জাতীয়
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) গাড়িচালক ছিলেন সৈয়দে আবেদ আলী। চাকরির সুবাদে কমিশনের অন্দরে অবাধ যাতায়াত ছিল তাঁর। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ১৯৯৭ সালে যে ছোটখাটো অনিয়ম আর ডামি পরীক্ষার্থী সরবরাহের কারবার শুরু করেছিলেন, তা কালক্রমে রূপ নেয় এক বিশাল দানবীয় সিন্ডিকেটে। প্রায় তিন দশক ধরে চলা এই অপকর্মের সাম্রাজ্য অবশেষে ধূলিসাৎ হয়েছে সিআইডির তদন্তে। সম্প্রতি আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে উঠে এসেছে প্রশ্নফাঁস আর নিয়োগ বাণিজ্যের এক লোমহর্ষক চিত্র, যেখানে জড়িত ৫৫ জন।
তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, শুরুতে আবেদ আলী পরীক্ষার্থীদের আসন ব্যবস্থা ও ডামি পরীক্ষার্থী সরবরাহের কাজ করতেন। একটি পদের বিপরীতে একজন প্রকৃত পরীক্ষার্থীর সঙ্গে দুজন ডামি যুক্ত করে ১ থেকে দেড় লাখ টাকা হাতিয়ে নিতেন তিনি। এরপর সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়াতে থাকেন তাঁর দৌরাত্ম্য। কালুর মতো এজেন্টদের মাধ্যমে সারা দেশে গড়ে তোলেন বিশাল এক নেটওয়ার্ক। হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা বিশ্লেষণ করে সিআইডি পেয়েছে বিস্ময়কর সব তথ্য। পরীক্ষার্থীদের কোড নাম দেওয়া হয়েছিল ‘মেহমান’। তাদের কোথায় রাখা হবে, কতজনের ব্যবস্থা করা যাবে—তা নিয়ে চলত নিয়মিত লেনদেন। ‘টাকা কই’, ‘লিস্ট পাঠাও’, ‘কাজ ১০০ ভাগ হবে’—এমন অসংখ্য বার্তার আদান-প্রদান প্রমাণ করে যে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সুসংগঠিত একটি অপরাধের কারবার ছিল।
নিয়োগ পরীক্ষার আগের দিন রাত যেন ছিল তাদের উৎসবের সময়। সাভারের বিভিন্ন রিসোর্টে পরীক্ষার্থীদের জড়ো করে চলত প্রশ্ন ও উত্তর সরবরাহের কর্মযজ্ঞ। বাংলাদেশ রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ৪৪ জন পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রশ্ন সরবরাহের জন্য অগ্রিম ৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য পেয়েছে সিআইডি। এ যেন এক অদ্ভুত বাণিজ্য, যেখানে মেধার কোনো মূল্যায়ন ছিল না, ছিল কেবল অর্থের ঝনঝনানি।
আবেদ আলীর ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোতে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে, তা আঁতকে ওঠার মতো। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে ১২টি ব্যাংক হিসাবে ৪১ কোটি ২৯ লাখ টাকার সন্ধান পেয়েছেন তদন্তকারীরা। এ ছাড়া রয়েছে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, যার কোনো বৈধ উৎস তিনি দেখাতে পারেননি। বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় কারাবন্দি থাকলেও প্রশ্নফাঁসের মামলার সব আসামি বর্তমানে জামিনে আছেন।
আগামী ১৪ জুন এই মামলার প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে। ৫৫ জন অভিযুক্তের মধ্যে ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও এখনো ১৯ জন পলাতক। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আশা করছেন, আগামী শুনানিতে চার্জশিট গৃহীত হলে বিচারের পথ প্রশস্ত হবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড—যাকে মেধাভিত্তিক হওয়ার কথা ছিল—সেই পিএসসির ভেতরে কীভাবে একজন চালক দিনের পর দিন এমন এক অন্ধকার জগৎ তৈরি করলেন? বিচার প্রক্রিয়ার দিকে এখন তাকিয়ে পুরো দেশ, যেখানে সাধারণ মানুষ দেখতে চায়, মেধার লড়াইয়ে জয়ী হতে আর কোনো আবেদ আলীর কাছে তাদের জিম্মি হতে হবে না।
2.png)
শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) গাড়িচালক ছিলেন সৈয়দে আবেদ আলী। চাকরির সুবাদে কমিশনের অন্দরে অবাধ যাতায়াত ছিল তাঁর। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ১৯৯৭ সালে যে ছোটখাটো অনিয়ম আর ডামি পরীক্ষার্থী সরবরাহের কারবার শুরু করেছিলেন, তা কালক্রমে রূপ নেয় এক বিশাল দানবীয় সিন্ডিকেটে। প্রায় তিন দশক ধরে চলা এই অপকর্মের সাম্রাজ্য অবশেষে ধূলিসাৎ হয়েছে সিআইডির তদন্তে। সম্প্রতি আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে উঠে এসেছে প্রশ্নফাঁস আর নিয়োগ বাণিজ্যের এক লোমহর্ষক চিত্র, যেখানে জড়িত ৫৫ জন।
তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, শুরুতে আবেদ আলী পরীক্ষার্থীদের আসন ব্যবস্থা ও ডামি পরীক্ষার্থী সরবরাহের কাজ করতেন। একটি পদের বিপরীতে একজন প্রকৃত পরীক্ষার্থীর সঙ্গে দুজন ডামি যুক্ত করে ১ থেকে দেড় লাখ টাকা হাতিয়ে নিতেন তিনি। এরপর সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়াতে থাকেন তাঁর দৌরাত্ম্য। কালুর মতো এজেন্টদের মাধ্যমে সারা দেশে গড়ে তোলেন বিশাল এক নেটওয়ার্ক। হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা বিশ্লেষণ করে সিআইডি পেয়েছে বিস্ময়কর সব তথ্য। পরীক্ষার্থীদের কোড নাম দেওয়া হয়েছিল ‘মেহমান’। তাদের কোথায় রাখা হবে, কতজনের ব্যবস্থা করা যাবে—তা নিয়ে চলত নিয়মিত লেনদেন। ‘টাকা কই’, ‘লিস্ট পাঠাও’, ‘কাজ ১০০ ভাগ হবে’—এমন অসংখ্য বার্তার আদান-প্রদান প্রমাণ করে যে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সুসংগঠিত একটি অপরাধের কারবার ছিল।
নিয়োগ পরীক্ষার আগের দিন রাত যেন ছিল তাদের উৎসবের সময়। সাভারের বিভিন্ন রিসোর্টে পরীক্ষার্থীদের জড়ো করে চলত প্রশ্ন ও উত্তর সরবরাহের কর্মযজ্ঞ। বাংলাদেশ রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ৪৪ জন পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রশ্ন সরবরাহের জন্য অগ্রিম ৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য পেয়েছে সিআইডি। এ যেন এক অদ্ভুত বাণিজ্য, যেখানে মেধার কোনো মূল্যায়ন ছিল না, ছিল কেবল অর্থের ঝনঝনানি।
আবেদ আলীর ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোতে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে, তা আঁতকে ওঠার মতো। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে ১২টি ব্যাংক হিসাবে ৪১ কোটি ২৯ লাখ টাকার সন্ধান পেয়েছেন তদন্তকারীরা। এ ছাড়া রয়েছে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, যার কোনো বৈধ উৎস তিনি দেখাতে পারেননি। বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় কারাবন্দি থাকলেও প্রশ্নফাঁসের মামলার সব আসামি বর্তমানে জামিনে আছেন।
আগামী ১৪ জুন এই মামলার প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে। ৫৫ জন অভিযুক্তের মধ্যে ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও এখনো ১৯ জন পলাতক। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আশা করছেন, আগামী শুনানিতে চার্জশিট গৃহীত হলে বিচারের পথ প্রশস্ত হবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড—যাকে মেধাভিত্তিক হওয়ার কথা ছিল—সেই পিএসসির ভেতরে কীভাবে একজন চালক দিনের পর দিন এমন এক অন্ধকার জগৎ তৈরি করলেন? বিচার প্রক্রিয়ার দিকে এখন তাকিয়ে পুরো দেশ, যেখানে সাধারণ মানুষ দেখতে চায়, মেধার লড়াইয়ে জয়ী হতে আর কোনো আবেদ আলীর কাছে তাদের জিম্মি হতে হবে না।
2.png)