোপকথন এ বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে দেয়। একদিন নবীজি (সা.) তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, সম্পদ বেশি হওয়াটাই কি ঐশ্বর্য আর কম হওয়াটাই কি দারিদ্র্য? আবু জর (রা.) সরল স্বীকারোক্তিতে ‘হ্যাঁ’ বলেছিলেন। তখন নবীজি (সা.) তাঁকে শুধরে দিয়ে বলেন, ‘অন্তরের অভাবমুক্তিই প্রকৃত ঐশ্বর্য, আর মনের দারিদ্র্যই প্রকৃত দারিদ্র্য।’
নবীজি (সা.) এরপর দুজন মানুষের উদাহরণ দেন। একজন কোরাইশের প্রভাবশালী ধনী ব্যক্তি, যাকে সবাই সমাদর করে। অন্যজন ‘সুফফা’য় থাকা এক অপরিচিত, দরিদ্র মানুষ। নবীজি (সা.) বলেন, ‘এই দরিদ্র মানুষটি সেই ধনী লোকটির চেয়ে উত্তম—এমনকি পৃথিবীর সব মানুষের চেয়েও।’ অবাক হয়ে আবু জর (রা.) প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কিন্তু ধনী লোকটিকে তো অনেক কিছু দেওয়া হয়েছে, আর এই মানুষটিকে কিছুই দেওয়া হয়নি!’ এর উত্তরে নবীজি (সা.) বলেছিলেন, ‘যদি তাকে ধনসম্পদ দেওয়া হয়, সে তার যোগ্য; আর যদি না দেওয়া হয়, তাকে তার চেয়েও বড় কিছু দেওয়া হয়েছে।’ (নাসায়ি, হাদিস ১১৭৮৫)
এই হাদিসের শিক্ষা হলো—সম্পদ থাকা বা না থাকা দুটোই আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের পরীক্ষা। এখানে সম্পদকে দোষারোপ করা হয়নি, বরং আসল মাপকাঠি হিসেবে মানুষের অন্তরের অবস্থাকে তুলে ধরা হয়েছে। ইসলাম কখনোই সম্পদ অর্জনকে নিরুৎসাহিত করেনি। ওসমান ইবনে আফফান (রা.) বা আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)-এর মতো সাহাবিরা বিপুল সম্পদের মালিক ছিলেন, যা তাঁদের দানশীলতার পথ প্রশস্ত করেছিল। পার্থক্যটা ছিল এখানেই—তাঁরা সম্পদের মালিক ছিলেন, কিন্তু সম্পদ তাঁদের মালিক হয়ে উঠতে পারেনি।
অন্তরের এই সচ্ছলতা বা প্রশান্তি অর্জনের পথ একটাই—আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা। সুনানে তিরমিজির (হাদিস ২৩০৫) একটি হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমার জন্য যা বণ্টন করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকো। তাহলে তুমিই হবে মানুষের মধ্যে সর্বাধিক ঐশ্বর্যশালী।’
এই সন্তুষ্টির অর্থ জীবন থেকে চেষ্টা-তদ্বির ছেড়ে দেওয়া নয়। এর মানে হলো, নিজের প্রাপ্য অর্জনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা, কিন্তু ফলাফলের জন্য অস্থির না হওয়া। অন্যের সাফল্য দেখে নিজেকে ছোট মনে না করা। ছোট ছোট অভ্যাসেই এই মানসিকতা গড়ে ওঠে। নিজের চেয়ে কম যাদের আছে, তাদের দিকে তাকালে শুকরিয়া আদায় করা সহজ হয়। যখনই আমরা বিশ্বাস করব যে আল্লাহই প্রকৃত দাতা এবং তাঁর বণ্টনই সর্বোত্তম, তখনই হাতে যা-ই থাকুক না কেন, মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
2.png)