সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 অর্থনীতিঅর্থনীতি

খেলাপি ঋণ ৬১ শতাংশ, ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণ বেহাল: রেজা কিবরিয়া

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আলোচনায় হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও অর্থনীতিবিদ রেজা কিবরিয়ার গভীর উদ্বেগ; খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা বদলে আসল চিত্র আড়াল করার অভিযোগ।

খেলাপি ঋণ ৬১ শতাংশ, ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণ বেহাল: রেজা কিবরিয়া
ছবি -সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী কোনো দেশে খেলাপি ঋণ ৬ শতাংশের ঘরে পৌঁছালেই চরম উদ্বেগ তৈরি হয়। অথচ বাংলাদেশে সেই খেলাপি ঋণের হার অবিশ্বাস্যভাবে ৬১ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। দেশের ব্যাংকিং খাতের এমন খাদের কিনারায় চলে যাওয়া নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে হবিগঞ্জ-১ আসনের এই সংসদ সদস্য এসব তথ্য তুলে ধরেন। বেলা ১১টায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের এই গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনটি শুরু হয়।

আইএমএফে দীর্ঘকাল কাজ করার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘আমি কর্মজীবনে বিশ্বের প্রায় ৩৫টি দেশে কাজ করেছি। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, মোট ঋণের মাত্র ৬ শতাংশ খেলাপি হলেই আমরা ঘাবড়ে যেতাম, নড়েচড়ে বসতাম। কিন্তু আজ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সেই খেলাপি ঋণের হার ৬১ শতাংশ! এর অর্থ হলো আমাদের ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণভাবে বেহাল হয়ে পড়েছে। এই খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে এখনই কড়া পদক্ষেপ না নিলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি আশা করাটা মস্ত বড় ভুল হবে।’ এ বিষয়ে তিনি অর্থমন্ত্রীর সরাসরি দৃষ্টি আকর্ষণ করে ব্যাংকিং দক্ষতা বাড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। এ সময় বিরোধী দলের সদস্যদের টেবিল চাপড়ে তাঁর এই বক্তব্যকে সমর্থন জানাতে দেখা যায়।

১৯৮৪ সালে আইএমএফে পেশাজীবন শুরু করা রেজা কিবরিয়া জানান, তিনি প্রায় ৪৫ বছর ধরে দেশী-বিদেশী অর্থনীতি খাত নিয়ে কাজ করছেন। সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, ব্যাংকিং খাতে কঠোর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দিন দিন বাড়তে থাকা আয়বৈষম্য কমানো ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতি কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম প্রধান গলদ ‘অদক্ষতা’ উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আমরা সাধারণ জনগণের কাছ থেকে মাত্র ৫ শতাংশ সুদে আমানত বা টাকা নিই। কিন্তু কোনো সৎ ব্যবসায়ী যখন ঋণ নিতে আসেন, তখন তাঁর কাছে ১৪ বা ১৬ শতাংশ পর্যন্ত চড়া সুদ দাবি করা হয়। স্প্রেড বা সুদের হারের এই আকাশচুম্বী ব্যবধানের কারণেই আমাদের ব্যাংকিং খাত কার্যকর হচ্ছে না।’ তাঁর মতে, একটি দক্ষ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত ও ঋণের সুদের হারের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৬ শতাংশের কাছাকাছি থাকা উচিত, যাতে সৎ ব্যবসায়ীরা সহজে ঋণ পেয়ে অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারেন।

বর্তমান সিস্টেমে খেলাপি ঋণের প্রকৃত ভয়াবহ চিত্র আড়াল করার অভিযোগ তুলে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘আমাদের পুরো ডিফল্ট বা খেলাপি সিস্টেমটাই ত্রুটিপূর্ণ। আমরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যাংকের খেলাপির সংজ্ঞাই পাল্টে দিয়েছি। আগে নিয়ম ছিল ৯০ দিন বা ৩ মাস ঋণের সুদ না দিলে তাকে খেলাপি বা ডিফল্ট বলা হতো। কিন্তু এখন আমরা ১ বছর পর্যন্ত সুদ না দিলেও তাকে খেলাপি বলছি না। এর চেয়ে বড় আত্মঘাতী নীতি আর হতে পারে না।’

বাজেট বক্তৃতার এক পর্যায়ে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হলে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল রেজা কিবরিয়াকে জিজ্ঞেস করেন, বক্তব্য শেষ করতে তাঁর আর কত সময় প্রয়োজন। জবাবে অত্যন্ত রসাত্মক ভঙ্গিতে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘আর মাত্র চার মিনিট দেন। পরে তো আমাকে আবার এটা ইউটিউবে ছাড়তে হবে।’ তাঁর এই চটজলদি ও অকপট মন্তব্যে পুরো সংসদ কক্ষে হাসির রোল ওঠে।

‘বিশ্ব অর্থনীতির বাস্তবতায় এই বাজেট বিস্ময়ের কিছু নয়’

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট টেনে এই সাংসদ বলেন, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির চলমান মন্থরতা ও মন্দার মধ্যে অর্থমন্ত্রী অত্যন্ত কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এই বাজেট প্রণয়ন করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতির সামগ্রিক সম্ভাবনা দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রতি ছয় মাস পর পর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কমিয়ে আনছে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতা মাথায় রাখলে অর্থমন্ত্রীর এই বাজেট খুব একটা বিস্ময়কর কিছু নয়।’

সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি আশার বাণী শুনিয়ে বলেন, দেশের মোট ঋণের পরিমাণ এখনো নিয়ন্ত্রণযোগ্য সীমার মধ্যেই রয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট ঋণের পরিমাণ জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রায় ৪০ শতাংশ এবং এই ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয় বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ। তবে বাণিজ্যিক বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়ানোর বিরুদ্ধে সতর্ক করে রেজা কিবরিয়া বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সুবিধা ও তুলনামূলক নামমাত্র সুদের কারণে বাংলাদেশের উচিত ঐতিহ্যগতভাবে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের (যেমন বিশ্বব্যাংক বা এডিবি) কাছ থেকে ঋণ নেওয়া, যার সুদের হার সাধারণত শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশের মধ্যে থাকে।

মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের সমীকরণ

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রধান শর্ত হিসেবে আখ্যা দিয়ে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘মুদ্রাস্ফীতি সবসময় কম রাখাটাই দেশের জন্য শ্রেয়। আমাদের টাকার এক্সচেঞ্জ রেট বা বিনিময় হার প্রতিবছর কমে যাওয়ার মূল কারণ হলো—আমাদের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোর মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে আমাদের দেশের মুদ্রাস্ফীতির তফাত। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের মুদ্রাস্ফীতি যদি ১০ শতাংশ হয় এবং আমাদের ট্রেডিং পার্টনারের মুদ্রাস্ফীতি ৩ শতাংশ হয়, তবে আমাদের বিনিময় হার বা টাকার মান ৭ শতাংশ কমবেই।’ তিনি মনে করেন, মূল্যস্ফীতি যেহেতু নীতিনির্ধারণ, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির মতো প্রায় সব ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে, তাই একে নিয়ন্ত্রণে রাখা সবচেয়ে জরুরি।

আয়বৈষম্য ও প্রবৃদ্ধির ভুল ধারণা

দেশের তীব্র আয়বৈষম্যের প্রসঙ্গ টেনে সাবেক সরকারগুলোর কড়া সমালোচনা করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, পূর্ববর্তী সরকারগুলো বৈষম্য কমাতে কোনো কার্যকর নীতি নিতে পারেনি। তিনি একটি অর্থনৈতিক তত্ত্ব দিয়ে বোঝান, ‘দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যখন অতিরিক্ত কোনো আয় করে, তখন তারা তার পুরোটাই বাজারে ব্যয় করে, যা সরাসরি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে ও গতি বাড়ায়। কিন্তু একজন অতি ধনী ব্যক্তি অতিরিক্ত অর্থ পেলে তা অলস ফেলে রাখতে পারেন বা বিদেশে পাচার করতে পারেন, ফলে অর্থনীতিতে তার প্রভাব নামমাত্র।’

সবশেষে দেশের তথাকথিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘শুধু বড় বড় বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ও চোখধাঁধানো শপিং মল নির্মাণ করলেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয় না। যদি আমাদের বিনিয়োগের সিংহভাগই ৭ হাজার বর্গফুটের বিশাল রাজকীয় অ্যাপার্টমেন্ট ও অনুৎপাদনশীল শপিং মল নির্মাণে আটকে থাকে, তবে তা দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কোনো উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে না।’

বিষয় : খেলাপি ঋণ রেজা কিবরিয়া

খেলাপি ঋণ ৬১ শতাংশ, ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণ বেহাল: রেজা কিবরিয়া
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬


খেলাপি ঋণ ৬১ শতাংশ, ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণ বেহাল: রেজা কিবরিয়া

প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬

featured Image

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী কোনো দেশে খেলাপি ঋণ ৬ শতাংশের ঘরে পৌঁছালেই চরম উদ্বেগ তৈরি হয়। অথচ বাংলাদেশে সেই খেলাপি ঋণের হার অবিশ্বাস্যভাবে ৬১ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। দেশের ব্যাংকিং খাতের এমন খাদের কিনারায় চলে যাওয়া নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে হবিগঞ্জ-১ আসনের এই সংসদ সদস্য এসব তথ্য তুলে ধরেন। বেলা ১১টায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের এই গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনটি শুরু হয়।

আইএমএফে দীর্ঘকাল কাজ করার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘আমি কর্মজীবনে বিশ্বের প্রায় ৩৫টি দেশে কাজ করেছি। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, মোট ঋণের মাত্র ৬ শতাংশ খেলাপি হলেই আমরা ঘাবড়ে যেতাম, নড়েচড়ে বসতাম। কিন্তু আজ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সেই খেলাপি ঋণের হার ৬১ শতাংশ! এর অর্থ হলো আমাদের ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণভাবে বেহাল হয়ে পড়েছে। এই খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে এখনই কড়া পদক্ষেপ না নিলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি আশা করাটা মস্ত বড় ভুল হবে।’ এ বিষয়ে তিনি অর্থমন্ত্রীর সরাসরি দৃষ্টি আকর্ষণ করে ব্যাংকিং দক্ষতা বাড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। এ সময় বিরোধী দলের সদস্যদের টেবিল চাপড়ে তাঁর এই বক্তব্যকে সমর্থন জানাতে দেখা যায়।

১৯৮৪ সালে আইএমএফে পেশাজীবন শুরু করা রেজা কিবরিয়া জানান, তিনি প্রায় ৪৫ বছর ধরে দেশী-বিদেশী অর্থনীতি খাত নিয়ে কাজ করছেন। সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, ব্যাংকিং খাতে কঠোর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দিন দিন বাড়তে থাকা আয়বৈষম্য কমানো ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতি কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম প্রধান গলদ ‘অদক্ষতা’ উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আমরা সাধারণ জনগণের কাছ থেকে মাত্র ৫ শতাংশ সুদে আমানত বা টাকা নিই। কিন্তু কোনো সৎ ব্যবসায়ী যখন ঋণ নিতে আসেন, তখন তাঁর কাছে ১৪ বা ১৬ শতাংশ পর্যন্ত চড়া সুদ দাবি করা হয়। স্প্রেড বা সুদের হারের এই আকাশচুম্বী ব্যবধানের কারণেই আমাদের ব্যাংকিং খাত কার্যকর হচ্ছে না।’ তাঁর মতে, একটি দক্ষ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত ও ঋণের সুদের হারের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৬ শতাংশের কাছাকাছি থাকা উচিত, যাতে সৎ ব্যবসায়ীরা সহজে ঋণ পেয়ে অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারেন।

বর্তমান সিস্টেমে খেলাপি ঋণের প্রকৃত ভয়াবহ চিত্র আড়াল করার অভিযোগ তুলে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘আমাদের পুরো ডিফল্ট বা খেলাপি সিস্টেমটাই ত্রুটিপূর্ণ। আমরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যাংকের খেলাপির সংজ্ঞাই পাল্টে দিয়েছি। আগে নিয়ম ছিল ৯০ দিন বা ৩ মাস ঋণের সুদ না দিলে তাকে খেলাপি বা ডিফল্ট বলা হতো। কিন্তু এখন আমরা ১ বছর পর্যন্ত সুদ না দিলেও তাকে খেলাপি বলছি না। এর চেয়ে বড় আত্মঘাতী নীতি আর হতে পারে না।’

বাজেট বক্তৃতার এক পর্যায়ে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হলে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল রেজা কিবরিয়াকে জিজ্ঞেস করেন, বক্তব্য শেষ করতে তাঁর আর কত সময় প্রয়োজন। জবাবে অত্যন্ত রসাত্মক ভঙ্গিতে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘আর মাত্র চার মিনিট দেন। পরে তো আমাকে আবার এটা ইউটিউবে ছাড়তে হবে।’ তাঁর এই চটজলদি ও অকপট মন্তব্যে পুরো সংসদ কক্ষে হাসির রোল ওঠে।

‘বিশ্ব অর্থনীতির বাস্তবতায় এই বাজেট বিস্ময়ের কিছু নয়’

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট টেনে এই সাংসদ বলেন, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির চলমান মন্থরতা ও মন্দার মধ্যে অর্থমন্ত্রী অত্যন্ত কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এই বাজেট প্রণয়ন করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতির সামগ্রিক সম্ভাবনা দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রতি ছয় মাস পর পর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কমিয়ে আনছে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতা মাথায় রাখলে অর্থমন্ত্রীর এই বাজেট খুব একটা বিস্ময়কর কিছু নয়।’

সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি আশার বাণী শুনিয়ে বলেন, দেশের মোট ঋণের পরিমাণ এখনো নিয়ন্ত্রণযোগ্য সীমার মধ্যেই রয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট ঋণের পরিমাণ জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রায় ৪০ শতাংশ এবং এই ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয় বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ। তবে বাণিজ্যিক বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়ানোর বিরুদ্ধে সতর্ক করে রেজা কিবরিয়া বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সুবিধা ও তুলনামূলক নামমাত্র সুদের কারণে বাংলাদেশের উচিত ঐতিহ্যগতভাবে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের (যেমন বিশ্বব্যাংক বা এডিবি) কাছ থেকে ঋণ নেওয়া, যার সুদের হার সাধারণত শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশের মধ্যে থাকে।

মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের সমীকরণ

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রধান শর্ত হিসেবে আখ্যা দিয়ে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘মুদ্রাস্ফীতি সবসময় কম রাখাটাই দেশের জন্য শ্রেয়। আমাদের টাকার এক্সচেঞ্জ রেট বা বিনিময় হার প্রতিবছর কমে যাওয়ার মূল কারণ হলো—আমাদের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোর মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে আমাদের দেশের মুদ্রাস্ফীতির তফাত। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের মুদ্রাস্ফীতি যদি ১০ শতাংশ হয় এবং আমাদের ট্রেডিং পার্টনারের মুদ্রাস্ফীতি ৩ শতাংশ হয়, তবে আমাদের বিনিময় হার বা টাকার মান ৭ শতাংশ কমবেই।’ তিনি মনে করেন, মূল্যস্ফীতি যেহেতু নীতিনির্ধারণ, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির মতো প্রায় সব ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে, তাই একে নিয়ন্ত্রণে রাখা সবচেয়ে জরুরি।

আয়বৈষম্য ও প্রবৃদ্ধির ভুল ধারণা

দেশের তীব্র আয়বৈষম্যের প্রসঙ্গ টেনে সাবেক সরকারগুলোর কড়া সমালোচনা করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, পূর্ববর্তী সরকারগুলো বৈষম্য কমাতে কোনো কার্যকর নীতি নিতে পারেনি। তিনি একটি অর্থনৈতিক তত্ত্ব দিয়ে বোঝান, ‘দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যখন অতিরিক্ত কোনো আয় করে, তখন তারা তার পুরোটাই বাজারে ব্যয় করে, যা সরাসরি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে ও গতি বাড়ায়। কিন্তু একজন অতি ধনী ব্যক্তি অতিরিক্ত অর্থ পেলে তা অলস ফেলে রাখতে পারেন বা বিদেশে পাচার করতে পারেন, ফলে অর্থনীতিতে তার প্রভাব নামমাত্র।’

সবশেষে দেশের তথাকথিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘শুধু বড় বড় বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ও চোখধাঁধানো শপিং মল নির্মাণ করলেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয় না। যদি আমাদের বিনিয়োগের সিংহভাগই ৭ হাজার বর্গফুটের বিশাল রাজকীয় অ্যাপার্টমেন্ট ও অনুৎপাদনশীল শপিং মল নির্মাণে আটকে থাকে, তবে তা দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কোনো উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে না।’


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত