বিনোদন
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের কণ্ঠ থেকে যায়। কিছু শিল্পী মঞ্চ ছেড়ে যান, কিন্তু তাঁদের সুর থামে না। আর কিছু কিংবদন্তি মৃত্যুর পরও হয়ে ওঠেন আরও জীবন্ত। আইয়ুব বাচ্চু তেমনই একজন।
আজ ১৬ আগস্ট। বাংলা ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি এই শিল্পীর জন্মদিন। ১৯৬২ সালের এই দিনে চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া আইয়ুব বাচ্চু বেঁচে থাকলে আজ ৬৪ বছরে পা দিতেন। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর মাত্র ৫৬ বছর বয়সে থেমে যায় তাঁর জীবন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া গান, গিটার আর স্মৃতি আজও অসংখ্য শ্রোতার হৃদয়ে বাজে।
চট্টগ্রাম থেকে শুরু, স্বপ্ন ছিল সুরের
আইয়ুব বাচ্চুর সংগীতজীবনের শুরু কৈশোরেই। গিটার হাতে তিনি যে পথচলা শুরু করেছিলেন, তা ধীরে ধীরে তাঁকে নিয়ে যায় বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের কেন্দ্রবিন্দুতে।
১৯৭০-এর দশকে বিভিন্ন ব্যান্ডে গিটার বাজানোর মধ্য দিয়ে তাঁর সংগীতজীবনের ভিত তৈরি হয়। ১৯৮০ সালে তিনি যোগ দেন সোলস-এ। সেখানে প্রায় এক দশক গিটারিস্ট, গীতিকার ও সংগীতশিল্পী হিসেবে কাজ করেন। সোলসের সঙ্গে তাঁর সময়টি ছিল নিজেকে তৈরি করার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তবে বাচ্চুর স্বপ্ন ছিল আরও বড়। নিজের সংগীতভাষা তৈরি করার সেই স্বপ্ন থেকেই ১৯৯১ সালে জন্ম নেয় এলআরবি (Love Runs Blind)। পরে এই ব্যান্ডই হয়ে ওঠে তাঁর পরিচয়ের অন্যতম প্রধান অংশ।
এলআরবি ও বাংলা রকের নতুন অধ্যায়
এলআরবির মাধ্যমে আইয়ুব বাচ্চু বাংলা ব্যান্ড সংগীতকে নিয়ে যান অন্য এক উচ্চতায়। তাঁর গিটার ছিল শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়—সেটি যেন তাঁর অনুভূতির আরেকটি ভাষা।
১৯৯২ সালে এলআরবির প্রথম দুটি অ্যালবাম একসঙ্গে প্রকাশিত হয়। এরপর ‘সুখ’ অ্যালবামের ‘চলো বদলে যাই’ গানটি শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। গানটি শুধু একটি ব্যান্ডের সাফল্য ছিল না; এটি নব্বইয়ের দশকের তরুণদের আবেগ ও স্বপ্নের সঙ্গে মিশে যাওয়া এক সংগীত হয়ে ওঠে।
সেই সময় বাংলাদেশের শহর থেকে মফস্বল—ক্যাসেট প্লেয়ারে, চায়ের দোকানে, বাসে কিংবা বন্ধুর আড্ডায় বেজে উঠত বাচ্চুর গান। তাঁর কণ্ঠে প্রেম ছিল, অভিমান ছিল, বিচ্ছেদ ছিল, আবার ছিল জীবনের প্রতি এক অদ্ভুত টান।
গিটার হাতে যে মানুষটি হয়ে উঠলেন ‘বস’
আইয়ুব বাচ্চুর সবচেয়ে বড় পরিচয়গুলোর একটি ছিল তাঁর গিটার।
বাংলাদেশে রক গিটারকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। মঞ্চে তিনি যখন গিটার হাতে দাঁড়াতেন, তখন দর্শকের চোখ আটকে থাকত তাঁর আঙুলের গতিতে। গিটারের প্রতিটি নোট যেন বলে দিত—এই মানুষটি শুধু গান করেন না, তিনি সুরকে অনুভব করেন।
সহশিল্পী ও ভক্তদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘বস’ নামে। তাঁর মৃত্যুর পরও সংগীতাঙ্গনে এই সম্বোধনটি যেন তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধারই প্রতীক হয়ে আছে।
একক শিল্পী হিসেবেও অনন্য
আইয়ুব বাচ্চুর সাফল্য শুধু এলআরবির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। একক শিল্পী হিসেবেও তিনি তৈরি করেছিলেন শক্তিশালী অবস্থান।
১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম ‘রক্ত গোলাপ’। এরপর ‘ময়না’, ‘কষ্ট’সহ একাধিক অ্যালবাম তাঁকে পৌঁছে দেয় আরও বড় শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে। বিশেষ করে ‘কষ্ট’ অ্যালবামটি তাঁর একক ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় কাজ হয়ে ওঠে।
‘কষ্ট’, ‘নীল বেদনা’, ‘কেউ সুখী নয়’, ‘হাসতে দেখ’—এমন বহু গান শ্রোতাদের ব্যক্তিগত জীবনের গল্পের সঙ্গে মিশে গেছে।
কারও কাছে তাঁর গান ছিল প্রেমের স্মৃতি, কারও কাছে বিচ্ছেদের সঙ্গী, আবার কারও কাছে নিঃসঙ্গ রাতের একমাত্র আশ্রয়।
‘আম্মাজান’ থেকে চলচ্চিত্রের গান
আইয়ুব বাচ্চু শুধু ব্যান্ড ও অ্যালবামের শিল্পী ছিলেন না। চলচ্চিত্রের গানেও তাঁর শক্তিশালী উপস্থিতি ছিল।
‘আম্মাজান’ গানটি তাঁর কণ্ঠের অন্যতম স্মরণীয় সৃষ্টি। বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গানের তালিকায় এটি আজও বিশেষভাবে আলোচিত।
তাঁর কণ্ঠে মায়ের প্রতি ভালোবাসা, সন্তানের আকুতি ও আবেগ এমনভাবে ফুটে উঠেছিল যে গানটি সিনেমার গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।
ব্যক্তিজীবন ছিল আড়ালেই
মঞ্চে আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন বিস্ফোরণ। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে তিনি অনেকটাই ছিলেন পরিবারকেন্দ্রিক।
তিনি বিয়ে করেন ফেরদৌসী চন্দনা বাচ্চুকে। তাঁদের দুই সন্তান—এক ছেলে ও এক মেয়ে। সংগীতের ব্যস্ততার মাঝেও পরিবার ছিল তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাঁর ব্যক্তিজীবনের অনেকটাই তিনি প্রচারের বাইরে রেখেছিলেন। তাই শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে যতটা আলোচনা হয়েছে, মানুষ আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে ততটা নয়।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
দীর্ঘ সংগীতজীবনে আইয়ুব বাচ্চু পেয়েছেন বহু পুরস্কার ও সম্মাননা। তিনি ছয়বার মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার পেয়েছেন। এলআরবির সঙ্গে পেয়েছেন সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড এবং ২০০৪ সালে বাচসাস পুরস্কারেও সম্মানিত হন। ২০১৭ সালে পান টেলি সিনে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড।
আর ২০২৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক দেওয়ার ঘোষণা আসে—বাংলাদেশের সংগীতে তাঁর দীর্ঘ অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে যা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
শেষ দিনটি এসেছিল হঠাৎ
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর। সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেদিনই আচমকা থেমে যায় বাংলাদেশের রক সংগীতের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
ঢাকার বাসায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আইয়ুব বাচ্চু। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর।
খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না কেউ।
যে মানুষটি মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষকে গান শুনিয়েছেন, যাঁর গিটারের শব্দে উচ্ছ্বসিত হয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম—তিনি আর মঞ্চে উঠবেন না। আর কোন নতুন গান নয়। আর কোনো নতুন গিটার সলো নয়।
আর কোনো মঞ্চে সেই পরিচিত কণ্ঠে বলা হবে না—‘কেমন আছেন?’
‘রুপালি গিটার’ আজও বাজে
আইয়ুব বাচ্চু নিজের গানে লিখেছিলেন—
‘এই রুপালি গিটার ফেলে একদিন চলে যাব দূরে, বহুদূরে।’
শেষ পর্যন্ত কথাগুলো যেন এক নির্মম সত্য হয়ে ফিরে আসে।
২০১৮ সালে সত্যিই তিনি তাঁর রুপালি গিটার ফেলে চলে গেলেন বহুদূরে। তবে সুরের জগতে দূরত্ব বলে কিছু নেই। তাঁর গান আজও বাজে। নতুন প্রজন্ম তাঁর গান শোনে। নতুন শিল্পীরা তাঁর গান গেয়ে শ্রদ্ধা জানায়। আর পুরোনো শ্রোতারা ফিরে যান নিজেদের কৈশোর-তারুণ্যের দিনগুলোতে। আজ জন্মদিন, কিন্তু নেই জন্মদিনের মানুষটি।
আজ তাঁর ৬৪তম জন্মদিন।
আজ হয়তো কোথাও তাঁর ছবি সামনে রেখে ভক্তরা ফুল দেবেন। কোথাও বাজবে ‘চলো বদলে যাই’। কোথাও কেউ নিঃশব্দে শুনবেন ‘কষ্ট’। কেউ হয়তো গিটারের তারে তুলে নেবেন তাঁর কোনো সুর।
কিন্তু যাঁকে ঘিরে এই আয়োজন—তিনি নেই।
এই অনুপস্থিতিই আজকের দিনটিকে আরও আবেগঘন করে তোলে।
আইয়ুব বাচ্চু শুধু একজন গায়ক ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটি সময়ের কণ্ঠস্বর। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের এক গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা। তাঁর গিটার ছিল এক প্রজন্মের সাহস, তাঁর গান ছিল এক প্রজন্মের ভালোবাসা, আর তাঁর কণ্ঠ ছিল অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ।
মানুষের জীবন থেমে যায়। কিন্তু শিল্পীর জীবন থামে না—যদি তাঁর সৃষ্টি মানুষের মনে থেকে যায়। আইয়ুব বাচ্চু তাই আজও আছেন।
কখনো গিটারের তারে, কখনো পুরোনো ক্যাসেটের শব্দে, কখনো কোনো বিষণ্ন সন্ধ্যায়, আবার কখনো তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে।
রুপালি গিটারটি তিনি ফেলে গেছেন। কিন্তু সুরের পথটি আজও তাঁরই।
সংক্ষিপ্ত তথ্য
নাম: আইয়ুব বাচ্চু
জন্ম: ১৬ আগস্ট ১৯৬২, চট্টগ্রাম
মৃত্যু: ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ঢাকা
ব্যান্ড: সোলস, এলআরবি
প্রথম একক অ্যালবাম: রক্ত গোলাপ
উল্লেখযোগ্য গান: চলো বদলে যাই, কষ্ট, নীল বেদনা, কেউ সুখী নয়, আম্মাজানসহ অসংখ্য গান
বিশেষ পরিচিতি: গায়ক, গীতিকার, সুরকার ও গিটারিস্ট
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি: ২০২৬ সালে মরণোত্তর একুশে পদক
বিষয় : আইয়ুব বাচ্চু এলআরবি আম্মাজান কষ্ট হাসতে দেখ
2.png)
রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ আগস্ট ২০২৬
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের কণ্ঠ থেকে যায়। কিছু শিল্পী মঞ্চ ছেড়ে যান, কিন্তু তাঁদের সুর থামে না। আর কিছু কিংবদন্তি মৃত্যুর পরও হয়ে ওঠেন আরও জীবন্ত। আইয়ুব বাচ্চু তেমনই একজন।
আজ ১৬ আগস্ট। বাংলা ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি এই শিল্পীর জন্মদিন। ১৯৬২ সালের এই দিনে চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া আইয়ুব বাচ্চু বেঁচে থাকলে আজ ৬৪ বছরে পা দিতেন। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর মাত্র ৫৬ বছর বয়সে থেমে যায় তাঁর জীবন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া গান, গিটার আর স্মৃতি আজও অসংখ্য শ্রোতার হৃদয়ে বাজে।
চট্টগ্রাম থেকে শুরু, স্বপ্ন ছিল সুরের
আইয়ুব বাচ্চুর সংগীতজীবনের শুরু কৈশোরেই। গিটার হাতে তিনি যে পথচলা শুরু করেছিলেন, তা ধীরে ধীরে তাঁকে নিয়ে যায় বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের কেন্দ্রবিন্দুতে।
১৯৭০-এর দশকে বিভিন্ন ব্যান্ডে গিটার বাজানোর মধ্য দিয়ে তাঁর সংগীতজীবনের ভিত তৈরি হয়। ১৯৮০ সালে তিনি যোগ দেন সোলস-এ। সেখানে প্রায় এক দশক গিটারিস্ট, গীতিকার ও সংগীতশিল্পী হিসেবে কাজ করেন। সোলসের সঙ্গে তাঁর সময়টি ছিল নিজেকে তৈরি করার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তবে বাচ্চুর স্বপ্ন ছিল আরও বড়। নিজের সংগীতভাষা তৈরি করার সেই স্বপ্ন থেকেই ১৯৯১ সালে জন্ম নেয় এলআরবি (Love Runs Blind)। পরে এই ব্যান্ডই হয়ে ওঠে তাঁর পরিচয়ের অন্যতম প্রধান অংশ।
এলআরবি ও বাংলা রকের নতুন অধ্যায়
এলআরবির মাধ্যমে আইয়ুব বাচ্চু বাংলা ব্যান্ড সংগীতকে নিয়ে যান অন্য এক উচ্চতায়। তাঁর গিটার ছিল শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়—সেটি যেন তাঁর অনুভূতির আরেকটি ভাষা।
১৯৯২ সালে এলআরবির প্রথম দুটি অ্যালবাম একসঙ্গে প্রকাশিত হয়। এরপর ‘সুখ’ অ্যালবামের ‘চলো বদলে যাই’ গানটি শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। গানটি শুধু একটি ব্যান্ডের সাফল্য ছিল না; এটি নব্বইয়ের দশকের তরুণদের আবেগ ও স্বপ্নের সঙ্গে মিশে যাওয়া এক সংগীত হয়ে ওঠে।
সেই সময় বাংলাদেশের শহর থেকে মফস্বল—ক্যাসেট প্লেয়ারে, চায়ের দোকানে, বাসে কিংবা বন্ধুর আড্ডায় বেজে উঠত বাচ্চুর গান। তাঁর কণ্ঠে প্রেম ছিল, অভিমান ছিল, বিচ্ছেদ ছিল, আবার ছিল জীবনের প্রতি এক অদ্ভুত টান।
গিটার হাতে যে মানুষটি হয়ে উঠলেন ‘বস’
আইয়ুব বাচ্চুর সবচেয়ে বড় পরিচয়গুলোর একটি ছিল তাঁর গিটার।
বাংলাদেশে রক গিটারকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। মঞ্চে তিনি যখন গিটার হাতে দাঁড়াতেন, তখন দর্শকের চোখ আটকে থাকত তাঁর আঙুলের গতিতে। গিটারের প্রতিটি নোট যেন বলে দিত—এই মানুষটি শুধু গান করেন না, তিনি সুরকে অনুভব করেন।
সহশিল্পী ও ভক্তদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘বস’ নামে। তাঁর মৃত্যুর পরও সংগীতাঙ্গনে এই সম্বোধনটি যেন তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধারই প্রতীক হয়ে আছে।
একক শিল্পী হিসেবেও অনন্য
আইয়ুব বাচ্চুর সাফল্য শুধু এলআরবির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। একক শিল্পী হিসেবেও তিনি তৈরি করেছিলেন শক্তিশালী অবস্থান।
১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম ‘রক্ত গোলাপ’। এরপর ‘ময়না’, ‘কষ্ট’সহ একাধিক অ্যালবাম তাঁকে পৌঁছে দেয় আরও বড় শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে। বিশেষ করে ‘কষ্ট’ অ্যালবামটি তাঁর একক ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় কাজ হয়ে ওঠে।
‘কষ্ট’, ‘নীল বেদনা’, ‘কেউ সুখী নয়’, ‘হাসতে দেখ’—এমন বহু গান শ্রোতাদের ব্যক্তিগত জীবনের গল্পের সঙ্গে মিশে গেছে।
কারও কাছে তাঁর গান ছিল প্রেমের স্মৃতি, কারও কাছে বিচ্ছেদের সঙ্গী, আবার কারও কাছে নিঃসঙ্গ রাতের একমাত্র আশ্রয়।
‘আম্মাজান’ থেকে চলচ্চিত্রের গান
আইয়ুব বাচ্চু শুধু ব্যান্ড ও অ্যালবামের শিল্পী ছিলেন না। চলচ্চিত্রের গানেও তাঁর শক্তিশালী উপস্থিতি ছিল।
‘আম্মাজান’ গানটি তাঁর কণ্ঠের অন্যতম স্মরণীয় সৃষ্টি। বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গানের তালিকায় এটি আজও বিশেষভাবে আলোচিত।
তাঁর কণ্ঠে মায়ের প্রতি ভালোবাসা, সন্তানের আকুতি ও আবেগ এমনভাবে ফুটে উঠেছিল যে গানটি সিনেমার গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।
ব্যক্তিজীবন ছিল আড়ালেই
মঞ্চে আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন বিস্ফোরণ। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে তিনি অনেকটাই ছিলেন পরিবারকেন্দ্রিক।
তিনি বিয়ে করেন ফেরদৌসী চন্দনা বাচ্চুকে। তাঁদের দুই সন্তান—এক ছেলে ও এক মেয়ে। সংগীতের ব্যস্ততার মাঝেও পরিবার ছিল তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাঁর ব্যক্তিজীবনের অনেকটাই তিনি প্রচারের বাইরে রেখেছিলেন। তাই শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে যতটা আলোচনা হয়েছে, মানুষ আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে ততটা নয়।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
দীর্ঘ সংগীতজীবনে আইয়ুব বাচ্চু পেয়েছেন বহু পুরস্কার ও সম্মাননা। তিনি ছয়বার মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার পেয়েছেন। এলআরবির সঙ্গে পেয়েছেন সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড এবং ২০০৪ সালে বাচসাস পুরস্কারেও সম্মানিত হন। ২০১৭ সালে পান টেলি সিনে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড।
আর ২০২৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক দেওয়ার ঘোষণা আসে—বাংলাদেশের সংগীতে তাঁর দীর্ঘ অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে যা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
শেষ দিনটি এসেছিল হঠাৎ
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর। সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেদিনই আচমকা থেমে যায় বাংলাদেশের রক সংগীতের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
ঢাকার বাসায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আইয়ুব বাচ্চু। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর।
খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না কেউ।
যে মানুষটি মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষকে গান শুনিয়েছেন, যাঁর গিটারের শব্দে উচ্ছ্বসিত হয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম—তিনি আর মঞ্চে উঠবেন না। আর কোন নতুন গান নয়। আর কোনো নতুন গিটার সলো নয়।
আর কোনো মঞ্চে সেই পরিচিত কণ্ঠে বলা হবে না—‘কেমন আছেন?’
‘রুপালি গিটার’ আজও বাজে
আইয়ুব বাচ্চু নিজের গানে লিখেছিলেন—
‘এই রুপালি গিটার ফেলে একদিন চলে যাব দূরে, বহুদূরে।’
শেষ পর্যন্ত কথাগুলো যেন এক নির্মম সত্য হয়ে ফিরে আসে।
২০১৮ সালে সত্যিই তিনি তাঁর রুপালি গিটার ফেলে চলে গেলেন বহুদূরে। তবে সুরের জগতে দূরত্ব বলে কিছু নেই। তাঁর গান আজও বাজে। নতুন প্রজন্ম তাঁর গান শোনে। নতুন শিল্পীরা তাঁর গান গেয়ে শ্রদ্ধা জানায়। আর পুরোনো শ্রোতারা ফিরে যান নিজেদের কৈশোর-তারুণ্যের দিনগুলোতে। আজ জন্মদিন, কিন্তু নেই জন্মদিনের মানুষটি।
আজ তাঁর ৬৪তম জন্মদিন।
আজ হয়তো কোথাও তাঁর ছবি সামনে রেখে ভক্তরা ফুল দেবেন। কোথাও বাজবে ‘চলো বদলে যাই’। কোথাও কেউ নিঃশব্দে শুনবেন ‘কষ্ট’। কেউ হয়তো গিটারের তারে তুলে নেবেন তাঁর কোনো সুর।
কিন্তু যাঁকে ঘিরে এই আয়োজন—তিনি নেই।
এই অনুপস্থিতিই আজকের দিনটিকে আরও আবেগঘন করে তোলে।
আইয়ুব বাচ্চু শুধু একজন গায়ক ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটি সময়ের কণ্ঠস্বর। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের এক গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা। তাঁর গিটার ছিল এক প্রজন্মের সাহস, তাঁর গান ছিল এক প্রজন্মের ভালোবাসা, আর তাঁর কণ্ঠ ছিল অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ।
মানুষের জীবন থেমে যায়। কিন্তু শিল্পীর জীবন থামে না—যদি তাঁর সৃষ্টি মানুষের মনে থেকে যায়। আইয়ুব বাচ্চু তাই আজও আছেন।
কখনো গিটারের তারে, কখনো পুরোনো ক্যাসেটের শব্দে, কখনো কোনো বিষণ্ন সন্ধ্যায়, আবার কখনো তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে।
রুপালি গিটারটি তিনি ফেলে গেছেন। কিন্তু সুরের পথটি আজও তাঁরই।
সংক্ষিপ্ত তথ্য
নাম: আইয়ুব বাচ্চু
জন্ম: ১৬ আগস্ট ১৯৬২, চট্টগ্রাম
মৃত্যু: ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ঢাকা
ব্যান্ড: সোলস, এলআরবি
প্রথম একক অ্যালবাম: রক্ত গোলাপ
উল্লেখযোগ্য গান: চলো বদলে যাই, কষ্ট, নীল বেদনা, কেউ সুখী নয়, আম্মাজানসহ অসংখ্য গান
বিশেষ পরিচিতি: গায়ক, গীতিকার, সুরকার ও গিটারিস্ট
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি: ২০২৬ সালে মরণোত্তর একুশে পদক
2.png)