সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 ইসলাম ও জীবনইসলাম ও জীবন

লোকদেখানো নয়, ত্যাগের মহিমায় হোক আপনার কুরবানি

পশু জবাই কেবল একটি বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা, আসল ইবাদত লুকানো থাকে অন্তরের তাকওয়ায়। আল্লাহর সন্তুষ্টির মাপকাঠিতে এবারের কুরবানিকে কীভাবে সার্থক করবেন, তা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

লোকদেখানো নয়, ত্যাগের মহিমায় হোক আপনার কুরবানি
ছবি -সংগৃহীত


ঈদুল আজহার সময় এলেই চারদিকে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। হাটে-মাঠে বড় বড় পশুর সমারোহ, দামি পশুর প্রদর্শনী আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা নিয়ে প্রতিযোগিতার আবহ—সব মিলিয়ে কুরবানির মূল সুর অনেক সময় হারিয়ে যেতে বসে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই যে এত বড় বড় পশু, এত ধুমধাম, তার কতটুকু সত্যিই আল্লাহর দরবারে কবুল হচ্ছে? ইসলাম কেবল বাহ্যিক চাকচিক্যের ধার ধারে না; আল্লাহ দেখেন হৃদয়ের ইখলাস বা বিশুদ্ধতা। পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, আল্লাহর কাছে পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না, পৌঁছায় কেবল বান্দার অন্তরের তাকওয়া। তাই কুরবানির সার্থকতা পশুর শারীরিক গঠনে নয়, বরং মালিকের নিয়ত ও অর্জনের উৎসস্থলে।

কুরবানি কবুল না হওয়ার পেছনে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় হারাম উপার্জন। কোনো ব্যক্তি যদি সুদ, ঘুষ, প্রতারণা কিংবা অন্যায্য পথে অর্জিত অর্থ দিয়ে পশু কেনেন, তবে বাহ্যিক আড়ম্বর যতই হোক, স্রষ্টার কাছে তা গ্রহণযোগ্য হয় না। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহ পবিত্র, আর তিনি কেবল পবিত্র বস্তুই গ্রহণ করেন। তাই কুরবানির পশুর চেয়েও জরুরি হলো নিজের উপার্জনের উৎসকে পবিত্র রাখা। পাশাপাশি বড় সংকটের জায়গা হলো আমাদের নিয়তের বিচ্যুতি। ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো ইখলাস। কুরবানি যদি নিছক সামাজিক মর্যাদা পাওয়া, প্রতিবেশীর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কিংবা লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে হয়, তবে সেই আমল আল্লাহর কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পশু কেনার ছবি প্রচারের যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা অনেক সময় ইবাদতের মাহাত্ম্যকে সংকুচিত করে ফেলে।

শরিকানা কুরবানির ক্ষেত্রেও অসতর্কতা কাম্য নয়। গরু বা উটে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারেন, কিন্তু সেই শরিকানায় প্রত্যেক অংশীদারের হিস্যা সমান হওয়া আবশ্যক। একজনের অংশ কম বা বেশি হলে বা অর্থের জোগান সমান না থাকলে কুরবানি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। মাংস বণ্টনের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। আবার অনেকের মূল উদ্দেশ্যই থাকে ফ্রিজ ভর্তি মাংস নিশ্চিত করা, যা ইবাদতের মূল সুরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কুরবানি তো ত্যাগের মহিমা, সেখানে মাংস সংগ্রহের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।

পশুর শারীরিক অবস্থার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের বিধানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, খুব দুর্বল, রোগাক্রান্ত, একচোখা বা খোঁড়া পশু দিয়ে কুরবানি আদায় হয় না। সুন্নাহর বিধান অমান্য করে ত্রুটিযুক্ত পশু নির্বাচন করলে সেই কুরবানি শরিয়তের মাপকাঠিতে শুদ্ধ হয় না। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়, ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর সেই অমর ত্যাগের ইতিহাস কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, তা ছিল ইমানের চূড়ান্ত পরীক্ষা। আজ আমাদের কুরবানি কেবল পশু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; এটি হওয়া উচিত দম্ভ ও অহংকার বিসর্জনের মাধ্যম। হালাল উপার্জন, বিশুদ্ধ নিয়ত ও তাকওয়া—এই তিনের সমন্বয়েই কুরবানি পূর্ণতা পায়। দিনশেষে, আমাদের প্রতিটি ইবাদতের লক্ষ্য হোক আল্লাহর নৈকট্য অর্জন, যেখানে কেবলই রবের সন্তুষ্টির জন্য আমরা নিজেদের অহং বিসর্জন দেব।


বিষয় : কুরবানির নিয়ম ঈদুল আজহা ২০২৬ কুরবানি কবুল হওয়ার শর্ত তাকওয়া ও কুরবানি হালাল কুরবানি ইবরাহিম (আ.)-এর ত্যাগ কুরবানির শিক্ষা

লোকদেখানো নয়, ত্যাগের মহিমায় হোক আপনার কুরবানি
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


লোকদেখানো নয়, ত্যাগের মহিমায় হোক আপনার কুরবানি

প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬

featured Image


ঈদুল আজহার সময় এলেই চারদিকে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। হাটে-মাঠে বড় বড় পশুর সমারোহ, দামি পশুর প্রদর্শনী আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা নিয়ে প্রতিযোগিতার আবহ—সব মিলিয়ে কুরবানির মূল সুর অনেক সময় হারিয়ে যেতে বসে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই যে এত বড় বড় পশু, এত ধুমধাম, তার কতটুকু সত্যিই আল্লাহর দরবারে কবুল হচ্ছে? ইসলাম কেবল বাহ্যিক চাকচিক্যের ধার ধারে না; আল্লাহ দেখেন হৃদয়ের ইখলাস বা বিশুদ্ধতা। পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, আল্লাহর কাছে পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না, পৌঁছায় কেবল বান্দার অন্তরের তাকওয়া। তাই কুরবানির সার্থকতা পশুর শারীরিক গঠনে নয়, বরং মালিকের নিয়ত ও অর্জনের উৎসস্থলে।

কুরবানি কবুল না হওয়ার পেছনে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় হারাম উপার্জন। কোনো ব্যক্তি যদি সুদ, ঘুষ, প্রতারণা কিংবা অন্যায্য পথে অর্জিত অর্থ দিয়ে পশু কেনেন, তবে বাহ্যিক আড়ম্বর যতই হোক, স্রষ্টার কাছে তা গ্রহণযোগ্য হয় না। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহ পবিত্র, আর তিনি কেবল পবিত্র বস্তুই গ্রহণ করেন। তাই কুরবানির পশুর চেয়েও জরুরি হলো নিজের উপার্জনের উৎসকে পবিত্র রাখা। পাশাপাশি বড় সংকটের জায়গা হলো আমাদের নিয়তের বিচ্যুতি। ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো ইখলাস। কুরবানি যদি নিছক সামাজিক মর্যাদা পাওয়া, প্রতিবেশীর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কিংবা লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে হয়, তবে সেই আমল আল্লাহর কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পশু কেনার ছবি প্রচারের যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা অনেক সময় ইবাদতের মাহাত্ম্যকে সংকুচিত করে ফেলে।

শরিকানা কুরবানির ক্ষেত্রেও অসতর্কতা কাম্য নয়। গরু বা উটে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারেন, কিন্তু সেই শরিকানায় প্রত্যেক অংশীদারের হিস্যা সমান হওয়া আবশ্যক। একজনের অংশ কম বা বেশি হলে বা অর্থের জোগান সমান না থাকলে কুরবানি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। মাংস বণ্টনের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। আবার অনেকের মূল উদ্দেশ্যই থাকে ফ্রিজ ভর্তি মাংস নিশ্চিত করা, যা ইবাদতের মূল সুরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কুরবানি তো ত্যাগের মহিমা, সেখানে মাংস সংগ্রহের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।

পশুর শারীরিক অবস্থার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের বিধানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, খুব দুর্বল, রোগাক্রান্ত, একচোখা বা খোঁড়া পশু দিয়ে কুরবানি আদায় হয় না। সুন্নাহর বিধান অমান্য করে ত্রুটিযুক্ত পশু নির্বাচন করলে সেই কুরবানি শরিয়তের মাপকাঠিতে শুদ্ধ হয় না। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়, ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর সেই অমর ত্যাগের ইতিহাস কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, তা ছিল ইমানের চূড়ান্ত পরীক্ষা। আজ আমাদের কুরবানি কেবল পশু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; এটি হওয়া উচিত দম্ভ ও অহংকার বিসর্জনের মাধ্যম। হালাল উপার্জন, বিশুদ্ধ নিয়ত ও তাকওয়া—এই তিনের সমন্বয়েই কুরবানি পূর্ণতা পায়। দিনশেষে, আমাদের প্রতিটি ইবাদতের লক্ষ্য হোক আল্লাহর নৈকট্য অর্জন, যেখানে কেবলই রবের সন্তুষ্টির জন্য আমরা নিজেদের অহং বিসর্জন দেব।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত