সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 জাতীয়জাতীয়

‘গর্বিত পিতা হতে চেয়েছিলাম: হলেছি ধর্ষিতার পিতা।

পল্লবীতে নৃশংসতার শিকার শিশুর বাবার কণ্ঠে এখন কেবলই হাহাকার। সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন রেখে তিনি বললেন, এই লাশের দায়ভার কার?

‘গর্বিত পিতা হতে চেয়েছিলাম: হলেছি ধর্ষিতার পিতা।
ছবি -সংগৃহীত

‘আমি একজন ধর্ষিতার বাবা, আমি একটি খণ্ডিত লাশের বাবা। কিন্তু আমি তো এভাবে পরিচিত হতে চাইনি। আমি তো চেয়েছিলাম গর্বিত পিতা হয়ে থাকতে।’ রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে যখন এই কথাগুলো উচ্চারিত হচ্ছিল, তখন উপস্থিত মানুষের চোখের কোণে জল আর গুমোট স্তব্ধতা। ‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে পল্লবীর সেই শিশুটির বাবা যখন মাইক্রোফোনে দাঁড়ালেন, তখন তিনি কেবল নিজের মেয়ের বিচার চাননি, চেয়েছেন প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ একটি সমাজ।

গত ১৯ মে পল্লবীর এক ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল আট বছরের সেই শিশুর খণ্ডিত দেহ। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত সোহেল বর্তমানে কারাগারে। ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় আগামী ৭ জুন মামলার রায় ঘোষণার কথা রয়েছে। তবে রায়ের প্রতীক্ষার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে এক শোকার্ত বাবার প্রশ্ন—‘এই দায় কি আমার অবহেলা, না রাষ্ট্রের?’ তিনি হাত জোড় করে সবার কাছে আবেদন জানান, তাকে যেন ‘ধর্ষিতার বাবা’ পরিচয় থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

বৈঠকে ওই বাবা তুলে ধরেন এক ভয়াবহ সামাজিক চিত্র। তিনি বলেন, ‘গতকাল বাড়িতে পাঁচ বছরের এক শিশু এসেছিল। সে এখন 'ধর্ষণ' শব্দটি শিখে গেছে। এই বয়সে তার তা জানার কথা নয়। সে এখন আর একা টয়লেটেও যেতে পারে না, মায়ের আঁচল ছাড়া নড়তে পারে না। এটাই কি তবে আজকের বাংলাদেশের শিশুদের মনের অবস্থা?’

এই হাহাকার কেবল এক বাবার নয়, পুরো সমাজের। শিশুটির বাবা জানান, ঘটনার পর থেকে তাঁর স্ত্রী পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার পথে। তিনি জানেন না তাঁর স্ত্রী সুস্থ হবেন কি না। নিজের বড় মেয়েকে নিয়েও তিনি চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি চান না আর কোনো বাবা-মায়ের বুক এভাবে খালি হোক, আর কেউ এভাবে ‘জিন্দা লাশ’ হয়ে বেঁচে থাকুক।

বিএনপির উদ্যোগে গঠিত ‘নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্যসহায়তা সেল’ আয়োজিত এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমানসহ বিশিষ্টজনেরা। বক্তারা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন, কেবল আইন করে নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করেই শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।

আগামী ৭ জুন যখন আদালত এই নৃশংস হত্যার রায় ঘোষণা করবেন, তখন কেবল একজন অপরাধীর সাজা হবে না, বরং রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার একটি বড় পরীক্ষা হবে। একটি শিশুর খণ্ডিত লাশের দায় কেবল অভিযুক্তের নয়, এই দায়ভার পুরো সমাজের—সেই বার্তাটিই যেন দিয়ে গেলেন সেই হতভাগ্য বাবা।

বিষয় : রামিসা হত্যাকান্ড পল্লবী শিশু হত্যা শিশু ধর্ষণ

‘গর্বিত পিতা হতে চেয়েছিলাম: হলেছি ধর্ষিতার পিতা।
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬


‘গর্বিত পিতা হতে চেয়েছিলাম: হলেছি ধর্ষিতার পিতা।

প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬

featured Image

‘আমি একজন ধর্ষিতার বাবা, আমি একটি খণ্ডিত লাশের বাবা। কিন্তু আমি তো এভাবে পরিচিত হতে চাইনি। আমি তো চেয়েছিলাম গর্বিত পিতা হয়ে থাকতে।’ রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে যখন এই কথাগুলো উচ্চারিত হচ্ছিল, তখন উপস্থিত মানুষের চোখের কোণে জল আর গুমোট স্তব্ধতা। ‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে পল্লবীর সেই শিশুটির বাবা যখন মাইক্রোফোনে দাঁড়ালেন, তখন তিনি কেবল নিজের মেয়ের বিচার চাননি, চেয়েছেন প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ একটি সমাজ।

গত ১৯ মে পল্লবীর এক ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল আট বছরের সেই শিশুর খণ্ডিত দেহ। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত সোহেল বর্তমানে কারাগারে। ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় আগামী ৭ জুন মামলার রায় ঘোষণার কথা রয়েছে। তবে রায়ের প্রতীক্ষার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে এক শোকার্ত বাবার প্রশ্ন—‘এই দায় কি আমার অবহেলা, না রাষ্ট্রের?’ তিনি হাত জোড় করে সবার কাছে আবেদন জানান, তাকে যেন ‘ধর্ষিতার বাবা’ পরিচয় থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

বৈঠকে ওই বাবা তুলে ধরেন এক ভয়াবহ সামাজিক চিত্র। তিনি বলেন, ‘গতকাল বাড়িতে পাঁচ বছরের এক শিশু এসেছিল। সে এখন 'ধর্ষণ' শব্দটি শিখে গেছে। এই বয়সে তার তা জানার কথা নয়। সে এখন আর একা টয়লেটেও যেতে পারে না, মায়ের আঁচল ছাড়া নড়তে পারে না। এটাই কি তবে আজকের বাংলাদেশের শিশুদের মনের অবস্থা?’

এই হাহাকার কেবল এক বাবার নয়, পুরো সমাজের। শিশুটির বাবা জানান, ঘটনার পর থেকে তাঁর স্ত্রী পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার পথে। তিনি জানেন না তাঁর স্ত্রী সুস্থ হবেন কি না। নিজের বড় মেয়েকে নিয়েও তিনি চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি চান না আর কোনো বাবা-মায়ের বুক এভাবে খালি হোক, আর কেউ এভাবে ‘জিন্দা লাশ’ হয়ে বেঁচে থাকুক।

বিএনপির উদ্যোগে গঠিত ‘নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্যসহায়তা সেল’ আয়োজিত এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমানসহ বিশিষ্টজনেরা। বক্তারা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন, কেবল আইন করে নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করেই শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।

আগামী ৭ জুন যখন আদালত এই নৃশংস হত্যার রায় ঘোষণা করবেন, তখন কেবল একজন অপরাধীর সাজা হবে না, বরং রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার একটি বড় পরীক্ষা হবে। একটি শিশুর খণ্ডিত লাশের দায় কেবল অভিযুক্তের নয়, এই দায়ভার পুরো সমাজের—সেই বার্তাটিই যেন দিয়ে গেলেন সেই হতভাগ্য বাবা।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত