বাংলাদেশের মানচিত্রে উত্তর থেকে দক্ষিণ—এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তকে যুক্ত করতে শুরু হয়েছে এক মহাযজ্ঞ। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও সর্ববৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প 'তেঁতুলিয়া-টেকনাফ ইকোনমিক করিডোর' (TTEC) এর কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে নিতে শুরু করেছে বর্তমান বিএনপি সরকার। প্রায় ৭৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত হতে যাওয়া এই প্রকল্পটি কেবল একটি রাস্তা নয়, বরং একে বলা হচ্ছে বাংলাদেশের আগামীর অর্থনীতির 'লাইফলাইন'।
এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB)-এর অর্থায়নে এই মেগা প্রকল্পে থাকছে সুপার এশিয়ান হাইওয়ে, হাই-স্পিড রেলওয়ে এবং করিডোর সংলগ্ন আধুনিক শিল্পাঞ্চল। দীর্ঘ ২০ বছরের একটি মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই বিনিয়োগ আসবে। প্রথম ৩ বছরে ২০ বিলিয়ন, পরবর্তী ৭ বছরে ৪৫ বিলিয়ন এবং শেষ ১০ বছরে ১৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কানেক্টিভিটির নতুন দিগন্ত: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গেটওয়ে
এই করিডোরটি মূলত একটি ল্যান্ডব্রিজ হিসেবে কাজ করবে। এটি একদিকে চীনের দক্ষিণাঞ্চল, নেপাল, ভুটান ও ভারতকে যুক্ত করবে; অন্যদিকে মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের মতো আসিয়ান দেশগুলোর বিশাল বাজারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করবে। এর ফলে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমিয়ে আনা। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের যেকোনো প্রান্তের কার্গো বা পণ্যবাহী যান মাত্র ১০ ঘণ্টার মধ্যে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পৌঁছাতে পারবে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সরাসরি কৃষি ও রপ্তানি খাতে। বর্তমানে উত্তরবঙ্গের কৃষিপণ্য ঢাকাসহ বন্দরনগরীগুলোতে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, যার ফলে অনেক পণ্য নষ্ট হয়। এই করিডোর চালু হলে রাজশাহীর আম কিংবা দিনাজপুরের লিচু গাছ থেকে নামানোর ১০ ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানো সম্ভব হবে, যা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ফল ও সবজি রপ্তানি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
অর্থনৈতিক রূপান্তর ও শিল্পায়নের মহাবিপ্লব
টিটিইসি (TTEC) করিডোরকে কেন্দ্র করে এর ১০০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে গড়ে তোলা হবে অত্যাধুনিক সব অর্থনৈতিক অঞ্চল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই করিডোর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি হবে শিল্পায়নের মেরুদণ্ড। করিডোর সংলগ্ন এলাকাগুলোতে হাই-ভ্যালু কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, প্রতি বছর দেশে যে বিপুল পরিমাণ আলু উদ্বৃত্ত থাকে বা পচে যায়, তা থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রেড স্টার্চ এবং অ্যালকোহল তৈরির কারখানা স্থাপন করা হবে। ফলে সাধারণ আলু রূপান্তরিত হবে উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্যে। এছাড়া এই করিডোরের সমান্তরালে বসানো হবে সোলার প্যানেল। ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোর থেকে প্রায় ১৫০০ থেকে ২৫০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যা একটি বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতার সমান।
বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে এই করিডোর ঘিরেই সেমিকন্ডাক্টর এবং ইলেকট্রনিক চিপ তৈরির কারখানা স্থাপন করার। হাই-স্পিড ইলেকট্রিক ট্রেন ও কার্গো ব্যবস্থা থাকার ফলে উৎপাদিত চিপ বা মাইক্রোপ্রসেসর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বন্দরে পৌঁছে দেওয়া যাবে। এটি বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান ও আগামীর সম্ভাবনা
এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই করিডোর চালু হলে ২০৫০ সালের মধ্যে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অর্থনৈতিক আউটপুট বর্তমানের ৩২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৮৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। অর্থাৎ আগামী দুই দশকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে প্রায় ৯ গুণ।
প্রকল্পের প্রভাব সম্পর্কে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই করিডোরটি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অতিরিক্ত ১.৫% থেকে ২% যোগ করবে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এটি এক বিশাল মাইলফলক হতে যাচ্ছে। ২০৩৬ সালের মধ্যে করিডোর সংলগ্ন এলাকায় ৭০ লাখ থেকে ১.৫ কোটি মানুষের নতুন কর্মসংস্থান হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ২০৫০ সাল নাগাদ এই অঞ্চলের মানুষের মাথাপিছু আয় ১২,০০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
পাঁচটি বিভাগকে এক সুতায় গাঁথা
এই মেগা করিডোরটি সরাসরি দেশের পাঁচটি বিভাগকে সংযুক্ত করবে: চট্টগ্রাম (টেকনাফ/কক্সবাজার), ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী এবং রংপুর (তেঁতুলিয়া/পঞ্চগড়)। এই বিশাল ভৌগোলিক এলাকা যখন একটি উচ্চগতির নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে, তখন সুষম উন্নয়ন আর কেবল স্বপ্ন থাকবে না।
রেলপথের আধুনিকায়ন, সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বহুমুখী শিল্পায়নের এই সমন্বিত মডেল বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার পথে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে এই প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন হলে আগামী এক দশকের মধ্যেই বদলে যাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালচিত্র।

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬
বাংলাদেশের মানচিত্রে উত্তর থেকে দক্ষিণ—এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তকে যুক্ত করতে শুরু হয়েছে এক মহাযজ্ঞ। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও সর্ববৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প 'তেঁতুলিয়া-টেকনাফ ইকোনমিক করিডোর' (TTEC) এর কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে নিতে শুরু করেছে বর্তমান বিএনপি সরকার। প্রায় ৭৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত হতে যাওয়া এই প্রকল্পটি কেবল একটি রাস্তা নয়, বরং একে বলা হচ্ছে বাংলাদেশের আগামীর অর্থনীতির 'লাইফলাইন'।
এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB)-এর অর্থায়নে এই মেগা প্রকল্পে থাকছে সুপার এশিয়ান হাইওয়ে, হাই-স্পিড রেলওয়ে এবং করিডোর সংলগ্ন আধুনিক শিল্পাঞ্চল। দীর্ঘ ২০ বছরের একটি মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই বিনিয়োগ আসবে। প্রথম ৩ বছরে ২০ বিলিয়ন, পরবর্তী ৭ বছরে ৪৫ বিলিয়ন এবং শেষ ১০ বছরে ১৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কানেক্টিভিটির নতুন দিগন্ত: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গেটওয়ে
এই করিডোরটি মূলত একটি ল্যান্ডব্রিজ হিসেবে কাজ করবে। এটি একদিকে চীনের দক্ষিণাঞ্চল, নেপাল, ভুটান ও ভারতকে যুক্ত করবে; অন্যদিকে মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের মতো আসিয়ান দেশগুলোর বিশাল বাজারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করবে। এর ফলে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমিয়ে আনা। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের যেকোনো প্রান্তের কার্গো বা পণ্যবাহী যান মাত্র ১০ ঘণ্টার মধ্যে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পৌঁছাতে পারবে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সরাসরি কৃষি ও রপ্তানি খাতে। বর্তমানে উত্তরবঙ্গের কৃষিপণ্য ঢাকাসহ বন্দরনগরীগুলোতে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, যার ফলে অনেক পণ্য নষ্ট হয়। এই করিডোর চালু হলে রাজশাহীর আম কিংবা দিনাজপুরের লিচু গাছ থেকে নামানোর ১০ ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানো সম্ভব হবে, যা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ফল ও সবজি রপ্তানি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
অর্থনৈতিক রূপান্তর ও শিল্পায়নের মহাবিপ্লব
টিটিইসি (TTEC) করিডোরকে কেন্দ্র করে এর ১০০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে গড়ে তোলা হবে অত্যাধুনিক সব অর্থনৈতিক অঞ্চল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই করিডোর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি হবে শিল্পায়নের মেরুদণ্ড। করিডোর সংলগ্ন এলাকাগুলোতে হাই-ভ্যালু কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, প্রতি বছর দেশে যে বিপুল পরিমাণ আলু উদ্বৃত্ত থাকে বা পচে যায়, তা থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রেড স্টার্চ এবং অ্যালকোহল তৈরির কারখানা স্থাপন করা হবে। ফলে সাধারণ আলু রূপান্তরিত হবে উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্যে। এছাড়া এই করিডোরের সমান্তরালে বসানো হবে সোলার প্যানেল। ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোর থেকে প্রায় ১৫০০ থেকে ২৫০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যা একটি বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতার সমান।
বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে এই করিডোর ঘিরেই সেমিকন্ডাক্টর এবং ইলেকট্রনিক চিপ তৈরির কারখানা স্থাপন করার। হাই-স্পিড ইলেকট্রিক ট্রেন ও কার্গো ব্যবস্থা থাকার ফলে উৎপাদিত চিপ বা মাইক্রোপ্রসেসর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বন্দরে পৌঁছে দেওয়া যাবে। এটি বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান ও আগামীর সম্ভাবনা
এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই করিডোর চালু হলে ২০৫০ সালের মধ্যে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অর্থনৈতিক আউটপুট বর্তমানের ৩২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৮৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। অর্থাৎ আগামী দুই দশকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে প্রায় ৯ গুণ।
প্রকল্পের প্রভাব সম্পর্কে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই করিডোরটি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অতিরিক্ত ১.৫% থেকে ২% যোগ করবে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এটি এক বিশাল মাইলফলক হতে যাচ্ছে। ২০৩৬ সালের মধ্যে করিডোর সংলগ্ন এলাকায় ৭০ লাখ থেকে ১.৫ কোটি মানুষের নতুন কর্মসংস্থান হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ২০৫০ সাল নাগাদ এই অঞ্চলের মানুষের মাথাপিছু আয় ১২,০০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
পাঁচটি বিভাগকে এক সুতায় গাঁথা
এই মেগা করিডোরটি সরাসরি দেশের পাঁচটি বিভাগকে সংযুক্ত করবে: চট্টগ্রাম (টেকনাফ/কক্সবাজার), ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী এবং রংপুর (তেঁতুলিয়া/পঞ্চগড়)। এই বিশাল ভৌগোলিক এলাকা যখন একটি উচ্চগতির নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে, তখন সুষম উন্নয়ন আর কেবল স্বপ্ন থাকবে না।
রেলপথের আধুনিকায়ন, সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বহুমুখী শিল্পায়নের এই সমন্বিত মডেল বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার পথে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে এই প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন হলে আগামী এক দশকের মধ্যেই বদলে যাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালচিত্র।
