সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

  বানিজ্য বানিজ্য

৫০% বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার এলএনজি কিনছে সরকার

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আগামী পাঁচ মাসের জন্য স্পট মার্কেট থেকে ১০ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এলএনজি কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি দাম গুনতে হতে পারে।

৫০% বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার এলএনজি কিনছে সরকার
ছবি -সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতেও। দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আগামী আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসের জন্য স্পট মার্কেট থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থার আওতায় ১০টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এলএনজি সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতি ইউনিট এলএনজির জন্য ১৭ থেকে ১৯ ডলার পর্যন্ত দর পাওয়া গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে কেনা গ্যাসের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) ও পেট্রোবাংলা ইতোমধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রস্তাব সংগ্রহ করেছে। প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন ও দরকষাকষি শেষে বিষয়টি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।

জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, জমা পড়া দর এখনো চূড়ান্ত নয়। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে মূল্য ও অন্যান্য শর্ত নির্ধারণের পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে একসঙ্গে পাঁচ মাসের এলএনজি কেনার পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে। অনেকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামও কমতে পারে। গত মাসেও একই ধরনের পরিস্থিতিতে প্রতি ইউনিটের দাম ১৮-১৯ ডলার থেকে নেমে ১৫-১৬ ডলারে এসেছিল।

বর্তমানে দেশে প্রতিদিন প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজির পরিমাণ ১০৫ কোটি ঘনফুটেরও বেশি। জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রতি মাসে ১০টির বেশি এলএনজি কার্গো আমদানি করতে হয় পেট্রোবাংলাকে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে, আগামী পাঁচ মাসে দেশের চাহিদা পূরণে ৫০টির বেশি এলএনজি কার্গো প্রয়োজন হবে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রতি মাসে মাত্র ৪ থেকে ৫টি কার্গো পাওয়া সম্ভব হওয়ায় বাকি চাহিদা স্পট মার্কেট থেকেই পূরণ করতে হবে।

সরকারি সূত্র জানায়, জি-টু-জি ব্যবস্থায় মোট ১৮টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করে দরপত্র জমা দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এখন মূল্য নিয়ে আলোচনা চলবে।

দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ভিটল, টোটালএনার্জিস, হ্যানবোর, গানভর, এমিরেটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি, অরচার এনার্জি ও সিকার ইন্টারন্যাশনালের যৌথ উদ্যোগ, এডনক ট্রেডিং, আইআরএইচ গ্লোবাল ট্রেডিং এবং সরকার ট্রেডিংসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী।

বর্তমান বাজারদরে প্রতি কার্গো এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয় হয় প্রায় ৬৫০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে প্রায় ৩০টি কার্গো আমদানিতে ব্যয় ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।

এদিকে সরকারের ভেতরেও এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এখনই পাঁচ মাসের জন্য চুক্তি হলে পরে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে গেলেও বাংলাদেশকে আগের উচ্চমূল্যেই এলএনজি কিনতে হবে।

বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার এনার্জি থেকে বাংলাদেশ প্রতি ইউনিট এলএনজি কিনছে ১৩ দশমিক ৭২ ডলারে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে কাতার, ওমান ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জিসহ কয়েকটি বড় সরবরাহকারী তাদের সরবরাহ সীমিত বা স্থগিত করেছে।

সম্প্রতি কাতার এনার্জি জানিয়েছে, সংঘাতে তাদের গ্যাসক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে আগের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কম এলএনজি সরবরাহ করতে হতে পারে। অন্য সরবরাহকারীরাও কবে পূর্ণমাত্রায় সরবরাহ শুরু করবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সময়সূচি দেয়নি।

এ পরিস্থিতিতে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে বাংলাদেশের। ফলে এলএনজি আমদানি ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত বছর এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও চলতি বছরে সেই ব্যয় বেড়ে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

বিষয় : এলএলজি

কাল মহাকাল

শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬


৫০% বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার এলএনজি কিনছে সরকার

প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুলাই ২০২৬

featured Image

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতেও। দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আগামী আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসের জন্য স্পট মার্কেট থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থার আওতায় ১০টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এলএনজি সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতি ইউনিট এলএনজির জন্য ১৭ থেকে ১৯ ডলার পর্যন্ত দর পাওয়া গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে কেনা গ্যাসের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) ও পেট্রোবাংলা ইতোমধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রস্তাব সংগ্রহ করেছে। প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন ও দরকষাকষি শেষে বিষয়টি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।

জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, জমা পড়া দর এখনো চূড়ান্ত নয়। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে মূল্য ও অন্যান্য শর্ত নির্ধারণের পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে একসঙ্গে পাঁচ মাসের এলএনজি কেনার পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে। অনেকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামও কমতে পারে। গত মাসেও একই ধরনের পরিস্থিতিতে প্রতি ইউনিটের দাম ১৮-১৯ ডলার থেকে নেমে ১৫-১৬ ডলারে এসেছিল।

বর্তমানে দেশে প্রতিদিন প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজির পরিমাণ ১০৫ কোটি ঘনফুটেরও বেশি। জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রতি মাসে ১০টির বেশি এলএনজি কার্গো আমদানি করতে হয় পেট্রোবাংলাকে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে, আগামী পাঁচ মাসে দেশের চাহিদা পূরণে ৫০টির বেশি এলএনজি কার্গো প্রয়োজন হবে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রতি মাসে মাত্র ৪ থেকে ৫টি কার্গো পাওয়া সম্ভব হওয়ায় বাকি চাহিদা স্পট মার্কেট থেকেই পূরণ করতে হবে।

সরকারি সূত্র জানায়, জি-টু-জি ব্যবস্থায় মোট ১৮টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করে দরপত্র জমা দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এখন মূল্য নিয়ে আলোচনা চলবে।

দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ভিটল, টোটালএনার্জিস, হ্যানবোর, গানভর, এমিরেটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি, অরচার এনার্জি ও সিকার ইন্টারন্যাশনালের যৌথ উদ্যোগ, এডনক ট্রেডিং, আইআরএইচ গ্লোবাল ট্রেডিং এবং সরকার ট্রেডিংসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী।

বর্তমান বাজারদরে প্রতি কার্গো এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয় হয় প্রায় ৬৫০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে প্রায় ৩০টি কার্গো আমদানিতে ব্যয় ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।

এদিকে সরকারের ভেতরেও এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এখনই পাঁচ মাসের জন্য চুক্তি হলে পরে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে গেলেও বাংলাদেশকে আগের উচ্চমূল্যেই এলএনজি কিনতে হবে।

বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার এনার্জি থেকে বাংলাদেশ প্রতি ইউনিট এলএনজি কিনছে ১৩ দশমিক ৭২ ডলারে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে কাতার, ওমান ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জিসহ কয়েকটি বড় সরবরাহকারী তাদের সরবরাহ সীমিত বা স্থগিত করেছে।

সম্প্রতি কাতার এনার্জি জানিয়েছে, সংঘাতে তাদের গ্যাসক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে আগের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কম এলএনজি সরবরাহ করতে হতে পারে। অন্য সরবরাহকারীরাও কবে পূর্ণমাত্রায় সরবরাহ শুরু করবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সময়সূচি দেয়নি।

এ পরিস্থিতিতে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে বাংলাদেশের। ফলে এলএনজি আমদানি ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত বছর এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও চলতি বছরে সেই ব্যয় বেড়ে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত