দেশের বন্দরে একের পর এক জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ ভিড়ছে। কিন্তু ডিপোর ট্যাঙ্ক প্রায় পূর্ণ থাকায় সব জাহাজ থেকে তেল খালাস করা যাচ্ছে না। ফলে কয়েকটি জাহাজ তেল নিয়ে সাগরে অপেক্ষা করছে বলে জানা যায়।
অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে মানুষকে। অনেক ক্ষেত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মিলছে না পর্যাপ্ত জ্বালানি।
বন্দর সূত্র জানায়, বর্তমানে পাঁচটি জাহাজে প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার টন জ্বালানি তেল দেশে এসেছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার টন ডিজেল এবং ২৭ হাজার টন অকটেন রয়েছে। এরই মধ্যে দুটি জাহাজ থেকে প্রায় ৬৮ হাজার টন ডিজেল খালাস শুরু হয়েছে। ডলফিন জেটিতে নোঙর করা এমটি ওকট্রি থেকে প্রায় ৩৫ হাজার টন এবং এমটি কেপ বনি থেকে প্রায় ৩৩ হাজার টন ডিজেল নামানো হচ্ছে।
এ ছাড়া এমটি লিয়ান সং হু প্রায় ৪১ হাজার টন ডিজেল, এমটি প্যাসিফিক ইন্ডিগো প্রায় ৩৩ হাজার টন ডিজেল এবং এমটি নেভি সিয়েলো প্রায় ২৭ হাজার টন অকটেন নিয়ে বাংলাদেশের জলসীমায় অবস্থান করছে।
তবে ডিপোগুলোর সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে তেল সংরক্ষণে সমস্যা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা মেইন পয়েন্ট ইনস্টলেশনে তিনটি বিতরণ কোম্পানি ও ইস্টার্ন রিফাইনারির অকটেন সংরক্ষণ ট্যাঙ্ক প্রায় ভরে গেছে। ফলে নতুন করে অকটেন খালাসের আগে অন্য ট্যাঙ্ক খালি করার চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য বলছে, দেশে মোট অকটেন সংরক্ষণ সক্ষমতা ৫৩ হাজার ৩৬১ টন। গত ২০ এপ্রিল পর্যন্ত বিপিসির হাতে ছিল প্রায় ২৭ হাজার ৬১২ টন অকটেন। বর্তমানে আরও ২৭ হাজার টন অকটেন খালাসের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
চলতি মাসের প্রথম ১৮ দিনে দেশে ২০ হাজার ৪০৪ টন অকটেন বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে বিক্রি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৩৪ টন। এই হিসাবে বর্তমান মজুত ও জাহাজে থাকা তেল মিলিয়ে অন্তত দুই মাসের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু আমদানি নয়, দেশীয় বেসরকারি শোধনাগার থেকেও জ্বালানি সরবরাহ চলছে। চলতি মাসের প্রথম ১৯ দিনে তিনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ১৫ হাজার ১৭০ টন অকটেন সংগ্রহ করেছে বিপিসি। সব মিলিয়ে পরিসংখ্যান বলছে, দেশে জ্বালানির বড় কোনো ঘাটতি নেই।
তবুও পেট্রোল পাম্পে মানুষের ভোগান্তি কমছে না। রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি পাম্পে দেখা গেছে, পাম্পের ভেতর থেকে শুরু হয়ে যানবাহনের লাইন প্রধান সড়ক পর্যন্ত চলে গেছে। অনেক চালককে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
মোটরসাইকেল চালক মেরাজ হোসেন বলেন, বিকেল ৫টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনো তেল পাইনি।
গ্রামাঞ্চলেও একই অবস্থা। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে কৃষকেরা সেচ পাম্পের জন্য জ্বালানি নিতে পেট্রোল পাম্পে ভিড় করছেন। অনেকেই সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না।
বেলকা ইউনিয়নের কৃষক ধীরেন চন্দ্র সরকার বলেন, এখন বোরো ধানক্ষেতে নিয়মিত পানি দিতে হয়। এক দিন পরপর পানি না দিলে ধান শুকিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজনীয় তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, দেশে জ্বালানি তেলের বড় কোনো সংকট নেই। বরং অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় অতিরিক্ত তেল কেনা এবং কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুতের কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে।
গতকাল তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ডিজেল মজুত রয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৬৩৩ টন, অকটেন ২৭ হাজার ৬০২ টন, পেট্রোল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫৪ টন এবং জেট ফুয়েল ২১ হাজার ৩৮২ টন।
অবৈধ মজুত ঠেকাতে সরকার ইতিমধ্যে অভিযানও শুরু করেছে। ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত এ ধরনের ৫৩টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এতে ৪৭টি মামলায় মোট ১ কোটি ৭২ লাখ ৮০ হাজার ৭১৫ টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং ১০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬
দেশের বন্দরে একের পর এক জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ ভিড়ছে। কিন্তু ডিপোর ট্যাঙ্ক প্রায় পূর্ণ থাকায় সব জাহাজ থেকে তেল খালাস করা যাচ্ছে না। ফলে কয়েকটি জাহাজ তেল নিয়ে সাগরে অপেক্ষা করছে বলে জানা যায়।
অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে মানুষকে। অনেক ক্ষেত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মিলছে না পর্যাপ্ত জ্বালানি।
বন্দর সূত্র জানায়, বর্তমানে পাঁচটি জাহাজে প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার টন জ্বালানি তেল দেশে এসেছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার টন ডিজেল এবং ২৭ হাজার টন অকটেন রয়েছে। এরই মধ্যে দুটি জাহাজ থেকে প্রায় ৬৮ হাজার টন ডিজেল খালাস শুরু হয়েছে। ডলফিন জেটিতে নোঙর করা এমটি ওকট্রি থেকে প্রায় ৩৫ হাজার টন এবং এমটি কেপ বনি থেকে প্রায় ৩৩ হাজার টন ডিজেল নামানো হচ্ছে।
এ ছাড়া এমটি লিয়ান সং হু প্রায় ৪১ হাজার টন ডিজেল, এমটি প্যাসিফিক ইন্ডিগো প্রায় ৩৩ হাজার টন ডিজেল এবং এমটি নেভি সিয়েলো প্রায় ২৭ হাজার টন অকটেন নিয়ে বাংলাদেশের জলসীমায় অবস্থান করছে।
তবে ডিপোগুলোর সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে তেল সংরক্ষণে সমস্যা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা মেইন পয়েন্ট ইনস্টলেশনে তিনটি বিতরণ কোম্পানি ও ইস্টার্ন রিফাইনারির অকটেন সংরক্ষণ ট্যাঙ্ক প্রায় ভরে গেছে। ফলে নতুন করে অকটেন খালাসের আগে অন্য ট্যাঙ্ক খালি করার চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য বলছে, দেশে মোট অকটেন সংরক্ষণ সক্ষমতা ৫৩ হাজার ৩৬১ টন। গত ২০ এপ্রিল পর্যন্ত বিপিসির হাতে ছিল প্রায় ২৭ হাজার ৬১২ টন অকটেন। বর্তমানে আরও ২৭ হাজার টন অকটেন খালাসের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
চলতি মাসের প্রথম ১৮ দিনে দেশে ২০ হাজার ৪০৪ টন অকটেন বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে বিক্রি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৩৪ টন। এই হিসাবে বর্তমান মজুত ও জাহাজে থাকা তেল মিলিয়ে অন্তত দুই মাসের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু আমদানি নয়, দেশীয় বেসরকারি শোধনাগার থেকেও জ্বালানি সরবরাহ চলছে। চলতি মাসের প্রথম ১৯ দিনে তিনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ১৫ হাজার ১৭০ টন অকটেন সংগ্রহ করেছে বিপিসি। সব মিলিয়ে পরিসংখ্যান বলছে, দেশে জ্বালানির বড় কোনো ঘাটতি নেই।
তবুও পেট্রোল পাম্পে মানুষের ভোগান্তি কমছে না। রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি পাম্পে দেখা গেছে, পাম্পের ভেতর থেকে শুরু হয়ে যানবাহনের লাইন প্রধান সড়ক পর্যন্ত চলে গেছে। অনেক চালককে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
মোটরসাইকেল চালক মেরাজ হোসেন বলেন, বিকেল ৫টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনো তেল পাইনি।
গ্রামাঞ্চলেও একই অবস্থা। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে কৃষকেরা সেচ পাম্পের জন্য জ্বালানি নিতে পেট্রোল পাম্পে ভিড় করছেন। অনেকেই সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না।
বেলকা ইউনিয়নের কৃষক ধীরেন চন্দ্র সরকার বলেন, এখন বোরো ধানক্ষেতে নিয়মিত পানি দিতে হয়। এক দিন পরপর পানি না দিলে ধান শুকিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজনীয় তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, দেশে জ্বালানি তেলের বড় কোনো সংকট নেই। বরং অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় অতিরিক্ত তেল কেনা এবং কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুতের কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে।
গতকাল তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ডিজেল মজুত রয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৬৩৩ টন, অকটেন ২৭ হাজার ৬০২ টন, পেট্রোল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫৪ টন এবং জেট ফুয়েল ২১ হাজার ৩৮২ টন।
অবৈধ মজুত ঠেকাতে সরকার ইতিমধ্যে অভিযানও শুরু করেছে। ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত এ ধরনের ৫৩টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এতে ৪৭টি মামলায় মোট ১ কোটি ৭২ লাখ ৮০ হাজার ৭১৫ টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং ১০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
