আন্তর্জাতিকআন্তর্জাতিক

যে চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বানিজ্য চুক্তি

এফ আই রাজীব
এফ আই রাজীব
যে চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে
ছবি -সংগৃহীত


একটি স্বাধীন দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়ার কথা ছিলো—নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার।  আধুনিক দুনিয়ায় একা চলার সুযোগ নেই কি ব্যাক্তির, কি দেশের । ফলে অন্য সকল দেশেরমত বাংলাদেশও বিশ্বের নানা দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, চুক্তি করে। যা স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়ারি অংশ। 

কিন্তু চুক্তি মানেই কেবল ছাড় দেওয়া হতে পারেনা। চুক্তির ভিত্তি হতে হয় মর্যাদার ওপর, সমতার ওপর। দুই পক্ষের স্বার্থ যদি সমানভাবে না থাকে, তাহলে সেটা চুক্তি নয়—একটা পক্ষের শর্ত মেনে নেওয়া।

এই বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৩২ পৃষ্ঠার একটি চুক্তি সই হয়েছে। চুক্তিটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ ও সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অনেকে মনে করছেন, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের চেয়ে আমেরিকার স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

চুক্তির ভেতরে কী আছে? একটু খুঁজলেই কিছু বিষয় চোখে পড়ে।

আমদানি তালিকা নিয়ে বিতর্ক

এই চুক্তিতে নানা ধরনের শূকরের মাংস আমদানির অবাধ সুযোগ প্রদানে বাধ্য করা হয়েছে যা বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না বলে অভিযোগ উঠেছে।  পণ্যের শুল্কসহ বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ও নিয়ন্ত্রণকাঠামো ঢেলে সাজানোর বাধ্যবাধকতার কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।  এমনকি বর্তমানে যেসব পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আছে, সেসব ক্ষেত্রেও বাধা শিথিলের ইঙ্গিত রয়েছে বলে সমালোচনা হচ্ছে। 

বিমান কিনতে হবে আমেরিকা থেকে

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ কেনা বাড়াতে হবে—এমন কথা চুক্তিতে রয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, এতে প্রতিযোগিতামূলক দামে অন্য দেশ থেকে বিমান কেনার সুযোগ কমে যাবে। দেশের টাকা বেশি খরচ হবে, কিন্তু বিকল্প বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থাকবে না।

জ্বালানিতে নির্ভরতার ফাঁদ?

আমেরিকা থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি বাড়ানোর বিষয়টি চুক্তিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই পথে হাঁটলে তুলনামূলক কম দামে অন্য দেশ থেকে জ্বালানি কেনার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। জ্বালানির মতো কৌশলগত খাতে এই ধরনের নির্ভরতা দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকির।

কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় শঙ্কা

নির্দিষ্ট পরিমাণ গম, সয়াবিনসহ কৃষিপণ্য আমেরিকা থেকে কিনতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে দেশের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং দেশকে খাদ্যে স্বনির্ভর করার যে চেষ্টা চলছে, সেটাও হোঁচট খাবে।

সামরিক ক্রয়ে বাধ্যবাধকতা

প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রেও শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আমেরিকা থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে এবং কিছু দেশ থেকে কেনাকাটায় সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত রয়েছে। এটি দেশের প্রতিরক্ষা নীতিতে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে বাধা হতে পারে।

বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?

আমদানি নীতিতে এমন বিধান রাখতে হবে, যাতে আমেরিকার পণ্য বিনা বাধায় বাংলাদেশের বাজারে ঢুকতে পারে। এমনকি আন্তর্জাতিক সনদ থাকলে সেই পণ্যের ওপর বাড়তি পরীক্ষা চালানোও যাবে না। ডিজিটাল তথ্য ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনায়ও এমন শর্ত আছে, যেখানে দেশের বাণিজ্যিক তথ্য বিদেশি পক্ষের কাছে উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া কৃষি ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকির তথ্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ভবিষ্যতে ভর্তুকি কমানোর চাপ তৈরি করতে পারে।

তবে চুক্তিতে একটি ইতিবাচক দিক আছে—৬০ দিনের নোটিসে এটি বাতিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আলোচনা দরকার। জাতীয় সংসদে বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা বিতর্ক হওয়া জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে যেসব শর্ত দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে, সেগুলো পুনর্বিবেচনার দাবি তোলা যেতে পারে।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বিশ্বাস করে। কিন্তু সেই সহযোগিতা হতে হবে মাথা উঁচু রেখে, নিজের স্বার্থ বুঝে। যে স্বাধীনতা লাখো মানুষের জীবনের বিনিময়ে এসেছে, সেটা কোনো চুক্তির কাগজে বিসর্জন দেওয়া যায় না।

বিষয় : অর্থনীতি

কাল মহাকাল

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬


যে চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে

প্রকাশের তারিখ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬

featured Image


একটি স্বাধীন দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়ার কথা ছিলো—নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার।  আধুনিক দুনিয়ায় একা চলার সুযোগ নেই কি ব্যাক্তির, কি দেশের । ফলে অন্য সকল দেশেরমত বাংলাদেশও বিশ্বের নানা দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, চুক্তি করে। যা স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়ারি অংশ। 

কিন্তু চুক্তি মানেই কেবল ছাড় দেওয়া হতে পারেনা। চুক্তির ভিত্তি হতে হয় মর্যাদার ওপর, সমতার ওপর। দুই পক্ষের স্বার্থ যদি সমানভাবে না থাকে, তাহলে সেটা চুক্তি নয়—একটা পক্ষের শর্ত মেনে নেওয়া।

এই বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৩২ পৃষ্ঠার একটি চুক্তি সই হয়েছে। চুক্তিটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ ও সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অনেকে মনে করছেন, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের চেয়ে আমেরিকার স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

চুক্তির ভেতরে কী আছে? একটু খুঁজলেই কিছু বিষয় চোখে পড়ে।

আমদানি তালিকা নিয়ে বিতর্ক

এই চুক্তিতে নানা ধরনের শূকরের মাংস আমদানির অবাধ সুযোগ প্রদানে বাধ্য করা হয়েছে যা বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না বলে অভিযোগ উঠেছে।  পণ্যের শুল্কসহ বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ও নিয়ন্ত্রণকাঠামো ঢেলে সাজানোর বাধ্যবাধকতার কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।  এমনকি বর্তমানে যেসব পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আছে, সেসব ক্ষেত্রেও বাধা শিথিলের ইঙ্গিত রয়েছে বলে সমালোচনা হচ্ছে। 

বিমান কিনতে হবে আমেরিকা থেকে

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ কেনা বাড়াতে হবে—এমন কথা চুক্তিতে রয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, এতে প্রতিযোগিতামূলক দামে অন্য দেশ থেকে বিমান কেনার সুযোগ কমে যাবে। দেশের টাকা বেশি খরচ হবে, কিন্তু বিকল্প বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থাকবে না।

জ্বালানিতে নির্ভরতার ফাঁদ?

আমেরিকা থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি বাড়ানোর বিষয়টি চুক্তিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই পথে হাঁটলে তুলনামূলক কম দামে অন্য দেশ থেকে জ্বালানি কেনার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। জ্বালানির মতো কৌশলগত খাতে এই ধরনের নির্ভরতা দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকির।

কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় শঙ্কা

নির্দিষ্ট পরিমাণ গম, সয়াবিনসহ কৃষিপণ্য আমেরিকা থেকে কিনতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে দেশের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং দেশকে খাদ্যে স্বনির্ভর করার যে চেষ্টা চলছে, সেটাও হোঁচট খাবে।

সামরিক ক্রয়ে বাধ্যবাধকতা

প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রেও শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আমেরিকা থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে এবং কিছু দেশ থেকে কেনাকাটায় সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত রয়েছে। এটি দেশের প্রতিরক্ষা নীতিতে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে বাধা হতে পারে।

বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?

আমদানি নীতিতে এমন বিধান রাখতে হবে, যাতে আমেরিকার পণ্য বিনা বাধায় বাংলাদেশের বাজারে ঢুকতে পারে। এমনকি আন্তর্জাতিক সনদ থাকলে সেই পণ্যের ওপর বাড়তি পরীক্ষা চালানোও যাবে না। ডিজিটাল তথ্য ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনায়ও এমন শর্ত আছে, যেখানে দেশের বাণিজ্যিক তথ্য বিদেশি পক্ষের কাছে উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া কৃষি ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকির তথ্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ভবিষ্যতে ভর্তুকি কমানোর চাপ তৈরি করতে পারে।

তবে চুক্তিতে একটি ইতিবাচক দিক আছে—৬০ দিনের নোটিসে এটি বাতিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আলোচনা দরকার। জাতীয় সংসদে বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা বিতর্ক হওয়া জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে যেসব শর্ত দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে, সেগুলো পুনর্বিবেচনার দাবি তোলা যেতে পারে।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বিশ্বাস করে। কিন্তু সেই সহযোগিতা হতে হবে মাথা উঁচু রেখে, নিজের স্বার্থ বুঝে। যে স্বাধীনতা লাখো মানুষের জীবনের বিনিময়ে এসেছে, সেটা কোনো চুক্তির কাগজে বিসর্জন দেওয়া যায় না।


কাল মহাকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ সম্পাদক আলী
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত