আন্তর্জাতিকআন্তর্জাতিক

তুরস্ক–সৌদি–পাকিস্তান জোটে মিসরও কি আসছে

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে মিসরের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। একই সঙ্গে সিরিয়া, গাজা, লেবানন ও হরমুজ ঘিরে আঙ্কারার অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন তিনি।

আবিদ আমান
আবিদ আমান
তুরস্ক–সৌদি–পাকিস্তান জোটে মিসরও কি আসছে
ছবি -সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত মিলছে। তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে মিসরকে যুক্ত করার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এই চুক্তির পরিধি আরও বাড়তে পারে এবং এতে অন্য দেশগুলোরও যোগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আল–জাজিরা আরবির ‘আল মুকাবালা’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি রোববার সন্ধ্যায় প্রচারিত হওয়ার কথা।

গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেন। মক্কা চুক্তি নামে পরিচিত এই সমঝোতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পারস্পরিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি।

চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর ফলে হামলার শিকার দেশটির পাশে অন্য দুই দেশের দাঁড়ানোর বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। এই ব্যবস্থাকে কিছু বিশ্লেষক ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করছেন। ন্যাটোর ওই বিধানে একটি সদস্যদেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে পুরো জোটের বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, মক্কা চুক্তিকে ন্যাটোর আদলে গঠিত সামরিক জোট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। একই সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে এই চুক্তি করা হয়েছে—এমন ব্যাখ্যাও তাঁরা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এরদোয়ানের বক্তব্যে মিসরের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি তাই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ মিসর যুক্ত হলে চুক্তিটির ভৌগোলিক পরিসর যেমন বাড়বে, তেমনি আরব বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটি এর সঙ্গে যুক্ত হবে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন ভারসাম্যের প্রশ্নও সামনে আসতে পারে।

হরমুজ নিয়ে তুরস্কের উদ্বেগ

সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা নিয়েও কথা বলেন। তাঁর মতে, প্রণালিটি বন্ধ থাকা কোনো পক্ষের জন্যই ভালো নয়। তাই এটি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়টিকে তুরস্ক অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে সাম্প্রতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ফলে এখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

এরদোয়ান আঞ্চলিক সংঘাত কমাতে কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। এ ক্ষেত্রে কাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সিরিয়া থেকে গাজা, সক্রিয় থাকতে চায় আঙ্কারা

সিরিয়া, গাজা ও লেবানন—এই তিন ক্ষেত্রেও তুরস্কের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন এরদোয়ান। তাঁর বক্তব্য, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোকে একা ছেড়ে দেবে না তুরস্ক।

সিরিয়ার ক্ষেত্রে আঙ্কারা স্থিতিশীলতা ফেরাতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছেন তিনি। সিরিয়া সফরের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে সিরিয়ার কুর্দিদের শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রক্রিয়ার অংশ হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

পুরো অঞ্চলের কুর্দি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা এবং তাদের অধিকার রক্ষায় তুরস্ক কাজ করবে বলেও জানান এরদোয়ান। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সিরিয়া ও ইরাকের কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে ঘিরে তুরস্কের নিরাপত্তা উদ্বেগ বহুদিনের।

গাজা নিয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। তাঁর ভাষায়, গাজাকে একা ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ তুরস্কের নেই। প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে আঙ্কারা কাজ চালিয়ে যাবে।

এরদোয়ান দাবি করেন, হামাস নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি আন্তরিকভাবে পালন করছে। তারপরও ইসরায়েল যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলাকেও তুরস্ক গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখছে। এরদোয়ান জানান, সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুরস্ক সফরের সময় তিনি লেবাননে সংঘাত বন্ধের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলেছেন। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি।

সুদান ও লিবিয়াতেও তুরস্কের সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার বার্তা দিয়েছেন এরদোয়ান। সুদানের সার্বভৌম কাউন্সিলের প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো বলে উল্লেখ করেন তিনি। লিবিয়ার সঙ্গেও তুরস্কের সম্পর্ক স্থিতিশীল রয়েছে এবং দেশটিকে আঙ্কারা পরিত্যাগ করবে না বলে জানান।

ইউরোপের দরজা নিয়ে হতাশ এরদোয়ান

তুরস্কের ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের বিষয়টিও উঠে আসে সাক্ষাৎকারে। এরদোয়ানের বক্তব্য, ইইউ তুরস্ককে সদস্য হিসেবে নিতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না। এ কারণে সদস্যপদ অর্জন এখন আর আঙ্কারার প্রধান অগ্রাধিকার নয়।

তবে এরদোয়ানের মতে, তুরস্ককে দূরে রাখার শেষ পর্যন্ত ক্ষতি ইউরোপেরই হবে। কয়েক দশক ধরে ইইউতে তুরস্কের সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা চললেও রাজনৈতিক ও কৌশলগত নানা কারণে সেই প্রক্রিয়া এগোয়নি।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পাওয়ার বিষয়েও আশাবাদ প্রকাশ করেছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। তাঁর দাবি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে এফ-৩৫ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে আঙ্কারা।

তবে এফ-৩৫ ইস্যুতে তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধের পেছনে রয়েছে রাশিয়ার কাছ থেকে কেনা এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। ২০১৯ সালে এস-৪০০ কেনার পর তুরস্ককে এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বাদ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের যুক্তি ছিল, রুশ নির্মিত এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থার উপস্থিতি এফ-৩৫-এর সংবেদনশীল প্রযুক্তির নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনে এরদোয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, এস-৪০০ কেনার কারণে তুরস্কের ওপর ২০২০ সালের ডিসেম্বরে আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তুরস্ককে আবার এফ-৩৫ কর্মসূচিতে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার কথাও জানান তিনি।

মক্কা চুক্তিতে সম্ভাব্য নতুন সদস্য হিসেবে মিসরের নাম ওঠা, হরমুজ নিয়ে তুরস্কের সক্রিয়তা এবং সিরিয়া, গাজা ও লেবাননে আঙ্কারার অবস্থান—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতিতে তুরস্কের ভূমিকা আরও বিস্তৃত করার একটি প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে।

বিষয় : মিশর মক্কা চুক্তি

কাল মহাকাল

রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬


তুরস্ক–সৌদি–পাকিস্তান জোটে মিসরও কি আসছে

প্রকাশের তারিখ : ১৬ আগস্ট ২০২৬

featured Image

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত মিলছে। তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে মিসরকে যুক্ত করার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এই চুক্তির পরিধি আরও বাড়তে পারে এবং এতে অন্য দেশগুলোরও যোগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আল–জাজিরা আরবির ‘আল মুকাবালা’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি রোববার সন্ধ্যায় প্রচারিত হওয়ার কথা।

গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেন। মক্কা চুক্তি নামে পরিচিত এই সমঝোতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পারস্পরিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি।

চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর ফলে হামলার শিকার দেশটির পাশে অন্য দুই দেশের দাঁড়ানোর বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। এই ব্যবস্থাকে কিছু বিশ্লেষক ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করছেন। ন্যাটোর ওই বিধানে একটি সদস্যদেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে পুরো জোটের বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, মক্কা চুক্তিকে ন্যাটোর আদলে গঠিত সামরিক জোট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। একই সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে এই চুক্তি করা হয়েছে—এমন ব্যাখ্যাও তাঁরা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এরদোয়ানের বক্তব্যে মিসরের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি তাই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ মিসর যুক্ত হলে চুক্তিটির ভৌগোলিক পরিসর যেমন বাড়বে, তেমনি আরব বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটি এর সঙ্গে যুক্ত হবে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন ভারসাম্যের প্রশ্নও সামনে আসতে পারে।

হরমুজ নিয়ে তুরস্কের উদ্বেগ

সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা নিয়েও কথা বলেন। তাঁর মতে, প্রণালিটি বন্ধ থাকা কোনো পক্ষের জন্যই ভালো নয়। তাই এটি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়টিকে তুরস্ক অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে সাম্প্রতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ফলে এখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

এরদোয়ান আঞ্চলিক সংঘাত কমাতে কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। এ ক্ষেত্রে কাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সিরিয়া থেকে গাজা, সক্রিয় থাকতে চায় আঙ্কারা

সিরিয়া, গাজা ও লেবানন—এই তিন ক্ষেত্রেও তুরস্কের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন এরদোয়ান। তাঁর বক্তব্য, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোকে একা ছেড়ে দেবে না তুরস্ক।

সিরিয়ার ক্ষেত্রে আঙ্কারা স্থিতিশীলতা ফেরাতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছেন তিনি। সিরিয়া সফরের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে সিরিয়ার কুর্দিদের শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রক্রিয়ার অংশ হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

পুরো অঞ্চলের কুর্দি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা এবং তাদের অধিকার রক্ষায় তুরস্ক কাজ করবে বলেও জানান এরদোয়ান। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সিরিয়া ও ইরাকের কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে ঘিরে তুরস্কের নিরাপত্তা উদ্বেগ বহুদিনের।

গাজা নিয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। তাঁর ভাষায়, গাজাকে একা ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ তুরস্কের নেই। প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে আঙ্কারা কাজ চালিয়ে যাবে।

এরদোয়ান দাবি করেন, হামাস নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি আন্তরিকভাবে পালন করছে। তারপরও ইসরায়েল যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলাকেও তুরস্ক গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখছে। এরদোয়ান জানান, সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুরস্ক সফরের সময় তিনি লেবাননে সংঘাত বন্ধের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলেছেন। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি।

সুদান ও লিবিয়াতেও তুরস্কের সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার বার্তা দিয়েছেন এরদোয়ান। সুদানের সার্বভৌম কাউন্সিলের প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো বলে উল্লেখ করেন তিনি। লিবিয়ার সঙ্গেও তুরস্কের সম্পর্ক স্থিতিশীল রয়েছে এবং দেশটিকে আঙ্কারা পরিত্যাগ করবে না বলে জানান।

ইউরোপের দরজা নিয়ে হতাশ এরদোয়ান

তুরস্কের ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের বিষয়টিও উঠে আসে সাক্ষাৎকারে। এরদোয়ানের বক্তব্য, ইইউ তুরস্ককে সদস্য হিসেবে নিতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না। এ কারণে সদস্যপদ অর্জন এখন আর আঙ্কারার প্রধান অগ্রাধিকার নয়।

তবে এরদোয়ানের মতে, তুরস্ককে দূরে রাখার শেষ পর্যন্ত ক্ষতি ইউরোপেরই হবে। কয়েক দশক ধরে ইইউতে তুরস্কের সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা চললেও রাজনৈতিক ও কৌশলগত নানা কারণে সেই প্রক্রিয়া এগোয়নি।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পাওয়ার বিষয়েও আশাবাদ প্রকাশ করেছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। তাঁর দাবি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে এফ-৩৫ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে আঙ্কারা।

তবে এফ-৩৫ ইস্যুতে তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধের পেছনে রয়েছে রাশিয়ার কাছ থেকে কেনা এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। ২০১৯ সালে এস-৪০০ কেনার পর তুরস্ককে এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বাদ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের যুক্তি ছিল, রুশ নির্মিত এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থার উপস্থিতি এফ-৩৫-এর সংবেদনশীল প্রযুক্তির নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনে এরদোয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, এস-৪০০ কেনার কারণে তুরস্কের ওপর ২০২০ সালের ডিসেম্বরে আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তুরস্ককে আবার এফ-৩৫ কর্মসূচিতে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার কথাও জানান তিনি।

মক্কা চুক্তিতে সম্ভাব্য নতুন সদস্য হিসেবে মিসরের নাম ওঠা, হরমুজ নিয়ে তুরস্কের সক্রিয়তা এবং সিরিয়া, গাজা ও লেবাননে আঙ্কারার অবস্থান—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতিতে তুরস্কের ভূমিকা আরও বিস্তৃত করার একটি প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  মোঃ ফখরুল ইসলাম রাজীব 

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত