সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা

স্তন ক্যানসার রুখবে এমআরএনএ টিকা! নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেন ইরানের গবেষকরা

উন্নত কম্পিউটার প্রযুক্তির সাহায্যে যৌথ গবেষণা; টিউমারের বৃদ্ধি ও ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখার আশা, তবে ট্রায়াল এখনো বাকি।

স্তন ক্যানসার রুখবে এমআরএনএ টিকা! নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেন ইরানের গবেষকরা
ছবি -সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে নারীদের জন্য অন্যতম প্রধান আতঙ্ক স্তন ক্যানসার বা ব্রেস্ট ক্যানসার প্রতিরোধে এক যুগান্তকারী আশার আলো দেখিয়েছেন ইরানের একদল গবেষক। উন্নত কম্পিউটারভিত্তিক (ইন-সিলিকো) প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় সম্ভাব্য একটি নতুন এমআরএনএ (mRNA) টিকার সফল নকশা (ডিজাইন) তৈরি করেছেন তাঁরা। গবেষকদের আশা, এই টিকা ভবিষ্যতে মানবদেহে স্তন ক্যানসারের টিউমার বৃদ্ধি এবং তা শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়া (মেটাস্ট্যাসিস) সম্পূর্ণ রোধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

ইরানের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি চিকিৎসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে তেহরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেস, সেমনান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেস, রাজি ভ্যাকসিন অ্যান্ড সিরাম রিসার্চ ইনস্টিটিউট, পাস্তুর ইনস্টিটিউট অব ইরান এবং মোতামেদ ক্যান্সার ইনস্টিটিউট। তাঁদের এই সম্মিলিত গবেষণার ফল চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের দারুণভাবে আশাবাদী করে তুলেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ৬ লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্বের অন্তত ১৫৭টি দেশে নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া ক্যানসার এটি। বর্তমানে কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপির মতো প্রচলিত ও সনাতন চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো ক্যানসার কোষ ধ্বংসের পাশাপাশি সুস্থ কোষেরও মারাত্মক ক্ষতি করে। এর অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে এবং অনেক সময় ক্যানসার কোষ এই চিকিৎসার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতেই গবেষকদের আগ্রহ বাড়ছে ‘ইমিউনোথেরাপি’র দিকে, যেখানে টিকার মাধ্যমে শরীরের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যানসার কোষ চিনে তা ধ্বংস করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

ইরানি বিজ্ঞানীদের তৈরি এই নতুন এমআরএনএ টিকাটি মূলত ক্যানসারের বৃদ্ধি ও বিস্তারে ভূমিকা রাখা দুটি সুনির্দিষ্ট প্রোটিনকে লক্ষ্য করে নকশা করা হয়েছে; এগুলো হলো—‘ভিইজিএফআর২’ (VEGFR2) এবং ‘সি-এমইটি’ (c-MET)। এর মধ্যে ‘ভিইজিএফআর২’ প্রোটিনটি টিউমারের বৃদ্ধির জন্য নতুন রক্তনালী তৈরিতে সাহায্য করে, আর ‘সি-এমইটি’ ক্যানসার কোষের দ্রুত বৃদ্ধি, টিকে থাকা ও তা ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এই দুটি প্রোটিনের কার্যকারিতা বন্ধ করতে পারলে ক্যানসার ছড়ানো রুখে দেওয়া সম্ভব।

টিকাটির ফর্মুলেশন তৈরিতে গবেষকরা ‘ইমিউনোইনফরমেটিক্স’ নামক অত্যাধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। তাঁরা হাজার হাজার প্রোটিন অংশ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে ১২ ধাপের এক কঠোর বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ১০টি সবচেয়ে কার্যকর ‘এপিটোপ’ (টিকার মূল উপাদান) নির্বাচন করেন, যা মানবদেহে সর্বোচ্চ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারবে।

বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমিউনোফার্মাকোলজি’ জার্নালে এই গবেষণার বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে। কম্পিউটার সিমুলেশনে দেখা গেছে, এই টিকাটি শরীরে দীর্ঘমেয়াদি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সক্ষম। এটি প্রতিরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি করার পাশাপাশি রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার মেমোরি সেল বা স্মৃতিধারী কোষগুলোকে সক্রিয় করে তোলে, যা ভবিষ্যতে শরীরে পুনরায় ক্যানসার ফিরে আসা প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে এই অবিস্মরণীয় সাফল্যের মধ্যেও গবেষকরা একটি বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া সমস্ত ইতিবাচক ফলাফল কেবল কম্পিউটারভিত্তিক সিমুলেশন ও বিশ্লেষণের ওপর নির্ভরশীল। সাধারণ মানুষের শরীরে বাণিজ্যিকভাবে এই টিকা ব্যবহারের আগে এটিকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। প্রথমে ল্যাবরেটরিতে এর কার্যকারিতা যাচাই, এরপর প্রাণিদেহে পরীক্ষা এবং সবশেষে কয়েক ধাপে মানবদেহে ‘ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল’ বা পরীক্ষামূলক প্রয়োগ সফল হতে হবে। তা সত্ত্বেও, ক্যানসারবিরোধী নতুন প্রজন্মের টিকা ও চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই গবেষণাকে একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে দেখছে চিকিৎসা বিশ্ব।

বিষয় : স্তন ক্যানসার এমআরএনএ টিকা

স্তন ক্যানসার রুখবে এমআরএনএ টিকা! নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেন ইরানের গবেষকরা
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬


স্তন ক্যানসার রুখবে এমআরএনএ টিকা! নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেন ইরানের গবেষকরা

প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬

featured Image

বিশ্বজুড়ে নারীদের জন্য অন্যতম প্রধান আতঙ্ক স্তন ক্যানসার বা ব্রেস্ট ক্যানসার প্রতিরোধে এক যুগান্তকারী আশার আলো দেখিয়েছেন ইরানের একদল গবেষক। উন্নত কম্পিউটারভিত্তিক (ইন-সিলিকো) প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় সম্ভাব্য একটি নতুন এমআরএনএ (mRNA) টিকার সফল নকশা (ডিজাইন) তৈরি করেছেন তাঁরা। গবেষকদের আশা, এই টিকা ভবিষ্যতে মানবদেহে স্তন ক্যানসারের টিউমার বৃদ্ধি এবং তা শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়া (মেটাস্ট্যাসিস) সম্পূর্ণ রোধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

ইরানের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি চিকিৎসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে তেহরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেস, সেমনান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেস, রাজি ভ্যাকসিন অ্যান্ড সিরাম রিসার্চ ইনস্টিটিউট, পাস্তুর ইনস্টিটিউট অব ইরান এবং মোতামেদ ক্যান্সার ইনস্টিটিউট। তাঁদের এই সম্মিলিত গবেষণার ফল চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের দারুণভাবে আশাবাদী করে তুলেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ৬ লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্বের অন্তত ১৫৭টি দেশে নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া ক্যানসার এটি। বর্তমানে কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপির মতো প্রচলিত ও সনাতন চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো ক্যানসার কোষ ধ্বংসের পাশাপাশি সুস্থ কোষেরও মারাত্মক ক্ষতি করে। এর অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে এবং অনেক সময় ক্যানসার কোষ এই চিকিৎসার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতেই গবেষকদের আগ্রহ বাড়ছে ‘ইমিউনোথেরাপি’র দিকে, যেখানে টিকার মাধ্যমে শরীরের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যানসার কোষ চিনে তা ধ্বংস করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

ইরানি বিজ্ঞানীদের তৈরি এই নতুন এমআরএনএ টিকাটি মূলত ক্যানসারের বৃদ্ধি ও বিস্তারে ভূমিকা রাখা দুটি সুনির্দিষ্ট প্রোটিনকে লক্ষ্য করে নকশা করা হয়েছে; এগুলো হলো—‘ভিইজিএফআর২’ (VEGFR2) এবং ‘সি-এমইটি’ (c-MET)। এর মধ্যে ‘ভিইজিএফআর২’ প্রোটিনটি টিউমারের বৃদ্ধির জন্য নতুন রক্তনালী তৈরিতে সাহায্য করে, আর ‘সি-এমইটি’ ক্যানসার কোষের দ্রুত বৃদ্ধি, টিকে থাকা ও তা ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এই দুটি প্রোটিনের কার্যকারিতা বন্ধ করতে পারলে ক্যানসার ছড়ানো রুখে দেওয়া সম্ভব।

টিকাটির ফর্মুলেশন তৈরিতে গবেষকরা ‘ইমিউনোইনফরমেটিক্স’ নামক অত্যাধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। তাঁরা হাজার হাজার প্রোটিন অংশ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে ১২ ধাপের এক কঠোর বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ১০টি সবচেয়ে কার্যকর ‘এপিটোপ’ (টিকার মূল উপাদান) নির্বাচন করেন, যা মানবদেহে সর্বোচ্চ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারবে।

বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমিউনোফার্মাকোলজি’ জার্নালে এই গবেষণার বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে। কম্পিউটার সিমুলেশনে দেখা গেছে, এই টিকাটি শরীরে দীর্ঘমেয়াদি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সক্ষম। এটি প্রতিরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি করার পাশাপাশি রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার মেমোরি সেল বা স্মৃতিধারী কোষগুলোকে সক্রিয় করে তোলে, যা ভবিষ্যতে শরীরে পুনরায় ক্যানসার ফিরে আসা প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে এই অবিস্মরণীয় সাফল্যের মধ্যেও গবেষকরা একটি বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া সমস্ত ইতিবাচক ফলাফল কেবল কম্পিউটারভিত্তিক সিমুলেশন ও বিশ্লেষণের ওপর নির্ভরশীল। সাধারণ মানুষের শরীরে বাণিজ্যিকভাবে এই টিকা ব্যবহারের আগে এটিকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। প্রথমে ল্যাবরেটরিতে এর কার্যকারিতা যাচাই, এরপর প্রাণিদেহে পরীক্ষা এবং সবশেষে কয়েক ধাপে মানবদেহে ‘ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল’ বা পরীক্ষামূলক প্রয়োগ সফল হতে হবে। তা সত্ত্বেও, ক্যানসারবিরোধী নতুন প্রজন্মের টিকা ও চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই গবেষণাকে একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে দেখছে চিকিৎসা বিশ্ব।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত