লাইফ স্টাইল
আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগের কথা। দক্ষিণ ইথিওপিয়ার কাফা অঞ্চলের নির্জন এক পাহাড়ে ছাগল চরাচ্ছিলেন খালিদ নামের এক আরব অধিবাসী। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন, বুনো এক গাছ থেকে টকটকে লাল জামের মতো কিছু ফল খাওয়ার পর তাঁর ছাগলগুলো এক অদ্ভুত চপলতায় মেতে উঠেছে। কৌতূহলী খালিদ সেই ফলগুলো সংগ্রহ করে সেদ্ধ করে পান করলেন এবং অনুভব করলেন এক অপূর্ব সতেজতা। ইতিহাসের সেই ক্ষণটিই ছিল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পানীয় ‘কফি’র জন্মলগ্ন। খালিদের সেই আবিষ্কার আজ বিশ্বজুড়ে মানুষের শিরা-উপশিরায় মিশে গেছে; বর্তমানে প্রতি বছর গড়ে একজন মানুষ প্রায় দুই কেজি কফি পান করেন।
ইথিওপিয়ার সেই কাফা অঞ্চল থেকেই কফি গাছের নাম হয় ‘অ্যারাবিকা’। শুরুতে ইথিওপিয়া থেকে কফি রফতানি হয় ইয়েমেনে। সেখানে সুফী-সাধকরা রাত জেগে ইবাদত ও দীর্ঘসময় ধ্যানে মগ্ন থাকার জন্য কফি পান করতে শুরু করেন। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে এটি মক্কা ও তুরস্ক হয়ে ১৬৪৫ সালে ইতালির ভেনিস নগরীতে পৌঁছায়। এরপর ১৬৫০ সালে পাস্ক রোসী নামের এক তুর্কি বংশোদ্ভূত ব্যক্তির হাত ধরে লন্ডনের লোম্বার্ড স্ট্রিটে যাত্রা শুরু করে প্রথম কফির দোকান। সেই থেকে কফি আর পেছনে ফিরে তাকায়নি; আভিজাত্য আর সতেজতার প্রতীক হয়ে এটি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়।
ইতিহাসের রোমাঞ্চকর পথ পাড়ি দিয়ে কফি আজ আমাদের ড্রয়িং রুমের নিয়মিত অনুষঙ্গ। তবে স্বাদের নেশায় বুঁদ থাকলেও এর স্বাস্থ্যগত দিকটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন নিয়ে কফিপ্রেমীদের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। হৃৎপিণ্ড যখন রক্ত পাম্প করে ধমনির দেয়ালের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তাকেই আমরা রক্তচাপ বলি। এর স্বাভাবিক মাত্রা ১২০/৮০ মিলিমিটার। কিন্তু যখনই এই মাত্রা ১৪০/৯০ বা তার বেশি হয়, তখনই তা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিসংখ্যান বলছে, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৩১ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন, যাদের বড় একটি অংশই এ সম্পর্কে অবগত নন।
কফিতে থাকা ক্যাফেইন আমাদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে। এটি অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে অ্যাড্রেনালিন হরমোন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে রক্তনালিগুলো কিছুটা সংকুচিত হয় এবং হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। কফি পানের ৩০ মিনিট থেকে ২ ঘণ্টার মধ্যে এর প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এই রক্তচাপ বৃদ্ধি সাময়িক হলেও, আগে থেকেই যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা হার্টের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি সচেতনতার দাবি রাখে।
প্রায় ৩ লক্ষ ১৫ হাজার মানুষের ওপর করা এক বৃহৎ গবেষণায় দেখা গেছে, কফি পানের সাথে দীর্ঘমেয়াদী হাইপারটেনশন বা স্থায়ী উচ্চ রক্তচাপের কোনো অকাট্য সম্পর্ক নেই। এমনকি ক্যাফেইনযুক্ত বা ক্যাফেইনমুক্ত—কোনো ধরনের কফিই স্থায়ীভাবে রক্তচাপ বাড়ানোর জন্য দায়ী নয়।
তবে সতর্কবার্তা আছে অন্য জায়গায়। জাপানের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের রক্তচাপ অত্যন্ত বেশি (সিস্টোলিক ১৬০ বা তার উপরে), তারা যদি দিনে দুই কাপ বা তার বেশি কফি পান করেন, তবে তাদের হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি দ্বিগুণ হতে পারে। অর্থাৎ, পরিমিতিবোধই এখানে আসল রক্ষাকবচ।
কফি বর্জন করার কোনো প্রয়োজন নেই, বরং প্রয়োজন সচেতনতা। কফিতে থাকা মেলানোইডিনস বা কুইনিক অ্যাসিডের মতো উপাদানগুলো রক্তনালির নমনীয়তা বাড়াতে সহায়তা করে। তবে যাদের রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত, তাদের জন্য দিনে এক কাপের বেশি কফি পান করা ঠিক হবে না। এছাড়া বিকেলের পর কফি পান না করাই ভালো, যাতে ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে। সুস্থ হৃদযন্ত্র আর কফির ধোঁয়া ওঠা স্বাদের মাঝে সেতুবন্ধন গড়তে চিকিৎসকের পরামর্শ ও নিজের শরীরের ভাষার ওপর নজর রাখাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬
আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগের কথা। দক্ষিণ ইথিওপিয়ার কাফা অঞ্চলের নির্জন এক পাহাড়ে ছাগল চরাচ্ছিলেন খালিদ নামের এক আরব অধিবাসী। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন, বুনো এক গাছ থেকে টকটকে লাল জামের মতো কিছু ফল খাওয়ার পর তাঁর ছাগলগুলো এক অদ্ভুত চপলতায় মেতে উঠেছে। কৌতূহলী খালিদ সেই ফলগুলো সংগ্রহ করে সেদ্ধ করে পান করলেন এবং অনুভব করলেন এক অপূর্ব সতেজতা। ইতিহাসের সেই ক্ষণটিই ছিল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পানীয় ‘কফি’র জন্মলগ্ন। খালিদের সেই আবিষ্কার আজ বিশ্বজুড়ে মানুষের শিরা-উপশিরায় মিশে গেছে; বর্তমানে প্রতি বছর গড়ে একজন মানুষ প্রায় দুই কেজি কফি পান করেন।
ইথিওপিয়ার সেই কাফা অঞ্চল থেকেই কফি গাছের নাম হয় ‘অ্যারাবিকা’। শুরুতে ইথিওপিয়া থেকে কফি রফতানি হয় ইয়েমেনে। সেখানে সুফী-সাধকরা রাত জেগে ইবাদত ও দীর্ঘসময় ধ্যানে মগ্ন থাকার জন্য কফি পান করতে শুরু করেন। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে এটি মক্কা ও তুরস্ক হয়ে ১৬৪৫ সালে ইতালির ভেনিস নগরীতে পৌঁছায়। এরপর ১৬৫০ সালে পাস্ক রোসী নামের এক তুর্কি বংশোদ্ভূত ব্যক্তির হাত ধরে লন্ডনের লোম্বার্ড স্ট্রিটে যাত্রা শুরু করে প্রথম কফির দোকান। সেই থেকে কফি আর পেছনে ফিরে তাকায়নি; আভিজাত্য আর সতেজতার প্রতীক হয়ে এটি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়।
ইতিহাসের রোমাঞ্চকর পথ পাড়ি দিয়ে কফি আজ আমাদের ড্রয়িং রুমের নিয়মিত অনুষঙ্গ। তবে স্বাদের নেশায় বুঁদ থাকলেও এর স্বাস্থ্যগত দিকটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন নিয়ে কফিপ্রেমীদের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। হৃৎপিণ্ড যখন রক্ত পাম্প করে ধমনির দেয়ালের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তাকেই আমরা রক্তচাপ বলি। এর স্বাভাবিক মাত্রা ১২০/৮০ মিলিমিটার। কিন্তু যখনই এই মাত্রা ১৪০/৯০ বা তার বেশি হয়, তখনই তা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিসংখ্যান বলছে, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৩১ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন, যাদের বড় একটি অংশই এ সম্পর্কে অবগত নন।
কফিতে থাকা ক্যাফেইন আমাদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে। এটি অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে অ্যাড্রেনালিন হরমোন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে রক্তনালিগুলো কিছুটা সংকুচিত হয় এবং হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। কফি পানের ৩০ মিনিট থেকে ২ ঘণ্টার মধ্যে এর প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এই রক্তচাপ বৃদ্ধি সাময়িক হলেও, আগে থেকেই যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা হার্টের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি সচেতনতার দাবি রাখে।
প্রায় ৩ লক্ষ ১৫ হাজার মানুষের ওপর করা এক বৃহৎ গবেষণায় দেখা গেছে, কফি পানের সাথে দীর্ঘমেয়াদী হাইপারটেনশন বা স্থায়ী উচ্চ রক্তচাপের কোনো অকাট্য সম্পর্ক নেই। এমনকি ক্যাফেইনযুক্ত বা ক্যাফেইনমুক্ত—কোনো ধরনের কফিই স্থায়ীভাবে রক্তচাপ বাড়ানোর জন্য দায়ী নয়।
তবে সতর্কবার্তা আছে অন্য জায়গায়। জাপানের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের রক্তচাপ অত্যন্ত বেশি (সিস্টোলিক ১৬০ বা তার উপরে), তারা যদি দিনে দুই কাপ বা তার বেশি কফি পান করেন, তবে তাদের হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি দ্বিগুণ হতে পারে। অর্থাৎ, পরিমিতিবোধই এখানে আসল রক্ষাকবচ।
কফি বর্জন করার কোনো প্রয়োজন নেই, বরং প্রয়োজন সচেতনতা। কফিতে থাকা মেলানোইডিনস বা কুইনিক অ্যাসিডের মতো উপাদানগুলো রক্তনালির নমনীয়তা বাড়াতে সহায়তা করে। তবে যাদের রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত, তাদের জন্য দিনে এক কাপের বেশি কফি পান করা ঠিক হবে না। এছাড়া বিকেলের পর কফি পান না করাই ভালো, যাতে ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে। সুস্থ হৃদযন্ত্র আর কফির ধোঁয়া ওঠা স্বাদের মাঝে সেতুবন্ধন গড়তে চিকিৎসকের পরামর্শ ও নিজের শরীরের ভাষার ওপর নজর রাখাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
2.png)