স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
দেশের হাসপাতালগুলোর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এখন অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়েছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) প্রকাশিত ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সার্ভেইল্যান্স বাংলাদেশ ২০২৫’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আইসিইউতে শনাক্ত হওয়া জীবাণুর ৮৯ শতাংশই বহু ওষুধ-প্রতিরোধী (মাল্টি-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট বা এমডিআর)। এর মধ্যে ৪১ শতাংশকে সন্দেহভাজন প্যান-ড্রাগ-প্রতিরোধী (পিডিআর) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প অত্যন্ত সীমিত।
দেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করা নমুনা ও তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রস্তুত করা এ প্রতিবেদনে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধের জাতীয় চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, জাতীয়ভাবে পরীক্ষিত নমুনার ৪৬ শতাংশে এমডিআর জীবাণু মিললেও আইসিইউতে এ হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৮৯ শতাংশে পৌঁছেছে। একইভাবে সারা দেশে সন্দেহভাজন পিডিআর জীবাণুর হার ৬ শতাংশ হলেও আইসিইউতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ শতাংশে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইসিইউর রোগীরা সাধারণত ভেন্টিলেটর, ইউরিনারি ক্যাথেটারসহ বিভিন্ন চিকিৎসা-যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। পাশাপাশি শুরু থেকেই তাদের শক্তিশালী ও বিস্তৃত কার্যক্ষমতার অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। এসব কারণে সেখানে প্রতিরোধী জীবাণুর টিকে থাকা ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাসপাতালজুড়ে এন্টারোকক্কাস ফেসিয়ামের ৭৪ শতাংশ, অ্যাসিনিটোব্যাক্টারের ৬৫ শতাংশ, ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়ার ৫৩ শতাংশ এবং ই. কোলাইয়ের ৫২ শতাংশ নমুনা বহু ওষুধ-প্রতিরোধী হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া সিউডোমোনাস অ্যারুজিনোসা, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস এবং এন্টারোকক্কাস ফেকালিসেও উল্লেখযোগ্য হারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ পাওয়া গেছে।
১৫ হাজার ৮৪৪টি চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হাসপাতালে ব্যবহৃত মোট অ্যান্টিবায়োটিকের ৪৮ শতাংশই আইসিইউতে প্রয়োগ করা হয়েছে। ওয়ার্ডে ব্যবহার হয়েছে ৪৪ শতাংশ এবং বহির্বিভাগে মাত্র ৮ শতাংশ। অর্থাৎ হাসপাতালে ব্যবহৃত প্রতি দুটি অ্যান্টিবায়োটিকের প্রায় একটি ব্যবহার হচ্ছে আইসিইউতে।
হাসপাতালভিত্তিক তথ্যেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শনাক্ত পজিটিভ নমুনার ৭২ শতাংশ এসেছে আইসিইউ থেকে। একই ধরনের উচ্চ উপস্থিতি পাওয়া গেছে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতেও, যেখানে বহু ওষুধ-প্রতিরোধী এবং কার্বাপেনেম-প্রতিরোধী জীবাণুর আধিক্য লক্ষ্য করা গেছে।
প্রতিবেদনের প্রধান সম্পাদক ও আইইডিসিআরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভাইরোলজি) অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন হাবীব বলেন, নজরদারির তথ্য অনুযায়ী দেশে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে আইসিইউতে বহু ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার এবং প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা কমে যাওয়া উদ্বেগের বিষয়। তার মতে, অ্যান্টিবায়োগ্রাম বিশ্লেষণে কার্যকর ওষুধের সংখ্যা কমে আসছে। তাই সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (আইপিসি) ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ডা. আরিফুল বাশার বলেন, দেশে আইপিসির নির্দেশিকা থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল। আইসিইউতে অপ্রয়োজনীয় লোকজনের প্রবেশ, স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা এবং যন্ত্রপাতি ও শয্যার যথাযথ পরিচর্যার অভাবে এক রোগী থেকে আরেক রোগীর শরীরে প্রতিরোধী জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
আইইডিসিআর নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনের পাশাপাশি বিদ্যমান ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে। এজন্য হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টিওয়ার্ডশিপ (এএসপি) কার্যক্রম আরও জোরদার, প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করা, পরীক্ষার ফল অনুযায়ী ওষুধ নির্বাচন এবং নিয়মিত প্রেসক্রিপশন পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের ৯০ দশমিক ৯ শতাংশই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ওয়াচ’ শ্রেণির, যেগুলো সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত। অন্যদিকে সাধারণ সংক্রমণের জন্য সুপারিশকৃত ‘অ্যাকসেস’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ছিল মাত্র ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। আর সবচেয়ে জটিল সংক্রমণের জন্য সংরক্ষিত ‘রিজার্ভ’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ছিল ১ শতাংশেরও কম।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন, অতিরিক্ত ব্যবহার এবং নির্ধারিত কোর্স সম্পন্ন না করার প্রবণতা দেশে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ দ্রুত বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ সংকট মোকাবেলায় হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়েও বিস্তৃত নজরদারি ও গবেষণা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বিষয় : আই সি ইউ ঔষধ অকার্যকর
2.png)
রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ আগস্ট ২০২৬
দেশের হাসপাতালগুলোর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এখন অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়েছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) প্রকাশিত ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সার্ভেইল্যান্স বাংলাদেশ ২০২৫’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আইসিইউতে শনাক্ত হওয়া জীবাণুর ৮৯ শতাংশই বহু ওষুধ-প্রতিরোধী (মাল্টি-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট বা এমডিআর)। এর মধ্যে ৪১ শতাংশকে সন্দেহভাজন প্যান-ড্রাগ-প্রতিরোধী (পিডিআর) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প অত্যন্ত সীমিত।
দেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করা নমুনা ও তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রস্তুত করা এ প্রতিবেদনে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধের জাতীয় চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, জাতীয়ভাবে পরীক্ষিত নমুনার ৪৬ শতাংশে এমডিআর জীবাণু মিললেও আইসিইউতে এ হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৮৯ শতাংশে পৌঁছেছে। একইভাবে সারা দেশে সন্দেহভাজন পিডিআর জীবাণুর হার ৬ শতাংশ হলেও আইসিইউতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ শতাংশে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইসিইউর রোগীরা সাধারণত ভেন্টিলেটর, ইউরিনারি ক্যাথেটারসহ বিভিন্ন চিকিৎসা-যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। পাশাপাশি শুরু থেকেই তাদের শক্তিশালী ও বিস্তৃত কার্যক্ষমতার অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। এসব কারণে সেখানে প্রতিরোধী জীবাণুর টিকে থাকা ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাসপাতালজুড়ে এন্টারোকক্কাস ফেসিয়ামের ৭৪ শতাংশ, অ্যাসিনিটোব্যাক্টারের ৬৫ শতাংশ, ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়ার ৫৩ শতাংশ এবং ই. কোলাইয়ের ৫২ শতাংশ নমুনা বহু ওষুধ-প্রতিরোধী হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া সিউডোমোনাস অ্যারুজিনোসা, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস এবং এন্টারোকক্কাস ফেকালিসেও উল্লেখযোগ্য হারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ পাওয়া গেছে।
১৫ হাজার ৮৪৪টি চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হাসপাতালে ব্যবহৃত মোট অ্যান্টিবায়োটিকের ৪৮ শতাংশই আইসিইউতে প্রয়োগ করা হয়েছে। ওয়ার্ডে ব্যবহার হয়েছে ৪৪ শতাংশ এবং বহির্বিভাগে মাত্র ৮ শতাংশ। অর্থাৎ হাসপাতালে ব্যবহৃত প্রতি দুটি অ্যান্টিবায়োটিকের প্রায় একটি ব্যবহার হচ্ছে আইসিইউতে।
হাসপাতালভিত্তিক তথ্যেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শনাক্ত পজিটিভ নমুনার ৭২ শতাংশ এসেছে আইসিইউ থেকে। একই ধরনের উচ্চ উপস্থিতি পাওয়া গেছে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতেও, যেখানে বহু ওষুধ-প্রতিরোধী এবং কার্বাপেনেম-প্রতিরোধী জীবাণুর আধিক্য লক্ষ্য করা গেছে।
প্রতিবেদনের প্রধান সম্পাদক ও আইইডিসিআরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভাইরোলজি) অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন হাবীব বলেন, নজরদারির তথ্য অনুযায়ী দেশে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে আইসিইউতে বহু ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার এবং প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা কমে যাওয়া উদ্বেগের বিষয়। তার মতে, অ্যান্টিবায়োগ্রাম বিশ্লেষণে কার্যকর ওষুধের সংখ্যা কমে আসছে। তাই সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (আইপিসি) ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ডা. আরিফুল বাশার বলেন, দেশে আইপিসির নির্দেশিকা থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল। আইসিইউতে অপ্রয়োজনীয় লোকজনের প্রবেশ, স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা এবং যন্ত্রপাতি ও শয্যার যথাযথ পরিচর্যার অভাবে এক রোগী থেকে আরেক রোগীর শরীরে প্রতিরোধী জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
আইইডিসিআর নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনের পাশাপাশি বিদ্যমান ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে। এজন্য হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টিওয়ার্ডশিপ (এএসপি) কার্যক্রম আরও জোরদার, প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করা, পরীক্ষার ফল অনুযায়ী ওষুধ নির্বাচন এবং নিয়মিত প্রেসক্রিপশন পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের ৯০ দশমিক ৯ শতাংশই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ওয়াচ’ শ্রেণির, যেগুলো সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত। অন্যদিকে সাধারণ সংক্রমণের জন্য সুপারিশকৃত ‘অ্যাকসেস’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ছিল মাত্র ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। আর সবচেয়ে জটিল সংক্রমণের জন্য সংরক্ষিত ‘রিজার্ভ’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ছিল ১ শতাংশেরও কম।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন, অতিরিক্ত ব্যবহার এবং নির্ধারিত কোর্স সম্পন্ন না করার প্রবণতা দেশে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ দ্রুত বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ সংকট মোকাবেলায় হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়েও বিস্তৃত নজরদারি ও গবেষণা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
2.png)