জাতীয়
কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সৃষ্ট বন্যায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় অর্ধশতাধিক মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি ফসলি জমি, মাছের খামার ও গবাদিপশু ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক হিসাবে শুধু মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪৮৮ কোটি টাকা।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এটি এখন পর্যন্ত প্রাথমিক হিসাব। মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ শেষ হলে আগামী সপ্তাহে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রকাশ করা হবে।
বন্যার শুরুতে প্রায় এক লাখ হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে চলে যায়। গত দুই দিনে বৃষ্টিপাত কমে আসায় কিছু এলাকায় পানি নেমেছে। তবে এখনো প্রায় ৮২ হাজার হেক্টর জমি প্লাবিত রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে আউশ ধান। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫৩ হাজার হেক্টর আউশ ধানের জমি এখনো পানির নিচে রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৯ হাজার হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ২০ হাজার হেক্টরের বেশি সবজির জমিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি খাতের আর্থিক ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
এবারের বন্যায় দেশের ৪৩টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ১৬টি জেলায়। এগুলো হলো চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, কুমিল্লা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, ঝালকাঠি, হবিগঞ্জ, নওগাঁ, যশোর, মেহেরপুর, বাগেরহাট ও বরগুনা।
বন্যার পানিতে পুকুর, ঘের ও মাছের খামার প্লাবিত হওয়ায় সবচেয়ে বড় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে মৎস্য খাতে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালীসহ উপকূলীয় অঞ্চলে অসংখ্য পুকুর ও চিংড়িঘেরের মাছ ভেসে গেছে। কুমিল্লা ও রাজশাহী অঞ্চলেও অনেক পুকুরে পানি ঢুকে মাছ বেরিয়ে যায়।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার মাছের খামার ও পুকুর, ৩ হাজার ৮৮৯টি মাছের ঘের এবং ৪৬টি মাছ ধরার নৌযান। বন্যার সময় পাঁচজন জেলের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। পাশাপাশি পুকুরের পাড় ভেঙে বিভিন্ন অবকাঠামোরও ক্ষতি হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৪ হাজার ৮১৯টি গবাদিপশুর খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ১৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ৬ হাজারের বেশি হাঁস-মুরগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আড়াই হাজারের বেশি মারা গেছে। এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা।
বন্যার কারণে প্রায় ১২ হাজার টন দানাদার পশুখাদ্য নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খড় ও ঘাসের খেতও। সব মিলিয়ে প্রাণিসম্পদ খাতের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮১ কোটি ৫ লাখ টাকা।
কৃষিবিদদের মতে, বন্যার কারণে খাদ্যশস্য, মাছ ও মুরগির সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে চালের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, প্রায় ১০ শতাংশ আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৩ লাখ টন চালের উৎপাদন কমে যেতে পারে। যদিও আমনের বীজতলা পুনরায় তৈরি করা সম্ভব, তবু সাময়িকভাবে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ পড়তে পারে। তবে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।
বন্যাকবলিত এলাকায় মানুষের পাশাপাশি পশুখাদ্যেরও সংকট দেখা দিয়েছে। জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত খামারি ও মৎস্যচাষিদের দ্রুত নগদ সহায়তা দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে পশুখাদ্যের সরবরাহ বাড়াতে হবে এবং সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে এগিয়ে আসতে হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম জানিয়েছেন, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সাতটি জেলার কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজও এগিয়ে চলছে।
2.png)
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুলাই ২০২৬
কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সৃষ্ট বন্যায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় অর্ধশতাধিক মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি ফসলি জমি, মাছের খামার ও গবাদিপশু ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক হিসাবে শুধু মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪৮৮ কোটি টাকা।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এটি এখন পর্যন্ত প্রাথমিক হিসাব। মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ শেষ হলে আগামী সপ্তাহে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রকাশ করা হবে।
বন্যার শুরুতে প্রায় এক লাখ হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে চলে যায়। গত দুই দিনে বৃষ্টিপাত কমে আসায় কিছু এলাকায় পানি নেমেছে। তবে এখনো প্রায় ৮২ হাজার হেক্টর জমি প্লাবিত রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে আউশ ধান। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫৩ হাজার হেক্টর আউশ ধানের জমি এখনো পানির নিচে রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৯ হাজার হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ২০ হাজার হেক্টরের বেশি সবজির জমিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি খাতের আর্থিক ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
এবারের বন্যায় দেশের ৪৩টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ১৬টি জেলায়। এগুলো হলো চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, কুমিল্লা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, ঝালকাঠি, হবিগঞ্জ, নওগাঁ, যশোর, মেহেরপুর, বাগেরহাট ও বরগুনা।
বন্যার পানিতে পুকুর, ঘের ও মাছের খামার প্লাবিত হওয়ায় সবচেয়ে বড় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে মৎস্য খাতে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালীসহ উপকূলীয় অঞ্চলে অসংখ্য পুকুর ও চিংড়িঘেরের মাছ ভেসে গেছে। কুমিল্লা ও রাজশাহী অঞ্চলেও অনেক পুকুরে পানি ঢুকে মাছ বেরিয়ে যায়।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার মাছের খামার ও পুকুর, ৩ হাজার ৮৮৯টি মাছের ঘের এবং ৪৬টি মাছ ধরার নৌযান। বন্যার সময় পাঁচজন জেলের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। পাশাপাশি পুকুরের পাড় ভেঙে বিভিন্ন অবকাঠামোরও ক্ষতি হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৪ হাজার ৮১৯টি গবাদিপশুর খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ১৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ৬ হাজারের বেশি হাঁস-মুরগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আড়াই হাজারের বেশি মারা গেছে। এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা।
বন্যার কারণে প্রায় ১২ হাজার টন দানাদার পশুখাদ্য নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খড় ও ঘাসের খেতও। সব মিলিয়ে প্রাণিসম্পদ খাতের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮১ কোটি ৫ লাখ টাকা।
কৃষিবিদদের মতে, বন্যার কারণে খাদ্যশস্য, মাছ ও মুরগির সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে চালের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, প্রায় ১০ শতাংশ আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৩ লাখ টন চালের উৎপাদন কমে যেতে পারে। যদিও আমনের বীজতলা পুনরায় তৈরি করা সম্ভব, তবু সাময়িকভাবে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ পড়তে পারে। তবে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।
বন্যাকবলিত এলাকায় মানুষের পাশাপাশি পশুখাদ্যেরও সংকট দেখা দিয়েছে। জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত খামারি ও মৎস্যচাষিদের দ্রুত নগদ সহায়তা দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে পশুখাদ্যের সরবরাহ বাড়াতে হবে এবং সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে এগিয়ে আসতে হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম জানিয়েছেন, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সাতটি জেলার কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজও এগিয়ে চলছে।
2.png)