রাজনীতি
ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ কাঁপানো তোফায়েল আহমেদ আর নেই। দীর্ঘদিন শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে সোমবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন এই প্রবীণ নেতা (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ২০২৪ সালের শুরু থেকেই গুরুতর অসুস্থ ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে ঘরবন্দী হয়ে পড়া তোফায়েলের জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছিল নিরিবিলি হাসপাতালের কেবিনে। জীবনের শেষবেলায় এসে দল যখন নিষিদ্ধ আর রাজনীতি যখন স্থবির, তখন একাকীত্বের অমোঘ নিয়তি মেনেই বিদায় নিলেন তিনি।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়ায় জন্ম নেওয়া তোফায়েল আহমেদ ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির স্রোতে গা ভাসিয়েছিলেন। ষাটের দশকের উত্তাল দিনগুলোতে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি হয়ে ওঠেন তুখোড় ছাত্রনেতা। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। সেই দিনগুলোতে তাঁর কণ্ঠই ছিল রাজপথের দাপট। ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়ার সেই মাহেন্দ্রক্ষণে ঘোষণাটি দিয়েছিলেন তোফায়েল আহমেদই।
১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়া তোফায়েল আহমেদ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের চার প্রধানের একজন হিসেবে বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর কারাবরণ, এরপর ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার নেপথ্যে সক্রিয় ভূমিকা—সব মিলিয়ে তোফায়েল আহমেদের ক্যারিয়ার ছিল উত্থান-পতনের এক অনন্য দলিল।
তবে রাজনীতির সমীকরণ বড় অদ্ভুত। নব্বইয়ের দশক থেকে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে টানা ১৬ বছর দাপটের সঙ্গে কাজ করলেও, এক-এগারোর সেনা-সমর্থিত সরকারের সময়ে ‘সংস্কারপন্থী’ তকমা তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বড় ধাক্কা হয়ে আসে। এরপর ধীরে ধীরে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে ছিটকে পড়েন তিনি। দলের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি, মন্ত্রিসভাতেও বারবার উপেক্ষিত হয়েছেন শেষদিকে। যদিও ৯ বার সংসদ সদস্য হওয়ার বিরল রেকর্ড গড়েছেন তিনি, কিন্তু জীবনের শেষ ভাগে এসে দলের ভেতরকার কোণঠাসা অবস্থান তাঁকে দিয়েছে অন্যরকম এক বিষাদ।
১৯৯৬ ও ২০১৪ সালে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও, দলের সভাপতি শেখ হাসিনার বিরাগভাজন হওয়ার পর থেকে নীতিনির্ধারণী ফোরামে তাঁর গুরুত্ব কমে যায়। এক সময়ের প্রভাবশালী এই নেতাকে শেষ দিকে থাকতে হয়েছিল দলের অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা পরিষদে। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ কালপর্বের সাক্ষী এই নেতা শেষ বিদায় নিলেন এমন এক সময়ে, যখন তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঠিকানা ও পরিচয়—উভয়ই বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি।
বিষয় : তোফায়েল আহমেদ
2.png)
মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬
ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ কাঁপানো তোফায়েল আহমেদ আর নেই। দীর্ঘদিন শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে সোমবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন এই প্রবীণ নেতা (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ২০২৪ সালের শুরু থেকেই গুরুতর অসুস্থ ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে ঘরবন্দী হয়ে পড়া তোফায়েলের জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছিল নিরিবিলি হাসপাতালের কেবিনে। জীবনের শেষবেলায় এসে দল যখন নিষিদ্ধ আর রাজনীতি যখন স্থবির, তখন একাকীত্বের অমোঘ নিয়তি মেনেই বিদায় নিলেন তিনি।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়ায় জন্ম নেওয়া তোফায়েল আহমেদ ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির স্রোতে গা ভাসিয়েছিলেন। ষাটের দশকের উত্তাল দিনগুলোতে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি হয়ে ওঠেন তুখোড় ছাত্রনেতা। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। সেই দিনগুলোতে তাঁর কণ্ঠই ছিল রাজপথের দাপট। ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়ার সেই মাহেন্দ্রক্ষণে ঘোষণাটি দিয়েছিলেন তোফায়েল আহমেদই।
১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়া তোফায়েল আহমেদ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের চার প্রধানের একজন হিসেবে বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর কারাবরণ, এরপর ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার নেপথ্যে সক্রিয় ভূমিকা—সব মিলিয়ে তোফায়েল আহমেদের ক্যারিয়ার ছিল উত্থান-পতনের এক অনন্য দলিল।
তবে রাজনীতির সমীকরণ বড় অদ্ভুত। নব্বইয়ের দশক থেকে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে টানা ১৬ বছর দাপটের সঙ্গে কাজ করলেও, এক-এগারোর সেনা-সমর্থিত সরকারের সময়ে ‘সংস্কারপন্থী’ তকমা তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বড় ধাক্কা হয়ে আসে। এরপর ধীরে ধীরে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে ছিটকে পড়েন তিনি। দলের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি, মন্ত্রিসভাতেও বারবার উপেক্ষিত হয়েছেন শেষদিকে। যদিও ৯ বার সংসদ সদস্য হওয়ার বিরল রেকর্ড গড়েছেন তিনি, কিন্তু জীবনের শেষ ভাগে এসে দলের ভেতরকার কোণঠাসা অবস্থান তাঁকে দিয়েছে অন্যরকম এক বিষাদ।
১৯৯৬ ও ২০১৪ সালে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও, দলের সভাপতি শেখ হাসিনার বিরাগভাজন হওয়ার পর থেকে নীতিনির্ধারণী ফোরামে তাঁর গুরুত্ব কমে যায়। এক সময়ের প্রভাবশালী এই নেতাকে শেষ দিকে থাকতে হয়েছিল দলের অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা পরিষদে। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ কালপর্বের সাক্ষী এই নেতা শেষ বিদায় নিলেন এমন এক সময়ে, যখন তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঠিকানা ও পরিচয়—উভয়ই বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি।
2.png)