বাংলাদেশ
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে ঋণের টাকায় বোনা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যেতে দেখে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ষাটোর্ধ্ব কৃষক আক্তার হোসেন; পরিবারে বইছে শোকের মাতম।
মাঠভর্তি সোনালী ধান দুলছিল বাতাসে। কৃষক আক্তার হোসেনের চোখে ছিল সুখের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন দিয়ে মিটাবেন দেড় লাখ টাকার ঋণের বোঝা, সারাবছরের অন্নের সংস্থান হবে পরিবারের। কিন্তু প্রকৃতির নিষ্ঠুর খেয়ালে মুহূর্তেই সেই স্বপ্ন পরিণত হলো বিষাদে। চোখের সামনে নিজের তিল তিল করে গড়ে তোলা সোনার ফসল পানির নিচে তলিয়ে যেতে দেখে সইতে পারলেন না ষাট বছর বয়সী এই কৃষক। মাঠেই লুটিয়ে পড়লেন তিনি, আর সন্ধ্যায় চিরতরে বিদায় নিলেন পৃথিবী থেকে।
শনিবার (২ মে) সন্ধ্যায় কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আক্তার হোসেন। তিনি উপজেলার দেওঘর ইউনিয়নের আলীনগর পশ্চিম পাড়ার মৃত দুধা মিয়ার ছেলে। তার এই আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি। আক্তার হোসেন এবার প্রায় ৩ একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। স্থানীয়রা জানান, জমি চাষ থেকে শুরু করে সার ও বীজ কেনা বাবদ বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। ফলনও হয়েছিল বেশ ভালো। আশা ছিল, এই ধান বিক্রি করে ঋণের টাকা পরিশোধ করবেন।
শনিবার বিকেলে তিনি মাঠে গিয়েছিলেন নিজের শেষ সম্বলটুকু দেখতে। সেখানে গিয়ে দেখেন, তার কষ্টের ফসল এখন কেবলই অথৈ জলরাশি। বৃষ্টির তোড়ে আর পাহাড়ি ঢলের ধাক্কায় বুক সমান পানির নিচে তলিয়ে গেছে পাকা ধান। কিছু ধান কাটতে পারলেও পরিবহনের অভাবে সেগুলো বাড়িতে নিতে পারেননি তিনি। শ্রমিকের অভাব আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে নিজের অসহায়ত্ব দেখে মাঠেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি।
তার ভাতিজা তৌহিদ কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “চাচা দেড় লাখ টাকা ঋণ করে চাষ করেছিলেন। পানির নিচে ধান চলে যাওয়া দেখে তিনি মানসিকভাবে পুরো ভেঙে পড়েন। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জমিতেই তিনি জ্ঞান হারান। আমরা দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও ডাক্তার তাকে আর ফিরিয়ে আনতে পারেননি।”
দেওঘর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য নাছিমা আক্তার এই মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে বলেন, “আক্তার হোসেন ছিলেন একজন পরিশ্রমী কৃষক। পাকা ধানের জমি পানিতে ডুবে যাওয়া দেখে তিনি প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পান। হাসপাতালে নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, এটি এই অঞ্চলের কৃষকদের বর্তমান অসহায়ত্বের একটি প্রতিচ্ছবি।”
গ্রামের বাসিন্দারা জানান, এই সময়টি হাওড় অঞ্চলের কৃষকদের জন্য সবচেয়ে খুশির হওয়ার কথা ছিল। অথচ ঘরে ধান তোলার বদলে তাদের এখন সলিল সমাধি দেখতে হচ্ছে। আক্তার হোসেনের মতো এমন অনেক কৃষকই এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চলে পরিস্থিতির দিন দিন অবনতি হচ্ছে। জেলা কৃষি বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উজানের ঢলে আজ নতুন করে আরও প্রায় ২ হাজার হেক্টর বোরো ধানের জমি তলিয়ে গেছে। বর্তমানে জেলায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায়।
হাওড়ের কৃষকরা বলছেন, একদিকে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়া—সব মিলিয়ে তারা এক অসম লড়াইয়ে নেমেছেন। অনেক ক্ষেত্রে আধপাকা ধান কেটে আনার চেষ্টা চললেও পানির স্রোতের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আকস্মিক এই বন্যায় কৃষকদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদী সরকারি সহায়তা ও ঋণের কিস্তি স্থগিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
আক্তার হোসেনের শূন্য গোয়াল আর পানির নিচে থাকা ফসলের মাঠ এখন কেবলই হাহাকার জাগাচ্ছে। এক বুক আশা নিয়ে লাঙল ধরা এই মানুষটি চলে গেলেন, কিন্তু পেছনে রেখে গেলেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চল এখন শুধু পানিতে নয়, কৃষকের চোখের জলেও ভাসছে।

রোববার, ০৩ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ মে ২০২৬
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে ঋণের টাকায় বোনা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যেতে দেখে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ষাটোর্ধ্ব কৃষক আক্তার হোসেন; পরিবারে বইছে শোকের মাতম।
মাঠভর্তি সোনালী ধান দুলছিল বাতাসে। কৃষক আক্তার হোসেনের চোখে ছিল সুখের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন দিয়ে মিটাবেন দেড় লাখ টাকার ঋণের বোঝা, সারাবছরের অন্নের সংস্থান হবে পরিবারের। কিন্তু প্রকৃতির নিষ্ঠুর খেয়ালে মুহূর্তেই সেই স্বপ্ন পরিণত হলো বিষাদে। চোখের সামনে নিজের তিল তিল করে গড়ে তোলা সোনার ফসল পানির নিচে তলিয়ে যেতে দেখে সইতে পারলেন না ষাট বছর বয়সী এই কৃষক। মাঠেই লুটিয়ে পড়লেন তিনি, আর সন্ধ্যায় চিরতরে বিদায় নিলেন পৃথিবী থেকে।
শনিবার (২ মে) সন্ধ্যায় কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আক্তার হোসেন। তিনি উপজেলার দেওঘর ইউনিয়নের আলীনগর পশ্চিম পাড়ার মৃত দুধা মিয়ার ছেলে। তার এই আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি। আক্তার হোসেন এবার প্রায় ৩ একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। স্থানীয়রা জানান, জমি চাষ থেকে শুরু করে সার ও বীজ কেনা বাবদ বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। ফলনও হয়েছিল বেশ ভালো। আশা ছিল, এই ধান বিক্রি করে ঋণের টাকা পরিশোধ করবেন।
শনিবার বিকেলে তিনি মাঠে গিয়েছিলেন নিজের শেষ সম্বলটুকু দেখতে। সেখানে গিয়ে দেখেন, তার কষ্টের ফসল এখন কেবলই অথৈ জলরাশি। বৃষ্টির তোড়ে আর পাহাড়ি ঢলের ধাক্কায় বুক সমান পানির নিচে তলিয়ে গেছে পাকা ধান। কিছু ধান কাটতে পারলেও পরিবহনের অভাবে সেগুলো বাড়িতে নিতে পারেননি তিনি। শ্রমিকের অভাব আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে নিজের অসহায়ত্ব দেখে মাঠেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি।
তার ভাতিজা তৌহিদ কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “চাচা দেড় লাখ টাকা ঋণ করে চাষ করেছিলেন। পানির নিচে ধান চলে যাওয়া দেখে তিনি মানসিকভাবে পুরো ভেঙে পড়েন। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জমিতেই তিনি জ্ঞান হারান। আমরা দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও ডাক্তার তাকে আর ফিরিয়ে আনতে পারেননি।”
দেওঘর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য নাছিমা আক্তার এই মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে বলেন, “আক্তার হোসেন ছিলেন একজন পরিশ্রমী কৃষক। পাকা ধানের জমি পানিতে ডুবে যাওয়া দেখে তিনি প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পান। হাসপাতালে নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, এটি এই অঞ্চলের কৃষকদের বর্তমান অসহায়ত্বের একটি প্রতিচ্ছবি।”
গ্রামের বাসিন্দারা জানান, এই সময়টি হাওড় অঞ্চলের কৃষকদের জন্য সবচেয়ে খুশির হওয়ার কথা ছিল। অথচ ঘরে ধান তোলার বদলে তাদের এখন সলিল সমাধি দেখতে হচ্ছে। আক্তার হোসেনের মতো এমন অনেক কৃষকই এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চলে পরিস্থিতির দিন দিন অবনতি হচ্ছে। জেলা কৃষি বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উজানের ঢলে আজ নতুন করে আরও প্রায় ২ হাজার হেক্টর বোরো ধানের জমি তলিয়ে গেছে। বর্তমানে জেলায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায়।
হাওড়ের কৃষকরা বলছেন, একদিকে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়া—সব মিলিয়ে তারা এক অসম লড়াইয়ে নেমেছেন। অনেক ক্ষেত্রে আধপাকা ধান কেটে আনার চেষ্টা চললেও পানির স্রোতের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আকস্মিক এই বন্যায় কৃষকদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদী সরকারি সহায়তা ও ঋণের কিস্তি স্থগিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
আক্তার হোসেনের শূন্য গোয়াল আর পানির নিচে থাকা ফসলের মাঠ এখন কেবলই হাহাকার জাগাচ্ছে। এক বুক আশা নিয়ে লাঙল ধরা এই মানুষটি চলে গেলেন, কিন্তু পেছনে রেখে গেলেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চল এখন শুধু পানিতে নয়, কৃষকের চোখের জলেও ভাসছে।
