সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 মতামতমতামত

হরিদাসের মূর্তির আড়ালে কি কোনো গোপন ভূ-রাজনৈতিক চাল চেলেছে আধিপত্যবাদী প্রতিবেশী?

ধর্মীয় আবেগের আড়ালে কি বিদেশি কোনো গভীর ষড়যন্ত্র? সীমান্ত এলাকার এই কর্মযজ্ঞ কি কেবল উপাসনালয়, নাকি তার চেয়ে বড় কিছু?

হরিদাসের মূর্তির আড়ালে কি কোনো গোপন ভূ-রাজনৈতিক চাল চেলেছে আধিপত্যবাদী প্রতিবেশী?
ছবি -সংগৃহীত

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে যে বিশাল মূর্তিগুলো তৈরি হচ্ছে, সেগুলোকে ওপর থেকে দেখলে মনে হতে পারে নিতান্তই ধর্মীয় শিল্পকর্ম। কিন্তু আপনি যদি সাম্প্রতিক  ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ মাথায় রেখে চোখ একটু বড় করে তাকান, তবে দেখবেন গ্রামের এই  সাধারণ ভূমিকে ঘিরে যেন কোনো পুরোনো মানচিত্র আবার নতুন করে আঁকা হচ্ছে। এঙ্গি মুর্তি কেবল ইট-পাথর বা সিমেন্টের কাঠামো নয় বরং এটা একটা টোপ। আমাদের এই বর্ডার বেল্ট বা সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় যখন কোনো পক্ষ হঠাৎ করেই এমন বিশাল স্থাপনা তৈরি করে, তখন ভূ-রাজনীতির ব্যাকরণ বলে দেয়—এর পেছনে কেবল ভক্তি নেই, আছে অন্য কোনো হিসাব।

এই গল্পটা শুরু হয়েছিল একজন এসি মেকানিককে কেন্দ্র করে। নাম তার হরিদাস চন্দ্র তরণী। সিনেমার গল্পের মতো তার উত্থান। এক সময় গণভবনের অন্দরে তার অবাধ যাতায়াত ছিল। কেন? কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যারা থাকেন, তাদের আশেপাশে এমন কিছু মানুষ প্রয়োজন হয় যারা সবসময় ‘কাজের’ কথা শোনে না, কিন্তু ‘কাজ’ হাসিল করে দেয়।হরিদাস এক সময় অনেকের কর্ম হাসিলের মাধ্যম হয়ে উঠেন। হরিদাস যখন গণভবনে যাতায়াত করতেন, তখন তিনি হয়তো জানতেন না যে ভবিষ্যতে এই অভিজ্ঞতা তাকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। শেখ সেলিমের মতো নেতাদের সাথে তার লেনদেন আর বিরোধের খবর যখন সামনে আসে, তখন বোঝা যায়, তিনি কতটা অসাধারণ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ছিলেন এমন এক সুতো, যা দিয়ে ক্ষমতার বড় বড় লবিং কাজ করতো।

এখন প্রশ্ন হলো, একজন এসি মেকানিক কেন গাইবান্ধার মতো একটা জায়গায় ১৭ কোটি টাকা খরচ করে মূর্তি বানাচ্ছেন? ভূ-রাজনীতির ভাষায় এটাকে বলে ‘সফট পাওয়ার’ বা নরম শক্তি প্রয়োগ। আপনি যখন কোনো জায়গায় বিশাল কোনো চিহ্ন স্থাপন করেন, তখন সেটা ওই এলাকার ভৌগোলিক স্বকীয়তাকে বদলে দেয়। এটাকে বলা হয় ‘টেরিটোরিয়াল মার্কিং’। প্রতিবেশী দেশ ভারত যখন সীমান্তে নানামুখী চাপ তৈরি করে, যখন খবর আসে সীমান্তে পুশ-ইনের—তখন এমন একটি জায়গা তৈরি করা কি নিছক কাকতালীয়? মনে হচ্ছে, এটি একটি ‘ট্রোজান হর্স’ কৌশলের প্রথম ধাপ। ভেতর থেকে জায়গাটা দখল করে ফেলা, যাতে ভবিষ্যতে ওই এলাকাকে কেন্দ্র করে অন্য কোনো অশুভ ছায়া খেলা চালাতে পারে।

গোয়েন্দা মহলে গুঞ্জন আছে, হরিদাসের সাথে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। তিন ভাই ভারতে থাকে, নিয়মিত বৈঠক হয়—এগুলো কি কেবল পারিবারিক সম্পর্ক? একজন মেকানিক কেন সবজি ব্যবসায় পাঁচ কোটি টাকা আয় দেখাবেন? আসলে এগুলো হলো মানি লন্ডারিংয়ের পুরনো কায়দা। টাকা আসছে বিদেশ থেকে, গন্তব্য গাইবান্ধা। তারা এমন এক দুর্গ বানাচ্ছে যার চারপাশ সিসি ক্যামেরায় ঘেরা। কেন? একটা উপাসনালয়ে এত কড়া পাহারা কেন থাকে? এর মানে হলো, ভেতরে যা ঘটছে, তা বাইরের পৃথিবীর মানুষের দেখার অধিকার নেই। এখানে কেবল উপাসনা হয় না, এখানে হয়তো তৈরি হচ্ছে নতুন কোনো ‘অপারেশন থিয়েটার’।

আরেকটা বিষয় খেয়াল করবেন, পলাশবাড়ীর এই মূর্তিগুলো ঠিক এমন জায়গায় বসানো হয়েছে যা ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের সাথে খুব কাছাকাছি। মানে, এখান থেকে পুরো অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নজর রাখা খুব সহজ। যারা সীমান্তে অস্থিরতা তৈরি করতে চায়, তারা সবসময় এমন কিছু স্পট খোঁজে যা থেকে সহজে পালানো যায় আবার সহজে নিয়ন্ত্রণও নেওয়া যায়। পুশ-ইনের মাধ্যমে যখন মানুষ পাঠানো হচ্ছে, তখন এই মূর্তিগুলো কি সেই মানুষের জন্য ল্যান্ডমার্ক বা দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করছে? অথবা এগুলো কি এমন কোনো নেটওয়ার্কের অংশ যা আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি?

আমরা যখন এসব কথা বলি, অনেকে বলেন আমরা বেশি ষড়যন্ত্র খুঁজি। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের অনেক দেশে এমন ছোটখাটো ‘সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ বা ‘মন্দির’ আড়ালে আসলে ফরওয়ার্ড অপারেটিং বেস বা গোয়েন্দা ঘাঁটি হিসেবে কাজ করেছে। ভারত যদি সত্যি বাংলাদেশের বন্ধু হয়, তবে তারা কেন একটি ছোট দেশের ভেতরে এভাবে ধর্মীয় উস্কানির আড়ালে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়? এই মূর্তিগুলো কি শান্তির প্রতীক, নাকি আগ্রাসনের নতুন কোনো সংস্করণ?

দিনশেষে বড় প্রশ্নটা হলো—হরিদাস একা এটা করছেন না। তার পেছনে আছে এক বিশাল নেটওয়ার্ক। সেই নেটওয়ার্কের সুতো কি আমাদের সীমান্তের ওপারের ক্ষমতার শিরা -উপশিরাতে গিয়ে মিশেছে? যদি তাই হয়, তবে আমাদের সাবধান হওয়ার সময় এসেছে। কারণ বন্ধুত্বের নামে যখন কেউ আমাদের আঙিনায় দুর্গ বানায়, তখন সেই দুর্গ একদিন আমাদেরই বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে। আর হরিদাসরা তখন হয়তো আর থাকবে না, রেখে যাবে এক জটিল রাজনৈতিক সংকট, যার দাম দেবে সাধারণ মানুষ। 

বিষয় : গাইবান্ধার পলাশবাড়ী হরিদাসের মূর্তি

হরিদাসের মূর্তির আড়ালে কি কোনো গোপন ভূ-রাজনৈতিক চাল চেলেছে আধিপত্যবাদী প্রতিবেশী?
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


হরিদাসের মূর্তির আড়ালে কি কোনো গোপন ভূ-রাজনৈতিক চাল চেলেছে আধিপত্যবাদী প্রতিবেশী?

প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুন ২০২৬

featured Image

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে যে বিশাল মূর্তিগুলো তৈরি হচ্ছে, সেগুলোকে ওপর থেকে দেখলে মনে হতে পারে নিতান্তই ধর্মীয় শিল্পকর্ম। কিন্তু আপনি যদি সাম্প্রতিক  ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ মাথায় রেখে চোখ একটু বড় করে তাকান, তবে দেখবেন গ্রামের এই  সাধারণ ভূমিকে ঘিরে যেন কোনো পুরোনো মানচিত্র আবার নতুন করে আঁকা হচ্ছে। এঙ্গি মুর্তি কেবল ইট-পাথর বা সিমেন্টের কাঠামো নয় বরং এটা একটা টোপ। আমাদের এই বর্ডার বেল্ট বা সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় যখন কোনো পক্ষ হঠাৎ করেই এমন বিশাল স্থাপনা তৈরি করে, তখন ভূ-রাজনীতির ব্যাকরণ বলে দেয়—এর পেছনে কেবল ভক্তি নেই, আছে অন্য কোনো হিসাব।

এই গল্পটা শুরু হয়েছিল একজন এসি মেকানিককে কেন্দ্র করে। নাম তার হরিদাস চন্দ্র তরণী। সিনেমার গল্পের মতো তার উত্থান। এক সময় গণভবনের অন্দরে তার অবাধ যাতায়াত ছিল। কেন? কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যারা থাকেন, তাদের আশেপাশে এমন কিছু মানুষ প্রয়োজন হয় যারা সবসময় ‘কাজের’ কথা শোনে না, কিন্তু ‘কাজ’ হাসিল করে দেয়।হরিদাস এক সময় অনেকের কর্ম হাসিলের মাধ্যম হয়ে উঠেন। হরিদাস যখন গণভবনে যাতায়াত করতেন, তখন তিনি হয়তো জানতেন না যে ভবিষ্যতে এই অভিজ্ঞতা তাকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। শেখ সেলিমের মতো নেতাদের সাথে তার লেনদেন আর বিরোধের খবর যখন সামনে আসে, তখন বোঝা যায়, তিনি কতটা অসাধারণ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ছিলেন এমন এক সুতো, যা দিয়ে ক্ষমতার বড় বড় লবিং কাজ করতো।

এখন প্রশ্ন হলো, একজন এসি মেকানিক কেন গাইবান্ধার মতো একটা জায়গায় ১৭ কোটি টাকা খরচ করে মূর্তি বানাচ্ছেন? ভূ-রাজনীতির ভাষায় এটাকে বলে ‘সফট পাওয়ার’ বা নরম শক্তি প্রয়োগ। আপনি যখন কোনো জায়গায় বিশাল কোনো চিহ্ন স্থাপন করেন, তখন সেটা ওই এলাকার ভৌগোলিক স্বকীয়তাকে বদলে দেয়। এটাকে বলা হয় ‘টেরিটোরিয়াল মার্কিং’। প্রতিবেশী দেশ ভারত যখন সীমান্তে নানামুখী চাপ তৈরি করে, যখন খবর আসে সীমান্তে পুশ-ইনের—তখন এমন একটি জায়গা তৈরি করা কি নিছক কাকতালীয়? মনে হচ্ছে, এটি একটি ‘ট্রোজান হর্স’ কৌশলের প্রথম ধাপ। ভেতর থেকে জায়গাটা দখল করে ফেলা, যাতে ভবিষ্যতে ওই এলাকাকে কেন্দ্র করে অন্য কোনো অশুভ ছায়া খেলা চালাতে পারে।

গোয়েন্দা মহলে গুঞ্জন আছে, হরিদাসের সাথে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। তিন ভাই ভারতে থাকে, নিয়মিত বৈঠক হয়—এগুলো কি কেবল পারিবারিক সম্পর্ক? একজন মেকানিক কেন সবজি ব্যবসায় পাঁচ কোটি টাকা আয় দেখাবেন? আসলে এগুলো হলো মানি লন্ডারিংয়ের পুরনো কায়দা। টাকা আসছে বিদেশ থেকে, গন্তব্য গাইবান্ধা। তারা এমন এক দুর্গ বানাচ্ছে যার চারপাশ সিসি ক্যামেরায় ঘেরা। কেন? একটা উপাসনালয়ে এত কড়া পাহারা কেন থাকে? এর মানে হলো, ভেতরে যা ঘটছে, তা বাইরের পৃথিবীর মানুষের দেখার অধিকার নেই। এখানে কেবল উপাসনা হয় না, এখানে হয়তো তৈরি হচ্ছে নতুন কোনো ‘অপারেশন থিয়েটার’।

আরেকটা বিষয় খেয়াল করবেন, পলাশবাড়ীর এই মূর্তিগুলো ঠিক এমন জায়গায় বসানো হয়েছে যা ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের সাথে খুব কাছাকাছি। মানে, এখান থেকে পুরো অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নজর রাখা খুব সহজ। যারা সীমান্তে অস্থিরতা তৈরি করতে চায়, তারা সবসময় এমন কিছু স্পট খোঁজে যা থেকে সহজে পালানো যায় আবার সহজে নিয়ন্ত্রণও নেওয়া যায়। পুশ-ইনের মাধ্যমে যখন মানুষ পাঠানো হচ্ছে, তখন এই মূর্তিগুলো কি সেই মানুষের জন্য ল্যান্ডমার্ক বা দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করছে? অথবা এগুলো কি এমন কোনো নেটওয়ার্কের অংশ যা আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি?

আমরা যখন এসব কথা বলি, অনেকে বলেন আমরা বেশি ষড়যন্ত্র খুঁজি। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের অনেক দেশে এমন ছোটখাটো ‘সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ বা ‘মন্দির’ আড়ালে আসলে ফরওয়ার্ড অপারেটিং বেস বা গোয়েন্দা ঘাঁটি হিসেবে কাজ করেছে। ভারত যদি সত্যি বাংলাদেশের বন্ধু হয়, তবে তারা কেন একটি ছোট দেশের ভেতরে এভাবে ধর্মীয় উস্কানির আড়ালে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়? এই মূর্তিগুলো কি শান্তির প্রতীক, নাকি আগ্রাসনের নতুন কোনো সংস্করণ?

দিনশেষে বড় প্রশ্নটা হলো—হরিদাস একা এটা করছেন না। তার পেছনে আছে এক বিশাল নেটওয়ার্ক। সেই নেটওয়ার্কের সুতো কি আমাদের সীমান্তের ওপারের ক্ষমতার শিরা -উপশিরাতে গিয়ে মিশেছে? যদি তাই হয়, তবে আমাদের সাবধান হওয়ার সময় এসেছে। কারণ বন্ধুত্বের নামে যখন কেউ আমাদের আঙিনায় দুর্গ বানায়, তখন সেই দুর্গ একদিন আমাদেরই বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে। আর হরিদাসরা তখন হয়তো আর থাকবে না, রেখে যাবে এক জটিল রাজনৈতিক সংকট, যার দাম দেবে সাধারণ মানুষ। 


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত