অর্থনীতি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে ভ্যাটের আওতা বাড়াতে এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বর্তমানে দেশে ভ্যাট নিবন্ধিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। এনবিআর চাচ্ছে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করতে। আর এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে এনবিআর দেশের ৪৬৫টি বাণিজ্য সংগঠনের কাছে তাদের সদস্যদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও ভ্যাট নিবন্ধনের তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের বদলে সংগঠনগুলোকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের এই উদ্যোগ শুরু থেকেই ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও কিছুটা ভয়ের সঞ্চার করেছে।
বাণিজ্য সংগঠনগুলোর দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, গত মাস থেকেই এনবিআর সদস্য তালিকা চেয়ে এই চিঠি পাঠানো শুরু করেছে। চিঠিতে সদস্যদের নাম, ঠিকানা এবং ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর ই-মেইলে এক্সেল ফরমেটে জমা দিতে বলা হয়েছে। এনবিআরের এই তৎপরতার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো, যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো নিবন্ধনের আওতার বাইরে রয়ে গেছে, তাদের চিহ্নিত করে ভ্যাট নেটওয়ার্কের ভেতরে আনা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কোনো সংগঠনে গড়ে ২৫০ সদস্য থাকলেও মোট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যাবে, যা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়ক হবে।
তবে এনবিআরের এই পদ্ধতিকে ‘দায়িত্ব এড়ানোর কৌশল’ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ী নেতারা। বাংলাদেশ হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, ব্যবসায়ীরা যদি সংগঠনের সদস্য হয়ে এনবিআরের হয়রানির শিকার হওয়ার ভয় পান, তবে তারা সংগঠন বিমুখ হয়ে পড়বেন। এতে সমিতিগুলো দুর্বল হবে এবং ব্যবসায়ীদের আস্থা কমবে। এসি রুমে বসে তথ্য না খুঁজে মাঠপর্যায়ে জরিপ চালানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি আরও বলেন, এই ধরনের চিন্তা অবিবেচনাপ্রসূত এবং সংগঠনের ওপর অযাচিত দায়িত্ব চাপানোর শামিল। ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশের মতে, নিবন্ধনের নামে ঢালাও তালিকা সংগ্রহ করলে শেষ পর্যন্ত তা ব্যবসার পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলবে।
বাজেটকে সামনে রেখে এনবিআর অবশ্য বেশ কিছু ইতিবাচক প্রস্তাবও বিবেচনায় রাখছে। বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য করের বোঝা না বাড়িয়ে বরং আওতা বাড়ানোর পক্ষে ব্যবসায়ীরাই মত দিয়েছিলেন। এর অংশ হিসেবে এনবিআর পরীক্ষামূলকভাবে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক টার্নওভার বা লেনদেন রয়েছে—এমন ব্যবসায়ীদের জন্য বছরে মাত্র ১ হাজার টাকা নির্দিষ্ট ভ্যাট চালুর পরিকল্পনা করছে। এনবিআর আশা করছে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এই ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ দিলে ব্যবসায়ীরা নিজেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিবন্ধন নিতে আগ্রহী হবেন।
কিন্তু বাস্তব চিত্রটি বেশ চ্যালেঞ্জিং। বর্তমানে নিবন্ধিত ৮ লাখ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ নিয়মিত রিটার্ন জমা দেয় না। অর্থাৎ, ৩০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান খাতায়-কলমে নিবন্ধিত থাকলেও রাজস্ব প্রক্রিয়ায় নিয়মিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে নতুন নিবন্ধন বাড়ানোর চেয়ে বিদ্যমান নিবন্ধিতদের নিয়মিত করার ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
আগামী ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট পেশ করবেন। এবারের বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি। বিশাল এই বাজেটের জোগান নিশ্চিত করতে এনবিআরের ওপর রাজস্ব আদায়ের চাপ রয়েছে পাহাড়সম। আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে এনবিআর, যার মধ্যে ভ্যাট থেকেই আসবে ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপ ও ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণের এই দৌড়ে ব্যবসায়ীদের সাথে এনবিআরের বোঝাপড়া কতটা মসৃণ হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
বিষয় : #এনবিআর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভ্যাট
2.png)
মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে ভ্যাটের আওতা বাড়াতে এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বর্তমানে দেশে ভ্যাট নিবন্ধিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। এনবিআর চাচ্ছে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করতে। আর এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে এনবিআর দেশের ৪৬৫টি বাণিজ্য সংগঠনের কাছে তাদের সদস্যদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও ভ্যাট নিবন্ধনের তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের বদলে সংগঠনগুলোকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের এই উদ্যোগ শুরু থেকেই ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও কিছুটা ভয়ের সঞ্চার করেছে।
বাণিজ্য সংগঠনগুলোর দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, গত মাস থেকেই এনবিআর সদস্য তালিকা চেয়ে এই চিঠি পাঠানো শুরু করেছে। চিঠিতে সদস্যদের নাম, ঠিকানা এবং ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর ই-মেইলে এক্সেল ফরমেটে জমা দিতে বলা হয়েছে। এনবিআরের এই তৎপরতার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো, যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো নিবন্ধনের আওতার বাইরে রয়ে গেছে, তাদের চিহ্নিত করে ভ্যাট নেটওয়ার্কের ভেতরে আনা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কোনো সংগঠনে গড়ে ২৫০ সদস্য থাকলেও মোট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যাবে, যা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়ক হবে।
তবে এনবিআরের এই পদ্ধতিকে ‘দায়িত্ব এড়ানোর কৌশল’ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ী নেতারা। বাংলাদেশ হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, ব্যবসায়ীরা যদি সংগঠনের সদস্য হয়ে এনবিআরের হয়রানির শিকার হওয়ার ভয় পান, তবে তারা সংগঠন বিমুখ হয়ে পড়বেন। এতে সমিতিগুলো দুর্বল হবে এবং ব্যবসায়ীদের আস্থা কমবে। এসি রুমে বসে তথ্য না খুঁজে মাঠপর্যায়ে জরিপ চালানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি আরও বলেন, এই ধরনের চিন্তা অবিবেচনাপ্রসূত এবং সংগঠনের ওপর অযাচিত দায়িত্ব চাপানোর শামিল। ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশের মতে, নিবন্ধনের নামে ঢালাও তালিকা সংগ্রহ করলে শেষ পর্যন্ত তা ব্যবসার পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলবে।
বাজেটকে সামনে রেখে এনবিআর অবশ্য বেশ কিছু ইতিবাচক প্রস্তাবও বিবেচনায় রাখছে। বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য করের বোঝা না বাড়িয়ে বরং আওতা বাড়ানোর পক্ষে ব্যবসায়ীরাই মত দিয়েছিলেন। এর অংশ হিসেবে এনবিআর পরীক্ষামূলকভাবে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক টার্নওভার বা লেনদেন রয়েছে—এমন ব্যবসায়ীদের জন্য বছরে মাত্র ১ হাজার টাকা নির্দিষ্ট ভ্যাট চালুর পরিকল্পনা করছে। এনবিআর আশা করছে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এই ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ দিলে ব্যবসায়ীরা নিজেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিবন্ধন নিতে আগ্রহী হবেন।
কিন্তু বাস্তব চিত্রটি বেশ চ্যালেঞ্জিং। বর্তমানে নিবন্ধিত ৮ লাখ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ নিয়মিত রিটার্ন জমা দেয় না। অর্থাৎ, ৩০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান খাতায়-কলমে নিবন্ধিত থাকলেও রাজস্ব প্রক্রিয়ায় নিয়মিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে নতুন নিবন্ধন বাড়ানোর চেয়ে বিদ্যমান নিবন্ধিতদের নিয়মিত করার ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
আগামী ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট পেশ করবেন। এবারের বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি। বিশাল এই বাজেটের জোগান নিশ্চিত করতে এনবিআরের ওপর রাজস্ব আদায়ের চাপ রয়েছে পাহাড়সম। আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে এনবিআর, যার মধ্যে ভ্যাট থেকেই আসবে ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপ ও ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণের এই দৌড়ে ব্যবসায়ীদের সাথে এনবিআরের বোঝাপড়া কতটা মসৃণ হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
2.png)