ইসলাম ও জীবন
সফর মাসের শেষ বুধবার এলেই উপমহাদেশীয় মুসলিম সমাজে ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। কোথাও চলে নফল ইবাদতের প্রস্তুতি, কোথাও আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকে ছুটি। তবে সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে—ইসলামের দৃষ্টিতে এই দিনের শরিয়তি অবস্থান আসলে কী?
ফারসি শব্দগুচ্ছ ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ অর্থ মূলত সফর মাসের শেষ বুধবার। ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়েছে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের শেষ অসুস্থতার একপর্যায়ে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। এই ঘটনাকে স্মরণ করেই পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশে দিনটি পালনের রেওয়াজ তৈরি হয়। তবে ইসলামি স্কলারদের মতে, নবীজির অসুস্থতা ও জীবনের শেষ সময়ের ঘটনাগুলো ইতিহাসের অংশ হলেও, এই দিনটিকে শরিয়ত নির্ধারিত কোনো বিশেষ ধর্মীয় উৎসব বা ইবাদতের দিন হিসেবে ঘোষণা করার পক্ষে কোরআন বা সহিহ হাদিসে কোনো সুস্পষ্ট দলিল নেই।
সহিহ হাদিসে এসেছে, নবীজির শেষ অসুস্থতা এতটাই গুরুতর ছিল যে তিনি নিজেই আবু বকর (রা.)-কে জামাতে ইমামতি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার সাময়িক উন্নতির পর তাঁর গোসল করার বর্ণনাও পাওয়া যায়। এসব ঘটনা থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—জীবনের শেষ মুহূর্তেও নবীজির কাছে সালাত বা নামাজ কতটা গুরুত্ব বহন করত। তাই একজন মুমিনের জন্য এই দিনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হওয়া উচিত প্রিয় নবীর সেই জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা গ্রহণ করা।
শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো দিন ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বা মানুষ তা স্মরণে রাখতে পারে, কিন্তু সেটিকে শরিয়ত নির্ধারিত ইবাদতের দিন বলতে হলে নির্ভরযোগ্য দলিল প্রয়োজন। সফর মাসের শেষ বুধবারে নির্দিষ্ট কোনো আমল বা বিশেষ নামাজকে সুন্নত হিসেবে প্রচার করার কোনো ভিত্তি নেই। তবে এদিন একজন মুসলমান সাধারণ দিনের মতো পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ পাঠ, নফল ইবাদত ও দান-সদকা করতেই পারেন। এগুলো ইসলামে সর্বদাই স্বীকৃত ভালো কাজ, তবে এগুলোকে আখেরি চাহার সোম্বার জন্য আবশ্যিক বিশেষ আমল বলা ভুল হবে।
পাশাপাশি সফর মাস নিয়ে সমাজে কিছু কুসংস্কার রয়েছে। ইসলাম আসার আগে আরব সমাজে এই মাসকে অশুভ মনে করা হতো। কিন্তু ইসলাম এসব অমূলক ভয় ও কুসংস্কার শক্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। মুমিনের বিশ্বাস হওয়া উচিত যে, কোনো মাস বা দিন কারও ক্ষতি করতে পারে না; সব কল্যাণ ও অকল্যাণের মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ।
বাংলাদেশে দিনটির পরিচিতি কেবল ধর্মীয় সংস্কৃতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক ছুটির কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত। সরকার বা প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে বা ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে অনেক সময় ঐচ্ছিক ছুটির ব্যবস্থা করে থাকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি থাকার অর্থ এই নয় যে দিনটি শরিয়তের কোনো ফরজ বা ওয়াজিব ইবাদতের দিন। ধর্মীয় দিবস এবং রাষ্ট্রীয় ছুটির বিষয়টিকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
সব মিলিয়ে, আখেরি চাহার সোম্বাকে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শরিয়তের মাপকাঠিতে আলাদাভাবে দেখা উচিত। এই দিনটিকে ঘিরে অতিভক্তি বা চরম অবজ্ঞা—উভয় পন্থাই পরিহার করা জরুরি। নবীজির জীবনের শেষ মুহূর্তের ত্যাগের কথা স্মরণ করে নিজের আমলের হিসাব নেওয়া, পরিবারের হক আদায় করা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমেই দিনটিকে সুন্দর ও অর্থবহ করে তোলা সম্ভব।
বিষয় : আখেরি চাহার সোম্বা
2.png)
বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ আগস্ট ২০২৬
সফর মাসের শেষ বুধবার এলেই উপমহাদেশীয় মুসলিম সমাজে ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। কোথাও চলে নফল ইবাদতের প্রস্তুতি, কোথাও আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকে ছুটি। তবে সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে—ইসলামের দৃষ্টিতে এই দিনের শরিয়তি অবস্থান আসলে কী?
ফারসি শব্দগুচ্ছ ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ অর্থ মূলত সফর মাসের শেষ বুধবার। ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়েছে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের শেষ অসুস্থতার একপর্যায়ে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। এই ঘটনাকে স্মরণ করেই পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশে দিনটি পালনের রেওয়াজ তৈরি হয়। তবে ইসলামি স্কলারদের মতে, নবীজির অসুস্থতা ও জীবনের শেষ সময়ের ঘটনাগুলো ইতিহাসের অংশ হলেও, এই দিনটিকে শরিয়ত নির্ধারিত কোনো বিশেষ ধর্মীয় উৎসব বা ইবাদতের দিন হিসেবে ঘোষণা করার পক্ষে কোরআন বা সহিহ হাদিসে কোনো সুস্পষ্ট দলিল নেই।
সহিহ হাদিসে এসেছে, নবীজির শেষ অসুস্থতা এতটাই গুরুতর ছিল যে তিনি নিজেই আবু বকর (রা.)-কে জামাতে ইমামতি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার সাময়িক উন্নতির পর তাঁর গোসল করার বর্ণনাও পাওয়া যায়। এসব ঘটনা থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—জীবনের শেষ মুহূর্তেও নবীজির কাছে সালাত বা নামাজ কতটা গুরুত্ব বহন করত। তাই একজন মুমিনের জন্য এই দিনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হওয়া উচিত প্রিয় নবীর সেই জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা গ্রহণ করা।
শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো দিন ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বা মানুষ তা স্মরণে রাখতে পারে, কিন্তু সেটিকে শরিয়ত নির্ধারিত ইবাদতের দিন বলতে হলে নির্ভরযোগ্য দলিল প্রয়োজন। সফর মাসের শেষ বুধবারে নির্দিষ্ট কোনো আমল বা বিশেষ নামাজকে সুন্নত হিসেবে প্রচার করার কোনো ভিত্তি নেই। তবে এদিন একজন মুসলমান সাধারণ দিনের মতো পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ পাঠ, নফল ইবাদত ও দান-সদকা করতেই পারেন। এগুলো ইসলামে সর্বদাই স্বীকৃত ভালো কাজ, তবে এগুলোকে আখেরি চাহার সোম্বার জন্য আবশ্যিক বিশেষ আমল বলা ভুল হবে।
পাশাপাশি সফর মাস নিয়ে সমাজে কিছু কুসংস্কার রয়েছে। ইসলাম আসার আগে আরব সমাজে এই মাসকে অশুভ মনে করা হতো। কিন্তু ইসলাম এসব অমূলক ভয় ও কুসংস্কার শক্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। মুমিনের বিশ্বাস হওয়া উচিত যে, কোনো মাস বা দিন কারও ক্ষতি করতে পারে না; সব কল্যাণ ও অকল্যাণের মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ।
বাংলাদেশে দিনটির পরিচিতি কেবল ধর্মীয় সংস্কৃতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক ছুটির কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত। সরকার বা প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে বা ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে অনেক সময় ঐচ্ছিক ছুটির ব্যবস্থা করে থাকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি থাকার অর্থ এই নয় যে দিনটি শরিয়তের কোনো ফরজ বা ওয়াজিব ইবাদতের দিন। ধর্মীয় দিবস এবং রাষ্ট্রীয় ছুটির বিষয়টিকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
সব মিলিয়ে, আখেরি চাহার সোম্বাকে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শরিয়তের মাপকাঠিতে আলাদাভাবে দেখা উচিত। এই দিনটিকে ঘিরে অতিভক্তি বা চরম অবজ্ঞা—উভয় পন্থাই পরিহার করা জরুরি। নবীজির জীবনের শেষ মুহূর্তের ত্যাগের কথা স্মরণ করে নিজের আমলের হিসাব নেওয়া, পরিবারের হক আদায় করা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমেই দিনটিকে সুন্দর ও অর্থবহ করে তোলা সম্ভব।
2.png)