বাংলাদেশ
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলাদেশের মাটির প্রতিটি ধূলিকণায় ধর্মীয় সম্প্রীতির সুর মিশে আছে। রাজধানী ঢাকার গেন্ডারিয়ার স্বামীবাগের ৭৯ নম্বর ঠিকানায় শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দির বা ইসকন মন্দিরের ঠিক বিপরীতেই দাঁড়িয়ে আছে ৩৫০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক স্বামীবাগ জামে মসজিদ। এটি কেবল দুটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের সান্নিধ্য নয়, বরং বহু শতাব্দীর সামাজিক মেলবন্ধনের এক জীবন্ত দলিল। শুধু ঢাকা নয়, লালমনিরহাটের কালিবাড়ির পুরান বাজার জামে মসজিদ ও মন্দির, মৌলভীবাজারের জুড়ির ভূয়াই বাজার, টাঙ্গাইলের নাগরপুর চৌধুরী বাড়ি কিংবা নারায়ণগঞ্জ সোনারগাঁয়ের ইউসুফগঞ্জ—এমন বহু দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে সারা দেশে। কোথাও একই আঙিনায়, কোথাও বা একই ফটক দিয়ে ভিন্ন ধর্মের মানুষ নিজ নিজ উপাসনালয়ে প্রবেশ করছেন। শত বছর ধরে এভাবেই এক ছায়াতলে চলছে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, যা বাংলাদেশের চিরায়ত সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তবে ধর্মীয় সম্প্রীতির এই দীর্ঘ ইতিহাসের বিপরীতে বর্তমানে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি দৃশ্যমান। একটি বিশেষ গোষ্ঠী বা মহলকে প্রায়ই বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজপথে দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র থেকে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু গোষ্ঠী কি বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় পিছিয়ে? পরিসংখ্যান বলছে উল্টো কথা।
বর্তমানে দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য রাষ্ট্র যে পরিমাণ পৃষ্ঠপোষকতা করছে, তা নজিরবিহীন। দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে ৩২ হাজার মন্দিরে ৫ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে বছরে ১৪০ কোটি টাকার বেশি অর্থায়ন, আর ইমাম-মুয়াজ্জিনের পাশাপাশি পুরোহিত, ভিক্ষু, পাদ্রীদের মাসিক ভাতার ব্যবস্থা—এর সবই রাষ্ট্রীয় অসাম্প্রদায়িক কাঠামোর প্রমাণ। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বড়দিন, বুদ্ধ পূর্ণিমা, জন্মাষ্টমীর মতো বড় উৎসবে ছুটি এবং নিজ ধর্মের জন্য ঐচ্ছিক ছুটি ভোগ করার সুযোগ কেবল বাংলাদেশেই সম্ভব। এমনকি উৎসব বোনাসের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র আজ সকল ধর্মের নাগরিককে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
এমন উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশে দাঁড়িয়েও যখন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী 'অধিকারের' নামে রাজপথে নামে, তখন তাদের দাবি নিয়ে জনমনে সন্দেহের উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক। বিশ্লেষকদের মতে, এদের এই আন্দোলন ধর্মীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার চেয়ে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ বেশি। অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা এবং উগ্রবাদকে পুঁজি করে বিদেশি শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাই যেন তাদের মূল লক্ষ্য।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এরা শান্তিপ্রিয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে চায়। ধর্মীয় অধিকারের কথা বলে আসলে তারা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এবং জাতীয় স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করতে তৎপর। নাগরিক অধিকার নিশ্চিত থাকলেও, যারা রাষ্ট্রের এই উদারতাকে অস্বীকার করে বিদেশনির্ভর রাজনীতিতে লিপ্ত, তারা প্রকারান্তরে দেশের সকল ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকেই হুমকির মুখে ফেলছে। দেশের শান্তিপ্রিয় নাগরিকরা মনে করেন, সম্প্রীতির এই চিরচেনা বাংলাদেশে উস্কানিমূলক রাজনীতির কোনো স্থান নেই। যেসব উগ্রবাদী ব্যক্তি বা সংগঠন ধর্মীয় সম্প্রীতির বিরুদ্ধে কথা বলার বা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টায় লিপ্ত তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। তারা কারো এজেন্ডা বাস্তবায়নে লিপ্ত কি না তা আইনিপদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। রাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে অঙ্কুরেই দমনের অভিমত সচেতন মহলের।
বিষয় : বাংলাদেশ সম্প্রীতি হিন্দু মুসলিম চৈতালি
2.png)
রোববার, ২১ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলাদেশের মাটির প্রতিটি ধূলিকণায় ধর্মীয় সম্প্রীতির সুর মিশে আছে। রাজধানী ঢাকার গেন্ডারিয়ার স্বামীবাগের ৭৯ নম্বর ঠিকানায় শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দির বা ইসকন মন্দিরের ঠিক বিপরীতেই দাঁড়িয়ে আছে ৩৫০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক স্বামীবাগ জামে মসজিদ। এটি কেবল দুটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের সান্নিধ্য নয়, বরং বহু শতাব্দীর সামাজিক মেলবন্ধনের এক জীবন্ত দলিল। শুধু ঢাকা নয়, লালমনিরহাটের কালিবাড়ির পুরান বাজার জামে মসজিদ ও মন্দির, মৌলভীবাজারের জুড়ির ভূয়াই বাজার, টাঙ্গাইলের নাগরপুর চৌধুরী বাড়ি কিংবা নারায়ণগঞ্জ সোনারগাঁয়ের ইউসুফগঞ্জ—এমন বহু দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে সারা দেশে। কোথাও একই আঙিনায়, কোথাও বা একই ফটক দিয়ে ভিন্ন ধর্মের মানুষ নিজ নিজ উপাসনালয়ে প্রবেশ করছেন। শত বছর ধরে এভাবেই এক ছায়াতলে চলছে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, যা বাংলাদেশের চিরায়ত সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তবে ধর্মীয় সম্প্রীতির এই দীর্ঘ ইতিহাসের বিপরীতে বর্তমানে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি দৃশ্যমান। একটি বিশেষ গোষ্ঠী বা মহলকে প্রায়ই বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজপথে দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র থেকে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু গোষ্ঠী কি বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় পিছিয়ে? পরিসংখ্যান বলছে উল্টো কথা।
বর্তমানে দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য রাষ্ট্র যে পরিমাণ পৃষ্ঠপোষকতা করছে, তা নজিরবিহীন। দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে ৩২ হাজার মন্দিরে ৫ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে বছরে ১৪০ কোটি টাকার বেশি অর্থায়ন, আর ইমাম-মুয়াজ্জিনের পাশাপাশি পুরোহিত, ভিক্ষু, পাদ্রীদের মাসিক ভাতার ব্যবস্থা—এর সবই রাষ্ট্রীয় অসাম্প্রদায়িক কাঠামোর প্রমাণ। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বড়দিন, বুদ্ধ পূর্ণিমা, জন্মাষ্টমীর মতো বড় উৎসবে ছুটি এবং নিজ ধর্মের জন্য ঐচ্ছিক ছুটি ভোগ করার সুযোগ কেবল বাংলাদেশেই সম্ভব। এমনকি উৎসব বোনাসের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র আজ সকল ধর্মের নাগরিককে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
এমন উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশে দাঁড়িয়েও যখন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী 'অধিকারের' নামে রাজপথে নামে, তখন তাদের দাবি নিয়ে জনমনে সন্দেহের উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক। বিশ্লেষকদের মতে, এদের এই আন্দোলন ধর্মীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার চেয়ে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ বেশি। অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা এবং উগ্রবাদকে পুঁজি করে বিদেশি শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাই যেন তাদের মূল লক্ষ্য।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এরা শান্তিপ্রিয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে চায়। ধর্মীয় অধিকারের কথা বলে আসলে তারা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এবং জাতীয় স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করতে তৎপর। নাগরিক অধিকার নিশ্চিত থাকলেও, যারা রাষ্ট্রের এই উদারতাকে অস্বীকার করে বিদেশনির্ভর রাজনীতিতে লিপ্ত, তারা প্রকারান্তরে দেশের সকল ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকেই হুমকির মুখে ফেলছে। দেশের শান্তিপ্রিয় নাগরিকরা মনে করেন, সম্প্রীতির এই চিরচেনা বাংলাদেশে উস্কানিমূলক রাজনীতির কোনো স্থান নেই। যেসব উগ্রবাদী ব্যক্তি বা সংগঠন ধর্মীয় সম্প্রীতির বিরুদ্ধে কথা বলার বা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টায় লিপ্ত তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। তারা কারো এজেন্ডা বাস্তবায়নে লিপ্ত কি না তা আইনিপদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। রাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে অঙ্কুরেই দমনের অভিমত সচেতন মহলের।
2.png)