আন্তর্জাতিক
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে উত্তেজনা যখন চরমে, তখনই ইরানের বিরুদ্ধে আরও একদফা কঠোর অবস্থান নিল যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের ড্রোন কর্মসূচি ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত থাকার অভিযোগে দেশটির ৩৫ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন প্রশাসন। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইরানের হয়ে প্রক্সি যুদ্ধে ইন্ধন দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় (ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট) থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞার মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইরানের সামরিক খাতের অর্থনৈতিক উৎসগুলো বন্ধ করে দেওয়া। বিশেষ করে দেশটির ড্রোন ও মিসাইল প্রযুক্তিতে যারা যন্ত্রাংশ এবং অর্থ সরবরাহ করত, তাদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে এসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আর্থিক ব্যবস্থার সুবিধা নিতে পারবে না এবং মার্কিন কোনো নাগরিক বা সংস্থার সাথে ব্যবসায়িক লেনদেন করতে পারবে না।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান গত কয়েক বছরে তাদের ড্রোন প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। এসব ড্রোন কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ওয়াশিংটন মনে করছে, এই ৩৫টি টার্গেট আসলে ইরানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) একটি অদৃশ্য নেটওয়ার্কের অংশ।
এই নেটওয়ার্কটি মূলত এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছদ্মবেশে ব্যবসা পরিচালনা করত। তারা এমন সব ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ আমদানি করত, যা সরাসরি ব্যালিস্টিক মিসাইল ও কামিকাজে ড্রোন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এই নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে আমরা তেহরানকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই—তাদের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আঞ্চলিক অস্থিরতা ছড়ানোর প্রচেষ্টাকে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেওয়া হবে না।
নিষেধাজ্ঞার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর তেহরান থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, ওয়াশিংটন আলোচনার পথ বন্ধ করে দিয়ে পুনরায় ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের সেই পুরোনো নীতিতে ফিরে যাচ্ছে, যা অতীতেও সফল হয়নি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, ওয়াশিংটন আলোচনার পথ বন্ধ করে দিয়ে পুনরায় ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের সেই পুরোনো নীতিতে ফিরে যাচ্ছে, যা অতীতেও সফল হয়নি। তেহরানের একজন মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেছেন, এ ধরনের একতরফা নিষেধাজ্ঞা ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত এবং এর মাধ্যমে ইরানকে তার প্রতিরক্ষা কর্মসূচি থেকে বিচ্যুত করা যাবে না।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছে তাদের মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলো। বিশেষ করে ইসরায়েল ও সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের ড্রোন কর্মসূচির ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের সাথে পশ্চিমা দেশগুলোর পারমাণবিক চুক্তির (JCPOA) পুনর্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়ল।
অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে চাপ তৈরি করলেও তা দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ ইরান গত কয়েক দশকে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামরিক বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। তবে এবারের তালিকায় নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিবর্গকে অন্তর্ভুক্ত করায় তাদের আন্তর্জাতিক যাতায়াত এবং গোপন ব্যাংকিং লেনদেন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর অবস্থান কেবল ইরানের জন্যই নয়, বরং তেহরানের সাথে ব্যবসা করা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্যও একটি সর্তকবার্তা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াশিংটন এখন সামরিক সংঘাতের চেয়ে অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমেই ইরানের লাগাম টেনে ধরতে বেশি আগ্রহী। তবে এই টানাপোড়েন মধ্যপ্রাচ্যের তেলের বাজার ও সাধারণ নিরাপত্তার ওপর কেমন প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
বিষয় : ইরান নিষেধাজ্ঞা যুদ্ধ
2.png)
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে উত্তেজনা যখন চরমে, তখনই ইরানের বিরুদ্ধে আরও একদফা কঠোর অবস্থান নিল যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের ড্রোন কর্মসূচি ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত থাকার অভিযোগে দেশটির ৩৫ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন প্রশাসন। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইরানের হয়ে প্রক্সি যুদ্ধে ইন্ধন দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় (ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট) থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞার মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইরানের সামরিক খাতের অর্থনৈতিক উৎসগুলো বন্ধ করে দেওয়া। বিশেষ করে দেশটির ড্রোন ও মিসাইল প্রযুক্তিতে যারা যন্ত্রাংশ এবং অর্থ সরবরাহ করত, তাদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে এসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আর্থিক ব্যবস্থার সুবিধা নিতে পারবে না এবং মার্কিন কোনো নাগরিক বা সংস্থার সাথে ব্যবসায়িক লেনদেন করতে পারবে না।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান গত কয়েক বছরে তাদের ড্রোন প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। এসব ড্রোন কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ওয়াশিংটন মনে করছে, এই ৩৫টি টার্গেট আসলে ইরানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) একটি অদৃশ্য নেটওয়ার্কের অংশ।
এই নেটওয়ার্কটি মূলত এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছদ্মবেশে ব্যবসা পরিচালনা করত। তারা এমন সব ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ আমদানি করত, যা সরাসরি ব্যালিস্টিক মিসাইল ও কামিকাজে ড্রোন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এই নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে আমরা তেহরানকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই—তাদের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আঞ্চলিক অস্থিরতা ছড়ানোর প্রচেষ্টাকে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেওয়া হবে না।
নিষেধাজ্ঞার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর তেহরান থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, ওয়াশিংটন আলোচনার পথ বন্ধ করে দিয়ে পুনরায় ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের সেই পুরোনো নীতিতে ফিরে যাচ্ছে, যা অতীতেও সফল হয়নি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, ওয়াশিংটন আলোচনার পথ বন্ধ করে দিয়ে পুনরায় ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের সেই পুরোনো নীতিতে ফিরে যাচ্ছে, যা অতীতেও সফল হয়নি। তেহরানের একজন মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেছেন, এ ধরনের একতরফা নিষেধাজ্ঞা ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত এবং এর মাধ্যমে ইরানকে তার প্রতিরক্ষা কর্মসূচি থেকে বিচ্যুত করা যাবে না।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছে তাদের মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলো। বিশেষ করে ইসরায়েল ও সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের ড্রোন কর্মসূচির ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের সাথে পশ্চিমা দেশগুলোর পারমাণবিক চুক্তির (JCPOA) পুনর্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়ল।
অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে চাপ তৈরি করলেও তা দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ ইরান গত কয়েক দশকে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামরিক বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। তবে এবারের তালিকায় নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিবর্গকে অন্তর্ভুক্ত করায় তাদের আন্তর্জাতিক যাতায়াত এবং গোপন ব্যাংকিং লেনদেন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর অবস্থান কেবল ইরানের জন্যই নয়, বরং তেহরানের সাথে ব্যবসা করা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্যও একটি সর্তকবার্তা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াশিংটন এখন সামরিক সংঘাতের চেয়ে অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমেই ইরানের লাগাম টেনে ধরতে বেশি আগ্রহী। তবে এই টানাপোড়েন মধ্যপ্রাচ্যের তেলের বাজার ও সাধারণ নিরাপত্তার ওপর কেমন প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
2.png)