জাতীয়
রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার বাসাবাড়িতে চলমান গ্যাস সংকট আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে আরও ভয়ংকর রূপ নিতে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যে, অনেক এলাকায় বাসাবাড়িতে রান্নার জন্য পাইপলাইনের কোনো গ্যাসই মিলবে না। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে ইতিমধ্যে এই আশঙ্কাজনক তথ্য জানানো হয়েছে। ভিআইপি এলাকা গুলশানে কিছুটা গ্যাস পাওয়া গেলেও মোহাম্মদপুর, সাভার, গাজীপুরসহ অধিকাংশ এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলা জ্বলছে না। এমনকি সংসদ-সদস্যদের আবাসিক ভবন ‘ন্যাম ভবন’-এও তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দেওয়ায় সংসদ সচিবালয় থেকে তিতাসকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
এই চরম বাস্তবতাকে সামনে রেখে আবাসিক খাতে পাইপলাইনের গ্যাসের আশা ছেড়ে দিচ্ছে সরকার। ফলে প্রি-পেইড মিটার এবং নতুন গ্যাসলাইন নির্মাণের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার দুটি বড় প্রকল্প পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। এর পরিবর্তে এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) খাতে এক বিশাল বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে আগামী দেড় বছরের মধ্যে সরকারি উদ্যোগে এলপিজি সিলিন্ডারের বাজার বড় আকারে নিয়ন্ত্রণে নিতে চায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
বর্তমানে তিতাস এলাকায় আবাসিক গ্রাহক সংখ্যা ২৮ লাখের বেশি। তীব্র সংকটের কারণে রাজধানীর মোহাম্মদপুর হাউজিংয়ের ভুক্তভোগী গৃহিণীরা জানান, দিনের বেলা গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে পুরো পরিবারের জন্য রান্না করতে হচ্ছে। এদিকে, সাবেক এক অতিরিক্ত সচিব জানান, তাঁর বাসায় গত ২ বছর ধরে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় তিনি তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) সঙ্গে দেখা করে ২ বছরের গ্যাস বিল মওকুফের লিখিত আবেদন জানিয়েছেন।
তিতাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মুহাম্মদ সাইদুল হাসান জানান, তিতাস সিস্টেমে প্রতিবছরই গ্যাসের সরবরাহ কমছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাসাবাড়িতে। আগামী দিনে এই সংকট আরও প্রকট হবে এবং বিষয়টি সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে।
তিতাস কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ঢাকার বাসাবাড়ি, রিফুয়েলিং স্টেশন ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য দৈনিক ১৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। আমিনবাজার, টঙ্গী, ডেমরা ও কদমতলী জোন দিয়ে ঢাকায় আগে যে পরিমাণ গ্যাস আসত, এখন তার চেয়ে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কম আসছে।
পেট্রোবাংলা ও তিতাসের সূত্র অনুযায়ী, দেশীয় খনিগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে:
দৈনিক গড় উৎপাদন: গত বছর যেখানে দৈনিক ১৮০ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত, সেখানে চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত তা নেমে এসেছে মাত্র ১৬০ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুটে।
জাতীয় সরবরাহ (আমদানিকৃত এলএনজিসহ): ২০২৩ সালে দৈনিক সরবরাহ ছিল ২৭৭.৭৪ কোটি ঘনফুট, ২০২৪ সালে ২৬৮.৬০ কোটি, ২০২৫ সালে ২৭০.৬০ কোটি এবং ২০২৬ সালের জুনের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৫৬.৯০ কোটি ঘনফুটে।
তিতাসের প্রাপ্তি: ২০২৩ সালে তিতাস পেয়েছিল ১৫৩.৮০ কোটি ঘনফুট, যা ২০২৬ সালের জুন নাগাদ কমে ১৪৪.১০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে।
এই গ্যাস সংকটের ধাক্কায় গাজীপুরের কোনাবাড়ী, চন্দ্রা, সাভার, আশুলিয়া, মানিকগঞ্জ ও রূপগঞ্জের শিল্পকারখানাগুলো এখন আংশিক বা অর্ধেক ক্ষমতায় চলছে, যা দেশের উৎপাদন খাতকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে।
বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ আর বাড়ানো সম্ভব নয়—এটি নিশ্চিত হওয়ার পর সরকার আবাসিক খাতে নতুন করে বড় বিনিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে:
১. এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১৭ লাখ ৫০ হাজার গ্রাহকের ঘরে প্রি-পেইড মিটার বসানোর প্রকল্পটি বাতিল করা হয়েছে।
২. পাইপের লিকেজ মেরামত, দুর্ঘটনা এড়ানো এবং ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে পুরনো পাইপলাইন তুলে ২,৭০০ কিলোমিটার নতুন লাইন বসানোর জন্য অনুমোদিত ৮,১৬০ কোটি টাকার পুনর্বাসন প্রকল্পটি চূড়ান্ত মুহূর্তে বন্ধ করে দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
বর্তমানে দেশে প্রতিমাসে ১ লাখ ৬০ হাজার টনের বেশি এলপিজি ব্যবহৃত হয়। এর মাত্র ৩-৪ শতাংশ দেয় সরকারি কোম্পানি, আর বাকি ৯৬ শতাংশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র ৮-১০টি বেসরকারি আমদানিকারক সিন্ডিকেট। এই একচেটিয়া বাজার ভাঙতে সরকার বড় ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করেছে:
মোংলা ও এলেঙ্গা প্ল্যান্ট: মোংলায় ৬.৫ একর এবং এলেঙ্গায় ৭ একর জমিতে এলপিজির বোটলিং প্ল্যান্ট ও বিশাল মজুত ট্যাংক নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে, যার সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।
মাতারবাড়ী টার্মিনাল: মাতারবাড়ীতে একটি স্থায়ী ল্যান্ডবেইজড এলপিজি টার্মিনাল করা হচ্ছে, যেখান থেকে বছরে ১২ লাখ টন এলপিজি সরবরাহ করা যাবে। পাশাপাশি জাহাজ থেকে সরাসরি খালাসের জন্য (STS পদ্ধতি) একটি ভাসমান টার্মিনালও করা হবে।
চট্টগ্রাম বে-টার্মিনাল: চট্টগ্রামের বে-টার্মিনাল এলাকায় ২৫ হেক্টর জমিতে বার্ষিক ১২ লাখ টন ধারণক্ষমতার আরও একটি বিশাল এলপিজি মজুত টার্মিনাল গড়ে তোলার মেগা প্ল্যান হাতে নিয়েছে সরকার।
2.png)
রোববার, ২৮ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুন ২০২৬
রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার বাসাবাড়িতে চলমান গ্যাস সংকট আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে আরও ভয়ংকর রূপ নিতে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যে, অনেক এলাকায় বাসাবাড়িতে রান্নার জন্য পাইপলাইনের কোনো গ্যাসই মিলবে না। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে ইতিমধ্যে এই আশঙ্কাজনক তথ্য জানানো হয়েছে। ভিআইপি এলাকা গুলশানে কিছুটা গ্যাস পাওয়া গেলেও মোহাম্মদপুর, সাভার, গাজীপুরসহ অধিকাংশ এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলা জ্বলছে না। এমনকি সংসদ-সদস্যদের আবাসিক ভবন ‘ন্যাম ভবন’-এও তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দেওয়ায় সংসদ সচিবালয় থেকে তিতাসকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
এই চরম বাস্তবতাকে সামনে রেখে আবাসিক খাতে পাইপলাইনের গ্যাসের আশা ছেড়ে দিচ্ছে সরকার। ফলে প্রি-পেইড মিটার এবং নতুন গ্যাসলাইন নির্মাণের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার দুটি বড় প্রকল্প পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। এর পরিবর্তে এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) খাতে এক বিশাল বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে আগামী দেড় বছরের মধ্যে সরকারি উদ্যোগে এলপিজি সিলিন্ডারের বাজার বড় আকারে নিয়ন্ত্রণে নিতে চায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
বর্তমানে তিতাস এলাকায় আবাসিক গ্রাহক সংখ্যা ২৮ লাখের বেশি। তীব্র সংকটের কারণে রাজধানীর মোহাম্মদপুর হাউজিংয়ের ভুক্তভোগী গৃহিণীরা জানান, দিনের বেলা গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে পুরো পরিবারের জন্য রান্না করতে হচ্ছে। এদিকে, সাবেক এক অতিরিক্ত সচিব জানান, তাঁর বাসায় গত ২ বছর ধরে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় তিনি তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) সঙ্গে দেখা করে ২ বছরের গ্যাস বিল মওকুফের লিখিত আবেদন জানিয়েছেন।
তিতাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মুহাম্মদ সাইদুল হাসান জানান, তিতাস সিস্টেমে প্রতিবছরই গ্যাসের সরবরাহ কমছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাসাবাড়িতে। আগামী দিনে এই সংকট আরও প্রকট হবে এবং বিষয়টি সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে।
তিতাস কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ঢাকার বাসাবাড়ি, রিফুয়েলিং স্টেশন ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য দৈনিক ১৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। আমিনবাজার, টঙ্গী, ডেমরা ও কদমতলী জোন দিয়ে ঢাকায় আগে যে পরিমাণ গ্যাস আসত, এখন তার চেয়ে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কম আসছে।
পেট্রোবাংলা ও তিতাসের সূত্র অনুযায়ী, দেশীয় খনিগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে:
দৈনিক গড় উৎপাদন: গত বছর যেখানে দৈনিক ১৮০ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত, সেখানে চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত তা নেমে এসেছে মাত্র ১৬০ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুটে।
জাতীয় সরবরাহ (আমদানিকৃত এলএনজিসহ): ২০২৩ সালে দৈনিক সরবরাহ ছিল ২৭৭.৭৪ কোটি ঘনফুট, ২০২৪ সালে ২৬৮.৬০ কোটি, ২০২৫ সালে ২৭০.৬০ কোটি এবং ২০২৬ সালের জুনের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৫৬.৯০ কোটি ঘনফুটে।
তিতাসের প্রাপ্তি: ২০২৩ সালে তিতাস পেয়েছিল ১৫৩.৮০ কোটি ঘনফুট, যা ২০২৬ সালের জুন নাগাদ কমে ১৪৪.১০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে।
এই গ্যাস সংকটের ধাক্কায় গাজীপুরের কোনাবাড়ী, চন্দ্রা, সাভার, আশুলিয়া, মানিকগঞ্জ ও রূপগঞ্জের শিল্পকারখানাগুলো এখন আংশিক বা অর্ধেক ক্ষমতায় চলছে, যা দেশের উৎপাদন খাতকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে।
বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ আর বাড়ানো সম্ভব নয়—এটি নিশ্চিত হওয়ার পর সরকার আবাসিক খাতে নতুন করে বড় বিনিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে:
১. এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১৭ লাখ ৫০ হাজার গ্রাহকের ঘরে প্রি-পেইড মিটার বসানোর প্রকল্পটি বাতিল করা হয়েছে।
২. পাইপের লিকেজ মেরামত, দুর্ঘটনা এড়ানো এবং ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে পুরনো পাইপলাইন তুলে ২,৭০০ কিলোমিটার নতুন লাইন বসানোর জন্য অনুমোদিত ৮,১৬০ কোটি টাকার পুনর্বাসন প্রকল্পটি চূড়ান্ত মুহূর্তে বন্ধ করে দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
বর্তমানে দেশে প্রতিমাসে ১ লাখ ৬০ হাজার টনের বেশি এলপিজি ব্যবহৃত হয়। এর মাত্র ৩-৪ শতাংশ দেয় সরকারি কোম্পানি, আর বাকি ৯৬ শতাংশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র ৮-১০টি বেসরকারি আমদানিকারক সিন্ডিকেট। এই একচেটিয়া বাজার ভাঙতে সরকার বড় ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করেছে:
মোংলা ও এলেঙ্গা প্ল্যান্ট: মোংলায় ৬.৫ একর এবং এলেঙ্গায় ৭ একর জমিতে এলপিজির বোটলিং প্ল্যান্ট ও বিশাল মজুত ট্যাংক নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে, যার সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।
মাতারবাড়ী টার্মিনাল: মাতারবাড়ীতে একটি স্থায়ী ল্যান্ডবেইজড এলপিজি টার্মিনাল করা হচ্ছে, যেখান থেকে বছরে ১২ লাখ টন এলপিজি সরবরাহ করা যাবে। পাশাপাশি জাহাজ থেকে সরাসরি খালাসের জন্য (STS পদ্ধতি) একটি ভাসমান টার্মিনালও করা হবে।
চট্টগ্রাম বে-টার্মিনাল: চট্টগ্রামের বে-টার্মিনাল এলাকায় ২৫ হেক্টর জমিতে বার্ষিক ১২ লাখ টন ধারণক্ষমতার আরও একটি বিশাল এলপিজি মজুত টার্মিনাল গড়ে তোলার মেগা প্ল্যান হাতে নিয়েছে সরকার।
2.png)